ভূগোল

উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলা

আমাদের পশ্চিমবঙ্গ মূলত ২৩টি জেলাতে বিভক্ত। বেশীরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ আমাদের বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল উত্তর চব্বিশ পরগণা (North 24 Parganas)।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তরপূর্ব দিকের একটি জেলা উত্তর চব্বিশ পরগণা। এই জেলা গঠিত হয়েছে বারাসাত, ব্যারাকপুর, বনগাঁ, বসিরহাট, বিধাননগর এই পাঁচটি মহকুমা নিয়ে। ভৌগলিক দিক থেকে দেখলে এই জেলার উত্তরে রয়েছে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলা।  দক্ষিণে অবস্থান করছে কলকাতা, পূর্ব দিকে রয়েছে বাংলাদেশ এবং  পশ্চিমে হাওড়াহুগলী জেলা

এই জেলার অবস্থান নিম্ন গঙ্গা-বদ্বীপ অঞ্চলে হওয়ায় এখানে প্রবাহিত নদীগুলি মূলত গঙ্গা-পদ্মার শাখানদী ও জোয়ারের জলে পুষ্ট। এখানকার নদীগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য নদীগুলি হল-  ইছামতি,  যমুনা, বিদ্যাধরী, রায়মঙ্গল, হাড়িয়াভাঙা, চৈতা প্রভৃতি। নিম্ন গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে উত্তর ২৪ পরগণা জেলা বিশ্বের বৃৃহত্তম ব-দ্বীপ অঞ্চল। এই জেলার পুর্ব প্রান্তে হিঙ্গলগঞ্জ, মিনাখাঁ, সন্দেশখালি ও হাবড়া অঞ্চলে বনভূমির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

৪০৯৪ বর্গকিমি বিস্তৃত উত্তর চব্বিশ পরগণা আয়তনের বিচারে পশ্চিমবঙ্গে নবম স্থান অধিকার করেছে৷ জনসংখ্যার বিচারে পশ্চিমবঙ্গে সর্বপ্রথম স্থান অধিকার করেছে উত্তর চব্বিশ পরগণা। ২০১১ সালের জনগননা অনুসারে প্রায় ১০০৮২৮৫২ জন লোক এখানে বসবাস করেন৷

উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, নবাব মীরজাফর ১৭৫৭ সালে কলকাতার দক্ষিণে কুলপি পর্যন্ত ২৪টি জংলীমহল বা পরগনা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে জমিদারি সত্ত্ব ভোগ করার অধিকার দিলে এরপর থেকে এই অঞ্চলকে একত্রে চব্বিশ পরগণা নামে ডাকা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালে ডঃ অশোক মিত্রের প্রশাসনিক সংস্কার কমিটির সুপারিশ অনুসারে ২৪ পরগণা জেলাটিকে দুভাগে ভাগ করে এর উত্তরাংশ নিয়ে উত্তর ২৪ পরগণা জেলা গঠন করা হয়। উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার নামকরণের ইতিহাস জানতে পড়ুন এখানে। মনসামঙ্গল কাব্যে ২৪ পরগণার অনেক স্থানের উল্লেখ যেমন পাওয়া যায় তেমনি ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থেও ২৪ পরগণার অনেক জায়গার উল্লেখ আছে৷ বস্তুত এ প্রসঙ্গে বলা ভালো, সিপাহী বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়েছিল এই জেলার ব্যারাকপুরে।

উত্তর ২৪ পরগণা জেলা  কলকাতা উপনগরীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এই জেলার উত্তর শহরতলি শিল্পাঞ্চলটি কর্ম সংস্থানের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে৷ এছাড়া এই জেলার অধিকাংশ মানুষই কৃৃষিকাজ, খামার, কুটিরশিল্প, মাছচাষ ইত্যাদি জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।

কলকাতার তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র সল্টলেক-বিধাননগর, রাজারহাট-নিউ টাউন অঞ্চলটি এই জেলাতেই অবস্থিত হওয়ায় এই জেলার পরিকাঠামোগত উন্নতি দ্রুত হচ্ছে। কাজের সুযোগ সুবিধা, পরিবহন ও সৌন্দর্যায়ন, পর্যটন সব মিলিয়ে জেলাটি অগ্রনী ভূমিকা পালন করে পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে।

সুন্দরবন জেলার বেশ কিছু অংশ উত্তর চব্বিশ পরগণার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে পর্যটনের ক্ষেত্রে এই জেলা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে।  এছাড়া বিভূতিভূষন অভয়ারণ্য, চাকলা কচুয়া, চন্দ্রকেতুগড়, দক্ষিণেশ্বর মন্দির, টাকি, মূলাজোড় কালীবাড়ি ইত্যাদি ভ্রমণের জন্য উল্লেখযোগ্য।

এই জেলায় বেশ কিছু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব জন্মগ্রহণ করেছেন যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঔপন্যাসিক বিমল কর, বিপ্লবী প্রমথনাথ মিত্র, বিপ্লবী তারকনাথ দাস, অধ্যাপক তথা গবেষক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যিক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়, প্রমুখ।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

রচনাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?



এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন