সববাংলায়

লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা

বিভাগঃ ,

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সশস্ত্র সংগ্রাম কিংবা গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের আন্দোলন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী দলের কার্যকলাপে আস্থা হারিয়েছিল কিছু তরুণ-যুব সম্প্রদায়। আবেদন-নিবেদনের বদলে সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে বাংলা সহ পুরো ভারতে একের পর এক তৈরি হয়েছিল গুপ্ত বিপ্লবী সমিতি। প্রথম পর্যায়ে বোমা তৈরি এবং পরপর কতগুলি বোমা নিক্ষেপের ঘটনার সাক্ষী থেকেছে ভারতবাসী। উঠে এসেছে একাধিক বিপ্লবীর নাম, চলেছে একাধিক ষড়যন্ত্র মামলা। আলিপুর বোমা মামলা, মুজফ্‌ফপুর বোমা মামলা, দক্ষিণেশ্বর বোমা মামলার পাশাপাশি বাংলার বাইরে যে সমস্ত বিপ্লবী কার্যকলাপ গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলার কথাও আমরা জেনেছি। অধিকাংশ মামলার পিছনে বোমা মেরে হত্যার ষড়যন্ত্র স্পষ্ট প্রমাণিত। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এসে ভারতে সমাজতান্ত্রিক গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন প্রথম কাউকে হত্যা না করে জানিয়ে দিতে চেয়েছিল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বার্তা, কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। ডেপুটি কমিশনার জে. পি. স্যাণ্ডার্সেকে হত্যার ইস্যুতে শুরু হয় আরেকটি নতুন মামলা – লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা (Lahore Conspiracy Case) । এই মামলাই ভারতীয় ইতিহাসে তিন বীর বিপ্লবীকে অমরত্ব দান করেছে।

লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা » সববাংলায়
তথ্যচিত্রটি দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন

১৯২৯ সালের ১১ জুলাই থেকে ১৯৩০ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের ইতিহাসে স্মরণীয় এই লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা চলেছিল। এই মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন – শুকদেব, কিশোরী লাল রত্তন, প্রেম দত্ত, দেশ রাজ, জয়দেব, শীউ ভার্মা, জ্ঞা প্রসাদ, মহাবীর সিং, ভগত সিং, অজয় কুমার ঘোষ, যতীন সান্যাল, বিজয় কুমার সিনহা, শিবরাম রাজগুরু, কুন্দনলাল, কনওয়াল নাথ ত্রিবেদী, ভগবান দাস, চন্দ্রশেখর আজাদ, কৈলাশ পাত্তি, ভগবতী চরণ, যশপাল এবং সদগুরদয়াল, আজ্ঞা রাম, সুরেন্দ্রনাথ পাণ্ডে, বটুকেশ্বর দত্ত। এঁদের মধ্যে ভগবান দাসকে বিচারের জন্য আদালতে পাঠানো হয়নি। চন্দ্রশেখর আজাদ, কৈলাশ পাত্তি, ভগবতী চরণ, যশপাল এবং সদগুরদয়াল পরে পালিয়ে যাওয়ার কারণে তাঁদের বিচার হয়নি। আজ্ঞা রাম এবং সুরেন্দ্রনাথ পাণ্ডেকে ভারতীয় ক্রিমিনাল কোডের ২৫৩ ধারা অনুযায়ী ছেড়ে দেওয়া হয়। সবশেষে বটুকেশ্বর দত্তকেও ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে বাকি পনেরো জন বিপ্লবীকে নিয়েই ব্রিটিশ সরকার শুরু করেছিল লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৭ ধারা এবং বিস্ফোরক আইন অনুসারে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চলা মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হয় ১৯৩০ সালের ৭ অক্টোবর। মামলার বিচারের ভার ন্যস্ত হয়েছিল স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট রায়সাহেব পণ্ডিত কিষাণচন্দের উপর।

১৯২১ সালে গান্ধীজি যখন চৌরিচৌরার ঘটনার পরে অভাবিতভাবে পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়া অহিংস অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন, তখন জাতীয় কংগ্রেসের সশস্ত্র চরমপন্থীরা ক্ষুব্ধ হন। এই পর্বেই জাতীয়তাবাদীদের একাংশ বিপ্লবী কার্যকলাপকে আরো বাড়িয়ে তুলতে দিকে দিকে গুপ্ত সমিতি গড়ে তুলছিলেন। ১৯২৪ সালে এই উদ্দেশ্যেই রামপ্রসাদ বিসমিল, শচীন্দ্রনাথ সান্যাল প্রমুখরা মিলে গড়ে তুলেছিলেন হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন। এই সংগঠনে পরে যোগ দেন ভগত সিং। ইতিমধ্যে ভারতের রাজনৈতিক পটভূমিতে সাইমন কমিশন এসে গেছে। দেশের নতুন আইন-বিধি প্রণয়ন এবং স্বরাজ ঘোষণার নাম করে অপমানজনক বিধি-নিয়ম আরোপের চেষ্টা করে এই কমিশন। ফলে সমগ্র দেশ জুড়ে সাইমন কমিশনের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। সকলের মুখে একটাই স্লোগান সরব হয়ে উঠেছিল – ‘সাইমন গো ব্যাক’। ১৯২৮ সালের ৩০ অক্টোবর তারিখে লাহোরের রাজপথে সাইমন কমিশন বিরোধী একটি অহিংস স্বদেশী মিছিল পরিচালনা করছিলেন লালা লাজপত রায়। লাহোরের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার জেমস. এ. স্কট ও ডেপুটি কমিশনার জে. পি. স্যাণ্ডার্সের নেতৃত্বে এক পুলিশ বাহিনী বিক্ষুব্ধ জনতার উপর লাঠিচার্জ করা শুরু করে। লাঠির আঘাতে গুরুতরভাবে আহত হন পাঞ্জাবকেশরী লালা লাজপত রায়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও ১৯২৮ সালের ১৭ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। ব্রিটিশ পুলিশের আঘাতে লালা লাজপত রায়ের মৃত্যু সমগ্র ভারত জুড়ে প্রবল উন্মাদনা তৈরি করে। এদিকে ব্রিটিশ পুলিশের নির্মম প্রহারের কারণে যে তাঁর মৃত্যু হয়েছে সেই সংবাদ সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে ব্রিটিশ পুলিশ এবং তাঁর পোস্টমর্টেম রিপোর্টে লেখা হয় হৃদরোগে মৃত্যু। ভারতীয় বিপ্লবীরা লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ঠিক এক মাসের মধ্যেই ১৯২৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর তারিখে দয়ানন্দ বৈদিক মহাবিদ্যালয়ের সামনে গুলি করে লাহোরের পুলিশ কমিশনার জে. পি. স্যাণ্ডার্সকে হত্যা করে। স্যাণ্ডার্সের হেড কনস্টেবল চন্দন সিং স্যাণ্ডার্সকে বাঁচাবার জন্য এগিয়ে এলে ভগত সিং তাঁকেও গুলি করে মেরে ফেলেন। এই হত্যা যে শুধুমাত্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বৃহত্তর লক্ষ্যে সাধিত তা বোঝাতে লাহোরের রাস্তায় রাস্তায় পোস্টারে লেখা হয় যে, স্যাণ্ডার্সের মৃত্যু আসলে লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধমাত্র। বিপ্লবীরা বাধ্য হয়ে বিপ্লবের জন্য রক্তের বিনিময়ে রক্ত ঝরিয়েছেন। এই ঘটনার পরে লাহোর থেকে গা ঢাকা দেন সকল বিপ্লবী। বাংলার বিপ্লবী যতীন দাস ভগত সিং-এর অনুরোধে আগ্রায় বোমা তৈরি ও নিক্ষেপ শেখাতে আসেন। ভগত সিং, বটুকেশ্বর দত্ত এবং বিজয় কুমার সিং নির্জন জায়গায় একটা বাড়ি ভাড়া করেছিলেন এবং ঝাঁসির জঙ্গলে এই বোমা নিক্ষেপের পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রশিক্ষণ নিয়ে শুকদেব লাহোর চলে যান এবং শীউ ভার্মা যান সাহারানপুরে। এই স্যাণ্ডার্স হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লির বিধানসভায় বিঠলভাই প্যাটেলের অধ্যক্ষতায় সভা বসে ১৯২৯ সালের ৬ জুন তারিখে। সেই সভার আলোচ্য বিষয় ছিল পাবলিক সেফটি বিল, ট্রেড ডিস্পুট বিল, সাইমন কমিশন এবং লালা লাজপত রায়ের শোচনীয় মৃত্যু। ঠিক এই বিধানসভাতেই আলোচনা চলাকালীন বিপ্লবী ভগত সিং এবং বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত উন্মুক্ত স্থানে কোনো মানুষকে হত্যা না করে সজোরে একটি বোমা নিক্ষেপ করেন। বোমার শব্দে চারদিকে ছুটোছুটি পড়ে যায়, আতঙ্কের আর্তনাদ শোনা যায় আর এই সব কোলাহলের মাঝে পিস্তল ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ভগত সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত চিৎকার করে ওঠেন – ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। ইংরেজ সরকার সচকিত হয়ে ওঠে। বোমা নিক্ষেপের ঘটনা এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের তদন্ত করতে সরকারি পরিকল্পনায় চালু হয় ‘ লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা ’। ১৯২৯ সালের ১৪ জুন সকালে কলকাতায় টাউনসেণ্ড রোড ও হাজরা রোডের মোড়ে দোতলার একটি ঘর থেকে বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ দাসকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে লাহোরে পাঠায়। স্যাণ্ডার্স হত্যা এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ১০ জুলাই তারিখে ভগত সিং, শুকদেব, যতীন দাস সহ মোট পঁচিশ জনকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে শুরু হয় লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা ।

১৯২৯ সালের ১৪ জুন ভগত সিংকে মিয়ানওয়ালি জেলে এবং বটুকেশ্বর দত্তকে পাঠানো হয় লাহোর জেলে। ১৫ জুন থেকেই রাজনৈতিক বন্দীর মর্যাদা আদায়ের দাবিতে অনশন শুরু করে দেন ভগত সিং। বটুকেশ্বর দত্ত এবং শুকদেবও একইভাবে অনশন শুরু করে দেন। ১৯২৯ সালের ১০ জুলাই মামলা শুরু হলে স্ট্রেচারে করে অসুস্থ ভগত সিংকে আদালতে হাজির করা হয়। অবশেষে ৪ অক্টোবর ১১২ দিনের অনশন ভঙ্গ করেন তিনি। ১৯৩০ সালের ৭ অক্টোবর তারিখে বিপ্লবী ভগত সিং, রাজগুরু এবং বিপ্লবী শুকদেবের ফাঁসির আদেশ ঘোষিত হয়। মামলা চলাকালীন রাজসাক্ষী হয়েছিলেন ফণী ঘোষ, ললিত মুখার্জী সহ আরো অনেকে। ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৮১ ধারায় ফাঁসি হয় এই তিন বিপ্লবীর।

১৯৩১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গান্ধীজি তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড আরউইনের সঙ্গে দেখা করে ভগত সিংয়ের ফাঁসির বিষয়টি উত্থাপন করে ফাঁসির দণ্ডাদেশ মকুবের আবেদন জানান। ভগত সিংয়ের ফাঁসি রদ করা নিয়ে গান্ধীজি বহু প্রচেষ্টা করেছেন কিন্তু আরউইন কোনোভাবেই এই আবেদনে সাড়া দেননি। তবে এই বয়ানেরও বিরুদ্ধতা রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিক গান্ধীর লেখা থেকে প্রমাণ করেছেন যে করাচিতে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনকে অক্ষুণ্ন রাখতে তিন বিপ্লবীর ফাঁসি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। এই ঘটনা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। জানা যায়, ফাঁসির দিন ইয়ং ইণ্ডিয়া পত্রিকায় গান্ধীজি ভগৎ সিংকে ‘জাতীয় বীর’ হিসেব আখ্যা দেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading