ভূগোল

ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয় কিভাবে?

ঘুর্ণিঝড় পরবর্তী বিপর্যয় থেকে যতটা পারা যায় কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য তার ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই পূর্বাভাসের বিষয়টিও ক্রমশ উন্নততর হচ্ছে। যে বিজ্ঞানের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র, তার প্রভাব ইত্যাদি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তা হল ট্রপিকাল সাইক্লোন ফোরকাস্টিং (Tropical Cyclone Forecasting)। ট্রপিকাল সাইক্লোন ফোরকাস্টিং এর কয়েকটি পদ্ধতি আছে যার মাধ্যমে এই পূর্বাভাসগুলি দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন- গতিপথের পূর্বাভাস, (Track Forecasting), প্রাবল্যের পূর্বাভাস (Intensity Forecasting), বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস (Rainfall Forecasting), ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলোছ্বাস ও ঋতুকালীন ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস (Storm Surge, tornado, and Seasonal forecasting)।

বিগত কয়েক বছর ধরে প্রাবল্যের পূর্বাভাসের পদ্ধতিটি অপরিবর্তিত থেকে গিয়েছে। তবে ১৯৮০-এর দশকে আটলান্টিক অববাহিকা অঞ্চল থেকে ঋতুকালীন পূর্বাভাস দেওয়া শুরু হয়েছে, যা চলতি বছরগুলিতে অন্যান্য অববাহিকা অঞ্চলেও ছড়িয়ে গিয়েছে। প্রাথমিকভাবে লেফটেন্যান্ট উইলিয়াম রিড (Lt. William Reed) তাঁর পূর্বাভাসের ভিত্তি হিসেবে ব্যারোমিটারের চাপের পরিমাপকে ব্যবহার করেছিলেন।

বেনিটো ভাইন্স (Benito Vines) মেঘের পরিবর্তনের ধারার ওপর নির্ভর করে প্রথম পূর্বাভাসের পদ্ধতি নির্দিষ্ট করেন। বিশ শতকের শুরুর দিকে সরাসরি আবহাওয়া দপ্তরে বসে করা পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে অধিকাংশ পূর্বাভাস দেওয়া হত। তখনও রেডিওর আবির্ভাব না হওয়ায় সমুদ্রের মধ্যে জাহাজে বসে করা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পূর্বাভাসের বিষয়টি কার্যকরী করা যায়নি। ১৯৩০ সাল নাগাদ ট্রপিকাল সাইক্লোন ফোরকাস্টিংয়ে রেডিওসোন্ডসের (Radisondes) ব্যবহার ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাসের কাজে সাহায্য করে। সময় যত এগিয়েছে এই প্রযুক্তি তত উন্নত হয়েছে।

১৯৬০ সালে প্রথম আবহাওয়া উপগ্রহ (Weather Satellite, TIROS-I) আসায় ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে একটি নবযুগের সূচনা হয়, যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে সমুদ্রের ওপর ভাসমান বয়ার ওপরে যন্ত্রপাতি রেখে টেলিমেট্রির (Telimetry) মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করাও বেশ জনপ্রিয় হয়। ১৯৭০ এর দশকের শেষের দিকে উইলিয়াম গ্রে (Wuilliam Grey) গবেষণা করে দেখান যে ঘূর্ণিঝড়ের জন্য বেশ কিছু কারণ দায়ী থাকে। নিজের গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই তিনি ঋতুকালীন ঘূর্ণিঝড়ের পরিসংখ্যানগত পূর্বাভাস নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেন।  তাঁর এই গবেষণা এবং তৎপরবর্তী কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত সফল হিসেবে পরিচিতি পায়। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাসের এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের পর জেনে নেওয়া যাক গোটা বিশ্বে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাসের মান্য পদ্ধতিগুলি ঠিক কেমন।

১) গতিপথের পূর্বাভাসঃ এই পদ্ধতিতে প্রতি ৬ থেকে ১২ ঘন্টা অন্তর পাঁচ দিনে ঘূর্ণিঝড়টি কোথায় কোথায় এগোতে পারে সেই বিষয়ে পূর্বাভাস দেওয়া হয়ে থাকে। এখানে লার্জ-স্কেল সাইনপ্টিক ফ্লো (Large-scale Synoptic Scale) একটি সাইক্লোনের গতিকে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে  নির্ধারণ করার চেষ্টা করে। সাইক্লোনের গতি এবং দিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটি বিশেষ উপযোগী ভূমিকা পালন করেছে। সাইক্লোনের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী উপাদানগুলি সম্বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে পূর্বাভাসের কিছু মডেল (Model) এবং পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকা উপগ্রহ এবং অন্যান্য সেন্সরের (Sensor) সাহায্যে বিগত কয়েক দশকে বিজ্ঞানীরা এই ‘লার্জ-স্কেল সাইনপ্টিক ফ্লো পদ্ধতিটির কার্যকারিতা বাড়িয়েছেন কারণ এই পদ্ধতিটি সঠিক না হলে পূর্বাভাসের অন্যান্য পদ্ধতিতেও গলদ থাকাই স্বাভাবিক।

২) প্রাবল্যের পূর্বাভাসঃ আবহাওয়াবিদেরা বলেন যে তাঁরা গতিপথের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রাবল্যের পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা কম অভিজ্ঞ। প্রাবল্যের পূর্বাভাস যথাযথ হওয়ার জন্য গতিপথের পূর্বাভাস যথাযথ হওয়া ভীষণ দরকার, বিশেষ করে বৃহৎ দ্বীপ আছে এমন এলাকায়। কারণ, স্থলভাগ সাইক্লোনের উৎপত্তির একটি বড় নির্ধারক উপাদান। ঘূর্ণবাতের চক্ষুর অবস্থানও ঘূর্ণিঝড়ের প্রাবল্যের মাত্রার ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং এটির সম্পর্কে পূর্বাভাস পাওয়াও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই পদ্ধতিটি সেই বিষয়ে ধারণা দিতে সক্ষম।

৩) বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসঃ ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে অতিবৃষ্টির এবং তার ফলে বন্যার আশঙ্কা অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা। ফলে বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এক্ষেত্রেও অনুসরণের পূর্বাভাস সঠিক থাকা ভীষণ জরুরি। ঘূর্ণিঝড়ের অনুসরণের পূর্বাভাস সঠিক থাকলে তবেই সেই ঘূর্ণিঝড়ক্লিষ্ট এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ কেমন হতে পারে এবং তার ফলে কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে তার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।

৪) ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলোছ্বাস এবং ঋতুকালীন ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাসঃ ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বেশি হলে এবং অন্যান্য উপাদান যা তাকে পুষ্ট করে তা মজুত থাকলে ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস এবং তা থেকে বৃহত্তর ক্ষতি হওয়া অস্বাভাবিক কিছুই নয়। ফলে, এই সংক্রান্ত পূর্বাভাস পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। অনুসরণের পূর্বাভাস থেকে শুরু করে প্রাবল্যের পূর্বাভাস সবকিছু সঠিক থাকলে ঘূর্ণিঝড় এবং তার ফলে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের যথাযথ পূর্বাভাস পাওয়া যায়। অন্যদিকে বিভিন্ন জলবায়ুর মাপকাঠিতে আবহাওয়ার বার্ষিক তারতম্যের ওপর নির্ভর করে আবহাওয়াবিদেরা নির্দিষ্ট ঋতুতে হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দিতে পারেন।

ঘূর্ণিঝড়ের পুর্বাভাস সম্পর্কে যে আলোচনা এতক্ষণ করা হল তা মূলত গোটা বিশ্বের নিরিখে করা একটি সামগ্রিক আলোচনা। এই প্রসঙ্গে ভারত সরকারের ভূবিজ্ঞান মন্ত্রকের (Ministry of Earth Sciences) তরফ থেকে প্রতিটি রাজ্য সরকারকে একটি চতুর্স্তরীয় সংকেতবার্তা পাঠানো হয় যার মূল উদ্দেশ্যই হলো রাজ্যগুলিকে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া।

এর  প্রথম স্তরটি হল, ঘূর্ণিঝড় পূর্ববর্তী পর্যবেক্ষণ (Pre Cyclone Watch)। এই স্তরে ঘূর্ণিঝড় শুরু হওয়ার ৭২ ঘন্টা আগে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে থাকা রাজ্যগুলিকে এবং উপকূলীয় এলাকার মানুষজনকে পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় স্তরটি হল, সাইক্লোন সতর্কতা (Cyclone Alert)। এই স্তরে ঘূর্ণিঝড় শুরু হওয়ার ৪৮ ঘন্টা আগে পূর্বাভাস দেওয়া হয়।  মৎস্যজীবী, সাধারণ মানুষজন, গণমাধ্যম, এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কর্মীদের বিশেষ সতর্কবার্তা জানানো হয়।

সতর্কবার্তার তৃতীয় স্তরের নাম ঘূর্ণিঝড় সাবধানবাণী (Cyclone Warning)। এই স্তরে ঘূর্ণিঝড় শুরু হওয়ার ২৪ ঘন্টা আগে থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। ৩ ঘন্টার ব্যবধানে ঘূর্ণিঝড়ের বর্তমান অবস্থা, তার প্রাবল্য, স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সম্ভাব্য সময়, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, হাওয়ার গতিবেগ, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও তার প্রভাব এবং সাধারণ মানুষ, মৎস্যজীবী, গণমাধ্যম এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরকে তাঁদের করণীয় সম্পর্কে সচেতনবার্তা ও সাবধানবাণী দেওয়া হতে থাকে।

চতুর্থ স্তরটি হল, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী অবস্থা (Post Landfall Outlook)। এই স্তরে ঘূর্ণিঝড় শুরু হওয়ার ১২ ঘন্টা আগে ঘূর্ণিঝড় স্থলভাগে আছড়ে পরার পরে প্রত্যন্ত এলাকায় কী ধরণের আবহাওয়া থাকতে পারে সেই সংক্রান্ত পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

বিভিন্ন স্তরের সতর্কবার্তার জন্য কিছু রঙ নির্দিষ্ট করা আছে। যেমন দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ স্তরের রঙ হলো যথাক্রমে হলুদ, কমলা এবং লাল। বঙ্গোপসাগর বা আরব সাগরের আবহাওয়া খারাপ হলে যে বন্দরগুলির ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি থাকে সেই বন্দরের কর্তৃপক্ষদের আগে থেকেই নির্দিষ্ট চিহ্ন দেখিয়ে সাবধান করে দেওয়া হয়। আবহাওয়া অস্বাভাবিক থাকলে মৎস্যজীবীদের দিনে চারবার সাবধান করা হয়। উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষ এবং মৎস্যজীবীদের রাজ্য প্রশাসন, সর্বভারতীয় বেতারকেন্দ্র এবং জাতীয় গণমাধ্যমের সাহায্যে সচেতন করে দেওয়া হয়। এইভাবেই ভারতবর্ষে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়ে থাকে।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।