ইতিহাস

হেস্কেথ প্রিকার্ড

প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীতে স্নাইপিং-অনুশীলনে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন যে বিখ্যাত অ্যাডভেঞ্চারার, গবেষক এবং পশু-শিকারী, তিনি হেস্কেথ প্রিকার্ড (Hesketh Prichard)। তিনি একজন ভারতে জন্মগ্রহণকারী ব্রিটিশ। তাঁর সুনিপুণ লক্ষ্যভেদের কৌশলে জার্মান স্নাইপারের গুলিবিদ্ধ হওয়া থেকে অক্ষশক্তির প্রায় সাড়ে তিন হাজার সৈন্যকে তিনি বাঁচাতে পেরেছিলেন। একাধারে ক্রিকেটার, ভ্রমণকাহিনি লেখক হেস্কেথ প্রিকার্ড ইউরোপের প্রায় সমস্ত স্থান ঘুরে দেখেছেন, লিখেছেন বহু ছোটোগল্প এবং উপন্যাস।

১৮৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের ঝাঁসিতে হেস্কেথ প্রিকার্ডের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম হেস্কেথ ব্রডরিক প্রিকার্ড (Hesketh Brodrick Prichard) এবং মায়ের নাম কেট ও’ ব্রায়েন রিয়্যাল প্রিকার্ড (Kate O’ Brien Ryall Prichard)। তাঁর বাবা ছিলেন ‘কিংস’ ওন স্কটিশ বর্ডারার্স’-এর অফিসার। হেস্কেথ প্রিকার্ডের জন্মের ছয় সপ্তাহ আগে টাইফয়েডে তিনি মারা যান। তাঁর মায়ের কাছেই একা মানুষ হন প্রিকার্ড। তাঁর মা’ও ছিলেন মিলিটারি পরিবারের কন্যা। প্রিকার্ডের দাদু ছিলেন মেজর জেনারেল ব্রাউন উইলিয়াম রিয়্যাল (Browne William Ryall)।  হেস্কেথের ডাকনাম ছিল ‘হেক্স’। তাঁর পরিবার বেশ কিছু বছর জার্সি-র সেন্ট. হেলিওর-এ কাটিয়েছিলেন। পরে তারা আবার ব্রিটেনে ফিরে আসেন। 

ইংল্যান্ডের ওয়ারউইকশায়ারের রাগবি-তে এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন হেস্কেথ। এখানেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষালাভ ঘটে। ১৮৮৭ সালে তিনি এডিনবরার ফেট্‌স কলেজ (Fetts’ College)-এ একটি বৃত্তি পান। এই কলেজে প্রবেশপত্রটিতে তিনি লিখেছিলেন ‘গ্রীষ্মকালীন খেলাধুলো’ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ। সেখানে তিনি নিজেকে ‘দীর্ঘকালব্যাপী সেরা বোলার’ হিসেবে পরিচয় দেন। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে পশ্চিম সাসেক্স-এর হরশ্যাম (Harsham)-এ হেস্কেথ ব্যক্তিগত উদ্যোগে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। প্রাথমিক পরীক্ষায় পাশ করলেও হেস্কেথ কখনোই আইনজীবী হিসেবে চর্চা করেননি। 

