বিজ্ঞান

ক্যামেরা কাজ করে কীভাবে

প্রতিদিন গড়ে প্রায় একশো আশি কোটি ছবি ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পরে। এই ছবিগুলো আসলে জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ডিজিটাল পিক্সেলে আবদ্ধ তথ্য। আগে ক্যামেরার ধরণ-ধারণ ছিল অন্যরকম, এখন একেবারে ডিজিটালের যুগ। এমনকি প্রতিটি মোবাইলেও উন্নত প্রযুক্তির ক্যামেরা থাকে। সেসব দিয়ে কত ছবিই না তুলি আমরা। কখনো ভেবেছেন, কীভাবে ক্যামেরা সময়কে থামিয়ে ছবিতে তার স্মৃতিকে চিরকালীনভাবে ধরে রাখতে পারে? আসুন জেনে নেওয়া যাক, ক্যামেরা কাজ করে কীভাবে সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য।

আমাদের চোখও কিন্তু ক্যামেরার মতোই কাজ করে। তাই ক্যামেরার কার্যপ্রণালী বোঝার আগে আমাদের জানতে হবে আমাদের চোখ কীভাবে কাজ করে। আমাদের চোখেও একটি লেন্স আছে। বাইরের প্রকৃতি থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে সেই লেন্সে পড়ে এবং লেন্সটি আলোকরশ্মিগুলিকে একত্রিত করে লেন্সের বিপরীতে রেটিনায় একটি উলটো সদ্‌বিম্ব গঠন করে। তখনই মস্তিষ্ক সেই ছবিটিকে চিনে নেয় এবং এর ফলে আমরা দেখতে পাই। ক্যামেরার কাজটিও প্রায় এক। ক্যামেরার সাহায্যে প্রথমে আমরা যার বা যে জিনিসের ছবি তুলতে চাই, তার দিকে ফোকাস করে ক্যামেরার লেন্সটিকে রাখা হয়। তারপর বাইরের প্রকৃতি থেকে ক্যামেরার লেন্সে যে আলো প্রবেশ করে তার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে অ্যাপারচার। ঐ লেন্স ঠিক কত সময় আলোর সংস্পর্শে থাকবে তা ঠিক করে ক্যামেরার শাটার সেন্সর এবং এই সেন্সরই উদ্দিষ্ট বস্তু বা ব্যক্তির একপ্রকার প্রাথমিক ছবি তৈরি করে নেয়, সবশেষে চূড়ান্ত ছবিটি তোলা হয়।

ইতিহাসের দিকে তাকালে জানা যায়, ১০২১ সালে বিজ্ঞানী ইবন-আল-হাইতামের লেখা সাতখণ্ডের আলোকবিজ্ঞানের বই ‘কিতাব-আল-মানাজির্‌’ থেকেই ক্যামেরা তৈরির প্রথম সূত্রপাত ঘটে। ১৫৫০ সালে জার্মানির বিজ্ঞানী জিরোলামো কারদানো প্রথম ক্যামেরায় লেন্স বসান। তবে প্রথম সার্থক ক্যামেরার আবিষ্কারক ছিলেন জোসেফ নাইসপোর নিপস যিনি ১৮২৬ সালে পাতলা কাঠের বাক্সের মধ্যে রাখা বিটুমিন প্লেটে আলোর ব্যবহার করে ছবি তোলেন এবং তাঁর এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বে প্রথম ছবি তোলেন ফ্রাঞ্চমেন চার্লস আর ভিনসেন্ট ক্যাভেলিয়ার। তারপর সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিবর্তিত হতে হতে উন্নততর ক্যামেরা বাজারে এসেছে। স্মার্টফোন কেনার ক্ষেত্রে এখন ক্যামেরার বৈশিষ্ট্য ভীষণভাবে ক্রেতাদের কাছে যাচাইয়ের বিষয়।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


সূচীছিদ্র ক্যামেরা কাজ করে কীভাবে জানা থাকলে প্রাচীনকালের ক্যামেরার কার্যপ্রণালী সহজেই বোঝা যাবে। প্রথমদিকে ক্যামেরা বলতে একটা বড়ো ঘরকে বোঝানো হতো যার একটা দেওয়ালে ছোট্ট ছিদ্র থাকতো, সেখান থেকে আসা আলোর প্রতিচ্ছবি উল্টো দিকের দেওয়ালে পড়তো। সেই জায়গায় কাগজে রাখা রাসায়নিক আগত আলোর সঙ্গে বিক্রিয়া করে প্রায় ৮-১০ ঘণ্টা পর একটা অস্পষ্ট ছবি দিতো। আজকাল ক্যামেরাতে পাওয়া এই সব পরিস্কার ও স্পষ্ট ছবির মূল কারণ লেন্স। ক্যামেরার লেন্স এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে যাওয়া আলোকরশ্মিগুলিকে একত্রিত করে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুকে কেন্দ্র করে স্পষ্ট ও পরিষ্কার প্রতিবিম্ব তৈরি করে এবং সেখানে থাকা ফিল্ম বা ক্যামেরার সেন্সর একটা ভালো ছবি আবদ্ধ করে। এই নির্দিষ্ট বিন্দুতে ফোকাস ঠিকঠাক না হলে ছবি ঘোলাটে ও অপরিষ্কার দেখায়। লেন্সের ফোকাসিং ব্যবস্থা গ্লাসটিকে ফিল্ম বা সেন্সর থেকে কাছে দূরে করার মাধ্যমে ক্যামেরা ব্যবহারকারীকে লেন্স যথাযথ জায়গায় রাখার ব্যবস্থা করে, তার ফলে স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ প্রতিবিম্ব পাওয়া যায়। ক্যামেরাতে লেন্সের সামনের গ্লাসটা সামনে পিছনে করে বস্তুকে কাছে-দূরে অর্থাৎ জুম-ইন জুম-আউট করা হয়। ক্যামেরার ফোকাস বলতে বোঝায়, লেন্স ও সেন্সরে আলোকরশ্মির আপতন বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব অর্থাৎ ৩০০ মিমি. ফোকাসের লেন্স-এ কথার অর্থ হল আলোকরশ্মিকে ৩০০ মিমি. চালিত করলে তবেই সেন্সরে স্পষ্ট প্রতিবিম্ব গঠন করবে। লেন্সের মাধ্যমে কোনো বস্তু থেকে প্রতিফলিত বা নিঃসৃত আলো কেন্দ্রীভূত করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের অনাবৃতকরণে (exposure) ওই তলে বস্তুর একটি যথার্থ ছবি (real image) ধরা হয়। সঙ্গের ছবিতে (চিত্র – ১) খেয়াল করে দেখলে বোঝা যাবে যে, ঠিক কীভাবে বাইরের বস্তু থেকে আলোকরশ্মি লেন্সের মধ্যে দিয়ে প্রতিসৃত হয়ে একটি উলটো প্রতিবিম্ব তৈরি করেছে।

How Does A Camera Work?
ক্যামেরা কাজ করে কীভাবে (চিত্র – ১)

ক্যামেরা ব্যবহারের শুরুর দিকে অধিকাংশ চিত্রগ্রাহকই রসায়নবিদ্ ছিলেন। বৰ্তমানে ফটোগ্রাফিক ফিল্মে আলোক সংবেদী রাসায়নিক (জিলেটিন ইমালসন ও সিলভার হ্যালাইড ক্রিস্টাল) ব্যবহার করা হয়। আলোকচিত্রগ্রাহী রঞ্জকস্তরের (photographic emulsion) উপস্থিতির ফলে একটি সুপ্ত চিত্র (latent image) তৈরি হয়। এটি পরে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত (photographic development) হয়ে একটি দৃশ্যমান চিত্রে পরিণত করা হয়। এই দৃশ্যমান চিত্রটির আলোকচিত্রগত উপকরণ ও প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতি অনুযায়ী হয় নেগেটিভ বা পজিটিভ হয়ে থাকে। প্রথাগতভাবে, ফিল্মে একটি নেগেটিভ চিত্র থেকে কাগজে পজিটিভ চিত্র তৈরি হয়। এটিকে বলে মুদ্রিত আলোকচিত্র (photographic print) বস্তু থেকে লেন্স হয়ে ফটোগ্রাফিক প্লেটে আলোক এসে পড়লে আলোর প্রকৃতি, বস্তুর আকার ইত্যাদি মিলিয়ে একটা প্রতিবিম্বের আকার পায়। পরবর্তী পর্যায়ে অন্ধকার ঘরে এই ফিল্মকে বার বার রাসায়নিকে ডুবিয়ে ছবি পাওয়া যায়।

আধুনিক ডিজিট্যাল ক্যামেরা বা মোবাইল ক্যামেরার সেন্সরগুলি লক্ষ-কোটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র লাল, সবুজ, নীল পিক্সেলের (মেগাপিক্সেলে) সমন্বয়ে তৈরি। যখন আলো এসে এই পিক্সেলে পড়ে সেন্সর সেই আলোর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শক্তি উৎপন্ন করে এবং ক্যামেরাতে থাকা মাইক্রোচিপ (কম্পিউটারের মতো কাজ করে) সেই প্রাপ্ত শক্তি অনুযায়ী বিশ্লেষণ করে নেয় প্রতিবিম্বের কোথায় আলো, কোথায় অন্ধকার, কী রঙ, কতটা উজ্জ্বল ইত্যাদি খুঁটিনাটি তথ্যগুলি। সমস্ত পিক্সেলের এই তথ্যগুলি একত্রিত করে মাইক্রোচিপ একটা হুবহু ছবি তুলতে পারে। ডিজিট্যাল ক্যামেরা চার্জ-কাপল্‌ড ডিভাইস (CCD) বা কমপ্লিমেন্টারি মেটাল-অক্সাইড-সেমিকনডাক্টর (CMOS) প্রযুক্তি জাতীয় আলোক-সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক্স-ভিত্তিক এক ধরনের ইলেকট্রনিক ইমেজ সেন্সর ব্যবহার করে। তার ফলে ডিজিট্যাল ইমেজ বৈদ্যুতিন পদ্ধতিতে সঞ্চিত হয়। সেন্সরের সাইজ, পিক্সেল সাইজ, আউটপুট (output), সাব পিক্সেল বর্ণনা (subpixel layout) ইত্যাদি বিষয়গুলো একটি সেন্সরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এগুলোর মানের উপর বিভিন্ন আলোর তীব্রতাতে বা লাইটিং কনডিশনে, বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন সময়ে কি কোয়ালিটির ছবি উঠবে অথবা ছবিতে নয়েস (noise), ডিসটরশন (distortion) থাকবে কি না, কম আলোতে (low light) এ কতটুক ডিটেল (detail) থাকবে, স্পষ্টতা (sharpness) থাকবে কতটা ইত্যাদি নানান বিষয় নির্ভর করে।
যেহেতু সমস্ত পিক্সেলই কিছু না কিছু আলোর বার্তা নিয়ে আসে তাই এটাই স্বাভাবিক, যে সমস্ত ক্যামেরার মেগাপিক্সেল বেশি সেই ক্যামেরাতে ছবির গুণগত মান ভালো হবে। এক্ষেত্রে সেন্সরের আকারও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কারণ বেশি আলো কেন্দ্রীভূত করলে তবেই কম আলোতেও ছবি ভালো হবে।

প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ছবির মান উন্নত হবে, ছবি তোলার পদ্ধতি সহজতর হতে থাকবে তবে ক্যামেরা কাজ করে কীভাবে তার পিছনের মূল বিজ্ঞান পাল্টাবে না।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য