সববাংলায়

ফ্রেড হয়েল

ফ্রেড হয়েল (Fred Hoyle)একজন ইংরেজ জ্যোতির্বিজ্ঞানী যিনি প্রথম ‘বিগ ব্যাং’ শব্দবন্ধটি প্রণয়নের জন্য বিখ্যাত। সারা জীবনের গবেষণার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন পর্যায় সারণির সমস্ত মৌলই এক সময় মহাবিশ্বের নক্ষত্রদের আভ্যন্তরীণ নিউক্লিয় সংশ্লেষণের ফলেই উদ্ভূত হয়েছে। বিগ ব্যাং তত্ত্বকেই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির একেবারে মূল কারণ বলে তিনি মনে করতেন। তাঁর মতে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়ামের থেকে ভারী সমস্ত মৌলই তৈরি হয়েছে নক্ষত্রের মধ্যে। পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য উদ্‌ঘাটনের জন্য তিনি ‘প্যানস্পার্মিয়া’ তত্ত্বের উদ্ভাবন করেন। ফ্রেড হয়েল বেশ কিছু কল্পবিজ্ঞানের গল্প, বেতার নাটকও লিখেছিলেন এবং তাঁর পুত্র জিওফ্রে হয়েলের সঙ্গে একত্রে বেশ কিছু বিজ্ঞানের বইও লিখেছেন। আজীবন বিজ্ঞানের সাধনায় নিয়োজিত থাকলেও নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হননি তিনি। তাঁর লেখা সবথেকে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কল্পবিজ্ঞানের বই হল ‘দ্য ব্ল্যাক ক্লাউড’।

১৯১৫ সালের ২৪ জুন ইংল্যান্ডের গিলস্টেডের একটি ছোট্ট গ্রামে ফ্রেড হয়েলের জন্ম হয়। তাঁর বাবা বেন হয়েল পেশায় ব্র্যাডফোর্ডের একজন কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তাঁর মা মেবল পিকার্ড একজন সঙ্গীতশিল্পী এবং প্রাক্তন স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন। ফ্রেডের বাবা বেন হয়েল খুব ভালো বেহালাও বাজাতেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দুকও ধরেছিলেন। অন্যদিকে তাঁর মা লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অফ মিউজিকে সঙ্গীতচর্চা করতেন। স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে ফ্রেডকে তিনিই পাটিগণিত শিখিয়েছিলেন। তাঁদের পরিবার খুব একটা সচ্ছ্বল ছিল না। বেন এবং মার্বেলের একমাত্র পুত্র ছিলেন ফ্রেড। মাত্র চার বছর বয়সেই অনেক নামতা মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল তাঁর, কিন্তু চোখের সমস্যার কারণে তিনি ৭ বছর বয়সের আগে পড়তেই পারতেন না। ছোটবেলায় বাড়িতে একটি রসায়নের বই খুঁজে পেয়ে তিনি সেই বইয়ের তথ্য থেকে বারুদ তৈরি করার চেষ্টা করেন এবং সেই জন্য মায়ের রান্নাঘরে বিষাক্ত ফসফাইন গ্যাস সংশ্লেষণ করে ফেলেছিলেন যা তাঁর জীবনে এক অত্যন্ত বিপজ্জনক ঘটনা ছিল। পরবর্তীকালে ১৯৩৯ সালে বারবারা ক্লার্ক নামের এক মহিলাকে বিবাহ করেন তিনি।  

প্রাথমিকপর্বে বিংলে গ্রামার স্কুলে পড়াশোনা করেছেন ফ্রেড হয়েল এবং পরে কেমব্রিজের ইমানুয়েল কলেজে ভর্তি হন তিনি। কৈশোর বয়সে স্থানীয় অ্যাংলিকান গির্জায় কয়্যারে গানও গাইতেন ফ্রেড। ১৯৩৬ সালে জর্জ স্ট্যানলি রাশব্রুকের সঙ্গে ফ্রেড হয়েল মেহিউ পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৪০ সালে ফ্রেড কেমব্রিজ ত্যাগ করেন এবং রাডার গবেষণার জন্য পোর্টসমাউথে ব্রিটিশ অ্যাডমিরালটিতে যোগ দেন। ১৯৪০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর প্রথম পর্বে বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত ছিলেন ফ্রেড যা যুদ্ধের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করেছিল। তিনি সেই সময় রাডার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ অ্যাডমিরালটির জন্য তিনি বিশ্বতত্ত্ব অধ্যয়নের কাজ চালিয়ে যান এবং বিভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে দেখা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। শোনা যায়, পদার্থবিদ্যার জগতে গবেষণা করার সব ধরনের সুযোগ থাকলেও তিনি গবেষণা করেননি শুধুমাত্র ছাত্রের তকমা থেকে বেরিয়ে তখন তাকে কর দিতে হবে বলে। জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করার সময় ফ্রেড হয়েল সুপারনোভা সংক্রান্ত বিষয়ে অবগত হন এবং জানতে পারেন যে এই সুপারনোভা একটি নক্ষত্রের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে প্লুটোনিয়াম কিংবা আরও অনেক ভারী মৌল উৎপন্ন হয়। এর থেকে ধীরে ধীরে সূর্যের মত সাধারণ নক্ষত্রের অভ্যন্তরে কী কী ঘটনা ঘটে সেই সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে কৌতূহলী হয়ে পড়েন ফ্রেড হয়েল। কীভাবে পৃথিবীতে কার্বন তৈরি হল তা জানার জন্য বহু অনুসন্ধান করেছেন তিনি।   

১৯৩৯ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার চার মাস আগে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সেন্ট জনস কলেজে তিনি সদস্যপদ গ্রহণ করেন এবং সেখানে লেকচারার হিসেবে কাজ করতে থাকেন। এখানেই তিনি একটি বিশেষ গবেষণা গোষ্ঠী গড়ে তোলেন যেখানে মূলত নাক্ষত্রিক সংশ্লেষণের বিষয়ে নানাবিধ গবেষণা ও চর্চা করা হয়ে থাকে। সহকর্মী উইলিয়াম আলফ্রেড ফাউলার, মার্গারেট বার্বিজ এবং জিওফ্রে বার্বিজের সঙ্গে একত্রে কাজ করে ফ্রেড হয়েল দেখান যে কীভাবে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে ভারী মৌলগুলি সংশ্লেষিত হয়। ১৯৭০ সালের আগে পর্যন্ত তিনি কেমব্রিজেই ছিলেন। সেই সময় তিনিই ছিলেন বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র গবেষক যিনি এই নাক্ষত্রিক নিউক্লীয় সংশ্লেষণের ব্যাপারে কাজ করছিলেন। তাঁকে প্রায়ই ‘বিগ ব্যাং’ এই শব্দবন্ধটি প্রণয়নের জন্য উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ফ্রেড কখনই মানতে চাইতেন না যে একটি নির্দিষ্ট সূচনা বিন্দুতেই মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছিল। ফ্রেড হয়েল স্থির স্থিতি মহাবিশ্বের (Steady State Universe) ধারণাকে মানতেন যেখানে বিশ্বের ঘনত্ব হল ধ্রুবক কিন্তু প্রতিনিয়ত এর মধ্যে বস্তু উৎপন্ন হয়েই যাচ্ছে। তুলনামূলকভাবে বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুসারে আজ থেকে প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর আগে এই সমগ্র মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময়েই বিশ্বের সকল বস্তু সৃষ্টি হয়েছে এবং মহাবিশ্ব বর্ধিত হতে শুরু করেছে। তবে বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফ্রেড হয়েল প্রথম স্থির স্থিতি তত্ত্ব এবং বিগ ব্যাং তত্ত্বের বিস্ফোরণের ধারণার তুলনার সময় প্রথম তিনি এই ‘বিগ ব্যাং’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন। স্থির স্থিতির তত্ত্বকে পরবর্তীকালে সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি ঠিকই, কিন্তু বহু বহু বছর ধরে এ নিয়ে বিতর্কও চলেছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে। ১৯৫৮ সালে ফ্রেড হয়েল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ্যা ও পরীক্ষামূলক দর্শনের প্লুমিয়ান অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৬৭ সালে তিনি ‘ইনস্টিটিউট অফ থিওরিটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমি’তে প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর পদে আসীন হন। ১৯৭১ সালে স্কটল্যান্ডের ‘ইনস্টিটিউশন অফ ইঞ্জিনিয়ারস অ্যান্ড শিপবিল্ডারস’ সংস্থায় ম্যাকমিলান বক্তৃতা দেওয়া জন্য বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হন তিনি। সেখানে তাঁর বক্তব্যের বিষয় ছিল ‘জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সেই চর্চায় ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ’। ১৯৭২ সালে তিনি প্লুমিয়ান অধ্যাপকের পদ থেকে অবসর নেন এবং ঐ বছরই তাঁকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালে তিনি ডিরেক্টরের পদ থেকেও অব্যাহতি নেন।

কেমব্রিজ ছাড়ার পরে ফ্রেড হয়েল বিজ্ঞানের এবং কল্পবিজ্ঞানের বেশ কিছু গল্পের বই লেখেন এবং সারা বিশ্বের নানা স্থানে বক্তৃতা দিতে থাকেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ‘অ্যাংলো-অস্ট্রেলিয়ান টেলিস্কোপ বোর্ড’-এর চেয়ারম্যান হন এবং ১৯৭৪ সালে এর উদ্বোধনে সভাপতিত্ব করেন। তিনি ক্রমে ক্রমে পৃথিবীতেই যে প্রথম প্রাণের বিকাশ ঘটে এই ধারণার তীব্র অবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন তিনি। তিনি মনে করতেন যে এই প্রাণের উৎপত্তি পৃথিবীতে নয় বরং তা মহাবিশ্ব থেকেই এখানে এসেছে। তাঁর এই তত্ত্বটির নাম দেন তিনি ‘প্যানস্পার্মিয়া’ যেখানে বলা হয় কোনও ধূমকেতুর মাধ্যমেই প্রাণের বীজ এই পৃথিবীতে এসে পড়েছিল। ১৯৮৩ সালে ফাউলার এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী সুব্রহ্মণ্যণ চন্দ্রশেখর পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় নাক্ষত্রিক নিউক্লীয় সংশ্লেষণ বিষয়ে গবেষণার জন্যেই তাঁরা নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, অথচ ফ্রেড হয়েলই ছিলেন এই গবেষণার অন্যতম পথপ্রদর্শক। অনেকে মনে করেন সহকর্মীদের সঙ্গে ফ্রেড হয়েলের রূঢ় ব্যবহার এবং পরবর্তীকালে ভিনগ্রহের প্রাণীর ব্যাপারে তাঁর গবেষণার কাজের জন্য তাঁকে নোবেল মনোনয়ন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। ইংল্যান্ডের লেক অঞ্চলেই জীবনের শেষ দিনগুলি কাটিয়েছেন ফ্রেড হয়েল। ১৯৯৭ সালে বিপজ্জনকভাবে পড়ে যাওয়ার পর থেকেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। তারপর বহুবার তাঁর স্ট্রোক হয়েছে।

১৯৫৭ সালে ফ্রেড হয়েল রয়্যাল সোসাইটির একজন সদস্য নির্বাচিত হন। তাছাড়া রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস থেকে ক্রাফুর্ড পুরস্কার, রয়্যাল পদক এবং ক্লাম্পকে-রবার্ট পুরস্কার সহ আরও বহু সম্মান পেয়েছেন হয়েল। তিনি ‘নাইট’ উপাধিতেও সম্মানিত হয়েছিলেন। তাঁর সম্মানেই একটি গ্রহাণুর নাম দেওয়া হয়েছে ‘৮০৭৭ হয়েল’। তাঁর লেখা সবথেকে বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞানের বই ‘দ্য ব্ল্যাক ক্লাউড’।

২০০১ সালের ২০ আগস্ট ফ্রেড হয়েলের মৃত্যু হয়।    


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading