ইতিহাস

শিবরাম রাজগুরু

শিবরাম হরি রাজগুরু (Shivaram Hari Rajguru) ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চরমপন্থী বিপ্লবী হিসেবে বিশিষ্ট একটি নাম। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবের ডাক দিয়ে একজন ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারের হত্যায় যুক্ত থাকার অভিযোগে তাঁকে ভগৎ সিং ও শুকদেব থাপারের সঙ্গে একই ফাঁসির মঞ্চে শহিদ হতে হয়।

ভারতের পশ্চিমে অধুনা মহারাষ্ট্রের এবং তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত খেদ নামক স্থানে একটি মারাঠি ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৯০৮ সালের ২৪ আগস্ট রাজগুরুর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম হরিনারায়ন রাজগুরু এবং মা ছিলেন পার্বতী দেবী। মাত্র ছয় বছর বয়সেই রাজগুরুর বাবার মৃত্যু হলে সংসারের সমস্ত দায়দায়িত্ব তাঁর দাদা দীনকরের কাঁধে এসে পড়ে।

খেদেই রাজগুরুর প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হলে তিনি পুনের নিউ ইংলিশ হাইস্কুলে পরবর্তী শিক্ষালাভ করেন। তিনি ছিলেন একজন উল্লেখযোগ্য ও সুদক্ষ সংস্কৃতের ছাত্র এবং কুস্তিগীর। বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দেখেছিলেন ভারতের জনগণের ওপর ব্রিটিশদের অন্যায়, বঞ্চনা ও অত্যাচার। তাঁর এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতে প্রস্তুত হন। চন্দ্রশেখর আজাদের জ্বালাময়ী বক্তৃতা, সাহসিকতা, দেশের প্রতি ভালোবাসা রাজগুরুকে হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের দিকে আকৃষ্ট করে এবং তিনি এই দলে যোগদান করেন। এই দলটি যে কোন মূল্যে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্রতী ছিল। দলের ভিতর তাঁর নাম ছিল রঘুনাথ। সুদক্ষ শ্যুটার হওয়ায় তাঁকে ‘গানম্যান অব এইচ.এস.আর.এ’ (Gunman of HSRA) বলা হত।

এখানেই তাঁর সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী ভগৎ সিং ও শুকদেব থাপারের পরিচয় হয়। রাজগুরু ছিলেন এইচ.এস.আর.এ দলের ভিতরে প্রধান বিনোদনকারী। তাঁর কারণেই দলের মধ্যে এবং দলের মিটিংগুলিতে হাসি-ঠাট্টার আবহ তৈরি হত। তিনি গান্ধীজির অহিংস সত্যাগ্রহের তীব্র বিরোধী ছিলেন। রাজগুরু মনে করতেন একমাত্র সহিংস সংগ্রামের মধ্য দিয়েই পূর্ণ স্বরাজ আসবে।

ফলস্বরূপ, রাজগুরু, ভগৎ সিং এবং শুকদেব এই তিনজন মিলে ১৯২৮ সালে লাহোরে ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার জে. পি. স্যান্ডার্সের হত্যাকান্ডের ঘটনাটি ঘটান। যদিও তাঁদের লক্ষ্য ছিলেন পুলিশ অফিসার জে. এ. স্কট কিন্তু এই ঘটনায় স্যান্ডার্সের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা আসলে বিপ্লবী লালা লাজপত রাইয়ের সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় পুলিশি লাঠিচার্জে রক্তক্ষরণ হয়ে মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া বলে জানানো হয়। লালা লাজপতের ওপর নৃশংস লাঠি প্রয়োগের হুকুম দিয়েছিলেন স্কট। যদিও স্যান্ডার্সই তাঁর উপর লাঠি প্রয়োগ করেন। লালা লাজপত রাইয়ের নেতৃত্বে এই মিছিলে উপস্থিত ছিলেন ভগৎ সিং, শুকদেব, যশপাল, ভগবতী চরণ প্রমুখরা। শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে রাজগুরু এই আন্দোলনের অংশ হতে পারেননি।

১৯৩০ সালে ভগৎ সিং, রাজগুরু, শুকদেব সহ আরও একুশ জন ষড়যন্ত্রকারীকে স্যান্ডার্স হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় যা ইতিহাসে লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা নামে খ্যাত হয়ে আছে। গ্রেফতারির সময় রাজগুরু পরবর্তী হত্যার ছক কষছিলেন এবং তাঁর তালিকায় এবার ছিলেন স্বয়ং গভর্নর। আদালতে মামলাটির শুনানি হলে রাজগুরু সহ বাকি দুজন বিপ্লবীকেও ১৯৩১ সালের ২৪ মার্চ ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ওই বছরই ২৩ মার্চ নির্দিষ্ট দিনের একদিন আগে তিনজন বিপ্লবীর ফাঁসি হয়। মৃত্যুর সময় রাজগুরুর বয়স ছিল মাত্র ২২। পাঞ্জাবের ফিরোজপুর জেলায় শতদ্রু নদীর ধারে হুসেইনিওয়ালা গ্রামে (বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত) তাঁদের মৃতদেহ চরম গোপনীয়তায় দাহ করা হয়।

শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে পরবর্তীকালে শহিদ রাজগুরুর জন্মস্থান খেদের নামকরণ হয় রাজগুরুনগর। প্রতি বছর ২৩ মার্চ তাঁদের মৃত্যুর দিনটিকে স্মরণে রেখে ‘শহিদ দিবস’ উদযাপিত হয়। 

কম খরচে বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

নেতাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সববাংলায় এর শ্রদ্ধার্ঘ্য



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন