ইতিহাস

বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরী

আধুনিক ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরী-র (Basanti Dulal Nagchaudhury) অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এই ভারতীয় পদার্থবিদ অধ্যাপনার পাশাপাশি ভারত সরকারের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছিলেন। ভারতে নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যার (Nuclear Physics) পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিতি বাসন্তী দুলাল নাগ চৌধুরী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের প্রথম সাইক্লোট্রনটি (Cyclotron) বানান। ১৯৭০ এর দশকে ভারতের প্রতিরক্ষা দপ্তরের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তরের ক্যাবিনেট কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি ভারতের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’তে (Smiling Buddha) প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jawaharlal Nehru University) উপাচার্য পদে বহাল ছিলেন।

১৯১৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার বারদী গ্রামে বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরীর জন্ম হয়। তাঁর বাবা ইউ. সি. নাগ (U. C. Nag) ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক। সাত ভাইয়ের মধ্যে বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরীই ছিলেন সবার বড়। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বি. এস. সি. পাশ করেন। তারপরে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. এস. সি. পাশ করেন। এলাহাবাদেই প্রভাবশালী উকিল পরমেশ্বর নারায়ণ হাকসর এবং বিখ্যাত ভারতীয় পদার্থবিদ মেঘনাদ সাহার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। মেঘনাদ সাহার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্টতা বাড়ে এবং তিনি তাঁর অধীনে গবেষণার কাজ করা শুরু করেন। ১৯৩৮ সালের জুলাই মাসে মেঘনাদ সাহা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ ক্যাম্পাসে চলে এলে তিনিও তাঁর সঙ্গে চলে আসেন।

মেঘনাদ সাহার সঙ্গে ঘনিষ্টতার সূত্রেই আর্নেস্ট লরেন্সের (Ernest Lawrence) সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয় এবং তাঁর সাহায্যেই তিনি ১৯৩৮ সালের শেষের দিকে নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যায় ডক্টরেট করার উদ্দেশ্যে বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of California, Berkeley) চলে যান। আর্নেস্ট লরেন্সের তত্ত্বাবধানে ১৯৪১ সালে বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরী তাঁর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করে ভারতে ফিরে আসেন।  

ভারতে ফিরে এসে তিনি মেঘনাদ সাহার দলের গবেষকদের সঙ্গে কাজ করতে থাকেন। ১৯৪৯ সালে সাহা ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স (Saha Institute of Nuclear Physics, SINP) প্রতিষ্ঠিত হলে বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরী সেখানে  গবেষণা করতে থাকেন এবং রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে পড়াতে থাকেন। ১৯৫২ সালে মেঘনাদ সাহা অবসর নিলে তাঁকে এই প্রতিষ্ঠানের নির্দেশক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল নিউক্লীয় আইসোমার (Nuclear Isomers), প্রবর্তিত তেজস্ক্রিয়তা (Induced Radioactivity) চার্নোকভ বিকিরণ (Chernokov Radiation),  ননথার্মাল প্লাজমা (Nonthermal Plasma)।

১৯৪১ সালে বার্কলেতে ডক্টরেট করার সময়ে তিনি সাইক্লোট্রনের পথিকৃৎদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। ভারতে ফেরার আগে মেঘনাদ সাহার সাহায্যে এবং টাটা গোষ্ঠীর অর্থানুকূল্যে বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরী একটি সাইক্লোট্রন চুম্বকের কিছু অংশ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু জাহাজে করে দ্বিতীয় দফায় সাইক্লোট্রনের জিনিসপত্র আনার সময় তা ডুবে যায়। ফলে প্রথমে মেঘনাদ সাহা এবং পরে বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরীর নেতৃত্বে তাঁদের ছাত্ররা  সাইক্লোট্রনের বাকি জিনিসপত্রগুলি বানিয়ে ফেলেন। কিন্তু নির্মাণের সময় কিছু যান্ত্রিক গোলযোগ হয় এবং ১৯৫৪ সালে এমিলিও সেগর (Emilio Segre) তাঁদের ল্যাবরেটরিতে এসে সাহায্য করলে ভারতের প্রথম সাইক্লোট্রনটি কাজ করা শুরু করে। ১৯৫৩ সালে মেঘনাদ সাহার পরে তিনিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার পালিত অধ্যাপক (Palit Professor of Physics) নিযুক্ত হন এবং ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। তিনি ১৯৬১-৬২ সালে ইলিনইস বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Illinois) অতিথি অধ্যাপক ছিলেন এবং লিংকন লেকচারার (Lincoln Lecturer) হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন।

বিধানচন্দ্র রায়, পি এন হাসকরের মতো পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি দপ্তরের ক্যাবিনেট কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সালে তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি ডিআরডিও-র (DRDO) বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা পদে বহাল ছিলেন। এই পদে থাকার সুবাদে তিনি ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষা ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’-র পরিকল্পনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পারমানবিক বোমা পরীক্ষায় সায় দেন এবং ১৯৭৪ সালের ১৮ মে ভারতে প্রথম পারমানবিক বোমা সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়।

১৯৭০ সালে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে ভারতে লং-রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইল (Long-range Ballistic Missiles) গঠনের সম্ভাব্য পরীক্ষা করার দায়িত্ব দেন। বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরীর অনুমোদনে ১৯৭২ সালে প্রজেক্ট ভ্যালিয়ান্ট (Project Valiant) এবং প্রজেক্ট ডেভিল (Project Devil) চালু করা হয়, যাদের মাধ্যমে যথাক্রমে তরল জ্বালানি সমৃদ্ধ ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইল (Intermediate Range Ballistic Missile) গঠন করার এবং একটি শর্ট রেঞ্জ সারফেস টু এয়ার মিসাইল (Short Range Surface to Air Missiles) গঠন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৭৪ সালে এই দুটি প্রকল্পই বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৭০-৭১ সালে বাসন্তী দুলাল নাগ চৌধুরী ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো সমস্যার জন্য গঠিত কমিটির হয়েও সভাপতিত্ব করেন।

১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরী পরিবেশ পরিকল্পনা এবং সমন্বয়ের জাতীয় কমিটির  (National Committee on Environmental Planning and Coordination) হয়ে সভাপতিত্ব করেন। তিনি বেশ কিছু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিকাল ফিজিক্সের (International Centre for Theoretical Physics)  বৈজ্ঞানিক পর্ষদের সদস্য ছিলেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ন্যাশনাল ফিজিক্স কাউন্সিল (National Physics Council), রিসার্চ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের (Research Advisory Council) সদস্য ছিলেন। বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতি, গানবাজনার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমির (ITC Sangeet Research Academy) উপদেষ্টা সমিতিরও সদস্য ছিলেন।

দীপালি নাগের (তালুকদার) সঙ্গে বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরীর বিয়ে হয়। দীপালি নাগ ছিলেন একজন প্রথিতযশা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী। তাঁদের একটি পুত্রসন্তান রয়েছে।  

১৯৬৪ সালে বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরী ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স আকাদেমির ফেলো (Indian National Science Academy) নির্বাচিত হন। তিনি অন্ধ্রপ্রদেশ বিশ্ববিদ্যালয় (Andhrapradesh University) এবং কানপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Kanpur University) থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে তাঁকে পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করা হয়।

২০০৬ সালের ২৫ জুন সেরিব্রাল ইনফার্কশনে (Cerebral Infarction) এই প্রতিভাধর বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।