বিজ্ঞান

সূর্যগ্রহণ ও কুসংস্কার

সূর্যগ্রহণ নিয়ে সারা পৃথিবীতেই নানান কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস প্রচলিত আছে। যুক্তি দিয়ে বুঝলেই বোঝা যাবে এই কুসংস্কারগুলি বেশিরভাগই অজ্ঞতাবশত তৈরি আর নাহলে মানসিক বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার ফল। এখানে সূর্যগ্রহণের সাথে প্রচলিত এরকম বেশ কিছু কুসংস্কার যুক্তি দিয়ে নস্যাৎ করা হল।

সূর্যগ্রহণের সময় ক্ষতিকারক রশ্মি বেরোয়
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ যখন পুরোপুরি সূর্যকে ঢেকে দেয় তখন সূর্যের করোনা মন্ডল থেকে যে উজ্জ্বল রশ্মি বেরোয় তা তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। বিজ্ঞানীরা শত শত বছর ধরে এই বিকিরণের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখেছেন এটি সূর্যের স্বাভাবিক আলো যা আমাদের পৃথিবীতে এসে পরে তার তুলনায় কয়েক কোটি গুণ ক্ষীণ। নাসার বিজ্ঞানীদের মতে এই ক্ষীণ রশ্মির এত ক্ষমতা নেই মহাশূন্যের মধ্যে দিয়ে যে ১৫০ মিলিয়ন কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বায়ুমণ্ডল ভেদ করে তা আমাদের চোখের ক্ষতি করবে। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের ক্ষেত্রেই কিন্তু এটি প্রযোজ্য। আংশিক সূর্যগ্রহণে এই বিকিরিত রশ্মির পরিমাণ অনেকটাই বেশি হয়। তাই একটানা সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা ঠিক নয়। অবশ্য এই একটানা তাকিয়ে আমরা থাকতেও পারবো না। কারণ প্রতিবর্ত ক্রিয়ার ফলে অতিরিক্ত আলোয় আমাদের চোখ এমনিই বুজে আসবে।

গর্ভবতী মহিলাদের সূর্যগ্রহণ দেখা উচিত নয় কারণ তা গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি করে।

সূর্যগ্রহণের সাথে জড়িত এটি একটি অতি প্রাচীন কুসংস্কার যা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানা হয়ে থাকে।
প্রাচীন আজটেকবাসীরা মনে করত সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণের অর্থ সূর্য বা চাঁদকে একটু একটু করে কোন অশুভ শক্তি গ্রাস করে নেওয়া। এই ধারণা থেকেই আজটেকবাসীদের মনে বদ্ধমূল বিশ্বাস জন্মায় যদি কোনও গর্ভবতী মহিলা গ্রহণ দেখেন তাঁর গর্ভস্থ সন্তানের মুখও একই ভাবে খেয়ে নেয় সেই অশুভ শক্তি। হিন্দুরা আবার বিশ্বাস করে সূর্য বা চন্দ্র গ্রহণের সময় রাহু গ্রাস করে সূর্য বা চন্দ্রকে। সুতরাং এই সময় গর্ভবতী মহিলাদের এই সময় কোনভাবেই গ্রহণ দেখা উচিত নয়। এতে গর্ভস্থ সন্তানের মুখ বিকৃত হতে পারে।মেক্সিকানরা মনে করেন আবার উল্টোটা। তাঁদের কুসংস্কার, গ্রহণের সময় গর্ভবতী মহিলারা পেটের কাছে ছুরি ধরে বসে থাকতে পারেন বা লাল অন্তর্বাস পরতে পারেন। এতে নাকি গ্রহণের কু-প্রভাব পড়ে না। রক্ষা পায় গর্ভের সন্তান। গ্রহণের সময় গর্ভবতী মহিলাদের বিছানার উপর চিৎ হয়ে শুয়ে থাকারও পরামর্শ দেন অনেকে। গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভস্থ ভ্রূণের কল্যাণ কামনায় ওপরের যতগুলি কুসংস্কার বা অন্ধ বিশ্বাসের উদাহরণ দেওয়া হল তার প্রত্যেকটিই গড়ে উঠেছে যুগযুগান্ত ধরে চলে আসা প্রাচীন বিশ্বাসের ওপর। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান কি বলে এ বিষয়ে? সূর্য থেকে বিকিরিত কোন রশ্মিরই এত ক্ষমতা নেই যা গর্ভস্থ ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে। নাসার বিজ্ঞানীদের মতে সূর্যগ্রহণের সময় সূর্য থেকে আগত রশ্মি নিরাপদ।

এছাড়া সূর্যের কেন্দ্রে ক্রমাগত ঘটে চলা নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে অকল্পনীয় পরিমাণে নিউট্রিনো কণা। জন্মানো মাত্রই এই কণা অবিশ্বাস্য বেগে সূর্য থেকে বেরিয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে যা চাঁদ ও পৃথিবীতেও পৌঁছায়। এই কণার ভেদশক্তি এতই বেশি যে যেকোন কঠিন বস্তু এমনকি চাঁদ বা পৃথিবী ভেদ করে পেরিয়ে যেতে পারে। গ্রহণ হোক বা না হোক, এমনকি রাতের বেলাতেও সূর্য যখন অন্য প্রান্তে থাকে তখনও কোটি কোটি নিউট্রিনো কণা আমাদের শরীর ভেদ করে বেড়িয়ে যায়। শুধু তাই নয়, পৃথিবীতে পৌঁছে এই কণার স্রোত ক্রমাগত আমাদের শরীর ফুঁড়ে বেরিয়ে যায় আমরা যা টেরও পাই না। সারাবছর যে ভাবে এই নিউট্রিনো কণা আমাদের ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় তেমনি ভাবেই সূর্যগ্রহণের সময়েও এই কণার স্রোত আমাদের দেহের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে নিউট্রিনো কণার এই স্রোত গর্ভবতী মা এবং সন্তানের পক্ষে সম্পূর্ণ নিরাপদ।

সূর্যগ্রহণ চলাকালীন সময়ে রান্না করা উচিত নয়। কিংবা রান্না করা খাবার ঢাকা দিয়ে তার ওপর তুলসী পাতা রাখা উচিত।

এখানেও সেই ক্ষতিকর রশ্মির তত্ত্বই হাজির করা হয়েছে। যুক্তি দিয়ে দেখলে সূর্যগ্রহণের সময় সূর্য থেকে আগত রশ্মি যদি বিষাক্ত হয় তাহলে তা কেবল রান্নার সময়েই খাবারকে বিষাক্ত করবে তা নয় ক্ষেতের ফসলকেও একইভাবে বিষাক্ত করে তুলতে পারে। কিন্তু এই ভয়ে তো ক্ষেতের সব ফসল রাতারাতি তুলে ফেলা সম্ভব নয়। যুক্তি দিয়ে দেখলে যেখানে সূর্য রশ্মিই ক্ষতিকর নয় সেখানে গ্রহণের সময় নির্গত রশ্মিও স্বাভাবিক ভাবে বিষাক্ত নয়। তাই সূর্য গ্রহণের সময় রান্না না করার কোন যুক্তি নেই, যেমন যুক্তি নেই খাবারকে বিষাক্ত হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে তুলসী পাতা রাখার। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় যে উজ্জ্বল সবুজ রঙের বলয় দেখা যায়। সেই আলো আমাদের কাছে অচেনা। এখন যা অচেনা তাই ভয়ানক এরকম একটা ধারণা গঠনের প্রবণতা আমাদের সকলের মধ্যেই কাজ করে। এর সাথে কাকতালীয় ভাবে কোন খাবারে বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটে তাহলে আমাদের মন এই কাকতালীয় ঘটনাকেই প্রতিপাদ্য সত্য হিসেবে ধরে নেয়। মনোবিজ্ঞানীরা এই প্রবণতাকে কনফার্মেশন বায়াস(Confirmation Bias) বলে। অর্থাৎ দুটি আপাত ভিন্ন ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে বের করার প্রবণতাই হল কনফার্মেশন বায়াস। সূর্যগ্রহণের ফলে খাবার বিষাক্ত হয়ে যাওয়ার ধারণাও এই প্রবনতারই একটি উদাহরণ।

সূর্যগ্রহণ মানেই অশুভ কিছু ঘটতে চলেছে

কনফার্মেশন বায়াস প্রবণতার সবথেকে ভালো উদাহরণ হল এই ধারণাটি। আমাদের জীবনে ঘটে চলা অজস্র খারাপ ঘটনার মধ্যে যেগুলি সূর্যগ্রহণের দিন ঘটেছে সেগুলোর থেকে আমরা অনায়াসে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই সূর্যগ্রহণ মানেই খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে। ইচ্ছে করেই বাদ দিয়ে দিই সূর্যগ্রহণের দিন যদি কিছু খারাপ বা অশুভ নয় এমন কিছু ঘটনাগুলো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১১৩৩ সালে এই সূর্যগ্রহণের সময়েই ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম হেনরী মারা যান। এরকম দুঃখজনক ঘটনা যেমন অজস্র আছে সারা পৃথিবীতে তেমনই ভালো ঘটনাও নেহাত কম নেই সূর্যগ্রহণের দিন। তাই সূর্যগ্রহণ মানেই যে অশুভ কিছু ঘটতে চলেছে এমন ভাবার কোন কারণ নেই।

সুমেরু এবং কুমেরুতে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়না

মহাজাগতিক দিক থেকে বিচার করলে পৃথিবীর আর পাঁচটা জায়গার থেকে সুমেরু ও কুমেরুর কোন পার্থক্য নেই। নেই বলেই ২০১৩ সালের ২০ মার্চ সুমেরু এবং ২০০৩ সালের ২৩ নভেম্বর কুমেরুতে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ শেষ দেখা গেছিল।

জন্মদিনের দিন বা জন্মদিনের ছ মাসের মধ্যে সূর্যগ্রহণ স্বাস্হ্য সংক্রান্ত কোন খারাপ খবর আনে

জ্যোতিষীদের এটি একটি খুব পছন্দের ভবিষ্যৎ বাণী। এই ধারণা কেন ঠিক নয় সে নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই কারণ বোঝাই যাচ্ছে কনফার্মেশন বায়াস প্রবণতার এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

কেবল এই ধারণাগুলিই নয় সূর্যগ্রহণ নিয়ে সব দেশেই সব সংস্কৃতিতেই কিছুনা কিছু উপকথা বা সংস্কার জড়িয়ে আছে। ইতালীয়রা বিশ্বাস করে থাকে সূর্যগ্রহণের সময়ে ফুলের গাছ পুঁতলে তাতে নাকি অন্য সময়ের তুলনায় বেশি রঙিন ফুল ফোটে। আফ্রিকার ছোট দুই দেশ টোগো ও বেনিনে বিশ্বাস করা হয় চাঁদের সাথে সূর্যের লড়াইয়ের ফলই হল গ্রহণ। এই লড়াই থেকে সূর্যকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে শেষ অবধি পৃথিবীর মানুষদেরই সাহায্য করতে হয়। চাঁদের সঙ্গে ঝগড়া মিটিয়ে নিলে তবেই সূর্য আবার নিজের অবস্থানে ফিরতে পারে। ভারতের কোন কোন রাজ্যে আবার গ্রহণের সময় শাড়িতে পিন বা সাধারণ ভাবে সেফটিপিন বা কোনও অলংকার পরা থেকে নিষেধ করা হয়। নিষেধ থাকে ছুরি বা বঁটি দিয়ে ফল-সবজি কাটাতেও। বলাই বাহুল্য এগুলোর সাথে সূর্যগ্রহণ যে কোনভাবেই জড়িত থাকতে পারে না তা শিক্ষিত ও বৈজ্ঞানিক মন সমন্বিত যেকোন ব্যক্তিই বুঝতে পারবে।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।