খেলা

ত্রিশা জর্ন

জন্মান্ধ হয়েও প্যারালিম্পিকের ইতিহাসে সাঁতারে পঞ্চান্নটি পদক জয় করে এক আশ্চর্য নজির গড়েছেন আমেরিকান প্যারালিম্পিক সাঁতারু ত্রিশা জর্ন (Trischa Zorn)। ১৯৮০ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত মোট সাতবার প্যারালিম্পিকে যোগ দিয়েছেন ত্রিশা। প্যারালিম্পিকের সবথেকে সফল সাঁতারু হিসেবে ৪১টি স্বর্ণপদক, ৯টি রৌপ্য পদক এবং ৫টি ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেছেন তিনি। ২০১২ সালে প্যারালিম্পিক ‘হল অফ ফেম’ সম্মানেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী হয়েও তাঁর অর্জিত পদকের সংখ্যা বিখ্যাত আমেরিকান সাঁতারু মাইকেল ফেল্পসের থেকেও বেশি যা বিশ্বের অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসে এক বিস্ময় এবং তিনিই প্রথম অ্যাথলিট যিনি দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী হিসেবে এনসিএএ সাঁতারু বৃত্তি লাভ করেছিলেন। মোট বারোটি বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী ত্রিশা জর্ন সমস্ত প্রতিবন্ধকতাজয়ী অ্যাথলিটদের কাছে অনুপ্রেরণার অপর নাম।

১৯৬৪ সালের ১ জুন ক্যালিফোর্ণিয়ার ওরেঞ্জে ত্রিশা জর্নের জন্ম হয়। জন্ম থেকেই ত্রিশার দৃষ্টিহীনতার কারণ ছিল মূলত জিনগত একটি ত্রুটি যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় অ্যানিরিডিয়া। মানবদেহে চোখের বিকাশের জন্য কার্যকর পিএএক্স৬ (PAX6) জিনটির ত্রুটির কারণে এই রোগ হয়ে থাকে যার ফলে চোখের গঠন বা দৃষ্টিশক্তি পূর্ণতা পায় না। এর একমাত্র প্রতিকার ছিল সার্জারি আর ত্রিশাকে বাধ্য হয়েই তা করতে হয়। সার্জারির ফলে তাঁর চোখের কনীনিকায় বাইরে থেকে আসা আলোর পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত হয় যা দৃষ্টিশক্তিকে উন্নত করে তোলে। আগে তাঁর চোখে কনীনিকা না থাকায় চোখের লেন্স কোনো দৃশ্যের প্রতি ফোকাস করতে পারতো না, আলোর নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো না যা সার্জারির মাধ্যমে প্রতিকার করা হয়। কিন্তু সার্জারি হলেও পরবর্তীকালে প্যারালিম্পিকে যোগদানের সময় প্রতিবন্ধী-শ্রেণি থেকে তিনি বিচ্যুত হননি আর সেটাই হয়তো তাঁর ক্ষেত্রে সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাত্র দশ বছর বয়সে মিশন ভিজোরেস নাতাদোরেস দলে সাঁতারে অংশ নিতে শুরু করেন ত্রিশা। ব্রেভ মন্ট্রেলা, প্যাট বুর্চ, ল্যারি লিবোউইৎজ, টেরি স্টবার্ড প্রমুখ প্রশিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ত্রিশা যে কারণে তিনি নিজেকে খুব ভাগ্যবান বলে মনে করেন।

লিঙ্কনে অবস্থিত নেব্রাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় ত্রিশা জর্নের এবং এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯৮৭ সালে শিক্ষাবিজ্ঞান তথা বিশেষ শিক্ষণ বিষয়ে তিনি বি.এস ডিগ্রি অর্জন করেন এবং স্নাতক উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীকালে অনেকগুলি বছর তিনি ইণ্ডিয়ানাপোলিস পাবলিক স্কুলে বিশেষভাবে সক্ষম ছাত্র-ছাত্রীদের শ্রেণিশিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর পড়ানোর বিষয় ছিল বিজ্ঞান এবং সমাজবিদ্যা। প্রায় দশ বছর ইণ্ডিয়ানাপোলিসের প্রাথমিক স্তরের বিদ্যালয়ে অনেক বছর পড়ানোর পরে ২০০২ সালে আইন বিদ্যালয়ে ভর্তি হন ত্রিশা জর্ন। ২০০৫ সালে ইণ্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ল স্কুল থেকে জুরিস ডক্টর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তাছাড়া এই ইণ্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদ্যালয় প্রশাসনের উপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও অর্জন করেছেন ত্রিশা জর্ন। কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের প্রধান অধ্যায় জড়িত ছিল প্যারালিম্পিককে কেন্দ্র করে।

১৯৮০ সালে নেদারল্যাণ্ডের অ্যামস্টারডামে আয়োজিত ষষ্ঠ গ্রীষ্মকালীন প্যারালিম্পিকে প্রথম অংশগ্রহণ করেন ত্রিশা জর্ন। নেব্রাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীনই পূর্ণ-অ্যাথলেটিক বৃত্তি পেয়েছিলেন ত্রিশা এবং তিনিই ছিলেন প্রথম আমেরিকান যিনি চারবার এই বৃত্তিলাভের সুযোগ পান। কলেজে পড়াকালীনই তাঁর অলিম্পিক-জীবন শুরু হয়। অ্যামস্টারডামের প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়ে প্রথমবারেই সাতটি স্বর্ণপদক জয় করেন ত্রিশা জর্ন। ১০০ মি ব্যাকস্ট্রোক, ১০০ মি বাটারফ্লাই, ১০০মি ফ্রি-স্টাইল, ২০০ মি এবং ৪০০ মি একক মেডলি আর সবশেষে ৪ ১০০ মি ফ্রি-স্টাইল রিলে, মেডলি রিলে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রতিটিতেই পদক লাভ করেন তিনি। এরপর ১৯৮৪ সালের নিউ ইয়র্ক অলিম্পিকেও একই শ্রেণিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। ১৯৮৮তে সিওল অলিম্পিকে প্রথমবারের জন্য ৫০ মি, ১০০ মি এবং ২০০ মি. ব্রেটস্ট্রোক শ্রেণিতে অংশ নেন ত্রিশা জর্ন। পরপর তিনবার অলিম্পিকে যোগ দিয়ে ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মোট ২৬টি পদক জিতেছেন তিনি যার মধ্যে ২৫টিই হল স্বর্ণপদক। ১৯৮৮ সালেই ত্রিশা জর্ন ‘স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড ওম্যান অফ দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন। এরপরে ১৯৯২ সালের বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে ১২টি পদক এবং ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিকে ৮টি পদক লাভ করেন ত্রিশা জর্ন। আর এই বছর প্যারালিম্পিকের সূচনালগ্নে অ্যাথলিটের শপথবাক্য পাঠ করেছিলেন তিনি। এখানেই থেমে থাকেননি ত্রিশা। ক্রমান্বয়ে আরো দুটি অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। ২০০০ সালে সিডনিতে এবং ২০০৪ সালে এথেন্সের অলিম্পিকে যোগ দিলেও স্বর্ণপদক পাননি ত্রিশা। সিডনি অলিম্পিকে ৪টি রৌপ্য পদক এবং এথেন্স অলিম্পিকে মাত্র একটি ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করতে সমর্থ হন তিনি। এথেন্স অলিম্পিকের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে তিনিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা বাহক ছিলেন এবং ঐ বছরই প্রথম প্রতিবন্ধী অলিম্পিয়ান হিসেবে এনসিএএ বৃত্তি লাভ করেন। কোনো দেশের কোনো অ্যাথলিট সাতবার অলিম্পিকে যোগ দিয়ে তাঁর মতো পঞ্চান্নটি পদক অরজ্রন করতে পারেননি যে কারণে ত্রিশার এই সাফল্য বিশ্বরেকর্ডের মর্যাদা পায়। ২০০০ সালের সিডনি গেমসের পরে প্রতিবন্ধী হিসেবে ৫০ মি, ১০০ মি ও ২০০ মি ব্যাকস্ট্রোক, ২০০ মি ও ৪০০ মি একক মেডলি, ২০০ মি ব্রেটস্ট্রোক এবং ৪ ৫০ মি মেডলি রিলে সহ ফ্রি রিলে শ্রেণিগুলিতে তিনি মোট আটটি বিশ্বরেকর্ড গড়েন। সমস্ত অলিম্পিকে নানা সময় এস১২, এসবি১২ বা এসএম১২ প্রতিবন্ধী শ্রেণিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ত্রিশা জর্ন।

ইণ্ডিয়ানার নোবেল্‌সভিল হাই স্কুলের সাঁতারু দলের ছেলে-মেয়েদের দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ত্রিশা জর্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক কমিটি অ্যাথলিট অ্যাডভাইসরি কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ত্রিশা জর্ন প্যারালিম্পিক গ্রীষ্মকালীন অ্যাথলিট প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিতেন। ‘ইউনাইটেড স্টেটস অ্যাসোসিয়েশন ফর ব্লাইণ্ড অ্যাথলিটস’-এ বোর্ড অফ ডিরেক্টরসের সদস্য ছিলেন ত্রিশা আর এই সংস্থার হয়ে দেশের সমস্ত দৃষ্টি-প্রতিবন্ধীদের মধ্যে ক্রীড়াচর্চার বিস্তার ঘটাতে কাজ করেন তিনি। আমেরিকার কর্নিয়া রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বোর্ড অফ ডিরেক্টরস্‌-এর সদস্যপদও সামলেছেন তিনি। তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যার দুই চোখেই কৃত্রিম কনীনিকা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। ইণ্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ফাউণ্ডেশনের অধীনে হার্টফোর্ড বীমা কোম্পানিতে এবং পরে নেব্রাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী সমিতিতে বহুবার অনুপ্রেরণামূলক বক্তা হিসেবে ভাষণ দিয়েছেন অলিম্পিকে ৪১টি স্বর্ণপদকজয়ী ত্রিশা জর্ন। তাঁর নামে আমেরিকার সাঁতার সম্মিলনে প্রতি বছর ‘ত্রিশা এল. জর্ন পুরস্কার’ দেওয়া শুরু হয় ২০১৭ সাল থেকে।

২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি তারিখে নিউ ইয়র্ক সিটির টাইমস স্কোয়ারে নববর্ষ উদ্‌যাপনের সময় আটজন অ্যাথলিটের সঙ্গে তাঁকেও সম্বর্ধনা জানানো হয়। ২০১২ সালে ইন্টারন্যাশনাল প্যারালিম্পিয়ান হল অফ ফেম সম্মানে ভূষিত হন ত্রিশা জর্ন।

বর্তমানে তিনি ইণ্ডিয়ানাপোলিস বীমা কোম্পানির একজন অ্যাটর্নি হিসেবে কাজ করছেন এবং সাঁতার-প্রশিক্ষক হিসেবে নতুন প্রজন্মের অ্যাথলিটদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। ২০১৯ সালে চল্লিশ বছর বয়সে এসে ইণ্ডি সুইমফিট মাস্টার্স ক্লাবের পক্ষ থেকে ইণ্ডিয়ানাপোলিসের ঈগলক্রিক রিসার্ভারে ‘ইউএসএমএস ওয়ান মাইল ওপেন ওয়াটার চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ অংশ নেন ত্রিশা জর্ন। সাধারণত উন্মুক্ত জলে সাঁতারে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধীরা অংশ নেন না, কিন্তু ত্রিশা জর্ন চল্লিশ বছর বয়সে সেই আশ্চর্য ঘটনাটাই ঘটালেন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।