পদার্থবিজ্ঞানের ধারণায় আমরা জেনেছি এই মহাবিশ্বে যা কিছু নির্দিষ্ট কিছু জায়গা (Space) দখল করে থাকে এবং যার নির্দিষ্ট ভর (mass) রয়েছে, তাকেই পদার্থ বলা হয়। প্রতিটি পদার্থের মূল উপাদান বলতে পরমাণু এবং তার অন্তঃস্থ ইলেকট্রন, প্রোটন কিংবা নিউট্রনের কথা বলা হয়। তবে এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন এই মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy) ছাড়া বাকি যা কিছু আছে, সবই পদার্থের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এই ধারণাও পালটে গিয়েছে, বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারে আবিষ্কৃত হয়েছে ‘অ্যান্টিম্যাটার’ বা প্রতিপদার্থ (Antimatter)। তাত্ত্বিকভাবে বিজ্ঞানীরা বলেছেন যে মহাবিশ্বে পদার্থ এবং প্রতিপদার্থ সমপরিমাণে থাকে, কিন্তু তারপরেও এতদিন পর্যন্ত অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিপদার্থ নিয়ে কোনওরকম গবেষণাই সফল হয়নি। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক, আসলে এই অ্যান্টিম্যাটার বলতে ঠিক কী বোঝায়।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে সাধারণ পদার্থে উপস্থিত কণার বিপরীতধর্মী প্রতিকণা (Anti-particle) দ্বারা গঠিত উপাদানকেই সাধারণভাবে প্রতিপদার্থ বা অ্যান্টিম্যাটার বলা হয়। তাত্ত্বিকভাবে একটি কণা ও একটি প্রতিকণার ভর সমান হয়, যেমন বলা হয় যে একটি প্রোটন আর একটি অ্যান্টি-প্রোটনের ভর সমান। কিন্তু তাদের আধান (charge) বিপরীতধর্মী হয়ে থাকে, তাছাড়া কোয়ান্টাম সংখ্যার ক্ষেত্রেও বৈপরীত্য দেখা যায়। কোনও কণা ও তার প্রতিকণার মধ্যে সংঘর্ষ হলে তাদের পারস্পরিক বিনাশ ঘটে এবং একইসঙ্গে বিভিন্ন অনুপাতে ফোটন কণা(Photon), নিউট্রিনো (Neutrino) কিংবা কোনও কোনও সময় তুলনায় কম বৃহদাকার কণা-প্রতিকণার জোড়া তৈরি হয়। এই বিনাশের ফলে উদ্ভূত শক্তির বেশিরভাগটাই নির্গত হয় আয়নীয় বিকিরণ হিসেবে (Ionization Radiation)। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা বলছেন যদি এই বিনাশকালে চারপাশে অন্যান্য পদার্থ উপস্থিত থাকে, তবে এই বিকিরিত শক্তি সেই পদার্থের দ্বারা শোষিত হয়ে অন্য রূপভেদে (তাপ বা আলো) বদলে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে কণা ও প্রতিকণার সংঘর্ষের সময় যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হয় তা তাদের সম্মিলিত ভরের সমানুপাতিক। এই ঘটনা আইনস্টাইনের ভর ও শক্তির নিত্যতা সূত্র মেনে চলে। মহাবিশ্বে একইসঙ্গে সমপরিমাণে পদার্থ ও প্রতিপদার্থ বিরাজ করে এবং তাদের উভয়ের মধ্যে এই বিপুল বৈপরীত্য তৈরি হয় ব্যারিওজেনেসিস (Baryogenesis) নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ঠিক যেভাবে সাধারণ কণাগুলি একত্রিত হয়ে পদার্থের পরমাণু তৈরি করে, সেভাবেই প্রতিকণাগুলি সম্মিলিত হয়ে প্রতিপদার্থের পরমাণু তৈরি করে। যেমন – একটি ইলেকট্রন ও একটি প্রোটন কণার সম্মিলনে তৈরি হয় হাইড্রোজেন পরমাণু। অন্যদিকে একইভাবে একটি প্রতি-ইলেকট্রন অর্থাৎ পজিট্রন (Positron) এবং একটি অ্যান্টি-প্রোটনের সমাহারে গঠিত হয় অ্যান্টি-হাইড্রোজেন (Anti-hydrogen)। সাধারণ পদার্থের কণাগুলির নির্দিষ্ট ধনাত্মক লেপ্টন সংখ্যা (Lepton Number) থাকে, কিন্তু অ্যান্টিম্যাটারের কণার লেপ্টন সংখ্যা হয় ঋণাত্মক। যেমন – ইলেকট্রন থাকে সাধারণ পদার্থে যা ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণা এবং অন্যদিকে প্রতিপদার্থে থাকে পজিট্রন যা ধনাত্মক আধানযুক্ত কণা, কিন্তু উভয়ের ভর সমান। নিউট্রনের মত নিস্তড়িৎ কণাগুলিরও নিজস্ব প্রতিপদার্থের অংশীদার রয়েছে বলেই কল্পনা করা হয়। তবে বিজ্ঞানীরা এখনও সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি যে মহাবিশ্বে প্রাপ্ত নিউট্রিনো কণাটিই নিউট্রনের প্রতিকণা কিনা। অনেকে মনে করেন, বিগ ব্যাং-এর (Big Bang) পরে মহাবিশ্বে অ্যান্টিম্যাটার তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তার তুলনায় পদার্থ বা ম্যাটারের পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়ে বিনাশের পরেও বহুল পরিমাণ পদার্থ ব্রহ্মাণ্ডে উপস্থিত ছিল যা থেকেই পরে নক্ষত্র, ছায়াপথ ইত্যাদি তৈরি হয়েছে। তবে এই পরিমাণের পার্থক্য ছিল খুবই সামান্য।
১৮৮০ সালে উইলিয়াম হিকস তাঁর মাধ্যাকর্ষণের শীর্ষবিন্দু তত্ত্বে (Gravitational Vortex Theory) প্রথম ঋণাত্মক মাধ্যাকর্ষণ বিশিষ্ট পদার্থের উপস্থিতির সম্ভাব্যতা সম্পর্কে ধারণা দিয়েছিলেন। পরে ১৮৯০ সালে কার্ল পিয়ার্সন একটি ‘স্কুইর্ট’ (squirt) ও ‘সিঙ্ক’ (Sink)-এর কথা বলেন যেখানে সিঙ্ক হল ঋণাত্মক এবং স্কুইর্ট ছিল ধনাত্মক। ১৮৯৮ সালে আর্থার স্কুশটার ‘নেচার’ পত্রিকায় লেখা তাঁর দুটি খামখেয়ালি চিঠিতে প্রথম ‘অ্যান্টিম্যাটার’ শব্দটি উল্লেখ করেন। সেখানেই তিনি প্রথম অ্যান্টি-অ্যাটম বা প্রতি-পরমাণুর (Anti-atom) অস্তিত্বের কথা বলেন, একইসঙ্গে প্রতিপদার্থজনিত সৌরজগতের কল্পনাও করেছিলেন তিনি সেই চিঠিতে। স্কুশটারের এই বক্তব্য কোনও গভীর তাত্ত্বিক আলোচনা ছিল না, বরং একটি কল্পিত সম্ভাব্যতার কথা ছিল। তবে অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিপদার্থের আধুনিক ধারণাটি তৈরি হয় ১৯২৮ সালের দিকে। বিজ্ঞানী পল ডিরাক একটি গবেষণাপত্রে শ্রোডিঙ্গার তরঙ্গ সমীকরণের (Shrodinger Wave Equation) সহায়তায় ইলেকট্রনের পাশাপাশি অ্যান্টি-ইলেকট্রনের অস্তিত্বের কথা বলেন। ১৯৩২ সালে কার্ল ডি অ্যান্ডারসন এই প্রতি-ইলেকট্রন আবিষ্কারও করে ফেলেন এবং তার নাম দেন পজিট্রন। ১৯২৯ সালে চার্লস জ্যানে সামগ্রিকভাবে প্রতিপদার্থের একটি পৃথক পর্যায় সারণি নির্মাণ করেছিলেন। অন্যদিকে ফাইনম্যান এবং স্টাকলবার্গের মতে প্রতিপদার্থ বা প্রতিকণা হল এক বিশেষ প্রকারের সাধারণ কণা বা সাধারণ পদার্থ যেগুলি সময়ের উল্টোস্রোতে চলছে। বিজ্ঞানের আলোচনায় এই প্রতিকণা বোঝানোর একটি বিশেষ পদ্ধতি আছে। যেমন একটি প্রোটনকে প্রকাশ করা হয় p দ্বারা আর প্রতি-প্রোটনকে চিহ্নিত করা হয় p– দ্বারা। আধানের বৈপরীত্য বোঝানোর জন্য ইলেকট্রনকে যেমন e– হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তেমনি পজিট্রনকে চিহ্নিত করা হয় e+ চিহ্ন দ্বারা।
বিজ্ঞানীরা গবেষণার মধ্য দিয়ে জানতে পেরেছেন যে যে কোনও তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের বিটা-ক্ষয়ের (Beta-Decay) ফলে পজিট্রন কণা উদ্ভূত হয়, আবার ঠিক একইভাবে বিটা-ক্ষয়ের ফলে অ্যান্টি-নিউট্রিনো তৈরি হয়। এছাড়াও স্যাটেলাইট পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে প্রাথমিক মহাজাগতিক রশ্মিতে পজিট্রন ও কয়েকটি অ্যান্টিপ্রোটনের উৎস পাওয়া গিয়েছে। প্রাথমিক মহাজাগতিক রশ্মির ১ শতাংশেরও কম পরিমাণে এই জাতীয় প্রতিকণার উপস্থিতি পাওয়া যায়। তবে পরীক্ষাগারে কৃত্রিম উপায়েও এই পজিট্রন, অ্যান্টিপ্রোটন বা অ্যান্টিনিউট্রন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এই পরীক্ষার মধ্যে সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য হল ১৯৯৫ সালে সুইজারল্যান্ডে জেনিভার অদূরে ‘সার্ন’-এর (CERN) ভূগর্ভস্থ ‘আলফা’ গবেষণাগারে অ্যান্টি-হাইড্রোজেন পরমাণু তৈরি করা হয়। তবে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা অ্যান্টিম্যাটার কখনই সাধারণ পদার্থ দিয়ে নির্মিত পাত্রের মধ্যে রাখা হয় না, কারণ সেক্ষেত্রে পদার্থ আর প্রতিপদার্থ উভয়েই সংঘর্ষের ফলে নিজেদের বিনাশ ঘটাবে। ‘পেনিং ট্র্যাপ’ (Penning Trap) নামে একটি যন্ত্রের মধ্যে তড়িৎক্ষেত্র ও চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সংমিশ্রণে আহিত কণার (Charged Particle) আকারে অ্যান্টিম্যাটারকে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তবে এই যন্ত্রে আবার অনাহিত কণার আকারে অ্যান্টিম্যাটারকে রাখা যায় না। অনাহিত কণার (Uncharged Particle) জন্য পৃথকভাবে ব্যবহৃত হয় অ্যাটমিক ট্র্যাপ (Atomic Trap)। আবার বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছন তীব্র শূন্যতার (High Vaccum) মধ্যে অ্যান্টিম্যাটারকে ম্যাগনেটিক ট্র্যাপের (Magnetic Trap) সাহায্যে সংরক্ষণ করে ফেলা যায়। ২০১১ সালে ‘সার্ন’-এর বিজ্ঞানীরা ১৭ মিনিট যাবৎ একটি অ্যান্টিহাইড্রোজেনকে সংরক্ষণ করেছিলেন ট্র্যাপ পদ্ধতির সাহায্যে। পরে পেনিং ট্র্যাপ পদ্ধতিতে ৪০৫ দিন ধরে তাঁরা অ্যান্টিপ্রোটনকে সংরক্ষণ করেছিলেন। সেভাবেই ২০১৮ সালে এসে বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট পাত্রের মধ্যে লক্ষ লক্ষ প্রোটনকে সংরক্ষণ করে এক গবেষণাগার থেকে অন্য গবেষণাগারে সফলভাবে নিয়ে যাওয়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছেন।
এই অ্যান্টিম্যাটার তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়। ২০০৬ সালে বিজ্ঞানী জেরাল্ড স্মিথ অনুমান করেছিলেন যে ১০ মিলিগ্রাম পজিট্রন তৈরি করতে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে। ‘সার্ন’-এর মতে, ১ গ্রামের ১০ কোটি ভাগ অ্যান্টিম্যাটার তৈরি করতে প্রায় কয়েকশো কোটি টাকা খরচ হতে পারে। বর্তমানে নানা ক্ষেত্রে এই অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিপদার্থ ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। চিকিৎসাক্ষেত্রে পজিট্রন ইমেজিং টোমোগ্রাফি (Positron Imaging Tomography)-র ক্ষেত্রে পজিট্রনের মত প্রতি-কণা ব্যবহৃত হয়। আবার ক্যান্সারের চিকিৎসায় আয়ন থেরাপির (Ion Therapy) ক্ষেত্রে অ্যান্টিপ্রোটন ব্যবহার করা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে চিকিৎসা-বিজ্ঞানীদের মধ্যে। অন্যদিকে পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে উদ্দীপক পদার্থ হিসেবেও অ্যান্টিম্যাটার ব্যবহার করা যায় বলেই বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন। তবে এর প্রায়োগিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। সবশেষে বলতে হয় বিজ্ঞানীরা অ্যান্টিম্যাটারকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে মহাকাশযান কিংবা অ্যান্টিম্যাটার-রকেট (Antimatter-Rocket) প্রস্তুতির বিষয়েও গবেষণা করে চলেছেন। প্রচলিত জ্বালানির থেকে অ্যান্টিম্যাটারের শক্তি-ঘনত্ব অনেক বেশি হওয়ায় এর ব্যবহারে প্রচলিত শক্তি ক্ষয় হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পদার্থ আর প্রতিপদার্থের মধ্যে সংঘর্ষে যে ফোটন বিকিরণ ঘটে, তার বাইরেও কিছু পরিমাণ গতিশক্তি নির্গত হয় আর এই শক্তিকেই এভাবে কাজে লাগানোর কথা ভাবছেন বিজ্ঞানীরা।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান