ইতিহাস

বটুকেশ্বর দত্ত

বটুকেশ্বর দত্ত (Batukeshwar Dutt) ভারতবর্ষের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন অন্যতম কাণ্ডারী ছিলেন। ইতিহাসে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন ভগত সিংয়ের সাথে ১৯২৯ সালে্র ৮ এপ্রিল নতুন দিল্লীর কেন্দ্রীয় সংসদ ভবনে বোমা নিক্ষেপ করার জন্য।

১৯১০ সালের ১৮ নভেম্বর পূর্ব বর্ধমানের ওয়ারি গ্রামে জন্ম হয় বটুকেশ্বর দত্তের। তাঁর বাবার নাম ছিল গোষ্ঠীবিহারি দত্ত। বটুকেশ্বর ছোটবেলায় ‘মোহন’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তাঁর বাবা পরবর্তীকালে কর্মসূত্রে কানপুর এলে বটুকেশ্বরও তাঁর সাথে সেখানে চলে আসেন।।

বটুকেশ্বর কানপুরের পি. পি. এন. হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছেন। সেখান থেকে তিনি ১৯২৪ সালে স্কুলস্তরের পড়াশোনা সমাপ্ত করেন।

বটুকেশ্বর ছোটবেলা থেকেই একজন সাহসী ও সংবেদনশীল যুবক হিসাবে বেড়ে উঠেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই দেশের প্রতি তাঁর ভালবাসা ছিল অগাধ। তাঁর প্রথম যৌবনেই বটুকেশ্বর ব্রিটিশ বিরোধী রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। তরুণ বয়সে ভগত সিংয়ের সঙ্গে বটুকেশ্বর দত্তের পরিচিতি তৈরী হয় এবং খুব দ্রুত তাঁদের এই পরিচিতি গভীর সখ্যে পরিণত হয়েছিল। ভগত সিং এর সান্নিধ্যে বটুকেশ্বরের বৈপ্লবিক চেতনার আরও বিকাশ ঘটেছিল। তিনি এই যোগাযোগের সূত্র ধরে  গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন ‘হিন্দুস্থান রিপাবলিকান এসোসিয়েশন’-এর সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন যা পরবর্তীকালে ‘হিন্দুস্থান সোসালিস্ট  রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন'(এইচ এস আর এ) নামে পরিচিত হয়েছিল।এই সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানো। অচিরেই তিনি বিপ্লবী চন্দ্রশেখর আজাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীতে পরিণত হন। ভগত সিং, শুকদেবের পাশাপাশি তিনিও বোমা বানানোয় ক্রমশই দক্ষ হয়ে ওঠেন।

বটুকেশ্বরই উত্তর ভারতের বিপ্লবী গোষ্ঠীর সাথে যতীন্দ্রনাথ দাসের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এই যতীন্দ্রনাথ অচিরেই হয়ে উঠেছিলেন বোমা বানানোর কাজে বিপ্লবীদের দীহ্মাগুরু। বিপ্লবী আন্দোলনকে দমন করার জন্য ব্রিটিশ সরকার কেন্দ্রীয় আইনসভায় ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিল পাশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এইচ এস আর এ সিদ্ধান্ত নেয় সংসদ ভবনে বোমা ছুড়ে তাঁরা এই বিলটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবে। তাঁদের উদ্দেশ্য বোমা ফাটিয়ে কাউকে হত্যা করা বা ত্রাস সৃষ্টি করা ছিল না বরং উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের শোষণমূলক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে সারা দেশের সামনে তুলে ধরা।

১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল ভগত সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লীর কেন্দ্রীয় সংসদ ভবনে ঢুকে দর্শকদের গ্যালারি থেকে দুটি বোমা নিক্ষেপ করেন। বোমাগুলি তাঁরা এমনভাবে নিক্ষেপ করেছিলেন যাতে কেউ নিহত বা আহত না হয়। বোমা নিক্ষেপের পর তাঁরা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানে সংসদ ভবন মুখরিত করে তোলেন এবং প্রচার পত্র ছড়িয়ে দেন। ভগত সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত পরিকল্পনা মাফিক ধরা দেন যেহেতু তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ভগত সিং-এর ভাষায় ‘বধিরদের শোনানো'(দেশের সমস্যা সম্পর্কে উদাসীন নেতাদের বৃটিশদের জনবিরোধী আচরণ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা।)।গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁরা আদালতে রাজনৈতিক বন্দীর সম্মান দাবী করে এক ঐতিহাসিক অনশনে বসেন এবং প্রাথমিকভাবে কিছু অধিকার আদায় করে নিতে সহ্মম হয়েছিলেন।

আদালতে তাঁরা তাঁদের বলিষ্ঠ বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে দেশের মুক্তির জন্য অস্ত্র ধরার প্রয়োজনীয়তা কতটা তা তুলে ধরেছিলেন। বিচারে ভগত সিং,শুকদেব ও বটুকেশ্বর দত্তকে ৩০৭নং ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হয়। তবে এরই মধ্যে স্যান্ডার্স হত্যা মামলায় শুকদেব ও ভগত সিংকে ফাঁসির সাজা শোনানো হয়। বটুকেশ্বর দত্তকে আন্দামানের সেলুলার জেলে পাঠানো হয়। সেলুলার জেলে ব্রিটিশ পুলিশের নির্মম শোষণে বহু বিপ্লবীই সেই সময়ে শারীরিক বা মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তেন। বটুকেশ্বর দত্তও দুরারোগ্য টিবিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এই অসুখ তাঁর বিপ্লবী চেতনাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালে তিনি ফের গ্রেফতার হয়েছিলেন। চার বছর পর তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন।

স্বাধীন ভারতবর্ষ এই আজন্ম বিপ্লবীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে পারেনি। ভগ্নস্বাস্থ্য বটুকেশ্বর দত্তকে সিগারেট কোম্পানির এজেন্ট হিসাবে কাজ করতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে, পাঁউরুটি বেচে,পরিবহন ব্যবসার অংশ নিয়েও উপার্জন করার চেষ্টা করেছিলেন বটুকেশ্বর দত্ত। ভারত সরকার তাঁর জন্য কোন সুবিধাজনক চাকরির ব্যবস্থা করেনি। প্রৌঢ় বয়সে এবং অশক্ত শরীরে বিভিন্ন পেশা অবলম্বন করেও স্বাভাবিকভাবেই তিনি সফল হননি।বটুকেশ্বর দত্তের প্রতি রাষ্ট্রীয় এই অবহেলা বজায় ছিল তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত।১৯৬৪সালে বটুকেশ্বর দত্ত গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার অনেক চেষ্টাচরিত্র করেছিলেন। কিন্তু কোন বেড পাননি।এই ঘটনায় হ্মুব্ধ হয়ে বটুকেশ্বরের একদা বিপ্লবী সহযোদ্ধা চমনলাল আজাদ এক দৈনিকে  চিঠি লিখেছিলেন,যার মূল বক্তব্য ছিল- বটুকেশ্বর দত্তের মতো একজন সাহসী মানুষকে অকৃতজ্ঞ ভারতবর্ষে জন্ম দিয়ে ঈশ্বর অত্যন্ত ভুল করেছেন,যাকে আজ সেই দেশে প্রাণ নিয়ে টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। ‘চমনলালের এই প্রতিবাদী চিঠি জনমানসে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে তোলে। অন্যান্য কিছু পত্রিকাতেও সরকারের ভূমিকার রূঢ় সমালোচনা শুরু হয়। রাজ্য জোড়া প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়ায় পঞ্জাব সরকার তাঁর চিকিৎসা বাবদ ১০০০টাকা খরচ দেয় এবং ,দিল্লি এবং চন্ডীগড়ে তাঁর চিকিৎসার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু বিহার সরকার তাঁকে সেখানে চিকিৎসা করানোর অনুমতি দেয়নি। অবশেষে তিনি যখন বিহারে যাওয়ার অনুমতি পান তখন ইতিমধ্যেই তিনি মৃত্যুশয্যায় পৌঁছে গেছেন।

১৯৬৪ সালের ২২ নভেম্বর বটুকেশ্বর দিল্লির সবরমতী হাসপাতালে পৌঁছান। তাঁর শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হচ্ছিল। শোনা যায় মৃত্যু শয্যায় বটুকেশ্বর ক্রমাগত খেদোক্তি করে যাচ্ছিলেন- “যে শহরের জন্য আমি একসময়ে বোমা তৈরি করেছিলাম সেই শহরের কাছেই কি আজ আমি বোঝা হয়ে গেলাম?” ছেলের বন্ধুর জীবনের এই শেষ মুহূর্তে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ভগত সিং-এর মা বিদ্যাবতী দেবী।   

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৯৬৫ সালের ২০ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় বটুকেশ্বর দত্তের মৃত্যু হয়। পঞ্জাবের ফিরোজপুরে হুসেইনিওয়ালা এলাকায় বটুকেশ্বর দত্তের দেহ তাঁর প্রিয় সহযোদ্ধা ভগত সিং এর সমাধির পাশে শায়িত রয়েছে।

বটুকেশ্বর দত্তের নামে দিল্লিতে এয়ারপোর্টের পাশে একটি রাস্তার নাম বটুকেশ্বর দত্ত কলোনি রাখা হয়েছে। বর্ধমান স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে বটুকেশ্বর দত্তের নামে রাখা হয়। অনিল ভার্মা বটুকেশ্বর দত্তের ওপর -‘বটুকেশ্বর দত্ত:ভগৎ সিং কে সহযোগী’ নামে একটি বই লিখেছেন।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন