ইতিহাস

অম্লান দত্ত

অম্লান দত্ত  (Amlan Dutta) একজন প্রখ্যাত বাঙালি অর্থনীতিবিদ এবং শিক্ষাবিদ ছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভাইস চ্যান্সেলর এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য হিসেবে কার্যভার সামলেছেন। মূলত বামপন্থী অর্থনীতিবিদ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি।

১৯২৪ সালে ১৭ জুন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত (অধুনা বাংলাদেশ) কুমিল্লা জেলার বাগিচা গ্রামে অম্লান দত্তের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম অশ্বিনীকুমার দত্ত এবং তাঁর মায়ের নাম সুনীতি বালা দেবী।  অম্লান দত্তের বড় ভাই অনিল দত্ত একজন স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ ও আইএএস অফিসার ছিলেন। ভারত সরকার দ্বারা গৃহীত প্রথম পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনার পিছনে তাঁর বিশেষ অবদান ছিল। অম্লান দত্তের একমাত্র বোন গীতি সেনও পড়াশোনায় খুব ভাল ছিলেন। তাঁর অন্য ভাই অনিন্দ্য দত্ত নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্লাইমাউথ স্টেট কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন।  ছোট ভাই অর্ঘ্য দত্ত বাংলা পত্রিকা ‘সমতা’র সম্পাদক ছিলেন। অম্লান দত্তের বিবাহ হয় স্কটিশ চার্চ কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপিকা কিটি দত্তের সাথে।

অম্লান দত্তের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালায়। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ভর্তি হন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। এখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন পন্ডিত মরহুম সৈয়দ আলী আহসান। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে থেকে পাস করে তিনি অর্থনীতিতে বিএ অনার্স  পড়তে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং এখান থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে পাস করেন। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে চতুর্থ হয়ে ডিস্টিংশন পেয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর পাস করেন।

পড়াশোনা শেষ করে ১৯৪৬ সালে অম্লান দত্ত আশুতোষ কলেজে  অর্থনীতির লেকচারার হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯৪৮ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির লেকচারার হিসেবে যুক্ত হন। যদিও তিনি সেখানে সবথেকে কনিষ্ঠ অধ্যাপক ছিলেন তবুও তাঁর উপরে বিভাগের অনেকটাই দায়িত্ব ছিল।

১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল অব্দি তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। এরপর ১৯৭৮ সালে তিনি গান্ধীয়ান ইনস্টিটিউট অফ স্টাডিজে উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীকালে তিনি শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সহ-উপাচার্য হিসেবে কার্যভার সামলেছেন। এছাড়াও তিনি বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে এবং ইউনিভার্সিটি অফ ব্রাসেলসে অতিথি অধ্যাপক অধ্যাপনা করেছেন।

তিনি কেবল একজন শিক্ষক এবং অর্থনীতিবিদই ছিলেননা তিনি একজন সুদক্ষ প্রবন্ধ রচয়িতাও ছিলেন। অর্থনীতি, দর্শন, সমাজনীতি, রাজনীতি সহ নানা বিষয়ে তিনি বহু প্রবন্ধ রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী এবং জওহরলাল নেহেরু তাঁর অন্যতম প্রেরণা ছিলেন। তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে থ্যানোটোলজিক্যাল টেরোরিজম (Thanotological terrorism) নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এবং তিনি এই প্রসঙ্গে তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে নানা রকম ইতিবাচক দিকের নির্দেশ করে গেছেন। তাঁর সমগ্র জীবনের লেখালিখিকে একত্র করে প্রবন্ধসংগ্রহ প্রকাশিত হয়। তিনি গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতার বিরোধী ছিলেন। এই বিরোধিতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে তিনি সমকালীন রাজনীতির মূল্যায়ন করেছেন এবং অর্থনৈতিক মতবাদের ভিত স্থাপন করেছেন।

অম্লান দত্ত মূলত বামপন্থী অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাংলায় প্রবন্ধ লেখার পাশাপাশি তিনি ইংরেজিতেও অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন যা “দ্য র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট” (The Radical Humanist), “ দ্য ইকোনমিক উইকলি” (The Economic Weekly) এবং “থট” (Thought) পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হত। তিনি মানবতাবাদী আন্দোলনের (Radical Humanist Movement) একজন দিকপাল ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

বক্তৃতার জন্য বারে বারে তিনি বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছেন। আমেরিকায় তিনি “অস্ট্রেলিয়ায় মহাত্মা গান্ধী” এবং “চীনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর” সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন। তিনি ভারতবর্ষের এবং বিদেশে যেমন জাপান, ডেনমার্ক এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিভিন্ন সভায় অর্থনৈতিক উন্নতি এবং শিক্ষা সংকট সম্বন্ধে বক্তৃতা দেন। এছাড়াও তিনি ১৯৭৯ সালে ইউনাইটেড নেশনস সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট কমিশনে (United Nations Social Development Commission) ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৮২ সালে তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে কমলা বক্তৃতামালায় বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।

অম্লান দত্তের জ্ঞানের পরিধি সুদূর বিস্তৃত ছিল। অর্থনীতি থেকে শুরু করে সাহিত্য, রাজনীতি, শিক্ষানীতি, সমাজনীতি সহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অসামান্য ব্যুৎপত্তি ছিল।। অনেক সময় তাঁর চিন্তা ভাবনা বিতর্কের সৃষ্টি করত। তবে তর্কবিতর্কের ক্ষেত্রে তাঁর অকাট্য যুক্তি চিরকালই অপরাজিত থাকত। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য রাজনীতি ও সমাজের অনেক ঘটনা এবং উত্থান পতন তিনি দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন যার ফলে তিনি রাজনৈতিক এবং সামাজিক সমস্যা খুব দ্রুত চিহ্নিত করতে পারতেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিদ্বেষ এবং অসহিষ্ণুতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে বিশাল এক অনিশ্চয়তা। সহনশীলতার অভাব মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করছে। এই কারণে মানুষের মৌলবাদী প্রবণতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। রাজনীতি ও সমাজের এই বিপজ্জনক প্রবনতার দিকে ইঙ্গিত তিনি অনেক আগেই তাঁর নানান লেখায় দিয়ে গেছেন।

তাঁর ছাত্ররা তাঁকে খুবই শ্রদ্ধা করত, কারণ তিনি তাদের ভিন্ন দৃষ্টিতে এবং ভিন্ন আঙ্গিকে অর্থনীতি বিষয়টি দেখতে এবং বুঝতে শেখাতেন। তাঁর ছাত্রদের কাছে তিনি সর্বদা রোল মডেল হয়ে থেকে গেছেন। অর্থনীতি বিষয়টিকে তিনি প্রায় দর্শনের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তাঁর অনেক লেখায় গণতন্ত্র, মানবতা, মানব চরিত্র এবং সমসাময়িক রাষ্ট্র ও সমাজের অনেক দুর্বলতা, সহিংসতা এবং অবিচারের চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি মনে করতেন সারা পৃথিবীতে রাজনীতির ক্ষেত্রে ধর্মের প্রভাব ক্রমেই বেড়ে চলেছে তার অন্যতম কারণ বিশ্বায়নের ফলে সৃষ্টি হওয়া অনিশ্চয়তা এবং জনপ্রিয়তার রাজনীতির বিস্তার। এছাড়াও উগ্রজাতীয়তাবাদ গণতন্ত্রের ক্ষতি করছে বলেও তিনি মনে করতেন।

১৯৫৩ সালে তাঁর লেখা প্রথম বই “ফর ডেমোক্রেসি” (For Democracy) প্রকাশিত হয় যা অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এবং বার্ট্রান্ড  রাসেলকে পাঠিয়েছিলেন তিনি। আইনস্টাইন এবং রাসেল দুজনেই তখন যুদ্ধ বিরোধী নীতি নিয়ে কাজ করছিলেন। বার্ট্রান্ড রাসেল অম্লান দত্তকে বইটি লেখার জন্য শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিলেন। অম্লান দত্ত সারা জীবনে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষা মিলিয়ে মোট একুশটি বই লিখেছিলেন। তিনি আবু সৈয়দ আইয়ুবের সাথে ‘কোয়েস্ট’ (Quest) পত্রিকার সহ-সম্পাদক ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত বাংলা গ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘গণতন্ত্র ও গণযুগ’ (১৯৬৭), ‘তিন দিগন্ত’ (১৯৭৮), ‘ব্যক্তি, যুক্তি, সমাজ’ (১৯৭৮), ‘কমলা বক্তৃতা ও অন্যান্য ভাষণ'(১৯৮৪), ‘সমন্বয়ের সন্ধানে’, ‘গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ (১৯৮৬), দ্বন্দ্ব ও উত্তরণ’ (১৯৮৯), ‘বিকল্প সমাজের সন্ধানে’ (১৯৯৪), ‘অন্য এক বিপ্লব’ (১৯৯৯), ‘যে কথা বলিতে চাই’ (২০০৯), ‘মুক্তি তোরে পেতেই হবে’  ইত্যাদি। তাঁর ইংরেজি বইগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘রিলিজিয়ান, এডুকেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট’, ‘দ্য থার্ড মুভমেন্ট’, ‘আ নিউ রাডিক্যালিজম এন্ড আদার এসেজ’, ‘ফর আ কোয়ায়েট রেভেলিউশন’  ইত্যাদি।

১৯৭২ সালে অম্লান দত্তকে আনন্দ পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে বিদ্যাসাগর পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে তাঁকে দেশিকোত্তম সম্মান প্রদান করা হয়। এছাড়াও তিনি জগত্তারিণী পদক এবং কমলা পুরস্কারে  পুরস্কৃত হন।

২০১০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার, ৮৫ বছর বয়সে সল্টলেকে নিজের বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অম্লান দত্তের মৃত্যু হয়।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।