ইতিহাস

শম্ভুনাথ পণ্ডিত

শম্ভুনাথ পণ্ডিত

কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম ভারতীয় বিচারপতি ছিলেন শম্ভুনাথ পণ্ডিত (Sambhunath Pandit)। ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারের সন্তান হলেও কলকাতার ভবানীপুরেই তাঁর বড় হয়ে ওঠা। ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকায় আইন বিষয়ে বহু প্রবন্ধ লিখেছেন শম্ভুনাথ পণ্ডিত। পরবর্তীকালে তিনি ভবানীপুর ব্রাহ্মসমাজের সভাপতি পদেও আসীন হন। তাঁর লেখা অন্যতম বিখ্যাত একটি গ্রন্থ ‘অন দ্য বিইং অফ গড’।

১৮২০ সালে কলকাতার ভবানীপুরে শম্ভুনাথ পণ্ডিতের জন্ম হয়। তিনি ছিলেন কাশ্মীরি পণ্ডিত বংশের সন্তান। তাঁর বাবার নাম সদাশিব পণ্ডিত এবং তাঁর ঠাকুরদাদার নাম মনসারাম পণ্ডিত। কাশ্মীরে আফগান শাসকদের অত্যাচারের ভয়ে সদাশিব সেখান থেকে পালিয়ে চলে এসেছিলেন লক্ষ্ণৌতে। কিন্তু লক্ষ্ণৌতে ভাল কাজ না জোটায় কলকাতায় চলে আসেন সদাশিব এবং কলকাতার দেওয়ানি আদালতে উর্দু-ফার্সি জানার দরুন ভাল কাজ পেয়ে যান। কলকাতার কলুটোলা স্ট্রিটে প্রথমে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতেন সদাশিব এবং তাঁর পুত্র শম্ভুনাথ। শৈশবে এত রুগ্ন ছিলেন শম্ভুনাথ যে তাঁর বাবা সদাশিব তাঁকে লক্ষ্ণৌতে মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য। মামার কাছেই উর্দু ও ফার্সি ভাষা শেখেন শম্ভুনাথ পণ্ডিত। পরে ইংরেজি শেখার জন্য তিনি বারাণসীতে চলে যান। মামার কাছে এত আদর-যত্নে বড় হয়েছেন বলে পরবর্তীকালে আদালতে কাজ করার সময় ছুটি পেলেই প্রতি বছর মামার বাড়ি চলে আসতেন শম্ভুনাথ। পরবর্তীকালে স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার জোরাজুরিতেই লক্ষ্ণৌয়ের মালো রানির সঙ্গে বিবাহ হয় শম্ভুনাথের। মালো রানির মৃত্যুর পরে বাঙালি কন্যা হরিদাসীকে বিবাহ করেছিলেন শম্ভুনাথ। পরে পুনরায় স্বরূপ রানি নামে স্বগোত্রীয় এক নারীর সঙ্গেও তাঁর বিবাহ হয়। তাঁর সন্তানদের মধ্যে প্রাণনাথ পণ্ডিত পরবর্তীকালে কলকাতা হাইকোর্টের উকিল হন।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

১৮২৯ সালে নিমতলার মানিক বসু ঘাট স্ট্রিটের একটি বাড়িতে স্থাপিত ওরিয়েন্টাল সেমিনারি স্কুলে ভর্তি হন শম্ভুনাথ পণ্ডিত। শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেব, কালীকৃষ্ণ দেব, নড়াইলের জমিদার রামরতন রায়ের সহায়তায় গৌরমোহন আঢ্য এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই স্কুলে ইংরেজি পড়াতেন হার্মান জেফ্রয় নামে এক ফরাসি সাহেব। স্কুলে শম্ভুনাথের সহপাঠী ছিলেন ক্ষেত্রচন্দ্র ঘোষ, কৈলাসচন্দ্র বসু প্রমুখরা। শম্ভুনাথ অঙ্কে দুর্বল হলেও ইংরেজিতে তিনি অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে জেফ্রয় সাহেব ছাত্রদের বাগ্মিতা এবং যুক্তিবাদিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতি সপ্তাহে একবার করে তর্কসভার আয়োজন করতেন আর সেই তর্কসভায় দুর্দান্ত উপস্থাপনার জন্য তিনি শম্ভুনাথকে ‘ফোশিয়ন’ বলে ডাকতেন। স্কুলে পড়াকালীন তাঁর সাহসের পরিচয় পাওয়া গেছে নানা সময়। একবার এক মদ্যপ সাহেব খোলা তলোয়ার নিয়ে ছাত্র ও শিক্ষকদের দিকে তেড়ে এলে অসীম সাহসে তাঁর সামনে গিয়ে শম্ভুনাথ পণ্ডিত তাঁকে নানা কথায় ভুলিয়ে তাঁর হাত থেকে তলোয়ারটি ফেলে দেন। আবার একদিন এক ফকির স্কুলের মধ্যে এসে ছাত্রদের অপমান করলে অন্যান্য ছাত্রদের একত্রিত করে সেই ফকিরকে বেঁধে শম্ভুনাথ স্কুলের মাঠে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বেশিদিন পড়াশোনা করা হয়নি তাঁর। প্রথমে বিবাহ এবং পরে বাবার মৃত্যুর ফলে সাংসারিক দায়িত্বের চাপে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করতে হয় তাঁকে।

প্রথমে ১৬ টাকা মাসিক বেতনে সদর আদালতের রেকর্ড কিপারের পদে যোগ দিয়ে শম্ভুনাথ পণ্ডিত কর্মজীবন শুরু করেন। ফার্সি ও উর্দু ভাষায় বিরাট দখল ছিল তাঁর। এই কাজের পাশাপাশি তিনি বাংলা ও ফার্সি ভাষায় লেখা দলিল-দস্তাবেজ ইংরেজিতে অনুবাদ করে অতিরিক্ত উপার্জন করতেন। ক্রমে ক্রমে অনুবাদের কারণেই তাঁর পরিচিতি বাড়তে লাগল। স্যার রবার্ট বার্লোর বদান্যতায় ডিক্রি দেওয়ার মুহুরু পদে আসীন হন তিনি। এই কাজের পাশাপাশি ঐ সময় একটি বই লেখেন শম্ভুনাথ পণ্ডিত যার নাম ‘ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও স্বরূপ’ এবং পরে ১৮৪৬ সালে ভবানীচরণ দত্তের সাহায্যে রজার বেকনের প্রবন্ধগুলির টীকা সহ একটি সংস্করণ প্রকাশ করেন তিনি। এমনকি ডিক্রি জারির আইন নিয়েও বই লিখেছিলেন তিনি। ক্রমে সদর আদালতের সকলের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন শম্ভুনাথ। সদর আদালতেই রিডারের পদ খালি হওয়ায় শম্ভুনাথ আবেদন করতে চান, কিন্তু বার্লো সাহেবের অনুরোধে ও পরামর্শে সেই কাজে অব্যাহতি দেন। কাজ না পাওয়ার দুঃখের কথা বন্ধুস্থানীয় হরচন্দ্র ঘোষকে জানালে তিনি শম্ভুনাথকে আইন পড়ে ওকালতি করার পরামর্শ দেন। ১৮৪৮ সালে প্রথম সদর আদালতে ওকালতি শুরু করেন শম্ভুনাথ পণ্ডিত। এরপর একে একে প্রথম শ্রেণির ফৌজদারি উকিল, তারপর ১৮৫৩ সালে জুনিয়র গভর্নমেন্ট প্লিডার পদে বহাল হন তিনি। এই সময় থেকেই প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে থাকেন তিনি। কিছুদিন পরে মুর্শিদাবাদের নবাবের প্রাসাদ থেকে সোনা-দানা চুরির মামলায় সরকার পক্ষের আইনজীবী হিসেবে মামলা লড়ে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন শম্ভুনাথ।

ইতিমধ্যে ১৮৫৫ সালে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজে চালু হয়েছে আইন বিভাগ। মাসিক ৪০০ টাকা বেতনে সেখানে আইনের অধ্যাপক হিসেবে কাজে যোগ দেন তিনি। শিক্ষা পরিষদের সম্পাদকের অনুরোধে এই পদে প্রায় দু বছর কাজ করেছেন শম্ভুনাথ পণ্ডিত। ১৮৬১-তে সিনিয়র গভর্নমেন্ট প্লিডারের পদে উন্নীত হন তিনি। তার পরের বছরই ১৮৬২ সালে স্থাপিত হয় কলকাতা হাইকোর্ট। রানি ভিক্টোরিয়ার নির্দেশে সেই হাইকোর্টের প্রথম বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন রামমোহন রায়ের কনিষ্ঠ পুত্র রমাপ্রসাদ রায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিয়োগপত্র আসার সময় দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েন রমাপ্রসাদ। ফলে হাইকোর্টের প্রথম ও প্রধান বিচারপতি স্যার বার্নস্‌ পিককের অনুমোদনে রমাপ্রসাদের জায়গায় কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম দেশীয় তথা ভারতীয় বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন শম্ভুনাথ পণ্ডিত। সেক্রেটারি স্যার অ্যাস্লি ইডেন এবং লর্ড এলগিনও এই নিয়োগকে সমর্থন করেন। ১৮৬২ সালের ১৮ নভেম্বর স্যার চার্লস উড মহারানি ভিক্টোরিয়ার অনুমোদন সহ বিচারপতি পদে নিয়োগপত্র পাঠান শম্ভুনাথকে। বিচারপতি পদে আরেক বাঙালিকে দেখে আনন্দে শম্ভুনাথের সম্মানে ভোজসভা আহ্বান করেন জগদানন্দ মুখোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন হাইকোর্টের এক বিখ্যাত সরকারি উকিল। শম্ভুনাথ পণ্ডিতই মধুসূদন দত্তকে কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টারি করে উপার্জনের পথ বের করতে প্রভূত সহায়তা করেছিলেন।

কলকাতায় ড্রিঙ্ক ওয়াটার বেথুন সাহেব প্রথম নারীশিক্ষার জন্য স্কুল স্থাপন করলে সেই স্কুলে নিজের মেয়ে মালতীকে প্রথম ভর্তি করেন শম্ভুনাথ। পরবর্তীকালে বেথুনের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্যতা তৈরি হয়ে যায়। শম্ভুনাথের মেয়ে মালতী একবার বেথুন সাহেবকে নিজে হাতে চটি তৈরি করে উপহারও দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। ১৮৫১ সালে বেথুন সাহেবের নির্দেশে পিয়ার্সনের ‘বাক্যাবলি’ বইয়ের নবতম সংস্করণে আইন সংক্রান্ত শব্দ ও তার ইংরেজি প্রতিশব্দের একটি তালিকা তৈরি করে দিয়েছিলেন শম্ভুনাথ পণ্ডিত। তিনি ‘বেথুন সোসাইটি’র সভাপতিও হয়েছিলেন। ঐ বছরই দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাধাকান্ত দেব প্রমুখ বিখ্যাত গুণীজনের সাহচর্যে যে ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ গড়ে ওঠে সেখানে শম্ভুনাথ পণ্ডিত ছিলেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী শম্ভুনাথ কিছুদিনের জন্য ভবানীপুর ব্রাহ্ম সমাজের সভাপতিত্বও করেছেন।

বর্তমান কলকাতার বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজির উল্টোদিকে শম্ভুনাথের বাড়ি ছিল। বর্তমানে যেখানে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতাল, সেখানেই ঐ সময় একটি দাতব্য চিকিৎসালয় ছিল যেখানে প্রায় রোজই বিকেলের দিকে শম্ভুনাথ পণ্ডিত আসতেন। গরীব-দুঃখী রোগীদের জন্য ওষুধ-পথ্য ইত্যাদির ব্যবস্থা করতেন। তিনি চেয়েছিলেন যে এই অঞ্চলে একটি হাসপাতাল গড়ে তোলা হোক যেখানে কেবলমাত্র ভারতীয়দের সম্পূর্ণ নিখরচায় চিকিৎসা করা হবে। তাঁর মৃত্যুর পরে স্মৃতিরক্ষা কমিটি তৈরি হয় এবং ২৫ হাজার টাকা চাঁদা ওঠে। এর মধ্যে হাজার চারেক টাকার বিনিময়ে শম্ভুনাথ পণ্ডিতের একটি বিরাট মাপের তৈলচিত্র আঁকানো হয় এবং বাকি টাকা দান করা হয় ঐ দাতব্য চিকিৎসালয়ে। ঐ টাকা দিয়েই পাশে ৯ কাঠা জমি কিনে স্থাপিত হয় আজকের শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতাল। তবে তা প্রথমে এই নামে ছিল না। প্রাথমিকপর্বে চিকিৎসালয়ে প্রথমে বহির্বিভাগ চালু হয়, ১৮৮৯ সালে কলকাতা পুরসভার অধীনস্থ হয় এই চিকিৎসালয়। ১৮৯৩ সালে সরকার এবং কলকাতা পুরসভা মিলিতভাবে এখানে একটি সরকারি হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা করে ১২৯ কাঠা জমি কিনে নেয়। ১৯০২ সালে হাসপাতালের নাম রাখা হয় শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতাল।

১৮৬৭ সালের ৬ জুন মাত্র ৪৭ বছর বয়সে কার্বাঙ্কলের বিষক্রিয়ার কারণে শম্ভুনাথ পণ্ডিতের মৃত্যু হয়।          

তথ্যসূত্র


  1. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, 'সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান', সাহিত্য সংসদ, মে ১৯৬০, পৃষ্ঠা ৫০০
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://advocatetanmoy.com/
  4. https://www.anandabazar.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন