ইতিহাস

জোসেফ স্তালিন

জোসেফ স্তালিন (Joseph Stalin)  একজন সোভিয়েত রাজনীতিবিদ যিনি দীর্ঘদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসক ছিলেন। এছাড়া তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের কাউন্সিল অফ মিনিস্টার্স-এর চেয়ারম্যানও ছিলেন।

১৮৭৮ সালে ১৮ ডিসেম্বর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের গোরি শহরে একটি গরীব পরিবারের জোসেফ স্তালিনের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম জোসেফ  ভিস্সারিয়োনভিচ স্তালিন। তাঁর ডাকনাম ছিল সোসো। তাঁর বাবার নাম বেসারিয়ন জুঘাশিভিলি এবং মায়ের নাম একাতেরিন গেলাদজে। স্তালিন তাঁদের একমাত্র সন্তান যিনি জীবিত ছিলেন। স্তালিনের বাবা একজন চর্মকার ছিলেন।  তাঁর একটি  জুতোর দোকানও ছিল যদিও তিনি সেটি বেশি দিন সফলভাবে চালাতে পারেননি। স্তালিনরা মূলত জর্জিয়ান ছিলেন। ১৯০৬ সালের জুলাই মাসে  স্তালিনের সাথে কাতো স্ভানীদজের  বিবাহ হয়। এরপর ১৯০৭ সালে  তাঁদের একটি ছেলে হয়।  তাঁরা তার ছেলের নাম ইয়াকভ রাখেন। ইয়াকভ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মারা যান। পরে কাতো স্ভানীদজের মৃত্যু হলে স্তালিন নেদেজহদা অ্যালিলুয়েভাকে  বিবাহ করেন তাঁদের দুটি সন্তান ছিল। নেদেজহদা ১৯৩২ সালে  আত্মহত্যা করেন।

স্তালিনকে ছোটবেলা থেকেই প্রবল দারিদ্র্যের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তাঁর বাবা ব্যবসায়ে অসফল হওয়ার পর মদ্যপ হয়ে পড়েন এবং তাঁর ও তাঁর মায়ের ওপর অত্যাচার করতে শুরু করেন। ১৮৮৩ সালে তিনি এবং তাঁর মা বাধ্য হয়ে ঘর ছেড়ে চলে যান এবং তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় ভাড়া থাকতে শুরু করেন। তাঁর মা একটি বাড়িতে কাপড় কাচার এবং ঘর পরিষ্কার করার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

১৮৮৮ সালে  স্তালিনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গোরি চার্চ স্কুলে । তিনি  খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি আঁকা এবং নাটকেও তিনি পারদর্শী ছিলেন। খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি কবিতা লিখতেন এবং কয়্যার (choir) গান করতেন।

১৮৯৪ সালে স্তালিন টিফলিসের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করান। সেখান থেকে তিনি বৃত্তি পেয়ে তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সক্ষম হন। সেই সময় থেকেই তাঁর লেখা কবিতা ‘ইভেরিয়া’ পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। এই সময় থেকে তাঁর আচরণ ক্রমশ দুর্দমনীয় হয়ে উঠতে থাকে। তাঁর বিদ্রোহী আচার আচরণের জন্য তাঁকে বহুবার কারাবন্দি করা হয়। তিনি নিজেকে নাস্তিক হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ধর্মের কাছে মাথা নোয়াতে অস্বীকার করেন। সেই সময় নিকোলাই চেরনিসেভস্কির লেখা ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান’ (What is to be done) বইটি তাঁকে খুব প্রভাবিত করে। এছাড়া আরেকটি বই যেটি তাঁকে প্রভাবিত  করেছিল সেটি হল আলেকজান্ডার কাজবেগির লেখা ‘দ্য পেট্রিফাইড’ (The Petrified)। তিনি সেই সময়ে কার্ল মার্ক্সের ‘ক্যাপিটাল’ (Capital) বইটিও পড়েন এবং নিজেকে মার্ক্সবাদী ঘোষণা করেন। এই সময় থেকেই তিনি শ্রমিকদের গোপন সভায় নিয়মিত যোগদান করতে শুরু করেন। ১৮৯৯ সালে তিনি সেমিনারি ত্যাগ করেন।

১৮৯৯ সালে তিনি টিফলিসের আবহাওয়া কেন্দ্রে আবহাওয়াবিদ হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। তিনি এরপর নিজের উদ্যোগে একটি  সমাজতান্ত্রিক দল তৈরি করলেন। ১৯০০ সালের  মে দিবসে তিনি শ্রমিকদের একটি সভা আয়োজন করেন যার জন্য ১৯০১ সালের  মার্চ মাসে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করতে যায় কিন্তু তিনি পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর তাঁকে বেশ কিছুদিন লুকিয়ে থাকতে হয়। সেই সময় তাঁর বেশ কিছু কাছের বন্ধুরা তাঁকে গোপনে সাহায্য করতেন। লুকিয়ে থাকাকালীনই তিনি সেই বছরের মে দিবস পালনের পরিকল্পনা করেন। সেই বছরের নভেম্বর মাসে তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টির (Russian Social Democratic Labour Party) সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়।

১৯০৫ সালের জানুয়ারি মাসে সেন্ট পিটার্সবার্গে সরকারী সেনা প্রতিবাদী জনতার উপর হামলা চালায় যাতে প্রচুর মানুষের মৃত্যু হয়। স্তালিন সেই সময় বলশেভিক ব্যাটল স্কোয়াড (Bolshevik Battle Squad) তৈরি করেন। এর পাশাপাশি তিনি আরও বেশ কিছু যুদ্ধ স্কোয়াড তৈরি করেন। সেইসব দলগুলি সরকারি সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে।

স্তালিন বাকিনস্কাই  প্রলেতারি এবং গুডোক নামক দুটি বলশেভিক সংবাদপত্র সম্পাদনা করতেন। ১৯০৮ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে বেইলভ জেলে বন্দী রাখা হয়। এরপর তাঁকে দু’বছরের জন্য একটি প্রত্যন্ত গ্রামে নির্বাসনে পাঠানো হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সেই গ্রাম থেকে পালিয়ে যান। ১৯১০ সালে তাঁকে আবার আটক করা হয় এবং তারপর সেই একই গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তাঁর সাথে তাঁর গৃহকর্ত্রীর একটি অবৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং তাঁদের একটি সন্তান হয়। মুক্তি পেয়ে স্তালিন প্রথমে ভলোগদায় এবং তারপর সেখান থেকে সেন্ট পিটার্সবাগে যান। সেখানে তাঁকে পুলিশ আবার গ্রেফতার করে এবং তাঁকে তিন বছরের জন্য ভলোগদায় নির্বাসিত করা হয়। সেখান থেকেও তিনি তাঁর দলের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখতে থাকেন। এরপর তাঁকে আবার গ্রেফতার করে সাইবেরিয়াতে পাঠানো হয়।

১৯১৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং নির্বাসনে থাকা স্তালিন সহ আরো অনেককে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। স্তালিনের খুব অল্প বয়স থেকেই হাতের একটু সমস্যা ছিল সেই কারণে তাঁকে সৈন্যবাহিনী থেকে বাদ দেওয়া হয়। ১৯১৭ সালে  সারা সোভিয়েত জুড়ে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয় এবং তার ফলে সোভিয়েত সরকার ভেঙ্গে পড়ে।  এরপর লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রথম সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠন করা হয়। লেনিন নিজেকে কাউন্সিল অফ পিপলস কমিসারের (Council of People’s Commissars) চেয়ারম্যান (chairman) ঘোষণা করেন। লেনিন এবং ট্রটস্কির পাশাপাশি স্তালিন সেই সরকারের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।

১৯২৪ সালের  জানুয়ারি মাসে লেনিনের মৃত্যু হলে স্তালিন দলের মধ্যে দ্রুতগতিতে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে থাকেন। তিনি ক্রমেই সোভিয়েত কমিউনিস্ট সরকারের মুখপাত্র হয়ে ওঠেন। ১৯২৬ সালে তিনি ‘কোশ্চেনস অফ লেনিনিজম’ (Questions of Leninism) প্রকাশ করেন যেখানে তিনি ‘সোসালিজম ইন ওয়ান কান্ট্রি’ (Socialism in one country) সম্পর্কে আলোচনা করেন। স্তালিন যখন সরকারের দায়িত্ব নেন তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন শিল্পক্ষেত্রে (industrial field) পশ্চিম দেশগুলির থেকে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল এবং সেই সময়ে খাদ্যশস্যের অনটন ঘটে। তিনি দক্ষতার সঙ্গে সেই সমস্যার মোকাবিলা করে  তার সমাধান করেন। তিনি বাজারকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বন্ধ করে একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হন। এছাড়াও তিনি পাঁচ বছর মেয়াদী বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা (five year plan) গ্রহণ করেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় নতুন নতুন খনি  আবিষ্কার করা হয় এবং সেখানে খননের কাজ শুরু হয়। তিনি গণসংস্কৃতির উন্নয়নের  উপর জোর দেন।

১৯৩৯ সালে  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর  স্তালিনের দ্বারা পরিচালিত সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার জার্মানির সাথে হাত মেলায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন জার্মানির সাথে মোলোটোভ রিব্বেনট্রপ প্যাক্ট (Molotov Ribbentrop Pact) সই করে। এরপরে সোভিয়েত সৈন্যরা ফিনল্যান্ড দখল করতে যায়। কিন্তু তাতে অসফল হয়ে তাদের বাধ্য হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তিতে (Interim peace treaty) সই করতে হয়। ১৯৪১ সালে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে বাধ্য হয়ে স্তালিন ব্রিটেন এবং আমেরিকার সাথে হাত মেলায়। ১৯৪৫ সালে স্তালিনের লাল সৈন্যদল বার্লিন দখল করে নেয়। এরপর হিটলার আত্মহত্যা করেন এবং জার্মানি আত্মসমর্পণ করে।

যুদ্ধজয়ের পরে স্তালিনের খ্যাতি দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আস্তে আস্তে তাঁর স্বাস্থ্য ভাঙতে শুরু করে। হৃদযন্ত্রে কিছু সমস্যা হওয়ার কারণে তাঁকে দুমাসের জন্য ছুটি কাটাতে যেতে হয়। যুদ্ধের পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে খাদ্য সমস্যা খুব বড় আকারে দেখা দেয়। কিন্তু তার দিকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে উৎপাদন হওয়া খাদ্যশস্য রপ্তানি করা হতে থাকে। এর ফলে প্রায় এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার মানুষের মৃত্যু হলেও স্তালিন সেই দিকে গুরুত্ব না দিয়ে খাল (canal) তৈরি, রেল লাইন তৈরি এবং জলবিদ্যুৎ প্লান্ট (hydroelectric plant) তৈরিতে মনোযোগ দেন।

১৯৫০ সালের পর থেকে তাঁর স্বাস্থ্য আরো ভেঙে পড়তে থাকে এবং তিনি ক্রমাগত তাঁর কাজ থেকে ছুটি নিতে বাধ্য হন।  ডাক্তাররা যখন তাঁকে ভগ্ন স্বাস্থ্যের জন্য রাজনৈতিক জীবন থেকে অবসর নিতে বলেন তখন তিনি তাঁদের কারাবন্দি করেন। তাঁর মনে হত ডাক্তাররা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ডাক্তারদের বন্দী করার সেই কুখ্যাত ঘটনাকে ‘ডক্টর্স প্লট’ (Doctor’s Plot) বলা হয়। ১৯৫২ সালে  তাঁর লেখা শেষ বই ‘ইকনমিক প্রবলেমস অফ সোশালিজিম ইন ইউএসএসআর’ (Economic Problems of Socialism in the USSR) প্রকাশিত হয়।

১৯৫৩ সালে ১ মার্চ তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরন(cerebral hemorrhage) শুরু হয় এবং ৫ মার্চ তাঁর মৃত্যু হয়।

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: জোসেফ স্তালিন সোভিয়েত রাষ্ট্রনায়ক এবং মানবেতিহাসের মহত্তম নেতা - ফুলকিবাজ

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন