ভূগোল

খড়্গেশ্বরী || খড়ি নদী

বাংলার লোকজীবনে, লোক সাহিত্য, গান, দেবদেবী কথা জীবনচর্যার অন্যতম অঙ্গ। লৌকিক দেবদেবীকে নিয়ে বিভিন্ন লোকগাথা ছড়িয়ে আছে প্রায় গোটা বাংলায়। খড়্গেশ্বরী তেমনই এক লৌকিক দেবী, তাঁর কাহিনী মাহাত্ম্য যেমন আছে তেমনই আছে দেবীর নদী হয়ে যাওয়ার কাহিনী। এই খড়্গেশ্বরী ও খড়ি নদী নিয়ে কিছু কাহিনী, জনশ্রুতি, এবং বাস্তব চালচিত্র এখানে লিপিবদ্ধ করা হল।

পূর্ব বর্ধমানের বুদবুদ থানার মানকর অঞ্চলের গ্রাম মাড়ো। বর্ধমান শহর থেকে ৪১ কিমি পশ্চিমে এই গ্রামটি অবস্থিত। এই গ্রামের উত্তর পশ্চিম কোণে একটি ডোবা দেখা যায়। এটাকেই খড়ি নদীর উৎস বলা হয়। উৎস থেকে গলসী ও ভাতার থানার মধ্য দিয়ে ৪৫ কিমি পথ অতিক্রম করার পর মন্তেশ্বরের কাছে কালনা মহকুমায় প্রবেশ করেছে। তারপর অত্যন্ত বক্রগতিতে প্রবাহিত হয়ে নাদনঘাটের কাছে বাঁকানদীর (বঙ্কেশ্বরী) জলধারা গ্রহণ করেছে। মন্তেশ্বরের দেনুড় ছুঁয়ে কাটোয়া থানার শ্রীবাটি সিঙ্গি ঘুরে পূর্বস্থলী থানার নিমদহ দিয়ে নাদনঘাট সমুদ্রগড়ের কাছে ভাগীরথীতে  মিশেছে। খড়ির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪০ কিমি। এই হল খড়ি নদীর উৎস থেকে মোহনার গতিপথ। খড়ি উৎস

সাধারণত কোন নদীর উৎসে থাকে হিমবাহ বা ঝরণা । কিন্তু খড়ি নদীর উৎস এ দুটির কোনটিই নয়। মাড়ো গ্রামের উত্তর পশ্চিমে বিস্তীর্ণ বনভূমি ও বলরামপুরের ডাঙ্গা। বর্ষায়  এই বিস্তীর্ণ উচ্চভূমির জল যে খাতে প্রবাহিত হত তাই খড়ি নদী। অরণ্য অঞ্চলে বৃষ্টিও হত প্রচুর। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ডিভিসি সেচ ক্যানেল খননের ফলে উচ্চ ভূমির জল সেই খাতে চলে যায়, তৈরি হয় নতুন জলবিভাজিকা। ফলে খড়ির মূলখাতে জল কমে যায়, নদী যায় শুকিয়ে। নদীর উৎসমুখ তাই দীর্ণা, শীর্ণা। মাড়োর পূর্বে বুদবুদ এবং আরও পূর্বমুখী হয়ে ক্রমে ক্রমে যত নিম্নে প্রবাহিত হয়েছে, তত চওড়া ও জল বেশি পেয়েছে। খড়ির চারটি উপনদী আছে -- কলিগ্রামের কাছে গৌড় নদী, সিঙ্গির কাছে কারুলিয়া গ্রামে ব্রহ্মণী, নাদনঘাটের দক্ষিণ পূর্বে জালুইডাঙ্গাতে বাঁকা নদী এবং আরও দক্ষিণে বেহুলা নদী।খড়ি গোপভূমে এক বিশিষ্ট নদীর স্বীকৃতি পেয়েছ কারণ এ অঞ্চলে অজয় দামোদরের পর খড়িই ভাগীরথীতে মিলিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ভাগীরথী থেকে নাদনঘাট পর্যন্ত প্রায় সারা বছর নৌকা চলে। আগে প্রায় সারা বছরই জল থাকত, তবে পাম্প ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যে এই নদীর জলের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে পশ্চিমাংশ শুকিয়ে যাচ্ছে। এই নদীতে মাঝে মাঝে বন্যা হয় তবে তা অজয় বা দামোদরের মত ভয়ংকর নয়।

এবার আসা যাক খড়ি নদীর জন্মের লোককথায়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, কালাচাঁদ গোঁসাই নামে এক শাক্ত ব্রাহ্মণ পূজারী ছিলেন। নিঃসন্তান এই ব্রাহ্মণ শুধু ধর্মচর্চা করেই দিন কাটাতেন। একসময় পরপর কয়েক বছর অনাবৃষ্টির কারণে গ্রামের লোক তাঁর শরণপন্ন হলে, তিনি গ্রামের বাইরে বরুণ দেবের উদ্দেশ্যে 'মুনুই' পুজোর আয়োজন করলেন। তাঁর কাতর আহ্বানে সাড়া দিলেন মহামায়া। পরদিন ঘরের পাশের এক মাঠে দশ এগারো বছরের এক বালিকাকে দেখলেন যার গায়ের রঙ খড়ির মত সাদা। পরিচয়ে জানতে পারলেন  মেয়েটির নাম খড়ি, তার কোথাও কেউ নেই। অনেক অনুনয় করে তাকে বাড়িতে আনলেন। মেয়েটি শর্ত দিল, তাকে উচ্ছিষ্ট খাবার দেওয়া যাবে না। কিন্তু ব্রাহ্মণী তাকে উচ্ছিষ্ট খাবার দিতে থাকে। খড়ি ক্রোধান্বিতা হয়ে ব্রাহ্মণকে সব জানায় এবং চলে যেতে উদ্যত হয়। পূজারী অনেক সাধ্যসাধনায় তাকে আটকান। কিন্তু আবার কিছুকাল পরে মেয়েটি যখন যৌবনবতী, ব্রাহ্মণী সন্দেহের বশে আবার উচ্ছিষ্ট দিতে থাকে। মেয়েটি না খেয়ে সেগুলি আঁস্তাকুড়ে পুঁতে ফেলে। কিন্তু একটা সময় মেয়েটি রেগে গিয়ে মন্দিরে গিয়ে মা আদ্যাশক্তির খড়্গ দিয়ে নিজের জিভ কেটে স্ব-মূর্তি ধারণ করে! ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণি অনেক মিনতি করলেও আর দেবী থাকতে চান না। তিনি চলে যেতে চান। ব্রাহ্মণ তাঁকে আটকাতে পিছনে 'মা-মা' বলে ধাওয়া করেন। ব্রাহ্মণ যতই ছোটেন খড়ি মা-ও ছুটতে থাকেন, আর তাই হয়ে যায় নদীর গতিপথ। ডাইনে বামে এঁকেবেঁকে ছোটার জন্যে নদীর গতিপথও আঁকাবাঁকা। শেষ পর্যন্ত বর্তমান নাদাই পুলের কাছে হাতিপোঁতা গ্রামে ভাগীরথীতে ঝাঁপ দিয়ে পড়েন। ব্রাহ্মণ স্তম্ভিত হয়ে দঁড়িয়ে থাকেন আর তখন আকাশবাণী হয় 'ঠাকুর,তোমার সেবায় আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। মন্দিরে গিয়ে পুজো করলেই আমি তোমার নিকট থাকব। ব্রাহ্মণীকে গিয়ে বলবে ঘরের ঈশান কোণে হাঁড়িতে সোনার হার আছে নিতে আর আঁস্তাকুড় খুঁড়ে যা পাবে তোমার। আর প্রচার করো, মানুষের বেশে সংসারের প্রতি ঘরে আমার মতো দেবদেবী লাখেলাখে বিরাজ করছে, তাদের সেবাকরলেই প্রক্রিত ঈশ্বর সেব করা হয়।' বাড়ি ফিরে আঁস্তাকুড় খুঁড়ে ব্রাহ্মণ মোহর আর ব্রাহ্মণী হাঁড়ি থেকে হার বের করতে গিয়ে সর্পদংশনে মারা যান।

এখন খড়ি নদীর উতপত্তি স্থলে পৌষ সংক্রান্তিতে নাম কীর্তন ও প্রসাদ বিতরণ হয়। গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে খড়ি পুকুর তার পাড়ে আছে খড়ি মা বা খড়্গেশ্বরী মায়ের মন্দির। আগে পৌষমেলায় নামকীর্তনের পাশাপাশি কবিগান, বাউলগান, টুসুগান ইত্যাদি। নদীতে ভাসানো হত ফুলমালা সাজিয়ে নতুন হোলা। এখন নদীতে জল নেই, মকর সংক্রান্তিতে হয় এক বেলার অনুষ্ঠান, কবিগান, বাউলগান এসব আর হয় না।

খড়ি পুকুরের পূর্ব পাড়ে খড়্গেশ্বরীর মন্দির, মন্দির মানে মাটির ঘর। সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে দেবী মূর্তি শ্রী কিশোরীমোহন গোস্বামী প্রতিষ্ঠিত রাধামাধবের মন্দিরে রাখা আছে। দেবীর মূর্তি কালো পাথরের, উচ্চতা আড়াই বা তিন ফুট। কথিত আছে কালাপাহাড়ের নিষ্ঠুর খড়্গ মূর্তিটিকে তিন চার খন্ডে খন্ডিত করেছে। তাতে অবশ্য দেবী মাহাত্ম্য নষ্ট হয়নি। মানুষের বিশ্বাসের কাছে সে মাহাত্ম্য নদীর মত চিরকাল প্রবহমান।

স্রোত না থাকুক,বর্ষা ছাড়া জল না থাকুক, খড়ি বেঁচে থাকবে তার শুষ্ক নদীখাতে, উপকথার গল্পে, মাহাত্ম্যের মহিমায়, সাধক কমলাকান্তের সাধনায়। তিনি খড়ি নদীর তীরেই সাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেন। বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্র তাঁকে গুরুপদে বরণ করে নেন। খড়্গেশ্বরী বা খড়ি মা বালিকা বেশেই হোক আর নদী রূপেই হোক তিনি চিরন্তন বিরাজিতা।

তথ্যসূত্র


  1. ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে মানকর, মাড়ো, অমরারগড়  (লেখক - ধীরেন্দ্রনাথ মেটে, ISBN 81-88064-00-9)
  2. মাড়ো অঞ্চলে প্রচলিত জনশ্রুতি

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!