ভারতীয় ইতিহাসে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন মারাঠা যোদ্ধা নানা সাহেব (Nana Sahib)। ইংরেজ শাসন থেকে ভারতকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন নানা সাহেব যাঁর সাহসিকতায় দশ থেকে পনেরো হাজার সৈন্য ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনিই ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথপ্রদর্শক। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য মারাঠা সাম্রাজ্যের অষ্টম পেশোয়া বালাজী বাজীরাও ইতিহাসে প্রথম নানা সাহেব (Nana Sahib – I) আর সিপাহী বিদ্রোহখ্যাত নানা সাহেব পরিচিত দ্বিতীয় নানা সাহেব পেশোয়া (Nana Sahib Peshwa II)।
১৮২৪ সালের ১৯ মে অধুনা উত্তরপ্রদেশে অবস্থিত বিথুরে নানা সাহেব এর জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম নানা গোবিন্দ ধন্দু পান্থ (Nana Govind Dhondu Pant)। তাঁর বাবার নাম নারায়ণ ভাট ও মায়ের নাম গঙ্গা বাঈ। তাঁর দুই ভাইয়ের নাম যথাক্রমে রঘুনাথ রাও এবং জনার্দন যাদের মধ্যে পরবর্তীকালে ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রঘুনাথ রাও মারাঠাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। ১৮২৭ সালে শেষ মারাঠা পেশোয়া দ্বিতীয় বাজীরাও-এর কোনও পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি নানা গোবিন্দকে দত্তক নেন এবং বিথুরের উত্তরাধিকার ঘোষণা করেন। সুশিক্ষিত নানা সাহেব সংস্কৃত অধ্যয়ন করেছিলেন, ধর্ম বিষয়েও তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। একজন দক্ষ মারাঠা যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধকৌশল রপ্ত করেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় বাজীরাওয়ের মৃত্যুর পরে তিনি কুড়ি বছর বিথুরে শাসন করেছেন। শৈশবে তাঁর বন্ধু ছিলেন তাঁতিয়া টোপি, আজিমুল্লাহ্ খান এবং মণিকর্ণিকা তাম্বে (লক্ষী বাঈ) যাঁরা পরবর্তীকালে তাঁকে ব্রিটিশ-বিরোধী যুদ্ধে সহযোগিতা করেন।
এক নজরে নানা সাহেব-এর জীবনী:
- জন্ম: ১৯ মে, ১৮২৪
- মৃত্যু: নিশ্চিত তারিখ নেই
- কেন বিখ্যাত: ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে বেশ কয়েকটি জায়গা ব্রিটিশদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে সমর্থ হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তিন বন্ধু ও মহাবিদ্রোহের নেতা নানা সাহেব, তাঁতিয়া টোপি, ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ প্রমুখের নাম একযোগে উচ্চারিত হয়।
১৮৪৮ থেকে ভারতে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ভাইসরয় ছিলেন লর্ড ডালহৌসি যিনি খুবই আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন ছিলেন। ‘স্বত্ব বিলোপ নীতি’ প্রয়োগ করে ভারতীয় রাজ্যগুলিকে ব্রিটিশ শাসনের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ডালহৌসি। এই ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ অনুযায়ী যদি ব্রিটিশ-আশ্রিত কোনো ভারতীয় রাজা অপুত্রক অবস্থায় মারা যান, তাহলে সেই রাজ্য ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির অধীনস্থ হয়ে যাবে এবং কোনো অপুত্রক রাজা যদি দত্তক নিতে চান তাহলে সেক্ষেত্রে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির অনুমতি নিতে হবে। লর্ড ডালহৌসি এই নীতি প্রয়োগ করে সাঁতরা, সম্বলপুর, জৌনপুর, ঝাঁসি, নাগপুর রাজ্যগুলি দখল করেন। ফলে দেশীয় রাজাদের মধ্যে অসন্তোষ জমা হতে থাকে। অন্যদিকে দেশীয় সৈন্যদের মধ্যে বর্ণবৈষম্য, বেতনের তফাৎ, অর্থনৈতিক শোষণ এবং একশো বছর ধরে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্রমেই ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। ভারত থেকে ব্রিটিশ শক্তির বিনাশের জন্য আন্দোলন ঘনীভূত হতে শুরু করে। ১৮৫৭ সালে বাংলার ব্যারাকপুর সেনা ছাউনিতে প্রথমবার মঙ্গল পাণ্ডে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সিপাহী বিদ্রোহের সূচনা করেন। ক্রমেই সেই মহাবিদ্রোহ সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে এবং মীরাট হয়ে কানপুরে পৌঁছায় বিদ্রোহের আগুন।
সেই সময় ইংরেজদের দয়ার উপর নির্ভর করেই ভারতীয় উপমহাদেশের রাজাদের চলতে হতো। ইংরেজদের অনুদানের উপরে নির্ভর করেই রাজারা তাঁদের রাজ্য চালাতেন। কোনো দাবি-দাওয়া থাকলে ইংল্যাণ্ডে ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’দের সভায় আপিল করতে হতো। ১৮৫১ সালে নির্বাসিত পেশোয়া দ্বিতীয় বাজীরাওয়ের মৃত্যু হয়। ব্রিটিশ কোম্পানি বাজীরাওকে বার্ষিক আশি হাজার টাকা দিতেন বার্ধক্য ভাতা হিসেবে। তাঁর মৃত্যুর পরে ব্রিটিশ কোম্পানি ভাতা ও অনুদান দেওয়া বন্ধ করে দেয়। দ্বিতীয় বাজীরাওয়ের নিজের কোনও সন্তান না থাকায় নানা সাহেবকে দত্তক নিয়েছিলেন আর তাই ব্রিটিশদের মতে নানাসাহেব যেহেতু তাঁর নিজস্ব ছেলে নয় তাই অনুদান দেওয়া যাবে না।
এই ঘটনায় নানা সাহেব অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ হন। তিনি ১৮৫৩ সালে তাঁর ছোটবেলার সঙ্গী ও দেওয়ান আজিমুল্লাহ্ খানকে ইংল্যাণ্ডে পাঠান ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’দের সভায় তাঁর বন্ধ হওয়া ভাতা ও অনুদান পুনরায় শুরু করার আর্জি জানিয়ে। ১৮৫৫ সালে আজিমুল্লাহ্ ইংল্যাণ্ড থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। আজিমুল্লাহ্ খানের এই ইংল্যাণ্ড যাত্রা ইতিহাসে ‘মারাঠা মিশন’ নামে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। আজিমুল্লাহ্ খান ফিরে এসে নানা সাহেব কে জানান রাশিয়ার কাছে ব্রিটিশ বাহিনীর পরাজয়ের কথা আর এই ঘটনায় নানাসাহেব উৎসাহিত হয়ে ভারত থেকে ব্রিটিশ শক্তি বিনাশ করার আহ্বান জানান।
নানা সাহেব কানপুরের কালেক্টর চার্লস হিলার সর্ডনের আস্থা অর্জন করেন এবং তাঁর সঙ্গে পরিকল্পনায় ঠিক হয় যে কানপুরে বিদ্রোহ হলে নানাসাহেব পনেরোশো জন সৈন্য নিয়ে ইংরেজদের সাহায্য করবেন। কিন্তু নানাসাহেব কূটনীতির আশ্রয় নেন। তিনি কানপুরের উত্তরাঞ্চলে ব্রিটিশ সেনাদের উপরে আক্রমণ করে বসেন আর তার ফলে যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনার পরাজয় হয় এবং নানাসাহেব ব্রিটিশ কোষাগারের দখল নেন। কানপুর দখল করে নিজেকে ঐ অঞ্চলের পেশোয়া ঘোষণা করেন তিনি। গ্র্যাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড দিয়ে দিল্লির দিকে এরপর তিনি ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকেন। পথে তাঁর সঙ্গে কিছু বিদ্রোহী সৈন্যদের সাক্ষাৎ ঘটে যারা দিল্লিতে মোগল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট ‘বাহাদুর শাহ’-এর কাছে যাচ্ছিলেন সিপাহি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়ার আর্জি নিয়ে। নানা সাহেব তাঁদের প্রস্তাব দেন তাঁর সঙ্গে কানপুর দখলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। এতে সৈন্যরা প্রথমে নিমরাজি হলেও পরে তাঁদের দ্বিগুণ ভাতার প্রলোভন দেখানো হয়। অবশেষে তাঁদের যৌথ আক্রমণে কানপুর থেকে ইংরেজ অবস্থানের পতন ঘটে।
এই ঘটনার পরে ৫ জুন নানাসাহেব এলাহাবাদ দখলের জন্য প্রস্তুত হন। নানাসাহেব এলাহাবাদে জেনারেল হুইলারকে একটি চিঠি দিয়ে পরেরদিন আক্রমণের কথা অবগত করেন। সেই অনুযায়ী নানাসাহেব তার পরেরদিন অর্থাৎ ৬ জুন বিদ্রোহী সিপাহিদের নিয়ে ব্রিটিশদের উপরে আক্রমণ করেন। এই অতর্কিত আক্রমণে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী পিছু হটে, কোম্পানির অস্থায়ী দূর্গে আশ্রয় নেয় তাঁরা। সেখানে ব্রিটিশ সৈন্যদের অনাহারে, অত্যধিক রোদে মৃত্যু হয়। এই ঘটনার ফলস্বরূপ ১০ জুনের মধ্যে আরও বিদ্রোহী সেনা নানাসাহেবের সঙ্গে যোগদান করে। মনে করা হয় তিনি প্রায় দশ থেকে বারো হাজার সৈন্যকে একত্রিত করে নেতৃত্ব দেন। এই বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে ২৩ জুন পুনরায় জেনারেল হুইলারের উপরে আক্রমণ চালান নানাসাহেব। এই ঘটনায় জেনারেল হুইলারের ছেলে লেফটেন্যান্ট গর্ডন হুইলারের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পরিপেক্ষিতে জেনারেল হুইলার আত্মসমর্পণ করেন এবং এলাহাবাদ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এলাহাবাদ ছেড়ে যাওয়ার সময় নানাসাহেবের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সংঘর্ষ হয়। ক্রমাগত যুদ্ধে একসময় ব্রিটিশবাহিনী হার স্বীকার করে। ব্রিটিশ মহিলা ও শিশুদের বন্দি করা হয় এবং নানাসাহেবের সহযোগী তাঁতিয়া টোপির নির্দেশে বাকি ব্রিটিশ সৈন্যদের মেরে ফেলা হয়। কিন্তু ১৫ জুলাই নানাসাহেব ব্রিটিশ মহিলা ও শিশুদেরও মেরে ফেলার নির্দেশ দেন। এই ঘটনার পরিপেক্ষিতে ১৬ জুলাই ১৮৫৭ সালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি জেনারেল হ্যাভেলককে কানপুরে পাঠায়। তাঁর কাছে খবর ছিল নানাসাহেব কানপুরের কাছে আহিওয়ারা গ্রামে রয়েছেন। জেনারেল হ্যাভেলক আহিওয়ারা গ্রামে আক্রমণ করে সমস্ত গ্রামবাসীদের নির্বিচারে মেরে ফেলেন। বিভিন্ন কৌশলে নানাসাহেব সেই গ্রাম থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। আর তার ফলে জেনারেল হ্যাভেলক পুনরায় কানপুরকে ব্রিটিশ শাসনের অধিকারে আনতে সক্ষম হন।
তাঁতিয়া টোপি, লক্ষ্মী বাঈ প্রমুখের মতে ১৮৫৮ সালে তিনি গোয়ালিয়রের পেশোয়া ছিলেন। বাঁকির যুদ্ধে ব্রিটিশরা জয় লাভ করলে নানা সাহেব নেপালে চলে যান। নানাসাহেব আরো শক্তি সঞ্চয় করার জন্য নেপালের প্রধানমন্ত্রী জং বাহাদুর রানার কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তবে তারপর বিশেষ কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। মনে করা হয় ১৮৫৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর নেপালের জঙ্গলে বাঘের আক্রমণে নানাসাহেবের মৃত্যু হয়, অনেকের মতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ম্যালেরিয়ায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন সেই সময় তাঁর মৃত্যু হয়নি, আত্মগোপনের জন্য এই গুজব ছড়ানো হয়েছিল। তাঁর মৃত্যু নিয়ে কোন সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়নি।
নানা সাহেবের জীবনী নিয়ে দেশ ও বিদেশে বহু উপন্যাস ও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে সোভিয়েত চলচ্চিত্র ‘ক্যাপ্টেন নিমো’ তৈরি হয় নানাসাহেবের জীবনের উপর নির্ভর করে। জুল ভার্নের উপন্যাস ‘দ্য এন্ড অফ নানাসাহেব’ প্রকাশিত হয় ১৮৬৭ সালে। ১৯৩৬ সালে ‘দ্য চার্জ অফ দ্য লাইট ব্রিগেড’ সিনেমায় সুরত খান অভিনীত চরিত্রটি ছিল নানাসাহেবের জীবনের আধারে নির্মিত। ২০০৮ সালে নানাসাহেবকে কেন্দ্র করে অনুরাগ কুমারের লেখা উপন্যাস ‘রিকার্লসিট্রেনস’ প্রকাশিত হয়েছিল। এর দশ বছর পরে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড সারুল্লির উপন্যাস ‘দ্য ডেভিলস উইন্ড’-এর মধ্যে কানপুর আক্রমণের কথা উল্লেখ করা হয় যাতে নানাসাহেবের ভূমিকা রয়েছে। ভূপিন্দর সিং ‘ক্রান্তি’ নামে একটি টিভি ধারাবাহিক পরিচালনা করেন নানাসাহেবের জীবন নিয়ে যে ধারাবাহিকটি একসময় দূরদর্শনে সম্প্রচারিত হতো।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান