ইতিহাস

চন্দ্রশেখর আজাদ

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যে সমস্ত মহান বিপ্লবীদের নাম যুক্ত তাঁদের মধ্যে একজন হলেন চন্দ্রশেখর আজাদ(Chandra shekhar azad)। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল চন্দ্রশেখর তিওয়ারি। চন্দ্রশেখর আজাদই রামপ্রসাদ বিসমিল, রওশন সিং, রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ী এবং আশফাকুল্লা খাঁ’র মৃত্যুর পর হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের নাম পরিবর্তন করে হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান আর্মি রাখেন।

১৯০৬ সালের ২৩ জুলাই মধ্যপ্রদেশের আলিরাজপুর জেলার ভাওরা গ্রামে মহান বিপ্লবী চন্দ্রশেখর আজাদের জন্ম হয়৷ তাঁর বাবার নাম পন্ডিত সীতারাম তিওয়ারি। তাঁর মা জাগরণী দেবী ছিলেন তাঁর বাবার তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী।

চন্দ্রশেখর প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে বেনারসের কাশী বিদ্যাপীঠ থেকে সংস্কৃত শিক্ষা লাভ করতে যান৷ তাঁর মা চেয়েছিলেন চন্দ্রশেখর সংস্কৃত পণ্ডিত হোক, তাই  তাঁর বাবাকে রাজী করিয়ে তিনি তাঁকে কাশী বিদ্যাপীঠে পড়াশোনার জন্য পাঠান৷

১৯২১ সালের ডিসেম্বরে মাত্র পনেরো বছর বয়সে যখন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেছিলেন সেখানে চন্দ্রশেখর যোগ দেন। আন্দোলনে যোগদানের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে পেশ করা হলে তিনি বলেন নিজের পরিচয় “আজাদ” (অর্থাৎ মুক্ত ), তাঁর বাবার পরিচয় “স্বতন্ত্র” (স্বাধীনতা) এবং তাঁর বাসভবনকে “জেল” বলে আখ্যায়িত করেন। এই ঘটনার পর থেকে তিনি মানুষের মধ্যে চন্দ্রশেখর আজাদ নামে পরিচিতি লাভ করেন ।

১৯২২ সালে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত হওয়ার পরে চন্দ্রশেখর আজাদ বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আরও জড়িয়ে পড়েন। তিনি এই সময় তরুণ বিপ্লবী মন্মথনাথ গুপ্তের সঙ্গে দেখা করেন যিনি তাঁকে হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (এইচআরএ) -এর মূল উদ্যোক্তা রামপ্রসাদ বিসমিলের সঙ্গে  পরিচয় করিয়ে দেন৷ এরপরে তিনি এইচএসআর এর সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠেন এবং এইচআরএর জন্য তহবিল সংগ্রহ শুরু করেন। এই তহবিলের বেশিরভাগ অংশই সংগ্রহ করা হত সরকারী সম্পত্তির ছিনতাইয়ের মাধ্যমে। তিনি কাকোরি অভিযান, এলাহাবাদের সশস্ত্র সংঘর্ষ এবং শেষ অবধি লালা লাজপত রায়ের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার মতন নানা বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন৷ ফলে গ্রেপ্তারি এড়ানোর জন্য অনেক দিন তাঁকে আত্মগোপন করে থাকতে হয়। কংগ্রেসের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও মতিলাল নেহেরু নিয়মিত চন্দ্রশেখর আজাদের সমর্থনে অর্থ দিতেন৷

চন্দ্রশেখর আজাদ বেশ কিছু সময়ের জন্য ঝাঁসিকে তাঁর সংস্থার কেন্দ্রস্থল করে গড়ে তুলেছিল। তিনি ঝাঁসি থেকে ১৫ কিলোমিটার (৯.৩ মাইল) দূরে অবস্থিত ওড়ছা বনটিকে বন্দুক চালনার অনুশীলনের জন্য বেছে নিয়েছিলেন৷  সেখানে তিনি তাঁর দলের অন্যান্য সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিতেন৷ ঝাঁসিতে থাকাকালীন, তিনি সদর বাজারের বুন্দেলখন্ড মোটর গ্যারেজে গাড়ি চালানো শেখেন। সাদশিবরাও মালকাপুরকর, বিশ্বনাথ বৈশম্পায়ন এবং ভগবান দাশ মহুর তাঁর সান্নিধ্যে এসেছিলেন এবং তাঁরা ক্রমে ক্রমে বিপ্লবী গোষ্ঠীর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠেন। রঘুনাথ বিনায়ক ধুলেকার এবং সীতারাম ভাস্কর ভাগবতের পাশাপাশি তৎকালীন কংগ্রেস নেতারাও চন্দ্রশেখর আজাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

আজাদ ১৯২৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর ভগত সিং, রাজগুরু এবং জয়গোপালের সঙ্গে পুলিশ সুপারিনটেন্ডেট মিস্টার স্কট কে হত্যা করতে গিয়ে ভুল করে ডিএসপি স্যান্ডর্সকে হত্যা করেন৷  ফলে তাঁকে দীর্ঘ সময় আত্মগোপন করে থাকতে হয় গ্রেপ্তারি এড়াতে৷

চন্দ্রশেখর ছিলেন অত্যন্ত তৎপর কর্মী। সবসময়ই কোনো না কোনো অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য ছটফট করতেন।তাই তাঁর সহকর্মী রা তাঁকে ‘কুইক সিলভার নাম দিয়েছিল ।

১৯৩১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আজাদ এলাহাবাদের আলফ্রেড পার্কে সঙ্গী সুখদেবরাজের সঙ্গে কথা বলছিলেন।সেই সময় এক বিশ্বাসঘাতক ব্রিটিশ পুলিশকে চন্দ্রশেখরের উপস্থিতি জানিয়ে খবর দিলে পুলিশ বাহিনী তাঁকে ঘিরে ফেলে। সেখানে ব্রিটিশ পুলিশের সাথে মরণপন যুদ্ধ চালিয়ে যান চন্দ্রশেখর আজাদ।  শেষ পর্যন্ত পালানো অসম্ভব বুঝতে পেরে নিজের পিস্তলের গুলিতে নিজের জীবন শেষ করে ফেলেন৷

এলাহাবাদে আলফ্রেড পার্ক (সরকারীভাবে প্রয়াগরাজ), যেখানে চন্দ্রশেখর আজাদ শহীদ হয়েছিলেন, সেই পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে চন্দ্রশেখর আজাদ পার্ক নামে৷ এছাড়া বেশ কয়েকটি স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট এবং ভারত জুড়ে অন্যান্য সরকারী প্রতিষ্ঠানের নামও তাঁর নামে রাখা হয়েছে। ২০১৮ সালে একটা টেলিভিশন সিরিজে  কিংবদন্তী বিপ্লবী চন্দ্রশেখর আজাদের শৈশব থেকে শুরু করে জীবনের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছিল৷

কম খরচে বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

নেতাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সববাংলায় এর শ্রদ্ধার্ঘ্য



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন