ইতিহাস

কার্ল মার্ক্স

কার্ল মার্ক্স(Karl Marx)ছিলেন একজন জার্মান দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সমাজ বিজ্ঞানী, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী এবং মার্ক্সবাদের জনক। মানব সভ্যতার ইতিহাসে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন তাঁর মার্কসীয় তত্ত্বের মাধ্যমে।

১৮১৮ সালের ৫ মে কার্ল মার্ক্স জার্মানির রাইন প্রদেশের অন্তর্গত ট্রায়ের(Trier) অঞ্চলে এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম হাইনরিখ মার্ক্স এবং মা’র নাম হেনরিটে প্রেসবার্গ। নয় সন্তানের মধ্যে কার্ল মার্ক্স ছিলেন তৃতীয় সন্তান৷ 

কার্ল মার্ক্সের প্রাথমিক পড়াশুনা তাঁর বাড়িতেই হয়৷ তেরো বছর বয়স পর্যন্ত তিনি বাড়িতেই তাঁর বাবার কাছে পড়াশোনা করেন ৷ তারপর তিনি ট্রায়ার হাই স্কুলে ভর্তি হন৷ এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হুগো উইটেনবাখ ছিলেন মার্কসের বাবার বন্ধু। ১৮৩৫ সালের অক্টোবর মাসে কার্ল মার্ক্স দর্শন ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনার জন্য বন্ ইউনিভার্সিটি( University of Bonn)তে ভর্তি হন। যদিও তাঁর বাবা চেয়েছিলেন তিনি আইন ( Law)  নিয়ে পড়াশুনা করুন৷ ১৮৪১ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ জেনা থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

কার্ল মার্কসের কর্মজীবন শুরু হয় Rheinische Zeitung পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ১৮৪২ সালে । পরবর্তীকালে এর সম্পাদক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন৷ ১৮৪৩ সালের অক্টোবর মাসে কার্ল মার্ক্স প্যারিসে যান। তিনি চেয়েছিলেন এখানে থেকে একটি বিপ্লবী সাময়িকপত্র (Radical Journal) প্রকাশ করবেন এবং সেই পত্র দেশের বাইরে নিয়ে গিয়ে ছাপিয়ে গোপনে জার্মানিতে পাঠানো হবে। সেই সময় প্যারিস ছিল বিপ্লবী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এবং ইউরোপের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র৷ এরপর মার্ক্স এবং আর্নল্ড রুগে-র (Arnold Ruge) যৌথ সম্পাদনায় “জার্মান-ফরাসি বার্ষিকী” (Deutsch-Französische Jahrbücher) নামে একটি সাময়িকপত্র প্যারিস থেকে প্রকাশিত হয়। আর্নল্ড রুগের সাথে মার্কসের প্রগতিশীল বিপ্লবী চিন্তার মত পার্থক্যের কারণে প্রথম সংখ্যার পরই এই পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। এই সাময়িকপত্রে মার্কসের দুটো রচনা On the Jewish Question এবং Introduction to a Critique of Hegel’s Philosophy of the Right প্রকাশিত হয়েছিল। 

১৮৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ফ্রান্সের প্যারিস থেকে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে চলে যান। এখানে তাঁর সাথে আলাপ হয় জার্মান সমাজতাত্ত্বিক ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের। ১৮৪৬ সালে মার্ক্স এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেলস যৌথ ভাবে ব্রাসেলসে ‘কমিউনিস্ট পত্র-যোগাযোগ কমিটি’ (Communist Correspondence Committee) প্রতিষ্ঠা করেন । এই কমিটি আয়োজিত বৈঠকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হত৷ এছাড়াও দেশের বিপ্লবীদের মধ্যে চিঠিপত্র বিনিময়ের মাধ্যমে আলাপ-আলোচনা এবং যোগাযোগ রক্ষা করত কমিটি সদস্যরা৷ মার্ক্স এবং এঙ্গেলসের উদ্যেগের ফলেই এই ধরনের নানান কমিটি ও গ্রুপ জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে এবং পরবর্তীতে প্যারিস ও লন্ডনের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে। 

১৮৪৭ সালে লন্ডনে কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে এঙ্গেলস এবং মার্ক্স দু’জনই যোগ দিয়েছিলেন।  মার্ক্স এখানেই তাঁর সর্বহারা বিপ্লবের নতুন তত্ত্ব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছিলেন। এর ফলস্বরূপ মার্ক্স-এঙ্গেলসকে ‘লীগ’-এর পক্ষ থেকে একটা ঘোষণাপত্র তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরই ফলাফল হিসেবে তৈরী হয় ঐতিহাসিক ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’(The Communist Manifesto)।  কমিউনিস্ট ইশতেহার আসলে প্রথম কর্মসূচিভিত্তিক দলিল, যেখানে প্রথমবার মার্কসীয় বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি, বিপ্লবী তত্ত্ব এবং চর্চার দিকগুলো একসঙ্গে, সংক্ষিপ্ত আকারে, গুছিয়ে হাজির করা হয়। ইতিহাসের গতিপথে পুঁজিবাদের অবশ্যম্ভাবী পতন এবং সর্বহারাশ্রেণির নেতৃত্বে শ্রেণিহীন সমাজের প্রতিষ্ঠাই এর মূল বক্তব্য ।

১৮৪৮ সালে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি প্রভৃতি দেশে জনগণের শাসন বা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক বিপ্লব শুরু হয়। এই বিপ্লব ‘ফেব্রুয়ারি বিপ্লব’ নামে পরিচিত।সেই সময় লন্ডন ‘লীগ’-এর কেন্দ্রীয় কমিটি নিজে থেকেই ভেঙে যায়।মার্ক্স নতুন ভাবে কেন্দ্রীয় কমিটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেন কিন্তু এরপরই ফরাসী পুলিশ মার্ক্সকে গ্রেফতার করে এবং ফ্রান্স ত্যাগে বাধ্য করে৷ 

১৯৫০ সালে কার্ল মার্ক্স লন্ডনে থাকাকালীন লন্ডনে মার্ক্স এবং এঙ্গেলস ‘নয়া রাইন সংবাদ রাজনৈতিক-অথনৈতিক পর্যালোচনা’ (Neue Rheinische Zeitung Poli sch–Ökonomische Revue) নামের একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন । কিন্তু এককভাবে এর চারটি সংখ্যা এবং একবার দুইসংখ্যা একসাথে ছাপার পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়৷ 

১৮৬৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর  লন্ডনের সেন্ট মার্টিন হলে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ইংরেজ এবং ফরাসি শ্রমিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন গণতন্ত্রী ও প্রবাসী সংগঠনের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংঘ’ । এটিই পরবর্তীকালে ‘প্রথম আন্তর্জাতিক ‘নামে পরিচিতি পায়। আন্তর্জাতিক ‘সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা হিসেবে শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনকে বিপ্লবী রূপ দেওয়ার দায়িত্ব মার্ক্সের ওপর বর্তায়। সহজাত দক্ষতায় মার্ক্স বুঝিয়ে দেন কিভাবে অসংগঠিত অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া থেকে শ্রমিকশ্রেণীকে সর্বহারা বিপ্লবী সচেতনতায় নিয়ে আসা যায়৷ ‘প্রথম আন্তর্জাতিক’ কোন রাজনৈতিক দল ছিল না, এটি ছিল একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো যার কাজ ছিল বিভিন্ন দেশে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সংযোগ রক্ষা করা এবং আন্দোলনের পথনির্দেশ করা। মার্কসের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল ‘ প্রথম আন্তর্জাতিক’। ‘প্রথম আন্তর্জাতিক’ ১৮৭৬ সালে অবলুপ্ত হয়ে যায়।

কার্ল মার্কসের সবথেকে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের মধ্যে পড়ে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা। এটিই ছিল তাঁর সংগ্রামের মূল অঙ্গ। তাঁর আবিষ্কৃত দুটি তত্ত্ব হল – দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মূলকথা হলো — প্রকৃতির কোনো কিছুই বা কোনো ঘটনাই স্থিতিশীল নয়, বরং দুটো বিপরীত বৈশিষ্ট্যের সংঘাতপূর্ণ সহাবস্থান হিসেবে এরা বিরাজ করে। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের প্রয়োগকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলা হয়।

প্রথমদিকে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা জার্মান দার্শনিক হেগেলের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। মার্ক্স বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রকৃতির মতোই সমাজ এবং ইতিহাসও দ্বন্দ্বের নিয়মে পরিবর্তিত হয়। দ্বন্দ্বমূলক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে একটি পরিপূর্ণ বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত  করার কাজে খুব কমসময়ের মধ্যেই লেখা হয় ‘ফুয়েরবাখ বিষয়ক থিসিস’ (The Theses on Feuerbach; 1845), ‘দর্শনের দারিদ্র্য’ (The Poverty of Philosophy; 1847) এবং ‘জার্মান ভাবাদর্শ’ (The German Ideology; 1846)। প্রথম দুটি মার্কসের লেখা, আর শেষটি মার্ক্স-এঙ্গেলসের যৌথ রচনা।’

কার্ল মার্কস রচিত সর্বাধিক চর্চিত বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ এবং তিন খন্ডে প্রকাশিত ‘দাস ক্যাপিটাল'( Das Kapital)৷ ‘দাস ক্যাপিটাল’ বইয়ে মার্ক্স পুঁজিবাদী উৎপাদন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নানা বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন, পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূল নিয়ম আবিষ্কার করেন এবং প্রমাণ করেন যে পুঁজিবাদী অর্থনীতি তার অভ্যন্তরীণ নিয়মের কারণেই অবশ্যম্ভাবীরূপে এক ঐতিহাসিক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। 

কার্ল মার্কসের ব্যক্তিগত জীবনে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না বরং কষ্টের করেই তিনি জীবন কাটিয়েছেন৷ তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কষ্ট তাঁকে দমাতে পারে নি৷

১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ কার্ল মার্ক্সের মৃত্যু হয়।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

ভিডিও

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।