প্রাচীন গ্রীসের নাট্যধারা কতখানি উন্নত ছিল তা আজ সাহিত্য-সমালোচক ও ঐতিহাসিকদের লেখা থেকে জানতে পারা যায়। তবে গ্রীসদেশে নাটক কেবল বিনোদনেরই একটি মাধ্যম মাত্র ছিল না, নাট্যরচনার প্রতিভার উপরে সামাজিক সম্মান-অসম্মানও নির্ভর করত। গ্রীসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ট্র্যাজেডি এবং নাটকের ইতিহাস রচনা করলে গ্রীক ট্র্যাজেডি রচয়িতাদের মধ্যে যাঁদের নাম উল্লেখ করতে হয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন সোফোক্লিস (Sophocles)। তাঁর নাম আরও দুই বিখ্যাত ট্র্যাজেডি রচয়িতা এস্কাইলাস ও ইউরিপিডিসের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। এথেন্স নগরে ডায়োনিসিয়ার ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে যে নাট্য প্রতিযোগিতা হত তাতে উক্ত দুজনের তুলনায় সবচেয়ে বেশিবার জয়লাভ করেছিলেন এই সোফোক্লিস। তাঁর রচিত বহু নাটক কালের অতলে তলিয়ে গেলেও মাত্র সাতটি নাটক উদ্ধার করা গেছে। অ্যারিস্টটল এই সোফোক্লিস রচিত ‘ইডিপাস’ নাটক থেকেই ট্র্যাজেডির বৈশিষ্ট্যগুলি নির্ণয় করেছিলেন। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি রচনাকারদের মধ্যে সোফোক্লিস অন্যতম একজন।
সোফোক্লিসের জীবন সম্পর্কে তথ্য খুবই কম পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন খ্রীস্টপূর্ব ৪৯০ সালে ম্যারাথন যুদ্ধের কয়েক বছর আগে আনুমানিক খ্রীস্টপূর্ব ৪৯৬ সাল নাগাদ মধ্য গ্রীসের অ্যাটিকার অন্তর্গত হিপ্পিওস কোলোনাসে এক গ্রামীন ডেমে সম্প্রদায়ে ধনী পরিবারে সোফোক্লিসের জন্ম হয়। তাঁর পিতা সোফিলাস (Sophillus) সম্ভবত একজন বর্ম প্রস্তুতকারী ছিলেন। সোফোক্লিসের মায়ের নাম জোকাস্টা (Jocasta)।
শৈশব থেকেই নানারকম শিক্ষায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে থাকেন সোফোক্লিস। ছোটবেলা থেকেই যে গ্রীকশিক্ষায় শিক্ষিত হন তিনি, তাতে সঙ্গীত এবং শিল্পও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সঙ্গীতে সোফোক্লিস খুবই পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। সেই কারণে পারস্যের সঙ্গে সালামিসের যুদ্ধে গ্রীস জয়লাভ করলে, সেই যুদ্ধজয়ের উদযাপনে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই পিয়ানেতে (দেবতার উদ্দেশে গান) কোরাসের নেতৃত্বদানের জন্য সোফোক্লিসকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। জানা যায় যে, সোফোক্লিসের সঙ্গীতের শিক্ষক ছিলেন ল্যামপ্রাস। সেই ল্যামপ্রাসের সঙ্গীতরচনায় যে সংযম লক্ষ করা যেত তা পরবর্তীতে তাঁর ছাত্রের সঙ্গীতের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। সঙ্গীত ছাড়াও সোফোক্লিস কবিতা, নৃত্য এমনকি জিমন্যাস্টিকও অধ্যয়ন করেছিলেন বলে জানা যায়। সঙ্গীত ও কুস্তির জন্য সোফোক্লিস স্কুলে বেশ কয়েকটি পুরস্কারও জিতেছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা তাঁকে সামরিক শিক্ষা, বৈদেশিক নীতি ও শিল্পকলাসহ জনজীবনের সমস্ত দিকগুলিতেই পারদর্শী করে তুলেছিল।
গ্রীসদেশের সংস্কৃতির অধিকাংশটাই তখন প্রায় বলা যেতে পারে ডায়োনোসিয়া উৎসবের নাট্য প্রতিযোগিতায় কেন্দ্রীভূত ছিল। গ্রীসের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট অলিম্পাসে সেই খ্রীস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে উক্ত উৎসবটি উপলক্ষে যে নাটকের প্রতিযোগিতা হত তা কেবলমাত্র বিনোদনের গন্ডীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সেই প্রতিযোগিতায় হারজিতের ওপর নাট্যকারদের সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান অনেকখানি নির্ভর করত। কমেডি, স্যাটায়ার ইত্যাদি বিভিন্ন রকম নাটকের চল থাকলেও সেখানে ট্র্যাজেডির কদর ছিল সবচেয়ে উঁচুতে। উচ্চমানের ট্র্যাজেডি রচয়িতাকেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সর্বোৎকৃষ্ট নাট্যকারের সম্মান প্রদান করা হত প্রাচীন গ্রীসে। অ্যারিস্টটলও ট্র্যাজেডিকেই বিবিধ প্রকার নাটকের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু আসন প্রদান করেছিলেন। অলিম্পাস পর্বতে সেই ডায়োনোসিয়া উৎসবের নাট্য প্রতিযোগিতাকে আসলে ট্র্যাজেডি-যুদ্ধ বলা যেতে পারে। কোন নাট্যকার কত ভাল ট্র্যাজেডি রচনা করতে পারেন, এ যেন তারই লড়াই ছিল। প্রতি বছর এই প্রতিযোগিতার জন্যই প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ ট্র্যাজেডি রচিত হত। এই প্রতিযোগিতায় প্রথম শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান পেয়েছিলেন থেসপিস। পরবর্তীতে এই ট্র্যাজেডি রচনার ধারায় আরও যে তিনটি নাম জনপ্রিয় হয়েছিল, তাঁরা হলেন এস্কাইলাস, ইউরিপিডিস এবং সোফোক্লিস।
৪৬৮ খ্রীস্টপূর্বাব্দে সোফোক্লিস তাঁর কয়েকটি নাটকের জন্য ডায়োনোসিয়া উৎসবের নাট্যপ্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার লাভ করেছিলেন এবং এস্কাইলাস হয়েছিলেন দ্বিতীয়। ঐতিহাসিক প্লুটার্কের মতে, পরাজিত হওয়ার পর নাকি এস্কাইলাস সিসিলিতে চলে গিয়েছিলেন। জানা যায় যে, মোট ২৪ বার নাট্যপ্রতিযোগিতায় জিতেছিলেন সোফোক্লিস, যার মধ্যে ১৮ বার জিতেছিলেন এই ডায়োনোসিয়া উৎসবের প্রতিযোগিতাতে এবং ৬ বার জেতেন লেনিয়া উৎসবে। বহুবার দ্বিতীয় স্থানও পেয়েছিলেন কিন্তু কখনই নাকি তৃতীয় বা শেষতম স্থান পাননি। সোফোক্লিসের যুগ ছিল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে এথেনিয়ান সংস্কৃতির পরিবর্তনের যুগ। সোফোক্লিস এই সভ্যতার সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। তাঁর রচনায় গ্রীসদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াড ও ওডিসি সোফোক্লিসকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। সেই সময়ের একজন বেনামী জীবনীকার সোফোক্লিসকে হোমারের ছাত্র বলেও অভিহিত করেছিলেন। অনেকে মনে করেন যে, সোফোক্লিস সম্ভবত গ্রীক নাট্যকার এস্কাইলাসের অধীনেও অধ্যয়ন করেছিলেন।
প্রথমদিকে সোফোক্লিস নিজের নাটকে অভিনয়ও করতেন কিন্তু তাঁর দুর্বল কন্ঠের কারণে সেই ভূমিকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। প্রাচীন গ্রীসে গোলাকার একটি সমতল জায়গার চারদিক ঘিরে থাকত সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া গ্যালারি। সেই সমতল জায়গাটিই ছিল অভিনয়স্থল এবং গ্যালারির ধাপে ধাপে কয়েক হাজার দর্শক বসে নাটক উপভোগ করতেন। খালি গলাতেই অভিনয় করতে হত, সেই কারণে অভিনেতার যে একটি সাধারণ গুণ আবশ্যক ছিল, তা হল উচ্চস্বর। গলার স্বর দুর্বল হওয়া তাই অভিনয়ের পক্ষে একটি বড় অন্তরায় ছিল। সোফোক্লিস সেই কারণে অভিনয় ছেড়ে নাটক রচনাতেই মনোনিবেশ করেছিলেন।
প্রায় ১২৩টি নাটক সোফোক্লিস রচনা করেছিলেন বলে জানা যায়, তবে তা থেকে কেবল যে সাতটি নাটক উদ্ধার করা গিয়েছিল, সেগুলি হল, ‘অ্যাজাক্স’, ‘ইডিপাস রেক্স’, ‘ইলেক্ট্রা’, ‘ইডিপাস অ্যাট কলোনাস’, ‘উওম্যান অব ট্র্যাচিস’ ‘ফিলোকটেটাস’ এবং ‘আন্তিগোনে’। এই অবলুপ্তিরও অবশ্য এক কারণ রয়েছে। গ্রীক সমাজে লেখার অনীহা ছিল। তাছাড়া একবার কোন নাটক মঞ্চস্থ হয়ে গেলে তা আর কোন মঞ্চে অভিনীত হওয়ার রীতি ছিল না। নাটক সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও খুব বেশি জোর দেওয়া হয়নি, ফলে অসংখ্য নাটক কালের গর্ভে তলিয়ে গিয়েছে।
সোফোক্লিস রাজনীতিবিদ সিমনের কাছ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। এমনকি ৪৬১ খ্রীস্টপূর্বাব্দে পেরিক্লিস দ্বারা সিমন বহিষ্কৃত হলেও সোফোক্লিসের কোনো ক্ষতি হয়নি।
থিয়েটারের বাইরেও সরকারী কর্মচারী হিসেবেও কাজ করেছিলেন সোফোক্লিস। তিনি এথেনিয়ান পলিস বা ‘শহর-রাষ্ট্র’-এর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ৪৪৩-৪২ খ্রীস্টপূর্বাব্দে সোফোক্লিস একজন রাষ্ট্রীয় কোষাধ্যক্ষ (হেলেনোটামিয়াই) রূপে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়াও পেরিক্লিসের রাজনৈতিক উত্থানের সময় শহরের অর্থব্যবস্থা পরিচালনায় সহায়তা করার ভূমিকা পালন করেন তিনি। ভিটা সোফোক্লিসের বিবরণের ওপর ভিত্তি করে জানা যায় যে, তিনি ৪৪১ খ্রীস্টপূর্বাব্দে সামোসের বিরুদ্ধে এথেনিয়ান অভিযানে একজন জেনারেল হিসাবে কাজ করেছিলেন। এটা বিশ্বাস করা হয়েছিল যে সোফোক্লেস তাঁর ‘অ্যান্টিগোনে’ নাটকটি লেখার কারণে এই পদটি পেয়েছিলেন। ৪২০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে যখন এথেন্সে অ্যাসক্লেপিয়াস দেবতা জনপ্রিয়তা পায়, সোফোক্লিস তাঁকে স্বাগত জানান এবং নিজের বাড়িতে সেই দেবতার মূর্তির জন্য একটি বেদি স্থাপন করেছিলেন। ৪১৩ খ্রীস্টপূর্বাব্দে সোফোক্লিস একটি দশ সদস্যের কাউন্সিলে বসেছিলেন, যেটি সিরাকিউসের বিরুদ্ধে এথেন্সের ব্যর্থ সিসিলিয়ান অভিযানের সংকট মোকাবেলা করার জন্য ডাকা হয়েছিল।
সোফোক্লিস প্রথমে বিবাহ করেছিলেন নিকোস্ট্রাটাকে (Nicostrata)। তাঁদের আইওফোন নামে একটি সন্তানের জন্ম হয়েছিল। তবে পরবর্তীকালে সিসিওনের এক মহিলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন সোফোক্লিস এবং সেই সম্পর্কের জেরেই অ্যারিস্টন নামে তাঁর এক পুত্রের জন্ম হয়েছিল। এর ফলে সোফোক্লিসের বৈধ পুত্র পৈতৃক সম্পত্তির ভাগাভাগি বিষয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে, উপায়ন্তর না দেখে বৈধ সন্তান আইওফোন সমাজে ঘোষণা করে দেয় যে, তাঁর বাবার মানসিক স্থিতি লোপ পেয়েছে। এই অভিযোগ অবশেষে আদালতে গিয়ে উঠেছিল। বৃদ্ধ সোফোক্লিস কোনওরকম সওয়াল-জবাবের অবকাশ না দিয়ে বিচারপতির সামনে নিজের নাটক পড়ে শোনাতে শুরু করেছিলেন। নিজেকে প্রকৃতিস্থ প্রমাণ করতে আর কোনও প্রমাণের প্রয়োজন ছিল না, গ্রীকসমাজে নাটক এবং নাটককারদের ঠিক এতটাই সম্মানের চোখে দেখা হত। অনেকে বলেন, সোফোক্লিসের আরও তিন পুত্র ছিল, তবে তাঁদের সম্পর্কে কোনও তথ্য জানা যায় না।
নাটকে সোফোক্লিসের অন্যতম অবদান ছিল কোরাসের ভূমিকাকে কিয়ৎপরিমাণ হ্রাস করে তৃতীয় অভিনেতার প্রবর্তন করা। এর ফলে চরিত্রগুলির বিকাশ এবং তাদের মধ্যেকার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব আরও ভাল করে বিস্তার লাভের সুযোগ পেয়েছিল। এমনকি তাঁর কিয়ৎ পূর্বের নাট্যকার এস্কাইলাসও এই ধারণাটি গ্রহণ করে নিজের নাটকে প্রয়োগ করেছিলেন। অ্যারিস্টটল সোফোক্লিসকে স্কেনোগ্রাফিয়া বা সিনারি-পেইন্টিং প্রবর্তনের কৃতিত্ব দিয়েছিলেন।
৪০৬ বা ৪০৫ খ্রীস্টপূর্বাব্দে নব্বই বা একানব্বই বছর বয়সে শীতকালে এই বিখ্যাত গ্রীক ট্র্যাজেডি রচয়িতা সোফোক্লিসের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরেও নানান কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। একটি মত অনুসারে, শ্বাস না নিয়ে ‘আন্তিগোনে’ নাটক থেকে একটি দীর্ঘ বাক্য আবৃত্তি করবার সময় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। আবার কেউ বলেন, এথেন্সের অ্যান্থেস্টেরিয়া উৎসবে আঙ্গুর খেতে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে মারা যান তিনি। তৃতীয় আরেকটি মতানুযায়ী, ডায়োনিসিয়ার উৎসবে চূড়ান্ত জয়লাভের ফলে অতিরিক্ত আনন্দের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান