ইতিহাস

শুকদেব থাপার

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে বিপ্লবীরা চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন,তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শুকদেব থাপার (Sukhdev Thapar)। শহীদ ভগত সিংশিবরাম রাজগুরুর সাথে একত্রেই উচ্চারিত হয় শুকদেব থাপারের নাম।

১৯০৭ সালের ১৫ মে, ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় শুকদেব থাপারের জন্ম হয়।তাঁর বাবার নাম রামলাল থাপার এবং মায়ের নাম রাল্লি দেবী থাপার। শুকদেবের শৈশাবস্থাতেই তাঁর বাবার মৃত্যুর হলে শুকদেব মানুষ হন কাকা লালা অচিন্ত্যরামের কাছে। অচিন্ত্যরাম ছিলেন আর্য সমাজের সদস্য এবং সক্রিয় কংগ্রেস কর্মী।

স্কুলজীবন থেকেই শুকদেব ছিলেন বিপ্লবী মনোভাবাপন্ন। কম বয়সী হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশদের প্রতি তাঁর অনমনীয় দৃষ্টিভঙ্গীর জন্য স্কুলে পড়াকালীন ব্রিটিশ সাহেবদের কোনদিন কোন অভিবাদন জানাতেন না তিনি। শুকদেব পড়াশোনা করেন ন্যাশনাল ল’ কলেজ, লাহোর থেকে। শোনা যায়, ন্যাশনাল কলেজে পড়াকালীন তিনি কলেজের তরুণ ছাত্রদের সাথে ভারতের ইতিহাস এবং পৃথিবীর বাকি সমস্ত দেশের বৈপ্লবিক সাহিত্য নিয়ে চর্চা করতেন এবং এর সাথে সাথেই সহপাঠীদের উদ্বুদ্ধ করতেন স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্য।

১৯২৬ সালে ভগত সিংয়ের পরিচালনায় গঠিত নওজওয়ান ভারত সেবা দলে শুকদেব যোগদান করেন। এখান থেকেই তাঁরা হয়ে ওঠেন একে ওপরের ছায়াসঙ্গী। তাঁদের দলে অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নাম ছিল রাম চন্দ্র, যশপাল,ভগবতী চরন ভোহরা প্রভৃতি। এই দল মূলত উত্তর ভারতের বিভিন্ন অংশে যুবকদের ব্রিটিশ সরকারের নির্মমতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উৎসাহিত করত। তাছাড়াও সাম্প্রদায়িকতা এবং অস্পৃশ্যতার কুফল নিয়ে মানুষকে সচেতন করার কাজে এই দল অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে। প্রাথমিকভাবে শুকদেব এবং তাঁর দল নৈরাজ্যবাদের জনক পিয়ের যোশেফ প্রৌউডন(Pierre-Joseph Proudhon ) এবং রাশিয়ান নৈরাজ্যবাদী নেতা মিখাইল বাকুনিন (Mikhail Bakunin) দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে ভারতীয় সাম্যবাদী নেতা ছাবিল দাস এবং সোহন সিংয়ের সংস্পর্শে এসে তাঁরা বামপন্থা অবলম্বন করে। ১৯২৮ সালের ৮ আগষ্ট প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাব্লিকান আর্মি, এইচ আর এস এ (HRSA)। এই সংগঠন মূলত তৈরী করে পাঞ্জাব,হরিয়ানা,রাজস্থান এবং বিহারের ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের সংগঠন ছিল। শুকদেব ছিলেন এই দলের পাঞ্জাব শাখার প্রধান কর্মকর্তা।

১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনে ভারত যখন উত্তাল, বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা লালা লাজপত রাই ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার জেমস এ স্কটের লাঠিচার্জের আঘাতে গুরুতর আহত অবস্থায় মৃত্যু হয়। যদিও লালা লাজপত রাই হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাব্লিকান আর্মি-এর চরমপন্থী কার্যকলাপ একেবারেই সমর্থন করতেন না, এমনকি তাঁর বাড়িতেও শুকদেবসহ বাকিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তাও পাঞ্জাব শাখার প্রধান হিসেবেই শুকদেব লালা লাজপত রাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ভগত সিংকে সাথে নিয়ে অফিসার স্কটকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ১৯২৮ সালের ১৭ই ডিসেম্বর শুকদেব , ভগত সিং এবং রাজগুরু ভুলবশত সহকারী পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্ট জন পি সন্ডার্সকে হত্যা করেন। তারপরেও তাঁরা ঘোষণা করেন যে লালার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এইচ আর এস এ সক্ষম। এই ঘটনার পর তাঁরা রেলপথে লক্ষ্নৌ পালিয়ে যান। রাজগুরু লক্ষ্নৌ থেকে বেনারস চলে যান। এই ঘটনার কিছুদিন পর তাঁরা আবার পাঞ্জাব ফিরে আসেন। ১৯২৯ সালে ৮ই এপ্রিল পাবলিক সেফটি বিল এবং ট্রেড ডিস্পুট বিলের প্রতিবাদে শুকদেব,ভগত সিং এবং রাজগুরু ন্যাশনাল লেজিস্লেটিভ অ্যাসেম্বলিতে পরপর দুটি বোমা নিক্ষেপ করেন। যদিও তার ফলে কেউ হতাহত হননি।

এই ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই মে মাসে শুকদেব ,ভগত সিং এবং রাজগুরু তিনজনেই গ্রেপ্তার হন। রাজগুরু যখন বোমা কারখানায় কাজ করছিলেন, তখনই তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ইতিহাসের পাতায় শুকদেব তাঁর সহকর্মী ভগত সিং এর মতো আলোচিত চরিত্র নন। তার কারণ হিসেবে বলা যায়, সন্ডার্স হত্যাকান্ডের ঘটনাস্থলে ভগত সিং এবং রাজগুরুর অকুতোভয় কার্যকলাপ বেশী জনপ্রিয়তা লাভ করে। অথচ এই ঘটনার সম্পূর্ণ পরিকল্পনা করেছিলেন শুকদেব-ই। শুকদেব তাঁর গ্রেপ্তারির পর খুশী হয়ে বলেছিলেন এই গ্রেপ্তারি দেশে ঝড় তুলবে, মানুষ জানতে পারবে তাঁরা কিভাবে স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে লড়াই করেছেন। ভগত সিং এইচ আর এস এ এর পাঞ্জাব শাখার রাজনৈতিক প্রধান ছিলেন। শুকদেব ছিলেন পার্টির ভিত্তি। শুধু রাজনৈতিকভাবে না, দলের প্রত্যেক সদস্যের খুঁটিনাটি খেয়াল রাখতেন শুকদেব। লাহোর কান্ডে কিন্তু মূল অভিযুক্ত ছিলেন শুকদেব। পুলিশকর্তা হ্যামিল্টন হার্ডিং আদালতে যে রিপোর্ট পেশ করেন, তাতে শুকদেব ছিলেন প্রথম অভিযুক্ত। তাঁকে চিহ্নিত করা হয়েছিল, স্বামী ওরফে গ্রামবাসী হিসেবে, বাবা রাম লাল, জাতি থাপার ক্ষত্রিয়।

২৫ জন অভিযুক্তের তালিকায় ভগত সিং ছিলেন ১২তম নাম। রাজগুরু ছিলেন ২০তম অভিযুক্ত। এই রিপোর্ট থেকেই কার্যত পরিস্কার হয়, লাহোর কান্ডে শুকদেব প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও এইচ আর এস এ তে তাঁর কি ভূমিকা ছিল। তিনিই দলটির পরিচালনা করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত তাঁর নির্দেশেই পালন করা হত। লাহোর কান্ডের আগের এইচ আর এস এ -এর কমিটি মিটিং-এ শুকদেবের অনুপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ভগত সিংয়ের উপর যেহেতু লাহোর পুলিশের নজর আছে, কোনমতেই তাঁকে অ্যাসেম্বলিতে বোমাসমেত পাঠানো উচিৎ হবেনা। ভগতকে পাঠানো মানেই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। কিন্তু পরে শুকদেব ফিরে এসে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তিনি জানতেন এই কাজের জন্য তাঁর শ্রেষ্ঠ কমরেড ভগতকেই প্রয়োজন। তিনি ভগতকে একপ্রকার ভীতু, কাপুরুষ বলে অপমান করে তাঁকে বাধ্য করেন অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপের জন্য। কমিটিও নিজের সিদ্ধান্ত বদল করতে বাধ্য হয়। প্রিয় বন্ধুর আসন্ন পরিণতির কথা বুঝে শুকদেব প্রচন্ড আত্মদংশনে ভুগলেও তাঁর কাছে দেশের স্বার্থের উর্ধ্বে কোনকিছুই ছিল না।

এইচ আর এস এ-এর কার্যকলাপ মহাত্মা গান্ধী কোনদিন সমর্থন করেননি। তিনি সশস্ত্র, অতিবাম রাজনীতিকে অবিবেচক সন্ত্রাস হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। গান্ধী-আরউইন চুক্তির পর যখন গোটা দেশে মহাত্মা শান্তির জন্য আহবান করেছিলেন, সশস্ত্র আন্দোলন বন্ধ করার জন্য আবেদন করেছিলেন, শুকদেব নিজের দলীয় সাথীদের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছিলেন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। বলেছিলেন যুদ্ধবিরতি আসলে একটা অস্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়া যাতে পরবর্তী লড়াইয়ের জন্য আমরা নতুন উদ্যমে ঝাঁপাতে পারি। তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধুমাত্র সশস্ত্র বিপ্লব একমাত্র পন্থা নয়, স্বাধীনতার এই কাজে সবার আগে প্রয়োজন দেশবাসীর আস্থা অর্জন। তবেই একটা বৈপ্লবিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে দেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। জেলে থাকাকালীন সময়েও শুকদেব সব সময় নিজের সংগঠনের প্রাসঙ্গিকতার জন্য চিন্তা করেছেন। লাহোর কান্ডের জেরে, শুকদেব, ভগত সিং এবং রাজগুরুর মৃত্যুদণ্ড ধার্য করা হয়। ১৯২৯ এ বিপ্লবী বন্দীদের সাথে দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে শুকদেব ও বাকীরা দীর্ঘস্থায়ী অনশনে সামিল হন। এর জেরে গোটা দেশ শুকদেবদের মুক্তির দাবীতে উত্তাল হয়ে ওঠে। সেই সময় গান্ধীজিকে লেখা চিঠিতে শুকদেব জানিয়েছিলেন, তাঁদের মৃত্যুদণ্ড বলবত না হলে কোন প্রভাব পড়বে না, বরং মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে তা দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে ইতিবাচক হবে। জেল থেকে নিজের দলের কমরেডদের উদ্দেশ্যে তিনি দুটো চিঠি লেখেন। যার সারমর্ম ছিল এইরূপ, “… দেশের উচ্চস্থানীয় নেতারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। দেশের এই পরিস্থিতিতে একটি গণবিপ্লবী সংগঠন অবিলম্বে প্রয়োজন। যাদের কাজ হবে যে কোন মূল্যে ,বেআইনি ভাবে হলেও নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করা। সবার আগে দলীয় কর্মীদের বিপ্লবের সঠিক অর্থ বুঝতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন বৈপ্লবিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া। কারণ কর্মীদের আদর্শের উপরই একটি বিপ্লবের সার্থকতা নির্ভর করে।“

১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ, সন্ধ্যে ৭টা ৩৩ মিনিটে শুকদেব, ভগত সিং এবং রাজগুরুর ফাঁসি হয়। লাহোর থেকে ৫০মাইল দূরে, শতদ্রুর তীরে হুসেনওয়ালায় অত্যন্ত সন্তর্পনে তাঁদের দাহকার্র্য সম্পন্ন হয়। তাঁদের স্মৃতিতে ২৩ মার্চ দেশজুড়ে পালিত হয় জাতীয় শহীদ দিবস। শহীদ শুকদেবের স্মৃতিতে ১৯৮৭ সালে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত হয় শহীদ শুকদেব কলেজ অফ বিজনেস স্টাডিস।  

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

রচনাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?



এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন