এজরা পাউন্ড

এজরা পাউন্ড

বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল পর্যন্ত যে ক’জন কবি ও লেখক ইংরেজি সাহিত্যকে আধুনিকতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিলেন, এজরা পাউন্ড (Ezra Pound) তাঁদের অন্যতম। এজরা পাউন্ড ছিলেন তাঁর সময়কার ইংরেজি সাহিত্যের একজন শীর্ষস্থানীয় কবি ও সমালোচক, বিশেষ করে শিল্প-সমালোচক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল সুবিদিত।

১৮৮৫ সালের ৩০ অক্টোবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইডাহো অঞ্চলের হাইলে নামের একটি ছোট শহরে এজরা পাউন্ডের জন্ম হয়। তাঁর সম্পূর্ণ নাম এজরা লুমিস পাউন্ড। তাঁর বাবার নাম হোমার লুমিস পাউন্ড এবং মার নাম ইসাবেল ওয়েস্টন। পাউন্ডের বাবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতেন ফেডারেল ল্যান্ড অফিসে। এজরা পাউন্ড ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ১৮৮৯ সালে পাউন্ডের বাবা বদলি হয়ে চলে আসেন ওয়াইনকোটে। এখানেই এজরা পাউন্ডের শিক্ষাজীবন শুরু হয়।

এজরা পাউন্ডকে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো সেলটেনহাম মিলিটারি অ্যাকাডেমি শিশু বিভাগে। সেখানে তিনি কয়েক বছর পড়াশোনা করেন। তারপর সেখান থেকে তাঁকে ছাড়িয়ে এনে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় স্থানীয় একটি সাধারণ হাইস্কুলে। এরপর তিনি ভর্তি হন পেনিসেলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি ১৯০১ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই তাঁর সাথে আলাপ হয় কবি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের। তাঁদের এই বন্ধুত্ব আজীবন বজায় ছিল। কিন্তু এখানে এজরা পাউন্ডের পড়াশোনা ঠিকমতো না হওয়ায় তিনি ভর্তি হলেন নিউইয়র্কের হ্যামিলটন কলেজে। এই কলেজ থেকেই তিনি ১৯০৫ সালে পিএইচ. ডি. ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি পেনিসেলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন মাস্টারস এ । তিনি মাস্টার ডিগ্রি লাভ করেন ১৯০৬ সালে। তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ল্যাটিন, গ্রিক, ফরাসি, ইতালিয়ান, জার্মান, স্প্যানিশ, অ্যাংলো স্যাক্সন ইত্যাদি ভাষা শেখেন। এই সময় ইংরেজি ভাষা, সাহিত্য ও ব্যাকরণেও তাঁর বিশেষ দখল জন্মায়।

১৯০৭ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে ইন্ডিয়ানার ক্রাউফোর্ডসভিল শহরের ওবাস প্রেসবাইটারিয়ান কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন এজরা পাউন্ড । এখানে আসার আগে থেকেই তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন, এখানে এসে তাঁর উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। তাঁর কাব্যচর্চার একটি বিশেষত্ব হল তিনি অত্যন্ত অনাড়ম্বর আটপৌরে ভাষায় কবিতা লিখতেন। তাঁর এই নতুন আঙ্গিককে অনেকে ছোট করে দেখতে শুরু করলেন। ফলে তাঁর কাব্যসাধনার ক্ষেত্রেও একটা বড় রকমের বিপর্যয় নেমে এলো। তিনি প্রকাশককে যে কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপিই দেখান না কেন সবাই তা ফেরত পাঠিয়ে দেন।

এই আচরণে এজরা পাউন্ড এমন ভেঙে পড়লেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে পাড়ি জমান সুদূর ইউরোপে। ইউরোপে অবশ্য এর আগেও তিনি দু’বার এসেছিলেন। প্রথমবার এসেছিলেন ১৮৯৮ সালে তাঁর কাকার সাথে। দ্বিতীয়বার ১৯০৬ সালে একাই এসেছিলেন। সেবার তিনি এসেছিলেন তাঁর এর আগে প্রকাশিত রেনেসাঁ যুগের কবিদের নিয়ে লেখা ‘র‍্যাফেলাইট ল্যাটিন’ (Raphalite’ Latin), ইন্টারেস্টিং ফ্রেঞ্চ পাবলিকেশন’ (Interesting French Publications) এবং ‘বার্গোস, এ ড্রিম সিটি অব ওল্ড ক্যাস্টাইল’ (Burgos, a Dream City of Old Castile) – এই তিনটি প্রবন্ধ নিয়ে বই বের করা যায় কি না, তার চেষ্টা করার জন্য। সেবার অবশ্য বইটি প্রকাশিত হয়নি। সামান্য কিছু টাকা পকেটে নিয়ে তিনি মনের দুঃখে দেশ ছেড়ে পাড়ি জমালেন বিদেশে। প্রথমে এসে নামলেন জিব্রাল্টার শহরে। সেখান থেকে দক্ষিণ স্পেনে। তারপর এলেন ভেনিসে। এখানে এসেও তিনি কোনো প্রকাশক পেলেন না।

অবশেষে হাতে যা পুঁজি ছিল, তার সর্বস্ব খরচ করে নিজেই বের করলেন তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘এ লুম স্পেন্টো’ (A Lum Spento) ১৯০৮ সালে। তাঁর এই প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে। এরপর তিনি চলে আসেন লন্ডনে। এখানে এসে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে। অনেক খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিক ও সম্পাদকের সাথে এবং সাহিত্যমহলেও তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে ধীরে ধীরে। এরপর তাঁর সাথে পরিচয় হয় সম্পাদক ফোর্ড ম্যাডক্সের। ম্যাডক্স তাঁর সম্পাদিত ইংলিশ রিভিউ পত্রিকায় তাঁর একটি সাক্ষাৎকারও ছাপেন। এর ফলেই পাউন্ড সাহিত্য মহলে আরও বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন।এই সময় লন্ডনে কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসকে কেন্দ্র করে একটি সাহিত্যচক্র ছিল পাউন্ড যেটির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯০৯ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর ‘পারসোনাল’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কিছুদিন যেতে-না-যেতেই প্রকাশিত হয় ‘এক্সালটেশনস’ নামে আরেকটি কবিতার বই। এটি ছিল তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। ১৯১০ সালে প্রকাশিত হয় একটি গদ্যগ্রন্থ ‘দি স্পিরিট অব রোমান্স’। লন্ডনে আসার পর বিভিন্ন সাহিত্য সভায় তিনি যেসব বক্তৃতা দেন, এটি তারই সঙ্কলন।পরপর চারটি বইয়ের প্রকাশনা হয়ে যাওয়ার পর তাঁর খ্যাতি বেশ কিছুটা বিস্তৃত হয়। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো এই খ্যাতি নিয়ে এবার নিজের দেশে গিয়েও পরিচিতি পাবেন। এই ভরসাতেই তিনি আবার ফিরে আসেন ফিলাডেলাফিয়াতে। কিন্তু এখানকার কোনো প্রকাশক কিংবা পত্রিকার সম্পাদকই তাঁকে পাত্তা দিলেন না।

রবার্ট ফ্রস্ট এবং ডি. এইচ. লরেন্স -এর কাব্যগ্রন্থগুলির সমালোচনা প্রকাশ করেন তিনি পোয়েট্রি’ পত্রিকায়। শুধু সাহিত্যকর্মের সমালোচনা নয়, তিনি অনেক চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য নিয়েও আলোচনা করেন এই পত্রিকায়। বিখ্যাত ভাস্কর্য শিল্পী জ্যাকোব এপসটাইন এবং হেনরি গোদিয়ার ব্রাজেস্কার অনেক ভাস্কর্য নিয়েও প্রবন্ধ লেখেন তিনি।সংস্থার নেতৃত্ব চলে আসে তাঁর হাতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধের তাঁর কাব্যের জগতে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। এজরা পাউন্ড ভয়ানক হতাশ হয়ে পড়েন। যুদ্ধের অশান্তি থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য তিনি লন্ডন থেকে প্যারিসে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। লন্ডন ছেড়ে যাবার আগে তাঁর প্রকাশিত দুটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘কুইয়া পাপার অ্যামাভি’ (Quia Pauper Amavi) প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালে এবং ‘হিউ সেলইউন মাওবারলে (Hugh Selwyn Mauberley) প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে। তার এই দুটো কাব্যগ্রন্থকে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থগুলির অন্যতম হিসেবে বিবেচিত করা হয়। তিনি প্যারিসে থাকাকালীন তাঁর সাথে আলাপ হয় বিখ্যাত মার্কিন ঔপন্যাসিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের। অর্থনীতির ওপর তাঁর বেশ কয়েকটি বইও বের হয়। ইতালির একনায়ক মুসোলিনি নিজেকে ইতালির ভাগ্যবিধাতা বলে ঘোষণা করলে পাউন্ড তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘জেফারসন অ্যান্ড/অর মুসোলিনি’ একটি বই লেখেন। ১৯৩৯ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন তিনি ফিরে আসেন স্বদেশে অর্থাৎ আমেরিকায়। তার এই স্বদেশ ফিরে আসার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল। তার ধারণা ছিল তিনি নিশ্চয়ই আমেরিকা এবং ইতালির মধ্যকার দ্বন্দ্বের মীমাংসা করে দিতে পারবেন।১৯৪৪ সালে যখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পৌঁছে যায় তার তুঙ্গ অবস্থায়, তখনো তিনি রোমের বেতার থেকে বহুবার যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুরোধ জানান এবং ইহুদিদের ব্যাংকে টাকা জমা না রাখতেও আহ্বান জানান মার্কিন জনগণকে। কারণ তিনি নিজেও ছিলেন ইহুদি-বিদ্বেষী। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হলে শত্রুপক্ষীয় বলে মার্কিন সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে এবং পিসার এক জেলে বন্দি করে রাখে। এজরা পাউন্ড জেলের অস্বাস্থ্যকর অবস্থার মধ্যেও চীনের মহান দার্শনিক কনফুসিয়াসের রচিত গ্রন্থের অনুবাদ করেন, যেটি পরে “দি গ্রেট ডাইজেস্ট অ্যান্ড আনওব্লিং পিভট’ নামে ১৯৫১ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি জেলে ছিলেন।

জেলের বন্দিদশায় থাকতে থাকতে তাঁর শরীর অসুস্থ হয়ে পড়লে ডাক্তার তাঁকে বিচারের সম্মুখীন হওয়ার অযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। তখন তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তুলে নেওয়া হয় এবং মুক্তি দেওয়া হয় জেল থেকে। দীর্ঘ বারো বছরের বেশির সময় ধরে তিনি কাটিয়েছিলেন ওয়াশিংটনের জেল এলিজাবেথ হাসপাতালে। ১৯৭২ সালের ১ নভেম্বর এজরা পাউন্ডের মৃত্যু হয়।

আপনার মতামত জানান