সববাংলায়

মুন্ডা বিদ্রোহ

ব্রিটিশের নানাবিধ শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষ একেক সময় গর্জে উঠেছে। কখনও ব্রিটিশ প্রবর্তিত স্বৈরাচারী স্বার্থকেন্দ্রিক আইনব্যবস্থার ফলে দেশীয় জমিদার, মহাজন, ব্যবসায়ীরা যখন প্রান্তিক আদিবাসী কৃষক সম্প্রদায়কে অন্যায়ভাবে শোষণ করেছে তখন সেইসব তথাকথিত নিরক্ষর জনজাতি রুখে দাঁড়িয়েছে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে। উনিশ শতকের একেবারে শেষলগ্নে রাঁচি, ছোটনাগপুর অঞ্চলের একেবারে প্রান্তিক মুন্ডা জনজাতির মানুষের জোটবদ্ধ হয়ে তেমনই রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাসই মুন্ডা বিদ্রোহ (Munda Rebellion) নামে পরিচিত। ইতিহাসখ্যাত মুন্ডানেতা বিরসা মুন্ডার নাম এই বিদ্রোহের সূত্র ধরেই আজ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়ে আছে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যখন বিরসার নেতৃত্বে উগরে দিলেন মুন্ডারিরা তখন আগুন লাগল, রক্ত ঝরল। বিরসা হয়ে উঠলেন মুন্ডারিদের ‘ধরতি আবা’ বা ভগবান। তাদের বিদ্রোহকে মুন্ডারি ভাষায় বলা হয় উলগুলান (Ulgulan)। পরবর্তীকালে মহাশ্বেতা দেবীর ‘অরণ্যের অধিকার’ উপন্যাসে বিস্তারিতভাবে এই মুন্ডা বিদ্রোহের ছবি ফুটে উঠেছিল।

১৮৯৯-১৯০০ সালের মধ্যে মূল বিদ্রোহটি সংঘটিত হলেও আরও প্রায় চার-পাঁচ বছর আগে থেকে মুন্ডা বিদ্রোহের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। রাঁচির দক্ষিণাঞ্চলই ছিল মূলত এই বিদ্রোহের ঘটনাস্থল।

ব্রিটিশ প্রবর্তিত নতুন ভূমি ব্যবস্থা প্রচলিত হওয়ার আগে মুন্ডাদের কৃষিব্যবস্থায় প্রচিলত ছিল ‘খুৎকাঠি প্রথা’ অর্থাৎ মুন্ডারিরা তাঁদের পূর্বপুরুষদের জমির যৌথ মালিকানা ভোগ করতেন। এই ব্যবস্থায় সকলের কাছেই যেহেতু জমির মালিকানা ছিল, কেউ কাউকে খাজনা দিতেন না। তাঁরা নিজেদের মধ্যে থেকেই একজন গ্রাম প্রধান নিয়োগ করতেন। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে পুরাতন এই ভূমি ব্যবস্থায় ভাঙন ধরে। ব্রিটিশ সরকার প্রবর্তিত নতুন ভূমি ব্যবস্থার ফলে ‘খুৎকাঠি’ প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং জমির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার যুগ এসে পড়ে। এই সময় এমন ব্যবস্থারই ফায়দা তুলতে ছোটনাগপুর অঞ্চলের বাইরে থেকে ঠিকাদার, মহাজন এবং জমিদারদের আগমন ঘটে এবং মুন্ডাদের বহু জায়গাজমি তাদের হাতে চলে যায়। মালিকানা হস্তান্তরিত হয়ে যাওয়ার ফলে মুন্ডাদের ঘাড়ে এসে পড়ে খাজনার ভার। দুবেলা দুমুঠে ঠিকভাবে খেতে না পাওয়া মুন্ডারিদের পক্ষে চড়া খাজনা দেওয়া অধিকাংশ সময়তেই প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠত। খাজনা দিতে অক্ষম হলে বেশিরভাগ সময়েই মুন্ডাদের তাঁদের নিজস্ব জমি থেকে উৎখাত করে দেওয়া হত। এছাড়াও উচ্চ সুদে মহাজনরা টাকা ধার দিয়ে মুন্ডাদের ঋণের জালে ফাঁসাত এবং আইনি জ্ঞানের অভাব থাকা মুন্ডাদের সম্পত্তি দখল করে নিত তারা। বহিরাগত মহাজন ও ব্যবসায়ীদের মুন্ডারা ‘দিকু’ বলে ডাকত। মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাসে রয়েছে এই দিকুদের সম্পর্কে মুন্ডাদের মনোভাব কতখানি তিক্ত ছিল।

নগদ খাজনা ছাড়াও মুন্ডাদের ওপর এই দিকুরা, জমিদার, মহাজনরা নানারকম করের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। এছাড়াও বিনা পারিশ্রমিকে মুন্ডাদের কাজ করতে বাধ্য করা হত। এমনকি বেশ কিছু অসাধু ঠিকাদারদের খুব বাড়বাড়ন্ত দেখা যায় ওইসব অঞ্চলে। তারা চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক নিয়োগের কাজ করত এবং ভুল বুঝিয়ে মুন্ডাদের পাঠিয়ে দিত আসামের চা বাগানে কুলির কাজ করতে। সেখানে তাদের জীবন যে কতখানি দুর্বিষহ হয়ে উঠত তার বর্ণনা লোকসঙ্গীতে, বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

ছোটনাগপুর অঞ্চলে বহিরাগত ওইসব দিকুরা সেখানে মদের দোকান খুলে মুন্ডাদের নেশায় প্রলুব্ধ করত এবং নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে অনেক সময় ছল করে তাদের জমি-জায়গা কেড়ে নেওয়া হত।

এইসব অঞ্চলে তখন খ্রিস্টান মিশনারিদের বেশ প্রভাব ছিল। অনেকক্ষেত্রেই মুন্ডাদের জোর করে ধর্মান্তরিত করবার ঘটনা ঘটেছে। ফলত, খ্রিস্টান ও অ-খ্রিস্টান মুন্ডাদের মধ্যে একটা সামাজিক বিভাজন তৈরি হলেও খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যক্রম কিন্তু ওইসব অঞ্চলে শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়েছিল। শিক্ষার আলো পেয়ে মুন্ডারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছিল। মহাশ্বেতা দেবীর প্রামাণ্য উপন্যাস ‘অরণ্যের অধিকার’-এ এই শিক্ষালয়েরও প্রসঙ্গ আছে। বীরসা মুন্ডা নিজেও এই শিক্ষার স্পর্শ পেয়েছিলেন।

জমিদার, মহাজনদের এমন অত্যাচার দিনের পর দিন সহ্য করে ১৮৮৬ সালে মুন্ডারা ঐক্যবদ্ধভাবে মহারানি ভিক্টোরিয়ার কাছে একটি প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছিলেন। প্রথমে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি মুন্ডাদের আস্থা থাকলেও পরের দিকে তা চলে যায় এবং মুন্ডাদের উক্ত প্রতিবাদপত্রের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া তো দূরের কথা সরকার কর্ণপাত পর্যন্ত করেননি। মুন্ডাদের মধ্যে একটা অসন্তোষ তো জমছিলই, তার উপর সরকারের এই ঔদাসীন্য তাঁদের ক্রমে হিংস্র করে তোলে।

ভারতবর্ষের ইতিহাসে এরও পূর্বে সাঁওতাল বিদ্রোহের মতো প্রান্তিক জনজাতির বিদ্রোহ ঘটে গেছে এবং তাও ছিল জমির লড়াই, নিজেদের হকের লড়াই। মুন্ডারাও বীরসার নেতৃত্বে একত্রিত হতে শুরু করে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে, দিকুদের পতন ঘটিয়ে মুন্ডারাজ প্রতিষ্ঠা করবার জন্য। ক্রমশ মুন্ডাদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে রাঁচি, কারা, বাসিয়া, তোরপা, তামার, চক্রধরপুর প্রভৃতি এলাকাগুলিতে। প্রাথমিকভাবে গয়া মুন্ডা বিদ্রোহীদের সেনাপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন। প্রায় ৬০০০ মুন্ডাকে নিয়ে গড়ে ওঠে তাঁদের বাহিনী। খুঁটি জেলা ছিল বিদ্রোহের প্রধান কেন্দ্র। মনে রাখতে বীরসা মুন্ডারও জন্ম হয়েছিল এই জেলায়।

১৮৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্ডারা বিদ্রোহের দিন ধার্য করেছিল। তারা রাঁচি ও সিংভুম জেলার থানা, গির্জা, সরকারি অফিস এবং ইংরেজ কর্মচারীদের ওপর মুন্ডারা আক্রমণ চালাতে থাকে। বীরসা মুন্ডার মুখে শোনা যায় ‘আবুয়া রাজ এতে জানা, মহারানি রাজ টুঁডু জানা’ অর্থাৎ ‘মহারানির রাজ্যের অবসান হোক এবং আমাদের রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হোক’। মুন্ডাদের কাছে বীরসা হয়ে ওঠেন ‘ধরতি আবা’। সকল মুন্ডাকে তিনি খাজনা না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৮৯৫ সালে বীরসার উত্থানের সময় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৮৯৮ সালের ২৮ জানুয়ারি মুক্তি পান বীরসা। তারপর কিছুদিন গোপনে ছিলেন তিনি এবং ১৮৯৯ সালে মুন্ডাদের নিয়ে বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুরহুতে অ্যাংলিকান মিশন এবং সারওয়াদায় রোমান ক্যাথলিক মিশন বীরসাইতদের (বীরসার অনুগামী যাঁরা) প্রধান লক্ষ্য ছিল। তাঁরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, খ্রিস্টান মুন্ডারা নয়, বরং তাঁদের প্রকৃত শত্রু হল ব্রিটিশরা। তিনি ঠিকাদার, জায়গিরদার, হাকিমদের হত্যা করবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। রাঁচি ও সিংভূমে তাঁরা গির্জা পুড়িয়ে দেন। ১৯০০ সালে একডিহে দুই পুলিশ কনস্টেবলকে হত্যা করে। ৭ জানুয়ারি তাঁরা খুঁটি থানায় হামলা চালায়, একজন কনস্টেবলকে হত্যা করে এবং স্থানীয় দোকানদারদের বাড়িঘর ভাঙচুর করে।

স্থানীয় কমিশনার, এ. ফোবস এবং ডেপুটি কমিশনার এইচসি স্ট্রেটফিল্ড ক্রমবর্ধমান মুন্ডা বিদ্রোহ দমন করার জন্য ১৫০জন লোক নিয়ে খুঁটিতে ছুটে আসেন। ফোবস এবং স্ট্রেটফিল্ডের নেতৃত্বাধীন সৈন্যরা দুম্বারি হিলে মুন্ডাদের গেরিলা আক্রমণ করে পরাজিত করে। তীর-ধনুক-বর্শা নিয়ে ব্রিটিশের বন্দুকের সম্মুখে বেশিক্ষণ যুদ্ধ করতে পারেননি তাঁরা। বীরসা সেখান থেকে সিংভূম হিলে পলায়ন করেছিল। ১৯০০ সালের ৯ জানুয়ারি ডুমারির শৈল রাকাব পাহাড়ে বীরসাইতদের উপরে পুলিশ গুলি বর্ষণ করেছিল যদিও সেখানে কতজনের মৃত্যু হয়েছিল তা অজানা রয়ে গেছে। সরকার বীরসাকে ধরবার জন্য তাঁর উপরে ৫০০ টাকা পুরষ্কার ধার্য করেছিল। অবশেষে ১৯০০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি চক্রধরপুরের জামকোপাই জঙ্গল থেকে বীরসাকে গ্রেফতার করা হয়। রাঁচির ডেপুটি কমিশনারের চিঠি অনুযায়ী ৪৬০ জন আদিবাসীকে ১৫টি বিভিন্ন ফৌজদারী মামলায় আসামি করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৬৩ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজনকে মৃত্যুদন্ড, ৩৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২৩ জনকে চোদ্দ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। বিচার চলাকালীন ১৯০০ সালের ৯ জুন কারাগারেই বীরসার মৃত্যু হয়েছিল।

বীরসার মৃত্যুর পর মুন্ডা বিদ্রোহ ম্লান হয়ে গেলেও তা ব্রিটিশ শাসনকে কিছুদিনের জন্য বেশ নাকাল করে ছেড়েছিল। এমনকি ঔপনিবেশিক সরকার ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন প্রবর্তন করেছিল, যার মাধ্যমে উপজাতিদের জমি কোনও বহিরাগত, অ-উপজাতিদের কাছে হস্তান্তর হওয়া নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও ‘খুৎকাঠি’ পুনরায় প্রবর্তিত হয় ও জোরপূর্বক শ্রম এই অঞ্চলে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। মুন্ডা বিদ্রোহের ফলে এই যে পাওনাটুকু, তার গুরুত্বকে অস্বীকার করা চলে না।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading