বিজ্ঞান

গাড়িতে চড়লে অনেক মানুষের বমি পায় কেন

দৈনন্দিন জীবনে কাজের প্রয়োজনে বা শুধুই ভ্রমণের জন্য আমাদেরকে বিভিন্ন যানবাহনে যাতায়াত করতে হয়। বাস বা ট্রেন হোক বা বিমান হোক বা জলযান অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেখেছেন যে অনেকের বমি বমি ভাব হয় বা বমি হয় বা মাথা ঝিম ঝিম করে। ইংরাজিতে আমরা একে মোশন সিকনেস (Motion sickness) বলি যা খুব সাধারণ ঘটনা এবং অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। এখানে আমরা জেনে নেব গাড়িতে চড়লে অনেক মানুষের বমি পায় কেন ।

গতি জনিত অসুস্থতা বা মোশন সিকনেসকে ডাক্তারি পরিভাষায় কাইনেটোসিস (Kinetosis) বলে। এটি মূলত স্নায়ু সংক্রান্ত অসুস্থতা। স্নায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় গতি বোঝবার জন্যে আমাদের যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং ইন্দ্রিয় আছে সেগুলি থেকে বিভিন্ন রকম সংবেদন বা বার্তা পৌঁছালে মস্তিষ্কে একধরণের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় যার ফল স্বরূপ মাথা ধরা থেকে শুরু করে বমি বমি ভাব এবং  বমি পর্যন্ত হতে পারে।

ব্যাপারটা আরও একটু সহজ ভাবে বোঝানো যাক। আমরা যখন কোন গতিশীল অবস্থায় থাকি তা বোঝার জন্যে মূলত চোখ, ত্বক, অন্তর্কর্ণ  এই তিনটি ইন্দ্রিয় মূলত ব্যবহৃত হয়। এবার ধরা যাক যানের ভিতরের কোন অংশে আমাদের দৃষ্টি আবদ্ধ, তাহলে চোখ দিয়ে মস্তিষ্কে যে বার্তা যাবে তার থেকে মস্তিষ্ক বুঝবে দেহ স্থির আছে, কিন্তু যানটি চলার জন্য যে ঝাঁকুনি বা নড়াচড়া তা থেকে আমাদের অন্তর্কর্ণ যা আমাদের দেহের ভারসাম্য রক্ষা হয় সেটি মস্তিষ্ককে বলবে যে দেহ গতিশীল মাধ্যমে আছে। এই দুটি পরস্পর বিরোধী বার্তা। আবার যদি যানটির জানলা, দরজা বন্ধ থাকে তাহলে ত্বকের উপর বায়ুপ্রবাহ স্থির আবহাওয়ার মতোই হবে সেক্ষেত্রেও মস্তিষ্ক ভাববে স্থির জায়গায় মানুষটি আছে। তাই সব মিলিয়ে মস্তিষ্কের উপর এক ঘেঁটে যাওয়া পরিস্থিতির উৎপত্তি হয় যার ফল স্বরূপ বমি বমি ভাব, মাথা ধরা এসব হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, যাঁরা চলন্ত গাড়িতে এক টানা বই পড়েন বা মোবাইল ঘাঁটেন তাঁরা এই ধরণের অসুস্থতা বোধ বেশি করেন কারণ তাঁদের চোখ স্থির বস্তুর দিকে বেশি থাকে।

তবে কোন কোন মানুষ কেন এই অসুস্থতা বোধ বেশি করেন এবং অনেকে করেন না বা কম করেন তার নির্দিষ্ট কোন উত্তর না পাওয়া গেলেও বিজ্ঞানীদের ধারণা যাঁদের ভারসাম্য রক্ষাকারী স্নায়ুগুলি বেশি সংবেদনশীল তাঁদের ক্ষেত্রে এগুলি বেশি দেখা যায়। যেসব প্রাণিদের (বা বিভিন্ন ত্রুটির কারণে মানুষের) ভেস্টিবুলার (ভারসাম্য) সিস্টেম নেই তাদের এই ধরণের অসুস্থতা হয় না।

মোশন সিকনেস  কম করার কিছু উপায় এখানে দেওয়া হল, তবে যাঁদের বমি হয় তাঁরা ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে যাত্রা শুরুর আগে ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন। নিচে দেওয়া বিভিন্ন পদ্ধতির এক বা একাধিক প্রয়োগ করলে এই অসুস্থতা জনিত অস্বস্তি থেকে কিছুটা  আরাম পেতে পারেন -

  • এমন জায়গায় বসতে হবে যাতে বাইরেটা ভালো করে দেখা যায় এবং চোখ অন্তর্কর্ণের মতোই গতি বুঝতে পারে। যেমন, গাড়ির সামনের সিট।
  • জানলার ধারে বসলে দূরের দিগন্তের দিকে চোখ রাখা।
  • চোখ বন্ধ করে থাকা বা পারলে ঘুমিয়ে পড়া।
  • কিছু চেবানো, চুয়িং গাম বা যেকোন জিনিস - কিছু চেবাতে থাকলে ভারসাম্য রক্ষাকারী স্নায়ুগুলির সংবেদনশীলতা  কমে।
  • জানলা খুলে বাইরের তাজা, ঠান্ডা বাতাস নেওয়া, তবে বাজে গন্ধ বা ধুলো-বালি উল্টো প্রভাব ফেলতে পারে।
  • আদা চিবোলে বা চুষলে উপশম হতে পারে।

সব শেষে, মনে রাখবেন এই বমি ভাব, বমি হওয়া এগুলো সাময়িক অস্বস্তি - এবং এর সঙ্গে জটিল কোন রোগের সম্পর্ক নেই।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!