ভূগোল

মানকর

কখনও কদমা খেয়েছেন অথবা না খেয়ে থাকলেও নাম শুনেছেন? উত্তরগুলি হ্যাঁ হলে মানকর গ্রামের কথাও শুনে থাকবেন। কদমা মিষ্টিটির জন্যে অনায়াসে জিআই ট্যাগ দাবি করতে পারে মানকর (Mankar) গ্রামটি। এখানে ঐতিহ্যবাহী মানকর গ্রামের কথা বিশদে জেনে নেব।

পূর্ব বর্ধমান জেলার গলসি-১ নম্বর ব্লকের অন্যতম প্রধান গ্রাম মানকর। বর্ধমান - আসানসোল ডিভিশনের ট্রেন লাইনে মানকর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম যেমন অমরারগড়, মাড়ো, খাণ্ডারি, বুদবুদ এই সবের রেলপথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম মানকর স্টেশন।

মানকর একটি প্রাচীন জনবসতি। ‘পৌষমুনির ডাঙ্গা’ বা ‘পাণ্ডবক্ষেত্র তলা’ ইত্যাদি দিয়ে ঐতিহাসিক প্রাচীনত্ব নির্ণয় করা না গেলেও মানকর গোপভূম পরগণার অংশ ছিল সে নিয়ে সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত স্পর্শমণি কবিতায় মানকরের উল্লেখ আছে - 'জীবন আমার নাম, মানকরে মোর ধাম, জিলা বর্ধমানে'। এই মানকর গ্রামের নামকরণের পিছনে একাধিক মত আছে তবে সবই কথিত মত, কোন লিখিত ইতিহাস নেই। যেমন, মানিক খাঁ নামে একজন তার গরুর দুধ কমে যাওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখে গরুটি একটি শিবলিঙ্গকে দুধপান করাচ্ছে। শিবলিঙ্গটি মানিকেশ্বর বা মানকেশ্বর নামে পরিচিতি পায় আর তার থেকে গ্রামটির নাম হয় মানকর। অন্য আরও একটি মতে, বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচন্দ্র তাঁর দীক্ষাগুরু ভক্তলাল গোস্বামীকে প্রণামী স্বরূপ সম্মানী দিতেন; 'মানই যার কর/ সেই গ্রাম মানকর' - এই উপকথা থেকেও মানকর নামের উৎপত্তি।

মানকরে প্রচুর শিব ও কালী মন্দির এর দেখা মেলে তাই শৈব ও শাক্ত ধর্মের প্রাধান্যের কথা মেনে নিতে অসুবিধা হয় না। কবিরাজদের কুলদেবী আনন্দময়ী, পঞ্চমুন্ডীর আসন করে সিদ্ধিলাভ করা রামানন্দ গোস্বামী প্রতিষ্ঠিত বড় কালী, পঞ্চকালী, মানকেশ্বর শিব, বুড়ো শিব, দেউলেশ্বর (শিব) মন্দির, বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচন্দ্রের দীক্ষাগুরু ভক্তলাল গোস্বামী প্রতিষ্ঠিত রাধাবল্লভ মন্দির, রথের আকারের রথমন্দির ইত্যাদি মানকরের প্রসিদ্ধ ও প্রাচীন মন্দিরগুলির অন্যতম। মন্দিরগুলিতে অনেক সূক্ষ্ম ও টেরাকোটার কাজ দেখতে পাওয়া যায়।  মন্দিরের পাশাপাশি এখানে একটি মসজিদ ও একটি চার্চ (সেন্ট লিউক চার্চ, St. Luke’s Church) অবস্থিত।

 

ভক্তলাল গোস্বামীর পূর্বপুরুষ কনৌজের ব্রাহ্মণ ছিলেন, তাঁর পূর্ব পুরুষরা রাধাবল্লভী সম্প্রদায়ের কাছে দীক্ষা নিয়ে এক সময় মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণায় আসেন। ভক্তলাল গোস্বামী ১১২৯ বঙ্গাব্দে (আনুমানিক ১৭২২ খ্রিষ্টাব্দ) মানকরের একটি প্রধান অংশ রাইপুর বর্ধমানের মহারাজার কাছ থেকে ব্রহ্মোত্তর পান। এঁরাই পরবর্তীকালে মানকরের প্রধান জমিদার হন। রাধাবল্লভ মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে এই জমিদার বংশের হস্তলিখিত ইতিহাস থেকে জানা যায় ১১৩৫ বঙ্গাব্দের উত্তরায়ণ সংক্রান্তি দিন নবরত্ন মন্দিরে ভগবানমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভক্তলালের প্রপৌত্র অজিতলাল গোস্বামী এবং অজিতলালের দৌহিত্র হিতলাল মিশ্র। হিতলাল মিশ্র শুধু জমিদার ও নীলকুঠির মালিক ছিলেন তা নয় তিনি ‘ভাগবতালয়’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেখানে বহু মূল্যবান হাতে লেখা পুঁথি সংরহ করেছিলেন। তিনি নিজে গীতার একটি ভাষ্যও রচনা করেছিলেন। তাঁর একটি টোলও ছিল। আরও বিস্ময়কর তথ্য হল ভাগবতালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিতলাল মিশ্র মুসলমানদের জন্য একটি মসজিদ বানিয়ে দিয়েছিলেন, নিষ্কর জমি এবং অজু করার জন্য একটি পুকুরও দান করেছিলেন। হিতলাল মিশ্রের দৌহিত্র রাজকৃষ্ণ দীক্ষিত। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের স্বদেশী আন্দোলনের সময় রাজকৃষ্ণ দীক্ষিত প্রথম জমিদার যিনি কারাবরণ করেন। সেই প্রাচীন ঐতিহ্যময় জমিদারবাড়িটি (রঙমহল) উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে।

পন্ডিত সমাজের মধ্যেও মানকরের বেশ প্রসিদ্ধি ছিল। কনৌজ ব্রাহ্মণেরা একসময় গুরুগিরি ও বিদ্যাচর্চার জন্যই এখানে আসেন। মানকরের পন্ডিতদের মধ্যে মদনমোহন সিদ্ধান্ত (মানকরের ভট্টাচার্যরা এঁকে বর্ধমান রাজসভা থেকে নিয়ে আসেন), গদাধর চূড়ামণি, নারায়ণ চূড়ামণি, যাদবেন্দ্র সার্বভৌম (হিতলাল মিশ্রের সভাপন্ডিত), কৈলাসনাথ ও অযোধ্যানাথ ভট্টাচার্য প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। নবদ্বীপের পন্ডিত রঘুনাথ শিরোমণির জন্মস্থান কোটা মানকর বলে পরিচিত, সারদাদেবীর কাছে দীক্ষাপ্রাপ্ত ও রামকৃষ্ণের বাণী প্রচারের অগ্রণী স্বামী তপানন্দের জন্ম মানকরে। নির্ভুল জ্যোতিষ গণনায় পারদর্শী বিভূতিভূষণ শুক্ল, সাধকপ্রবর ভবদেব অধিকারীর খ্যাতি মানকর থেকে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁদের দুজনের নামে প্রতিবছর যথাক্রমে বিভূতি মেলা ও ভবের মেলা হয়ে থাকে। এ ছাড়াও বামদেবের শিষ্য পূর্ণক্ষ্যাপা, শ্রী চৈতন্যদেবের শিষ্য হরিদাস বৈরাগী, চারণ ।কবি মুকুন্দ দাস প্রমুখের পদধূলি ধন্য এই গ্রাম।

নোবেল পুরস্কারজয়ী বিজ্ঞানী হরগোবিন্দ খোরানার সহযোগী ছিলেন মানকরের ডঃ নবকুমার গুপ্ত। তিনি আমেরিকার নেব্রাস্কা লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যানসার নিয়ে গবেষণায় নিযুক্ত ছিলেন। জন্মভূমির কথা মনে রেখে মানকরের দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য 'বিজয়কুমার অপরাজিতা স্মারকবৃত্তি' অনুদান দেওয়ার স্থায়ী ব্যবস্থা করে গেছেন। মানকরের পার্থ সারথী মুখার্জী রসায়ন বিজ্ঞানে গবেষণার জন্য.২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে বিজ্ঞান বিষয়ক ভারতের সর্বোচ্চ পুরস্কার 'শান্তি স্বরূপ ভাটনগর' পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দের আগে মানকর একটি স্বাস্থ্যকর জায়গা হিসেব গণ্য হত। এক সময় বিদ্যাসাগর তাঁর স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য কবিরাজ বাড়ির ‘অতিথি ভবনে’ ছিলেন। সেই সময় তিনি বর্তমান ‘মানকর উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা নভেম্বর ‘নরম্যাল স্কুল’ হিসেবে চালু হয় এবং ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্যালয় পরিদর্শক ভূদেব মুখোপাধ্যায় এর প্রচেষ্টায় উচ্চ ইংরাজি স্কুলে উন্নীত হয়।

বিদ্যাচর্চার পাশাপাশি মানকরের শিল্পী ও বণিকদের কথাও উল্লেখযোগ্য। একটা সময় হাজারের উপর তাঁত চলত। ‘বেনারসী চেলী’ মানকরে তৈরি হত। মানকরের তসর বিখ্যাত ছিল। বিশ্বাসদের পূর্বপুরুষ মহেশ বিশ্বাস পলুপোকার চাষ সম্বন্ধে ‘কীট-কৌতুক’ বলে একটা বইও লিখেছিলেন। তাঁর মুখের বুলি, ‘পরে তসর, খায় ঘি/তার আবার খরচ কি’ একটা সময় প্রবাদের মত হয়ে গিয়েছিল। একদিকে রেশমের নকসা অন্যদিকে সুতোয় নকশা করা কাপড় ‘কুতুনি’ খুব বিখ্যাত ছিল। বয়ন শিল্পীদের একচেটিয়া ব্যবসা ছিল ‘মুগো সুতো’ – মাছ ধরবার এই সুতো গোটা বাংলাদেশে প্রধানত মানকরেই হত। মানকরের কর্মকাররা গহনার ডাইস করতেন, তাও বাংলাদেশে আর কোথাও হত না। বিখ্যাত ‘গোপীনাথ দত্তের তামাক’ মানকরের। মানকরের কদমা ও তিলখাজার এক সময় বিশেষ সুনাম ছিল। ঠাকুরের নৈবেদ্যের জন্য মূলত কদমা তৈরি হলেও বিয়ে, অন্নপ্রাশন ইত্যাদি অনুষ্ঠানেও কদমার রমরমা ছিল এবং সেই ঐতিহ্য এখনও কিছুটা টিকে আছে। এক সময় কদমার ভিতরে মানকরের তাঁতিদের তৈরি শাড়ি ঢুকিয়ে বিবাহের তত্ত্ব পাঠানো হত। কৃষক, কারিগর, কুটিরশিল্পী, বণিক, সাধক, ব্রাহ্মণ, পন্ডিত ইত্যাদি নিয়ে আত্মনির্ভর গ্রাম ছিল মানকর। শোনা যায় ১৮ পাড়া নিয়ে এই গ্রাম ছিল। ষোড়শ, সপ্তদশ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত মানকর বেশ সমৃদ্ধ গ্রাম ছিল। ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দের ভয়াবহ মহামারী, ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষ, ম্যালেরিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদির ফলে গ্রামটি প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। ১৯৫০ এর দশকে বিনয় ঘোষ (কালপেঁচা) পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি বিষয়ে বই লেখার জন্যে যখন এই গ্রামে আসেন তখন এখানের অবস্থা দেখে লেখেন “চোদ্দ মণ ময়দা লাগত যে মানকরের ব্রাহ্মণদের খাওয়াতে, সেই মানকর পরে মড়কে মহাশ্মশানে পরিণত হয়েছিল। ...ভিটের পর ভিটে, পরিত্যক্ত, জঙ্গলাকীর্ণ, জনশূন্য। একদা সুপ্রসন্ন মানকর গ্রাম আজ বিষণ্ণতায় ম্লান।”

তবে ইংরেজ অপশাসনের বিষময় ফলভোগের পর স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আবার মানকর পুরনো দিন ফিরে পাচ্ছে। মানকর উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়া একটি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, একটি সাধারণ কলেজ, একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, আইটিআই কলেজ, অনেকগুলি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। পাশাপাশি, একটি শহর গ্রন্থাগার ‘পল্লীমঙ্গল লাইব্রেরি’, গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিদ্যুৎ সাব স্টেশন ইত্যাদি আছে। অনেক বাধাবিপত্তি কাটিয়ে মানকর ‘গ্রাম’ আবার  স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়ে উঠছে, তবে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগে ‘গ্রাম’ নয় শহরে উন্নীত হওয়ার পথে।

তথ্যসূত্র


  1. পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি (লেখক - বিনয় ঘোষ, মানকর,  পৃষ্ঠা ২১০-২১৬) 
  2. ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে মানকর, মাড়ো, অমরারগড়  (লেখক - ধীরেন্দ্রনাথ মেটে, ISBN 81-88064-00-9)
  3. মানকর অঞ্চলে প্রচলিত জনশ্রুতি
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Partha_Sarathi_Mukherjee
  5. ছবি - সববাংলায়

2 Comments

2 Comments

  1. Prashanta dey

    September 20, 2018 at 12:49 pm

    Khub valo laglo amader mankar er oetijjo akhono bojae rekheche amader mankar er basinda

  2. Pingback: গড়জঙ্গল | সববাংলায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনারা জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন তথ্য ভাগ করে নিতে পারবেন বাংলা ভাষায়। আশা করি আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন। আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে, আমাদের Facebook Page-এ মেসেজ করুন। আমাদের পেজ এ যেতে এখানে দেয়া Facebook icon-এর ওপর ক্লিক করুন।

Copyright © 2017 সব বাংলায়। All rights reserved.

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!