সববাংলায়

বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য ভ্রমণ | পারমাদন জঙ্গল ভ্রমণ

বিভাগঃ ,

পাহাড়, সমুদ্রের পাশাপাশি কিছু মানুষ ঘন নিবিড় সবুজ আরণ্যক প্রকৃতি উপভোগ করতেও সমান পছন্দ করেন। জঙ্গল যাদের বিশেষ প্রিয়, তাদের জন্য অবশ্যই বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য একটি উপযুক্ত ভ্রমণস্থল হতে পারে। বাংলার প্রথম সারির সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামের সঙ্গে জায়গাটির নাম জড়িত। তাঁর রচনার মধ্যে সবুজ প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যের বর্ণনা নিখুঁতভাবে উঠে এসেছিল। প্রকৃতি তাঁর সাহিত্যের এক অন্যতম প্রধান উপাদান। ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত এই অভয়ারণ্যে বন্যপশুর দেখা তো মিলবেই, সেইসঙ্গে উপরিপাওনা হবে এখানকার মনোরম স্নিগ্ধ ও নির্জন পরিবেশ। এমনকি পিকনিকেরও বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে এখানে।

বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য কোথায়

বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলায় ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত। এটি শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে, কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে এবং বর্ধমান থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তবে বনগাঁ থেকে এই অভয়ারণ্যটির দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার, রানাঘাট থেকে এই অভয়ারণ্যের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার এবং চাকদহ থেকে দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। তাই রানাঘাট এবং চাকদহ থেকেও সহজেই পৌঁছনো যায় এখানে, তবে বনগাঁ থেকেই এই অভয়ারণ্যে যাওয়া সবচেয়ে সহজ বলে ধরা হয়।

বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যের ইতিহাস

১৯৬৪ সালে পারমাদন জঙ্গলের দ্বারোদঘাটন হয়েছিল। সেইসময় ১৪টি চিতল হরিণ ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল জঙ্গলের মধ্যে। ১৯৮০ সালে এই অরণ্যকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয় এবং এর নামকরণ করা হয়েছিল পারমাদন জঙ্গল। ১৯৯৫ সালে বিখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম অনুসারে এই অভয়ারণ্যের নামকরণ করা হয় বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য। অরণ্য প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে ‘আরণ্যক’ নামে উপন্যাসও লিখেছিলেন তিনি। অতএব তাঁর নামে একটি অভয়ারণ্যের নামকরণ যে সার্থক, তা বলাই বাহুল্য।

বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য কীভাবে যাবেন

ট্রেনে করে পারমাদন বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যে যেতে হলে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বনগাঁগামী ট্রেনে করে বনগাঁ স্টেশনে নেমে স্টেশন থেকে টোটো বা রিকশা নিয়ে চলে যেতে হবে মতিগঞ্জ-ইছামতি বাস টার্মিনাসে। সেখান থেকে দত্তফুলীগামী বাসে চড়ে নলডুগরি নামতে হবে। সেই নলডুগরি থেকে অভয়ারণ্য তিন কিলোমিটার। সেটুকু পথ অটো বা টোটোয় চলে যাওয়া যায়। মতিগঞ্জ থেকে অবশ্য সরাসরি অভয়ারণ্যে যাওয়ার জন্য অটো ভাড়া করা যায়। বনগাঁ থেকে বাসে করে নাটাবেরিয়া বাজারে নেমে সেখান থেকেও যাওয়া যায়।

বাসে করে যেতে হলে কলকাতার এসপ্ল্যানেড থেকে নলডুগরি যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে। এছাড়াও রাণাঘাট থেকেও দত্তফুলীগামী বাস পাওয়া যায়।  ব্যক্তিগত গাড়িতে বা ট্যাক্সিতে যেতে হলে, যদি বনগাঁ থেকে যেতে হয়, তবে বনগাঁ-হেলেঞ্চা রোড ধরে পৌঁছে যাওয়া যাবে এই অভয়ারণ্যে। এছাড়ও কলকাতা থেকে গাড়িতে যেতে হলে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে পৌঁছে যাওয়া যাবে এই অভয়ারণ্যে।

বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যে কোথায় থাকবেন

যেসব প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ জঙ্গল ভালবাসেন এবং অরণ্যের নির্জনতার সান্নিধ্যে কাটাতে চান একটি গোটা দিন, তাঁরা এই পারমাদন জঙ্গলের ভিতরে বনদপ্তরের ট্যুরিস্ট লজে রাত্রিযাপন করতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে আগে থাকতেই এই লজ বুক করে নিতে হবে। তবে থাকবার জন্য অভয়ারণ্যের একেবারে নিকটবর্তী অঞ্চলে সহজে হোটেল পাওয়া একটু দুঃসাধ্য। তবে কিছুটা দূরত্বে হোটেল বা হোম স্টে পাওয়া যেতে পারে।

বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যে কী দেখবেন

শহরের কোলাহল, ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে ছুটি নিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুক্ষণ কাটিয়ে যেতে চাইলে পারমাদন বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য এক উৎকৃষ্ট এবং উপযুক্ত স্থান হতে পারে নিঃসন্দেহে। এই অরণ্যে অর্জুন, শিশু, শিমুল ইত্যাদি বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ এবং বিচিত্র পশু ও পাখিদের সমারোহতে মন হারিয়ে যাবে সহজেই। সেই আরণ্যক নির্জনতা এবং সেইসঙ্গে ইছামতীর তীর ধরে হাঁটা, নদীর শীতল হাওয়ার স্পর্শ, নদীর বুকে বোটিং, জঙ্গলের মধ্যে আপনমনে ঘুরে বেড়ানো—এই সব মিলিয়ে অবসর যাপনের মুহূর্তগুলি মনের মনিকোঠায় থেকে যাবে দীর্ঘকাল। এছাড়াও দলবেঁধে পিকনিক করতেও যাওয়া চলে এই অভয়ারণ্যে। পিকনিকের জন্য আলাদা জায়গা রয়েছে। ইছামতীর তীরে, সবুজ গাছপালায় ঘেরা অরণ্যশোভার মাঝে, বিচিত্র পাখির কুজনে পিকনিকের আমেজ যে দারুণ জমে যাবে, তাতে সন্দেই নেই। মূলত যেসব জিনিস এই পারমাদন বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যের ভিতরে দেখার, সেগুলি নিম্নে আলোচিত হল।

চিড়িয়াখানা

বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যের মধ্যে একটি ছোটখাটো চিড়িয়াখানা দেখতে পাওয়া যায়। এই চিড়িয়াখানার মধ্যে যেটি খুবই আকর্ষণীয় সেটি হল, এখানে সাদা ময়ুর দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও কাঠবিড়ালি, মৌটুসী, শঙ্খচিল, নীলকন্ঠ, কাঠঠোকরা ইত্যাদি ছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এখানে দেখা যেতে পারে। এই চিড়িখানাতে ম্যাকাও পাখির দেখাও মিলবে। এই অভয়ারণ্যে প্রায় ২৫০টিরও বেশি হরিণ রয়েছে। এমনকি বাঁদর, লেঙুড়ের দেখাও পাওয়া যায়। হরিণদের যখন খাওয়ানো হয়, সেই দৃশ্যটি দেখবার মতো।

শিশুদের পার্ক

এই অভয়ারণ্যেরই ভিতরে ছোট ছোট শিশুদের বিনোদনের জন্য পার্কও রয়েছে। বাচ্চারা সেখানে আনন্দ উপভোগের দারুণ সুযোগ পাবে। সেখানে বাচ্চাদের উপভোগের জন্য রয়েছে কয়েকটি স্লিপ, দোলনা ইত্যাদি। মনে রাখবেন শিশুদের জন্য এই দোলনা বা বড়রাও সেই অরণ্য প্রকৃতির মাঝে তৈরি পার্কে ঘুরে আনন্দ পেতে পারেন।

ইছামতী

এই বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য একেবারে ইছামতী নদীর তীরেই অবস্থিত। ফলে নদীর ধারে যাওয়া, সেই তীর ধরে জঙ্গলের পাশ দিয়ে হেঁটে চলা এক আলাদা রোমাঞ্চ দেবে পর্যটকদের। ইছামতী নদীর বুকে বোটিংটি অবশ্যই করে দেখা উচিত। সেই নিস্তব্ধ অরণ্যকে পাশে রেখে ইছামতীর শান্ত স্নিগ্ধ জলে বোটের ওপর ভেসে বেড়ানোর যে অভিজ্ঞতা তা জীবনের এক অমূল্য সঞ্চয় হয়ে থেকে যাবে।

পিকনিক স্পট

জঙ্গলের মধ্যেই রয়েছে পিকনিক স্পট। এটা যেহেতু প্রাইভেট স্পট নয়, তাই আপনার দলের পাশাপাশি আরও অনেক দল এখানে পিকনিকের জন্য থাকবে, সেইজন্য অন্যের যাতে কোন অসুবিধা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। জঙ্গলের ভেতরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে রান্নার জ্বালানি, প্লাস্টিক, গানবাজনার ওপর বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

নীলকুঠি

নৌকো করে ইছমতীর অপরপাড়ে গেলে একটি পুরাতন পরিত্যক্ত নীলকুঠির দেখা পাওয়া যায়। ইতিহাসকে তা ধারণ করে তো আছেই, তাছাড়াও সেই নির্জন নীলকুঠির ছমছমে পরিবেশে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চও অনুভব করা যায়।

বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য থেকে আশেপাশে আরও বেশ কয়েকটি জায়গায় ঘুরে আসা যায়, যেমন হাজরাতলা মন্দির, বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি, নলডুগরি গ্রাম ইত্যাদি।

বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যে কখন যাবেন

অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে অর্থাৎ মূলত শীতকাল এই অভয়ারণ্যে ঘুরতে যাওয়ার উপযুক্ত সময় হতে পারে। শীতল আবহাওয়ায় জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে মন্দ লাগে না। শীতকালে পিকনিক করতে চাইলেও এই অভয়ারণ্য একটি উপযুক্ত স্থান হতে পারে, তবে ভিড় এড়িয়ে নির্জনতা উপভোগ করতে চাইলে বিশেষ ছুটির দিনগুলিতে না আসাই ভালো। তবে বর্ষাকালে বিচিত্র পোকামাকড়, সাপখোপের কারণেই জঙ্গলটি এড়িয়ে যাওয়াই মঙ্গল৷

সতর্কতা ও পরামর্শ

  • সোমবার থেকে রবিবার প্রত্যেকদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত এই অভয়ারণ্য খোলা থাকে। এই সময়সীমাটি মাথায় রেখেই এখানে ঘুরতে আসা উচিত।
  • অভয়ারণ্যে প্রবেশ করবার জন্য মাথাপিছু ১২০টাকা করে লাগে। দুচাকা বা বাস, ট্রাকের মতে চারচাকা গাড়ির জন্য আলাদা টাকা দিতে হয়। ইছামতীতে বোটিং করতে চাইলে, সেখানেও আলাদা করে টিকিট কাটতে হবে।
  • অভয়ারণ্যের মধ্যেই আলাদা একটি পিকনিক স্পট রয়েছে। সেই পিকনিকের জায়গাটির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে টিকিট কাটতে হয়।
  • পিকনিক করতে এসে বা ঘুরতে এসে অভয়ারণ্যের মধ্যে খুব বেশি হইচই না করাই ভালো, তাতে বন্যপ্রাণীদের অসুবিধা হয়।
  • যত্রতত্র প্লাস্টিক, প্যাকেট, কাগজপত্র ফেলে প্রকৃতিকে আবর্জনাময় করে তুলবে না। আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট পাত্র ব্যবহার করা উচিত।
  • বন্যপ্রাণীদের নিজেদের সঙ্গে থাকা খাদ্য দেবেন না এবং তাদের অযথা বিরক্ত করবেন না।
  • জঙ্গলের মধ্যে আগুন জ্বালানো উচিত নয়, নতুবা তা থেকে বড়রকমের কোনো বিপদ ঘটতে পারে।
  • কোনো মিউজিক সিস্টেম নিয়ে গিয়ে জঙ্গলে জোরালোভাবে গান চালানো একেবারেই উচিত নয়, তাতে পশুদের প্রভূত সমস্যা হতে পারে।
  • বর্ষাকালে এই অভয়ারণ্যে পোকামাকড়ের উপদ্রব থাকে। তাই সাবধানে জঙ্গলে চলাফেরা করবেন এবং সাঁতার না জানলে একা একা ইছামতীর ধারে না যাওয়াই ভালো।
  • ভিড় এড়িয়ে আরণ্যক নির্জনতা উপভোগ করতে হলে বিশেষ ছুটির দিনগুলিতে না আসাই ভালো।

ট্রিপ টিপস

  • কলকাতা এবং সংলগ্ন অঞ্চল থেকে একদিনের ট্যুরে বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যে আসতে হলে সকালের বনগাঁর ট্রেন ধরে নটা বা দশটার মধ্যে অভয়ারণ্যে পৌঁছে গিয়ে সারাদিন ঘুরে রাতে বাড়ি ফিরে যাওয়া যায় সহজেই।

সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৪


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading