সববাংলায়

গোবরডাঙা

বিভাগঃ , ,

গোবরডাঙা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার একটি শহর ও পৌরসভা এলাকা। এই অঞ্চল একসময় প্রাচীন কুশদহ পরগনা বা কুশদ্বীপের অন্তর্গত ছিল। ভৌগলিক দিক থেকে দেখলে এই জনপদ ২২.৮৭°উঃ অক্ষাংশ এবং ৮৮.৭৬°পূঃ দ্রাঘিমাংশ বরাবর অবস্থান করছে।

গোবরডাঙা » সববাংলায়

এই এলাকার নাম গোবরডাঙা হল কিভাবে সে প্রসঙ্গে মতভেদ আছে। গোবরডাঙা নামের অর্থ – ” পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান”। সংস্কৃতে ‘গো’ বলতে- পৃথিবী, ‘বর’ বলতে – শ্রেষ্ঠ এবং ‘ ডাঙা’ বলতে -স্থান বোঝায়।

ঐতিহাসিক দিক থেকে দেখলে গোবরডাঙা যথেষ্ট ঐতিহ্যশালী এক জনপদ।

প্রাচীন কুশদ্বীপের অন্তর্গত এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে একসময় ইছামতি নদী, যমুনা নদীর সঙ্গে প্রবাহিত হত৷ স্থানীয় চালুন্দিয়া নদীও বেশ খরস্রোতা হওয়ার কারণে বাণিজ্যিক নৌকা চলাচল করত। এই চান্দুলিয়ার কিছুটা অংশ আবার ‘কঙ্কনা বাওড়’ নামে খাঁটুরা বা হয়দাদপুরের পূর্বদিক দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এই অঞ্চল সংলগ্ন গোময়, গোপিনীপোতা, গবীপুর, গয়েশপুর, গোপালপুর প্রভৃতি গ্রামের গোপ-কৃষ্ণ জড়িত নাম এই এলাকা যে একসময় গোপ প্রধান ছিল তার সাক্ষ্য বহন করে। ষোলশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বর্গী আক্রমণের ফলে হুগলীর সপ্তগ্রামের ৪২ ঘর তাম্বুলি বণিক (রক্ষিত, সেন, আশ, কোঁচ, দত্ত, কর, দে, পাল, কুণ্ড) এখানকার খাঁটুরায় বসবাস শুরু করেছিলেন। কুশদহ পরগনার মাটিকোমরা, গৈপুর, খাঁটুরা প্রভৃতি অঞ্চলে ‘নবন্যায়’ শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ সংস্কৃত পণ্ডিতরা বসবাস করতেন

১৮৫০-৮০ সালের মধ্যে এখানকার কানাই-নাট্যশালা গ্রামে মাটি খুঁড়ে একাধিক প্রাচীন মন্দিরের ভিত পাওয়া যায়। এছাড়া প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখানকার মাটকুমড়ো অঞ্চলেও মাটি খুঁড়ে বড়-বড় বাড়ি ও পুরানো ইটের স্তুপ পেয়েছেন।

অষ্টাদশ শতকে যশোরের খেলারাম মুখোপাধ্যায় ব্রিটিশদের থেকে নিলামে গোবরডাঙার জমিদারি কেনেন। জনশ্রুতি দেবী কালীর আর্শীবাদে খেলারামের পুত্রসন্তান হলে দেবী কালীর প্রসন্নে ছেলে হওয়ায় খেলারাম ছেলের নাম রাখেন কালীপ্রসন্ন। তারপর থেকে বংশের প্রত্যেক ব্যক্তির নামের সঙ্গে ‘প্রসন্ন’ শব্দটি যুক্ত হয়ে আসছে। পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র কালিপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় এলাকার জমিদার হন।

কেবল প্রাচীন ইতিহাস নয় এই জনপদ সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অত্যন্ত সম্পদশালী। এই জনপদ ‘ভিলেজ অব থিয়েটার’ নামেও খ্যাত।

গোবরডাঙা যেমন গৌরবমণ্ডিত ইতিহাসে সমৃদ্ধ তেমনি গর্বিত তার সন্তানদের জন্যেও। এখানকার বিখ্যাত মানুষদের মধ্যে পড়ে পণ্ডিত রামধন তর্কবাগীশ, ভগবান বিদ্যালঙ্কার, কত্থক শিল্পী ধরণীধর বন্দ্যোপাধ্যায়, অধ্যাপক মুরলীধর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখরা। সিদ্ধিরাম রক্ষিত ছিলেন বিখ্যাত পুরাণ পাঠক। এখানকারই ভূমিপুত্র ছিলেন সমাজ সংস্কারক ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহযোগী শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। তিনি ছিলেন খাঁটুরার বাসিন্দা। ১৮৫৬ সালে বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে বিধবা বিবাহ আইন পাস করলে শ্রীশচন্দ্র প্রচলিত সংস্কারকে উপেক্ষা করে ৭ ডিসেম্বর কলকাতায় রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে বর্ধমানের বাল্য বিধবা কালীমতীকে বিয়ে করেন। মা সূর্যমণিদেবীর এই বিয়েতে মত না থাকলেও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন শ্রীশচন্দ্র। বাংলার ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম বিধবা বিবাহ। বিবাহ বাসরে উপস্থিত ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে রমাপ্রসাদ রায়, প্যারীচাঁদ মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহের মতো প্রথিতযশা মানুষ। শ্রীশচন্দ্র পরবর্তী সময়ে বনগাঁর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন। ঋণগ্রস্ত মাইকেল মধুসূদন দত্তকে বিদ্যাসাগর যে টাকা পাঠিয়েছিলেন সেখানেও সাহায্য করেছিলেন শ্রীশচন্দ্র। বনগাঁ-শিয়ালদহ ট্রেনলাইন তৈরির ব্যাপারে যাঁরা উদ্যোগী হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই শ্রীশচন্দ্র। ১৮৮৩ সালে দমদম থেকে দত্তপুকুর রেলপথ তৈরির সময়ে বনগাঁর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে রেলপথকে গোবরডাঙা পর্যন্ত টেনে আনার পিছনে শ্রীশচন্দ্রের ভূমিকা অন্যতম। বারাসত মহকুমা তৈরি করে যোগাযোগের সুবিধার জন্য গোবরডাঙাকে বসিরহাট মহকুমা থেকে বিছিন্ন করে বারাসতে যুক্ত করেন শ্রীশচন্দ্রই। সড়ক পথে যাতায়াতের সুবিধার জন্য গোবরডাঙা-ইছাপুরের মধ্যে রাস্তাটি নির্মাণেও ভূমিকা ছিল তাঁর। ১৮৭০ সালে গোবরডাঙা পুরসভার প্রথম চেয়ারম্যান হন শ্রীশচন্দ্রই। গোবরডাঙার উন্নয়নে তাঁর অবদান ভোলার নয়। এখানকার আরেক কৃতি সন্তান হলেন প্রমথনাথ বসু যিনি জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার উচ্চপদে চাকরি করেছেন। এই প্রমথনাথ বসুই ময়ূরভঞ্জ লৌহ খনির আবিষ্কারক। তাঁর নামেই তৈরি হয়েছে ‘প্রমথনাথ বসু স্মৃতি গোরবডাঙা পৌর টাউন হল।’ বিখ্যাত সাহিত্যিক প্রভাবতীদেবী সরস্বতী, হাসিরাশি দেবী এই শহরের বাসিন্দা। শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক উষাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়ও এই গোবরডাঙারই সন্তান। আই.এ.স হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় এখানকারই ভূমিপুত্র ছিলেন।

অনেকেই জানেননা এই জনপদ শ্রীরামকৃষ্ণ, বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেন, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু মিত্র, রামতনু লাহিড়ি, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, কাজি নজরুল , নেতাজির মত মনিষীদের পদধূলিতে ধন্য হয়েছে এক সময়।

গোবরডাঙাকে বলা হয় ‘সিটি অফ থিয়েটার’। এখানকার নাট্য শিল্পীরা দেশ বিদেশে প্রচুর সম্মান পেয়েছেন তাঁদের অভিনয়ের কারণে। এখানকার নাট্যচর্চার ইতিহাস প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো। পেশাদার অপেশাদার  অনেক নাট্যদল রয়েছে এখানে। রাজ্য তো বটেই গোটা দেশেই এখানকার নাট্যদলের নাটকের পরিচিতি ও খ্যাতি রয়েছে। সম্প্রতি এখানে তৈরি হয়েছে শিল্পায়ন নাট্য বিদ্যালয় ।

দেশ স্বাধীন হয় যে বছরে সেই বছরেই তৈরি হয় গোবরডাঙা হিন্দু কলেজ। এখানকার অন্যতম প্রাচীন স্কুল গোবরডাঙা খাঁটুরা হাইস্কুল স্থাপিত হয় ১৮৫৬ সালে। এছাড়াও গোবরডাঙা হাই ইংলিশ স্কুল ও খাঁটুরা মিডল ইংলিশ স্কুল দু’টি মিলে তৈরি হওয়া খাঁটুরা উচ্চ বিদ্যালয় এখানকার অত্যন্ত নামী একটি স্কুল।

 

এই গোবরডাঙায় এক্সময়ে বহু চিনির কল ছিল। এখানকার আখের লাল চিনি ভারত বিখ্যাত ছিল একটাসময়ে।

খেলারাম দেবী প্রসন্নময়ী কালীমন্দির তৈরির কাজ শুরু করেও মাঝপথে মারা গেলে তাঁর পুত্র কালীপ্রসন্ন ১২২৯ বঙ্গাব্দে প্রসন্নময়ী কালীমন্দির ও বারোটি শিবমন্দির স্থাপন করেছিলেন।

এখানকার ঐতিহাসিক গোষ্ঠবিহার উত্‌সব ও মেলা গোবরডাঙার অন্যতম প্রধান উৎসব। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে এই মেলা শুরু হয়। অতীতে এই উত্‌সবের মাধ্যমেই গোবরডাঙায় নববর্ষের সূচনা হত। এই উত্‌সবে একসময়ে একটি খ্যাপা ষাঁড়ের সামনে শূকর ছানা ফেলে হত্যার প্রথা থাকলেও এখন এই প্রথা বন্ধ হয়েছে।

এখানকার এক বিশেষ ব্যক্তির কথা না বললে বড় অবিচার করা হবে তাঁর প্রতি। তিনি বিশ্বজিৎ ঘোষ ওরফে মানিক। গাছের গায়ে পেরেক মারা দেখলেই তা তোলার কাজে লেগে পড়েন তিনি। ডাক্তারের মতো জখম গাছের শরীর থেকে সাবধানে পেরেক, লোহার শিক বার করে আনেন মানিক।

গোবরডাঙার মুখোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গা পুজো এখানকার অন্যতম অভিজাত পুজো। একসময়ে এই পুজোতে মোষবলি ও পাঁঠাবলির প্রচলন থাকলেও পরে তা বন্ধ হয়ে গিয়ে বদলে পাঁচ পোয়া চিনি ও এক পোয়া মধু দেওয়া হয় দেবী দুর্গাকে।  এখানকার দুর্গা প্রসন্নময়ী দুর্গা নামে পরিচিত। অতীতে জমিদার বাড়ি থেকে যমুনার ঘাট পর্যন্ত বিসর্জনের শোভাযাত্রা চলত, সঙ্গে থাকত হাতি। দশমীর দিন সন্ধ্যায় আকাশে একটি তারা দেখা গেলে তবেই যমুনাতে প্রতিমা বিসর্জন হত। এখনও এই রীতি মানা হয়।  

এলাকাটি আর্সেনিক-প্রবণ। এলাকার মানুষ, যাঁদের কিছুটা আর্থিক সামর্থ্য আছে, তাঁরা পানীয় জল কিনে খান। আর যাঁরা তা পারেন না, তাঁরা টিউবয়েলের জলের ভরসাতেই থাকেন।

এখানকার উল্লেখযোগ্য পর্যটনস্থানগুলির মধ্যে চণ্ডীতলার চণ্ডীপীঠ, বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের শিবমন্দির ও স্নানের ঘাট, গোবরডাঙার মুখোপাধ্যায় পরিবারের রাজবাড়ি, প্রসন্নময়ী কালী ও দ্বাদশ শিব মন্দির, সূর্যঘড়ি, ফেয়ারি হল, শাহজাহানের আতরদান, ফ্রেঞ্চ ক্লক, চাইনিজ মিংভাজ বা ফুলদানি সিংহদ্বার, নহবতখানা, গন্ধর্বপুরে ব্রাহ্মমন্দির, সাহাপুরের মঙ্গলালয়, নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ, গৈপুরের ওলাবিবির দরগা, কুণ্ডুপুকুরের শিবমন্দির, খাঁটুরার জোড়া শিবমন্দির, গড়পাড়া ও রঘুনাথপুরের মসজিদ উল্লেখযোগ্য।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading