সববাংলায়

গদর আন্দোলন

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন কিন্তু কেবল এই দেশের চৌহদ্দির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিদেশের মাটিতেও ভারতীয়রা সমানভাবে লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ অপশাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। ভারতের বাইরে প্রাথমিকভাবে আমেরিকা ও কানাডার মাটিতে প্রতিষ্ঠিত গদর দল (Ghadar Party) এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল। মূলত হিন্দু, মুসলমান এবং শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ গদর আন্দোলনের মুখ্য মুখ ছিলেন। ‘গদর’ নামক পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই গদর দল ও গদর আন্দোলন (Ghadar Movement) দানা বেঁধেছিল। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে গদর দলের কার্যকলাপের সূত্রপাত। লালা হরদয়াল, মহম্মদ বরকতুল্লার মতো মানুষেরা গদর দলের প্রধান প্রধান পদগুলিতে ছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী নানারকম কার্যকলাপের মাধ্যমে গদর দল তাদের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এই আন্দোলন কিন্তু ধীরে ধীরে সারা বিশ্বের প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়গুলির মধ্যে ছড়িয়ে পড়লেও অবশেষে এই আন্দোলনও ব্যর্থতার মুখ দেখেছিল।

‘গদর’ শব্দটি হল আরবি থেকে উদ্ভুত একটি পাঞ্জাবি ও উর্দু শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ হল ‘বিদ্রোহ’। ১৯০৩ থেকে ১৯১৩ সালের মধ্যে আনুমানিক প্রায় ১০,০০০ দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী উত্তর আমেরিকায় প্রবেশ করেছিল, যার মধ্যে অধিকাংশই ছিল পাঞ্জাবের গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ। প্রায় অর্ধেক পাঞ্জাবী ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীতে কাজ করতেন। এছাড়াও অনেক অভিবাসী উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমে মাঠে, কারখানায়, ক্যাম্পে কাজ করতে এসেছিল। কানাডার সরকার একাধিক আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এই অভিবাসনের প্রবাহ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়, যার কারণ দেশে দক্ষিণ এশীয়দের প্রবেশ সীমিত করা এবং যারা ইতিমধ্যে দেশে রয়েছে তাদের রাজনৈতিক অধিকারও সীমিত করে দেওয়া। এই সিদ্ধান্ত কানাডায় যেতে চাওয়া অনেক মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। আমেরিকায় এইসব ভারতীয়দের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ তো ঘটতই, এছাড়াও আমেরিকান ও ভারতীয় শ্রমিকদের স্বার্থের সংঘর্ষ ছিল আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়।

দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী ও ছাত্রদের মধ্যে বিশ্বজুড়েই জাতীয়তাবাদী মনোভাব গড়ে উঠছিল। বেশ কিছু ছাত্র বার্কলে বিশ্বিবদ্যালয়ে পড়তে এসেছিল এবং তাদের কেউ কেউ একজন ধনী পাঞ্জাবী কৃষকের দেওয়া বৃত্তি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। হরদয়াল এবং তারকনাথ দাসের মতো বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা ছাত্রদের সংগঠিত করার এবং তাদের নৈরাজ্যবাদী ও জাতীয়তাবাদী ধারণায় শিক্ষিত করার চেষ্টা করেছিলেন।

১৯১৩ সালের ১৫ জুলাই অ্যাস্টোরিয়াতে (ওরেগন) একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের হিন্দুস্তানি শ্রমিকদের একটি সমিতি গঠিত হয়েছিল। এই উপলক্ষ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, সমিতির উদ্দেশ্য হবে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানো এবং স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মূলনীতির ভিত্তিতে ভারতে স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখা। দলটির হেড কোয়ার্টার ছিল সানফ্রান্সিসকোর যুগান্তর আশ্রম। তাদের নিজস্ব প্রেস এবং একটি সাপ্তাহিক কাগজও ছিল যেটির নাম ‘দ্য গদর’। ১৯১৩ সালের নভেম্বর মাসে গদর সাপ্তাহিকটির প্রকাশনা শুরু হয় এবং দলটিও গদর দল নামে পরিচিত হয়। ভারতীয় অভিবাসীরাই এই দলের সদস্য ছিলেন তবে দলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন পাঞ্জাবীরা। সোহান সিং ভাকনা ছিলেন গদর দলের সভাপতি। লালা হরদয়াল ছিলেন এই দলের অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য এবং উর্দু গদর পত্রিকার সম্পাদক। অনেকে লালা হরদয়ালকে গদর দলের প্রতিষ্ঠাতা বলেন বটে তবে তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। দলের অনেক সদস্য যথা তারকনাথ দাস, মৌলভি বরকতুল্লাহ, হারনাম সিং টুন্ডিলাট, কর্তার সিং সারাভা, ভিজি পিংলে প্রমুখ বার্কলে বিশ্বিবদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ১ নভেম্বর সানফ্রান্সিসকোতে গদর পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। গদর সংবাদপত্রের ক্যাপশন ছিল ‘আংরেজি রাজ কা দুশমন’। সেই পত্রিকা সরাসরি ভারতে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জাগিয়ে তোলবার কথা ঘোষণা করেছিল। পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কর্তার সিং সারাভা গদরের প্রথম সংখ্যায় লিখেছিলেন বিদেশের মাটিতে শুরু হলেও গদর আন্দোলন ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধ।

উর্দু, পাঞ্জাবি, হিন্দি ইত্যাদি বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় প্রকাশিত এই পত্রিকাটি ভারতীয় অভিবাসী থাকা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই প্রচারিত হয়েছিল। মেক্সিকো, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর , থাইল্যান্ড , ফিলিপাইন, মালায়া, ইন্দো-চীন এবং পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো অন্যান্য দেশেও গদর পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিল।

গদর দলটি হংকং, ম্যানিলা, ব্যাংকক, সাংহাই এবং পানামায় নিজেদের শাখা তৈরি করেছিল। তারা একটি ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকার নকশা তৈরি করেছিল, যেটি ১৯১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার স্টকটনে উত্তোলন করা হয়েছিল। সেখানেই গদর বিপ্লবীরা দেশের স্বার্থে লড়াই করার ও নির্দ্বিধায় প্রাণ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজদের ব্যস্ত থাকার সময়টির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবার আহ্বান জানিয়েছিলেন গদর বিপ্লবীরা। জার্মানিতে ভারতীয় বার্লিন কমিটি গঠনকারী ভারতীয় বিপ্লবীরা গদরদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করবারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ১৯১৪ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত গদর বিপ্লবীরা জার্মানি এবং অটোমান তুরস্কের সমর্থনে গোপনে উপনিবেশ-বিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকে, যা হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র নামেও পরিচিত।

ব্রিটিশদের কড়া সতর্কতা সত্ত্বেও ১৯১৪ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে প্রায় ১০০০ জন বিপ্লবী পাঞ্জাবে প্রবেশ করেছিলেন এবং তাঁদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৩১২৫। বিশেষত রাসবিহারী বসু, বিষ্ণু গণেশ পিঙ্গালে এবং শচীন সান্যাল ১৯১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত বিদ্রোহ পুনর্গঠিত করবার জন্য পাঞ্জাবে আসেন। তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন, বোমা তৈরি করতে থাকেন এমনকি অস্ত্রাগার আক্রমণ পর্যন্ত করেন। তাঁদের পরিকল্পনা অনুসারে ১৯১৪ সালে এবং ১৯১৫ সালের শুরুর দিকে বেশ কয়েকটি ডাকাতির ঘটনাও ঘটে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বদ্ধ পরিকর গদর পার্টি সৈন্য ও স্থানীয় বিপ্লবীদের সাহায্যে ভারতে অস্ত্র ও লোক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কয়েক হাজার পুরুষ স্বেচ্ছায় ভারতে ফিরে আসেন। গদর দল পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-সহ সারা ভারতের বিভিন্ন রেজিমেন্টকে বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করেছিল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে থাকা ভারতীয় সৈন্যদেরও বিদ্রোহে প্ররোচিত করতে সফল হয়েছিলেন তাঁরা।

তবে রাসবিহারী বসুদের চূড়ান্ত বিদ্রোহের পরিকল্পনা সফলতা পায়নি। তাঁদের সর্বভারতীয় বিদ্রোহের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় কারণ, কিরপাল সিং সমস্ত গোপন পরিকল্পনা সরকারের নিকট পৌঁছে দিয়েছিল। অনেক জায়গায় সরকার গোপন অভিযান চালিয়ে বোমা উদ্ধার করেছিল। অনেক গোপন কাগজপত্রও সরকারের হাতে ধরা পড়ে। পাঞ্জাবের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অধিকাংশই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা এবং তারই সমতুল্য আরও কয়েকটি মামলায় বিপ্লবীদের বিচার করা হয়েছিল। বিচারের জন্য পাঠানো ২৯১ জনের মধ্যে ৪২ জনের ফাঁসি হয়েছিল এবং ১১৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও ৯৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং ৪২ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছিল।

প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ রাজকে উৎখাত করবার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও গান্ধীবাদী অহিংসার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকা সশস্ত্র গদর আন্দোলন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক বিপ্লবীকে প্রভাবিত করেছিল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading