ইতিহাস

উধম সিং

উধম সিং (Udham Singh) ভারতের একজন বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী যিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের একুশ বছর পর এই হত্যাকাণ্ডের মূল কাণ্ডারী  মাইকেল ও’ডায়ারকে লন্ডনে গুলি করে  হত্যা করার জন্য। তাঁর সাহসিকতা এবং দৃঢ়চেতা মনোভাবকে সারা ভারত তথা পৃথিবীর মানুষ কুর্নিশ জানায়। তাঁকে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নায়ক হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৮৯৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের সাঙ্গরু জেলার সুনাম গ্রামে একটি কম্বোজ শিখ পরিবারে উধম সিংয়ের জন্ম হয়। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয় শের সিং। তাঁর বাবা সরদার তেহার সিং জম্মু পেশায় চাষী ছিলেন। এছাড়াও তিনি উপালি গ্রামের রেল ক্রসিংয়ে চৌকিদারের কাজ করতেন। তাঁর মায়ের নাম হারনাম কৌর।খুব ছোটবেলায় উধম সিং তাঁর মা এবং বাবাকে হারান। বাবা মায়ের মৃত্যুর পর তাঁকে এবং তাঁর বড় ভাই মুক্ত সিংকে অমৃতসরের সেন্ট্রাল খালসা অনাথ আশ্রমে (Central Khalasa Orphanage) নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুদিন পরে  তাঁর বড় ভাইয়েরও মৃত্যু হয়। এই অনাথ আশ্রমেই তাঁর নাম বদলে উধম সিং রাখা হয়।

উধম সিং ১৯১৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করেন। ১৯১৯ সালে তিনি অনাথ আশ্রম ছেড়ে চলে যান। এরপর তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে (British Indian Army) শ্রমিক হিসেবে যোগদান করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর মোহভঙ্গ হয় এবং তিনি সেই সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন।

এরপর উধম সিং সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ভগত সিংয়ের দ্বারা খুবই প্রভাবিত হন। ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে রাওলাট অ্যাক্ট অনুযায়ী কংগ্রেসের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে বিনা অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এর প্রতিবাদে এপ্রিল মাসের ১৩ তারিখে অমৃতসরে একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল বেরোয়। সেই মিছিলে প্রায় কুড়ি হাজার নিরস্ত্র মানুষ অংশগ্রহণ করেন। মিছিলটি জালিয়ানওয়ালাবাগে গিয়ে সমবেত হয়। উধম সিং সেই সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন এবং সেখানে আসা মানুষদের পানীয় জল বিতরণের দায়িত্বে ছিলেন। এই শান্তিপূর্ণ জমায়েতের ওপরই মাইকেল ও’ডায়ারের নির্দেশে ব্রিটিশ পুলিশ নির্মমভাবে গুলি চালায় যার ফলে অন্তত ৩৭৯ জনের মৃত্যু হয় এবং সহস্রাধিক আহত হন। উধম সিং সহ আরো বেশ কিছু ব্যক্তি সে যাত্রায় বেঁচে যান কোন মতে। বেঁচে গেলেও উধম সিংয়ের মনে এই ঘটনা একটি গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। তখন থেকেই তিনি ঠিক করে ফেলেন যে সেই নারকীয় ঘটনার প্রতিশোধ তিনি নেবেনই।

এরপর উধম সিং বেশ কিছুদিন আফ্রিকার উগান্ডা শহরে  রেললাইন তৈরির প্রকল্পে কাজ করেন। ১৯২২ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং অমৃতসরে একটি দোকান খোলেন। মূলত এই সময় থেকেই তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯২৪ সালে তিনি পাঞ্জাবের গদর পার্টিতে যোগ দেন। এই দলটির প্রতিনিধিত্ব করে তিনি ভারতবর্ষের বাইরে নানান দেশে থাকা প্রবাসী ভারতীয়দের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং তাঁদের ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য একত্রিত করতে শুরু করেন। এছাড়াও প্রবাসী ভারতীয়দের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করার তাঁর আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল- স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য  প্রচুর পরিমাণে টাকা সংগ্রহ করা। এই উদ্দেশ্যে তিনি আমেরিকাতেও গেছিলেন। উধম সিং সেই সময় নিজে একটি দল তৈরী করেন যার নাম ছিল ‘আজাদ পার্টি’। তিনি এরপর আমেরিকার একটি জাহাজ কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন এবং সেই সূত্রে ভূমধ্যসাগর হয়ে তিনি আবার ইউরোপে গিয়ে পৌঁছান। তিনি ইউরোপ এবং এশিয়ার নানান দেশে অবস্থিত গদর পার্টির বিভিন্ন সদস্যদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে থাকেন নিরন্তর। সেই সময় তিনি ইতালি, জার্মানি, পোল্যান্ড, ইরান, হংকং, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর সহ আরো নানান দেশে যান। প্রায় তিন বছর বিদেশে কাটানোর পর ১৯২৭ সালে তিনি ভগত সিংয়ের আদেশে ভারতে ফেরেন। তাঁর সাথে প্রচুর পরিমাণে পিস্তল এবং গোলাবারুদ এবং প্রায় পঁচিশ জন প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে আসেন যাঁরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে আন্দোলন করতে তৎপর ছিলেন। এর পরেই তাঁকে বেআইনি অস্ত্র রাখার জন্য পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং পিস্তল, গোলাবারুদ এবং গদর পার্টির মুখপত্র ‘গদার ই গুঞ্জ’ (Voice of Revolt) তাঁর কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা হয়। বিচারে তাঁর পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়। ১৯৩১ সালে তিনি মুক্তি পেলেও পাঞ্জাব পুলিশ তাঁর গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখতে থাকে। তিনি এরপর কাশ্মীর যান তারপর পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে সেখান থেকে জার্মানি পালিয়ে যান। সেই সময় তিনি বহু দেশে বিভিন্ন ছদ্মনাম নিয়ে ঘোরেন এবং বিভিন্ন পেশার সাথে যুক্ত থাকেন। এই সময়ে তিনি দুটি সিনেমার এক্সট্রা হিসেবেও কাজ করেছেন। সিনেমা দুটির নাম- ‘এলিফ্যান্ট বয়’ (Elephant Boy) এবং ‘দ্য ফোর ফেদার্স’ (The Four Feathers)। 

১৯৩৪ সালে উধম সিং লন্ডনে পৌঁছান। সেখানে তিনি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বেশ কিছুদিন কাজ করেন। এই সময় থেকেই তিনি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের অন্যতম কাণ্ডারী মাইকেল ও’ডায়ারকে হত্যা করার ছক কষতে থাকেন। ১৯৪০ সালের ১৩ই মার্চ লন্ডনের স্যাক্সটন হলে ও’ডায়ারের ইস্ট ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন এবং সেন্ট্রাল এশিয়ান সোসাইটির একটি যুগ্ম সভায় বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল। উধম সিং সেই দিন সেখানে একটি বইয়ের ভেতর পিস্তল ঢুকিয়ে নিয়ে যান। পিস্তলটি তিনি এর আগে একটি পানশালায় একজন সৈনিকের কাছ থেকে কেনেন। সভার শেষে যখন মাইকেল ও’ডায়ার বক্তৃতা দেওয়ার জন্য মঞ্চের দিকে যান তখন উধম সিং তাঁর দিকে দুবার গুলি চালান। তার মধ্যে একটি গুলি  ও’ডায়ারের বুকে গিয়ে লাগে এবং তিনি সেখানেই মারা যান। এছাড়াও তার এলোপাথাড়ি গুলি চালানোর জন্য সেখানে উপস্থিত থাকা আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ আহত হন যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন লুইস ড্যান, লরেন্স ডানডাস, দ্বিতীয় মার্কেজ অফ জেটল্যান্ড এবং চার্লস কোচ্রান বেলিয়ে। এরপর উধম সিং আত্মসমর্পণ করেন।

১লা এপ্রিল ১৯৪০ সালে তাঁকে ব্রিক্সটন জেলে বন্দী করা হয়। বিচারাধীন থাকার সময় তিনি নিজেকে ‘রাম মহম্মদ সিং আজাদ’  নামে পরিচয় দিতেন। জেলবন্দি থাকার সময় তিনি ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে  প্রতিবাদ জানানোর জন্য ৪২ দিন ধরে অনশন করেন, কিন্তু শেষে তাঁকে জোর করে খাওয়ানো হয়। ৪ঠা জুন সেন্ট্রাল ক্রিমিনাল কোর্টে তাঁর শুনানি হয় এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

১৯৪০ সালের ৩১ জুলাই পেনটনভিল জেলে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।  তাঁর ফাঁসি হওয়ার আগে তিনি  জাতির উদ্দেশ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। সেটি পরে নানান জায়গায় প্রকাশিত করা হয়। তাঁর সেই বক্তৃতাটি ব্রিটিশ এবং ভারতীয় সব সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। পরে সেটি গুরমুখি ভাষায় অনুবাদ করা হয় এবং শিখ সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে তা বিলি করা হয়। তাঁর সেই সাহসিকতাকে দেশ বিদেশের সংবাদ মাধ্যম সমর্থন জানায়। উধম সিংয়ের মৃত্যুর দিনটিকে স্মরণে রেখে সুনাম শহরে প্রতি বছর অনেকগুলি সংস্থা মিলে একটি মিছিল বার করে। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের তত্ত্বাবধানে তাঁর দেহাবশেষ ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁর জন্মস্থান সুনামে তাঁর দেহাবশেষ দিয়ে শেষকৃত্য করা হয় এবং তাঁর চিতা ভষ্মের একটি অংশ শতদ্রু নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর বাকি অংশাবশেষ জালিয়ানওয়ালাবাগে সযত্নে সংরক্ষিত করা হয়। তাঁকে স্মরণে রেখে অমৃতসরে একটি মিউজিয়াম তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও সুনামে অবস্থিত তাঁর বাড়িটি একটি মিউজিয়ামে রূপান্তরিত করা হয়। শুধু তাই নয় সুনাম শহরটির নাম বদল করে ‘সুনাম উধম সিং ওয়ালা’ রাখা হয়। তাঁর জীবনের উপর ভিত্তি করে অনেক চলচ্চিত্রও তৈরি করা হয়েছে যার মধ্যে অন্যতম হল ১৯৭৭ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ’ এবং ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ‘শহীদ উধম সিং’। তাঁর মৃত্যু দিনটিকে স্মরণে রেখে প্রতি বছর পাঞ্জাব সরকার ছুটি ঘোষণা করে। ১৯৯৫ সালে তাঁর স্মরণে উত্তরাখণ্ডের একটি জেলার নাম পালটে ‘ উধম সিং নগর’ রাখা হয়েছে।

  • telegram sobbanglay

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন