ইতিহাস

চঞ্চল কুমার মজুমদার

চঞ্চল কুমার মজুমদার (Chanchal Kumar Majumdar) ছিলেন ঘনপদার্থবিজ্ঞানের (Condensed Matter Physics) একজন কৃতী ছাত্র এবং পরবর্তীকালে গবেষক এবং বিজ্ঞানী। কোয়ান্টাম মেকানিক্স (Quantum Mechanics) সংক্রান্ত গবেষণার জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন। চঞ্চল কুমার মজুমদার ভারতবর্ষের তিনটি প্রধান বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি, ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস, ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সের নির্বাচিত ফেলো ছিলেন।

১৯৩৮ সালের ১১ আগস্ট পরাধীন পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে চঞ্চল কুমার মজুমদারের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল নির্মলকান্তি মজুমদার। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল সীতা মজুমদার। শিক্ষিত পরিবারে বড় হওয়ার ফলে ছোট থেকেই চঞ্চল কুমারের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল অত্যন্ত বেশি। তাঁরা তিন ভাইই ভীষণ মেধাবী ছিলেন। চঞ্চল কুমার মজুমদার তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা সম্পূর্ণ করেন কৃষ্ণনগরের সি. এম. এস সেন্ট জন্স উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে পরবর্তী পড়াশোনা শেষ করেন। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদালয় সব স্তরেই তিনি একজন কৃতী ছাত্র ছিলেন।

সাহা ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স থেকে স্নাতকোত্তরের গবেষণা শেষ করে পরবর্তী গবেষণার জন্য তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে ওয়াল্টার কন-এর সঙ্গে কাজ করা শুরু করেন যিনি ১৯৯৮ সালে রসায়নবিদ্যায় নোবেল পান। কন তাঁর থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। কঠিন পদার্থের মধ্যে পজিট্রনের ধ্বংস হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত তাঁর গবেষণাটির তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ১৯৬৩ সালে নোবেল পাওয়া মারিয়া গোপার্ট-মায়ের। ১৯৬৫ সালে এই কাজটির জন্য তিনি পিএইচডি ডিগ্রি পান। এরপর কনের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয় যার বর্তমান নাম কার্নেগি ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে তিনি পোস্ট-ডক্টোরাল কাজ করেন।

১৯৬৬ সালে ভারতে ফিরে এসে তিনি টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া পর্যন্ত তিনি এখানেই বহাল ছিলেন। মাঝখানে ১৯৬৯-৭০ সাল পর্যন্ত ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যাম এডওয়ার্ডসের সঙ্গে কাজ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড এগ্রিকালচারে পদার্থবিদ্যার পালিত অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন।

ইন্ডিয়ান অ্যাসোশিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সের (Indian Association for the Cultivation of Science, IACS) ম্যাগনেটিজম অ্যান্ড সলিড স্টেট ফিজিক্স বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের পদে এরপর তাঁকে বহাল করা হয়। তিনি IACS এর পালিত গবেষণাগারে গবেষণার পাশাপাশি ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টারেও গবেষণা করতেন। অঙ্কের ওপর সাধারণ গবেষণা করার জন্য ডিপার্টমেন্ট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির তরফ থেকে ১৯৮৬ সালে এস. এন. বোস ন্যাশনাল সেন্টার ফর বেসিক সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৮৭ সালে চঞ্চল কুমার এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম নির্দেশক হিসেবে নিযুক্ত হন। দীর্ঘদিন এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে ১৯৯৯ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেন। তবে অবসর নেওয়ার পরে তিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইন্সটিটিউটে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করা শুরু করেন।

গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার পরীক্ষাগারগুলির আধুনিকীকরণের দিকে বিশেষ মনোযোগ দেন। তিনি বেশ কিছু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কমিশন ফর কোঅপারেশন উইথ ইউনেস্কো। অধ্যাপনা, গবেষণা, প্রশাসনিক দায়দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তিনি ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ফিজিক্সের সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ইন্ডিয়ান ফিজিকাল সোসাইটির এবং ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্সের সভাপতি নিযুক্ত হন। এছাড়াও, তিনি রমন সেন্টার ফর অ্যাপ্লায়েড অ্যান্ড ইন্টারডিসিপ্লিনারি সায়েন্সেসের একজন এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল মেম্বার ( হিসেবে কাজ করেছেন।

১৯৬৮ সালে উৎপলা ঘোষের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের দুটি সন্তানের নাম রুচিরা এবং রুপক।

১৯৭৬ সালে চঞ্চল কুমার ভারতে বিজ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ সম্মান শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার পান। ১৯৭৮ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির তরফ থেকে তিনি এম. এন. সাহা মেডালপান। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে ইন্ডিয়ান ফিজিক্স অ্যাসোসিয়েশনের তরফ থেকে পি. এ. পান্ড্যা পুরস্কার পান। ১৯৮৩ সালে ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন তাত্ত্বিক বিজ্ঞানে গবেষণা করার জন্য তাঁকে মেঘনাদ সাহা পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৮৯ সালে INSA তাঁকে সত্যেন্দ্রনাথ বসু মেডাল দেয়। ১৯৯৭ সালে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে সত্যেন্দ্রনাথ বোস জন্মশতবর্ষ পুরস্কার দেয়। এছাড়াও তিনি আরো বেশ কিছু সম্মান পেয়েছেন।

২০০০ সালের ২০ জুন হার্ট অ্যাটাকে মাত্র ৬১ বছর বয়সে এই কৃতী অধ্যাপক, গবেষক ও বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।