ইতিহাস

বরুণ বিশ্বাস

বরুণ বিশ্বাস (Barun Biswas) একজন ভারতীয় বাঙালি বিশিষ্ট সমাজসেবী ও শিক্ষক যিনি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণার সুঁটিয়া অঞ্চলে ঘটে চলা গণধর্ষণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে দুষ্কৃতীদের হাতে প্রাণ দেন। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে সাধারণ মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়িয়ে সাহস জোগানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। প্রতিবাদের জ্বলন্ত প্রতিমুর্তি ছিলেন বরুণ বিশ্বাস। নির্ভীক অকুতোভয় এই শিক্ষক রাজনৈতিক ছত্রছায়ার বাইরে এসে এককভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছিল। তাঁর এই পদক্ষেপে গ্রামের মানুষেরও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর সাহস জুগিয়েছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন আক্ষরিক অর্থে জননেতা।

১৯৭২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর উত্তর চব্বিশ পরগণার শেষপ্রান্তের গ্রাম সুঁটিয়ায় বরুণ বিশ্বাসের জন্ম হয়। বরুণের বাবার নাম জগদীশ বিশ্বাস ও মায়ের নাম গীতা বিশ্বাস। বরুণ তাঁদের ছোট ছেলে। তাঁদের আদি নিবাস ছিল বাংলাদেশের ফরিদপুর। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাঁরা উত্তর চব্বিশ পরগণার সুঁটিয়ায় এসে বসতি স্হাপন করেন। জগদীশ বিশ্বাস তাঁর সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালানোর জন্য দিনে দিনমজুরি করতেন এবং রাত্রে যাত্রাদলে গান পরিবেশন করতেন। ছোটবেলাটা খুব অভাবের মধ্যে দিয়েই অতিক্রান্ত হয়েছিল বরুণের।

বরুণের শিক্ষা জীবন শুরু হয় ভরাডাঙ্গা হাইস্কুলে। এখান থেকে তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর খাতরা হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং গোবরডাঙ্গা হিন্দু কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। নিউ ব্যারাকপুরের বিটি কলেজ থেকে বি.এড করেন তিনি। তিনি পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিস (WBCS) পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েও সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করবেন বলে শিক্ষকতার কাজ বেছে নেন।

১৯৯৮ সালে কলকাতার বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মিত্র ইনষ্টিটিউশন’ এর শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং মৃত্যুর দিন অবধি তিনি ঐ প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে বাংলা ভাষার প্রতি ছাত্রদের আর্কষন বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে ছাত্রদের পাঠ্যক্রমের বাইরেও পড়াতেন তিনি। বরুণ বিশ্বাস সকলের কাছেই প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। নিজের কর্মক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষককের অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করতেন তিনি।

বরুণ বিশ্বাস ছিলেন একজন নির্ভীক প্রতিবাদী যুবক ও সমাজসেবী। নিজের গ্রামে বিনা পারিশ্রমিকে ছেলেমেয়েদের পড়াতেন তিনি। গ্রামের গরীব ছেলেমেয়েদের নিজের বেতন থেকে বইখাতা ও স্কুলের পোশাক কিনে দিতেন। বাড়ী বাড়ী গিয়ে খোঁজ নিতেন সকলের লেখাপড়ার। গ্রামের মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতেন। টাকার অভাবে কারও মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, তাকে সাহায্য করতেন। কারও চিকিৎসার জন্য টাকা প্রয়োজন, তাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন। অসহায় দরিদ্র মানুষদের তিনি নিজের বেতনের টাকা দিয়ে চাল, ডাল কিনে দিতেন।

সুঁটিয়া গ্রামের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে ইচ্ছামতী ও যমুনা দুটি নদী। প্রতিবছর বর্ষায় এই দুই নদী সৃষ্ট বন্যায় সুঁটিয়া, গাইঘাটা, বনগাঁ অঞ্চল ভেসে যেত। প্রশাসনের তরফ থেকে ত্রাণ সহ বাঁধ তৈরী করার জন্যও অর্থ বরাদ্দ হত। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের দখলদারিতে সেই অর্থ, ত্রাণ কোনকিছুই সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত না এবং স্হানীয় ইটভাঁটার মালিকরা অবৈজ্ঞানিক উপায়ে মাটি তুলে নেওয়ার কারণেও ইচ্ছামতী ও যমুনার বহন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছিল। এই ঘটনা প্রতি বছর চক্রাকারে আবর্তিত হত। বরুণ সেই চক্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। পাশে পান অসহায় গ্রামবাসীদের। বরুণ সুঁটিয়া গ্রামের মধ্যে দিয়ে একটি খাল কাটার দাবী জানান। নিজে খালের একটি নকশা পর্যন্ত তৈরী করেন। ক্রমশ সেই দাবী জোরালো হতে থাকে। রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বরা প্রথম দিকে তাঁর পরিকল্পনায় কোনরূপ আগ্রহ প্রকাশ করেননি। কিন্তু ক্রমাগত আন্দোলনের চাপে রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রামবাসীদের দাবী মেনে নিয়ে গ্রামের মধ্যে খাল কাটার প্রস্তাব মেনে নেন।

১৯৯০ দশকের শেষের দিকে সুঁটিয়া অঞ্চলে একদল রাজনৈতিক মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পায়। এরা সংলগ্ন বাংলাদেশ বর্ডার অঞ্চলে বহু অসামাজিক কাজের সাথে যুক্ত ছিল। শুধু তাই নয়, এলাকার যুবতী মেয়েদের বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হত। ফলে এলাকায় একটা ত্রাসের আবহ তৈরী হয়। পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোন ফল হত না। সবই ছিল রাজনৈতিক মদতপুষ্ট। ২০০০ সাল থেকে ২০০২ এর মধ্যে এই অঞ্চলে খুন ও ধর্ষণের ঘটনা বহুমাত্রায় বৃদ্ধি পায়। সরকারি মতে ৩৩টি ধর্ষণ ও ১২ টি খুনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু বেসরকারী মতে সংখ্যাটা আরও কয়েকগুণ বেশী। ওই অঞ্চলের মহিলাদের বাইরে বেরোনোই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাধারণ মানুষের ক্রমাগত এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। তাঁরা প্রতিবাদী হওয়ার সাহস পাচ্ছিল না নিজেদের নিরাপত্তার কারণে। বরুণ বিশ্বাস এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। পাশে পায় কিছু অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের। যারা তাঁকে শ্রদ্ধা করত ও ভালবাসত। ২০০২ সালের ১আগষ্ট সুঁটিয়া বাজারে প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদের আহ্বান জানানো হয়। বরুণ ও তাঁর অনুগামীরা ধর্ষণের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদী মঞ্চ গড়ে তোলেন। নাম দেন ‘সুঁটিয়া গণধর্ষণ প্রতিবাদ মঞ্চ’। এই মঞ্চ থেকে তাঁরা ধর্ষণের প্রতিবাদ ও অপরাধীদের গ্রেফতারের দাবীতে আন্দোলন শুরু করেন। প্রতিবাদী জনসভার মাধ্যমে আন্দোলন জোরদার করে তোলেন। ১৬ আগষ্ট এসডিও, এস ডিপিও, ওসির কাছে ডেপুটেশন জমা দেওয়া হয়। তার ফলস্বরূপ প্রশাসনিক স্তরেও এক চাঞ্চল্য তৈরী হয়। বরুণ উপরের মহলে চিঠি লেখেন প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে। পুলিশের উপরের মহলে খবর যায়। রাজ্য মহিলা কমিশনের সদস্যরা সুঁটিয়ায় এসে ধর্ষিতা মহিলাদের সাথে কথা বলেন। সেই সাথে বরুণের অনুগামীরা ধর্ষিতাদের পুলিশে খবর দিতে সাহায্য করত ও মনোবল বাড়াতে সাহায্য করতে থাকে। বরুণের আন্দোলনের জেরে ঐ অঞ্চলের সমাজবিরোধীরা গ্রেফতার হতে থাকে। এর সূত্র ধরেই একদিন ঐ অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতা সুশান্ত চৌধুরী গ্রেফতার হন এই গণধর্ষণ কান্ডে। এলাকায় স্বস্তির বাতাবরণ তৈরী হলেও বরুণের জীবনে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। জেলে বসেই সুশান্ত বরুণকে খুনের ছক কষতে থাকে।

২০১২ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যায় গোবরডাঙ্গা রেল স্টেশন সংলগ্ন গাড়ী পার্কিং লটে বরুণ বিশ্বাসকে কেউ পিছন থেকে গুলি করে। ঘটনায় বরুণের মৃত্যু হয়। পরেরদিন ভাড়াটে খুনি সুমন্ত দেবনাথ ওরফে ফটকে, দেবাশিস সরকার, বিশ্বজিৎ বিশ্বাস ও রাজু সরকার ধরা পড়ে। তারা পুলিশি জেরায় স্বীকার করে তাঁরা সুশান্ত চৌধুরীর নির্দেশে বরুণকে খুন করেছিল। এই ঘটনা রাজ্য রাজনীতিতেও এক বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। রাজনৈতিক নেতা সুশান্ত চৌধুরীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। পরবর্তীতে সুশান্ত চৌধুরীর জেলেই মৃত্যু হয়। কিন্তু বরুণের পরিবারের দাবী বরুণের খুনের পিছনে আরও অনেক বড় কোন নেতার মস্তিষ্ক কাজ করেছে। বরুণের মৃত্যুতে চল্লিশ হাজার মানুষের জমায়েত হয়েছিল। তাঁরা সকলেই বরুণের অপরাধীদের শাস্তির দাবীতে সোচ্চার হন। এলাকার মহিলারাও প্রতিবাদে সামিল হন। তাঁরা ঐ অঞ্চলের পুলিশ ফাঁড়ি ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেন। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগেই মুখ্যমন্ত্রী সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দেন। কিন্তু আজও বরুণ খুনের ষড়যন্ত্রকারীদের শাস্তি হয় নি। এই খুনের মামলা এখন বনগাঁ কোর্টে বিচারাধীন। যারা বরুণকে খুন করেছিল, তাঁদের মধ্যে দুজন ফেরার। একজন নাবালক ছিলেন, তাঁর জুভেনাইল কোর্টে বিচার হয়েছে, তিনি এখন জেলে। আর বাকীদের এখনও কোর্টে কেস চলছে। যারা বরুণের মৃত্যুর প্রতিবাদে দোষীদের শাস্তির জন্য আন্দোলন করেছিল, তাঁরাও আজ কোথায় স্তিমিত হয়ে পড়ছে। ২০২১ এ সুঁটিয়ায় বরুণ বিশ্বাসের মৃত্যুদিনে একটি স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়। এই সভা থেকে বরুণের হত্যার মামলার দ্রুত নিস্পত্তি করার জন্য আবেদন জানানো হয়।

২০১১ সালে একটি টেলিভিশন সিরিয়াল তৈরী হয় ‘প্রলয়’ নামে। যা বরুণ বিশ্বাসের জীবনের উপর আধারিত। বরুণের জীবনের কিছু ঘটনা নিয়ে ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে পরিচালক রাজ চক্রবর্তী ‘প্রলয় আসছে ‘বলে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এই চলচ্চিত্রে বরুণের নামভূমিকায় অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেন।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।