হেস্কেথের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল একজন সাধারণ লেখক হিসেবে। ১৮৯৬ সালের গ্রীষ্মকালে তাঁর প্রথম ছোটোগল্প প্রকাশিত হয় ‘ট্যামার’স ডুয়েল’ (Tammer’s Duel) নামে। এই গল্পটি ‘পল্‌ মল্‌ ম্যাগাজিন’কে এক গিনির বিনিময়ে বিক্রি করেন প্রিকার্ড। তাঁর মা প্রভূত সাহায্য করেছিলেন এই গল্প লেখার সময়। সে বছর আইনচর্চা ও পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে প্রিকার্ড দক্ষিণ ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকা ঘুরে কাটান। পরে লণ্ডনে ফিরে এসে তিনি এবং তাঁর মা ‘এইচ. হেরন’ এবং ‘ই. হেরন’ ছদ্মনামে কয়েকটি লেখা লিখেছিলেন যেগুলি কর্নহিল ম্যাগাজিনসহ আরো অন্যত্র প্রকাশ পেয়েছিল। খুব শীঘ্রই তিনি আর্থার কনান ডয়েল এবং জে. এম. ব্যারির মতো গুণী সাহিত্যিকের সান্নিধ্যে আসেন। ১৮৯৭ সালে ব্যারি তাঁকে জনৈক ব্যারন সিরিল আর্থার পিয়ারসনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন যিনি প্রিকার্ডকে তাঁর মাসিক ‘পিয়ার্সন’স ম্যাগাজিন’-এর জন্য ভূতের গল্প লেখার অনুরোধ করেন। প্রিকার্ড ও তাঁর মা ‘ফ্লাক্সম্যান লো’ নামের একটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে বহু গল্প লেখেন ঐ পত্রিকার জন্য। এই সমস্ত গল্পগুলি একত্রিত হয়ে ১৮৯৯ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায় ‘দ্য এক্সপিরিয়েন্সেস অফ ফ্লাক্সম্যান লো’ নামে। ১৯০৪ সালে প্রিকার্ড এবং তাঁর মা ‘দ্য ক্রনিকল্‌স অফ ডন কিউ’ নামের এক স্পেনীয় রবিনহুড-জাতীয় চরিত্র তৈরি করেন যে কিনা শয়তান ধনী লোকের উপর ক্ষিপ্ত কিন্তু সৎ গরীব মানুষের প্রতি দয়ালু। ১৯২৫ সালে তাঁর লেখা ‘ডন কিউ লাভ স্টোরি’ বইটি থেকে জ্যাক কানিংহাম এবং লোটা উড্‌স একটি চিত্রনাট্য তৈরি করে, ‘ডন কিউ, এ সন্‌ অফ জোরো’ নামে পূর্ণদৈর্ঘ্যের এই ছবিটির প্রযোজক ছিলেন ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কস। ডগলাস নিজে মূল চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে হেস্কেথ প্রিকার্ড ‘ব্ল্যাক ওয়াচ এবং গার্ডস্‌ কমিশন’-এর জন্য আবেদন করা সত্ত্বেও বয়সজনিত কারণে তাঁর আবেদন মঞ্জুর হয়নি। অবশেষে তিনি যুদ্ধ-দপ্তরে সহকারী প্রেস অফিসার পদে বহাল হন। ১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধের সংবাদদাতাদের দায়িত্বে থাকা একজন ‘প্রত্যক্ষদর্শী অফিসার’ হিসেবে প্রথম মাসেই ফ্রান্সের ফ্রন্টলাইনে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। তিনি অবাক হয়ে যান দেখে কীভাবে প্রশিক্ষিত জার্মান স্নাইপারের আঘাতে অগণিত ব্রিটিশ সৈন্য অবলীলায় মারা যাচ্ছেন। দিনে জার্মান স্নাইপারের গুলিতে একেক দিন পাঁচ জন সৈন্যের মৃত্যু বিরল ছিল না। তিনি আরো জানতে পারেন যে একটি বাহিনীর আঠারোজনই একদিনে স্নাইপারের আক্রমণে প্রাণ হারায়। গোপনে লুকিয়ে থাকা জার্মান স্নাইপারদের চিহ্নিত করার পদ্ধতিও খুব একটা উন্নত ছিল না ব্রিটিশদের। দূরবীনের দৃশ্যক্ষমতা বাড়িয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে তিনি শত্রু চিহ্নিতকরণের মানোন্নতি ঘটান। প্রিকার্ড এও আবিষ্কার করেন যে জার্মানদের বর্মের পাতটি তুলনায় অনেক পুরু যা একমাত্র ‘জেফারি ৩৩৩’ বন্দুকের গুলিতেই বিদ্ধ করা সম্ভব। কিন্তু ব্রিটিশদের বর্মের পাত তখন এতটাই পাতলা ছিল যে সামান্য মাউসার পিস্তলের গুলিতেই তা বিদ্ধ হতে পারে। তাঁর অন্যতম একটি আবিস্কার ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে ‘ডামি’ বা নকল মাথার ব্যবহারের দ্বারা শত্রু-স্নাইপারের অবস্থান চিহ্নিত করা। বাস্তবতা আনার জন্য সেই মাথার মুখে একটি জ্বলন্ত সিগারেটও রাখা হত। শত্রুপক্ষ তাকে মানুষ ভেবে গুলি করলে সেই গুলির আঘাতের অবস্থা দেখে শত্রুর অবস্থান চিহ্নিত করা যেত। গুলির বিদ্ধ করা ছিদ্রের সমান্তরালে পেরিস্কোপ লাগিয়ে দেখা হত শত্রুর স্নাইপার কোথায় রয়েছে। এছাড়া প্রিকার্ড জার্মান সেনাবাহিনীর তাঁবু-প্রাচীরের গঠনকাঠামোর অনুকরণ করে ব্রিটিশ বাহিনীর আত্মরক্ষার জন্য পরিখা-প্রাচীর (Trench Parapet) তৈরি করেছিলেন।  এই দুটি আবিষ্কারই ব্রিটিশদের বাহিনীতে যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা অনেকাংশে হ্রাস করে।

১৯১৫ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে স্নাইপিং-প্রশিক্ষণ দেবার অনুমতি দেয়। সেহেতু ১৯১৬ সালে তিনি ‘প্রথম সেনা স্কুল’ স্থাপন করেন পাস-ডি-ক্যালিস-(Pas-De-Calais)এর লিংহেম (Linghem) গ্রামে। ওই বছরই অক্টোবর মাসে তাঁকে ‘মিলিটারি ক্রস’ সম্মান দেওয়া হয়৷ হেস্কেথের কাছের বন্ধু অন্যতম চ্যাম্পিয়ন শ্যুটার জর্জ গ্রে তাঁকে বলেছিলেন যে হেস্কেথ জার্মান স্নাইপারের আঘাতে মৃতের সংখ্যা প্রতি সপ্তাহে পাঁচজন থেকে তিন মাসে ষাটটি বাহিনীতে চুয়াল্লিশে কমিয়ে এনেছিলেন। এভাবে গ্রে’র গণনা অনুযায়ী তিনি প্রায় সাড়ে তিন হাজার সৈন্যের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। ১৯১৬-র নভেম্বরে প্রিকার্ড ‘মেজর’ পদলাভ করেন। 

হেস্কেথ প্রিকার্ড একজন প্রতিভাবান ক্রিকেটারও বটে। হ্যাম্পশায়ার, লণ্ডন কাউন্টি, মের্লবোন ক্রিকেট ক্লাব সহ বহু ক্লাবের হয়ে তিনি ক্রিকেট খেলেছেন। মূলত তিনি একজন বোলার। ১৯০০ সালের ‘কাউন্টি চ্যাম্পয়নশিপ’এ সমারসেটের বিপক্ষে খেলতে গিয়ে এই ডানহাতি ফাস্ট বোলার প্রথম তাঁর কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। ১৯০৪ সালে প্রিকার্ড মের্লবোন ক্লাবের (Marlyebone) হয়ে ওয়েস্ট ইণ্ডিজ-এ খেলেছিলেন ‘লর্ড ব্র‍্যাকলে’র একাদশ’ ( Lord Brackley’s XI)। এভাবে ১৯০০ থেকে ১৯১৩ পর্যন্ত তাঁর ক্রিকেট জীবনে তিনি ৭৫৮৬ রানের বিনিময়ে মোট ৩৩৯টি উইকেট সংগ্রহ করেছিলেন৷ শিকারী হিসেবে খ্যাতি সত্ত্বেও তিনি সমুদ্র-উপকূলের ধূসর সীল মাছ শিকারের বিরুদ্ধে প্রচার চালান। ১৯১৪ সালে ‘গ্রে-সীলস্‌ হান্টিং ল’ পাস করান তিনি। এই আইন ছিল ব্রিটেনের প্রথম আইনি সুরক্ষাব্যবস্থা যা কিনা অ-স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শিকারীদের হাত থেকে বাঁচালো। ১৯১৪’র মার্চ মাসে ‘পিয়ার্সন’স ম্যাগাজিন’-এ প্রিকার্ড একটি প্রবন্ধ লেখেন ‘স্লটার্ড ফর ফ্যাশন’ (Slaughtered for Fashion) যেখানে পাখির চোরাশিকার বন্ধ করার আবেদন জানান তিনি। 

১৯১৭ সালের শেষদিকে বিশেষ সংক্রমণজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে হেস্কেথ প্রিকার্ড বাহিনী থেকে অব্যাহতি নেন। এরই মধ্যে তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রথম সেনা স্কুলে স্নাইপিং প্রশিক্ষণ, স্কাউটিং এবং স্নাইপিং পর্যবেক্ষণের জন্য তাঁকে ‘ডিস্টিঙ্গুইশড সার্ভিস অর্ডার’-এ ভূষিত করে ব্রিটিশ সরকার। পরে স্বাস্থ্য ভালো হলে তিনি আবার লেখায় মনোনিবেশ করেন। ১৯২০তে হেস্কেথ প্রিকার্ড তাঁর সবথেকে বিখ্যাত ও চর্চিত উপন্যাসটি লেখেন ‘স্নাইপিং ইন ফ্রান্স’ (Sniping in France) যা আসলে তাঁর নিজের যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার ফসল। ১৯১৯ সালের জুলাই মাসে প্রিকার্ডকে ‘সোসাইটি অফ অথরস’ (Society of Authors)-এর চেয়ারম্যান করা হয়৷ তাঁর মৃত্যুর দু’বছর পরে তাঁরই এক বন্ধু এরিক পার্কার ( Eric Parker) প্রিকার্ডের জীবনী লেখেন ‘ হেস্কেথ প্রিকার্ড ডি.এস.ও, এম.সি : এক্সপ্লোরার, ন্যাচারালিস্ট, ক্রিকেটার, অথর, সোলজার’ (Hesketh Prichard D.S.O, M.C : Explorer, Naturalist, Cricketer, Author, Soldier) এই নামে। 

১৯২২ সালের ১৪ জুন সেপ্সিস ( Sepsis)- আক্রান্ত হয়ে হেস্কেথ প্রিকার্ডের মৃত্যু হয়৷ 

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন