ইতিহাস

লিও টলস্টয়

রুশ সাহিত্যের তথা বিশ্বসাহিত্যের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয় (Leo Tolstoy)। ম্যাক্সিম গোর্কি তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “টলস্টয় নিজেই একটি পৃথিবী”। ‘ওয়ার অ্যাণ্ড পিস্‌’ এবং ‘আনা কারেনিনা’ তাঁর লেখা শ্রেষ্ঠতম দুটি উপন্যাস যা আজও সমানভাবে জনপ্রিয়। উপন্যাস, নাটক, ছোটোগল্প সর্বক্ষেত্রেই তাঁর অনায়াস যাতায়াত ছিল। ফরাসি বিপ্লবের পিছনে যে সকল সাহিত্যিকের অবদান ছিল তাঁদের মধ্যে টলস্টয় অন্যতম। তাঁর সাহিত্যে ফুটে উঠেছে রুশ বিপ্লবের আগের সমাজ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ছবি। সারাজীবন ধরে তিনি যা লিখে গিয়েছেন তা প্রায় একশোটি খণ্ডে বিভাজিত। জীবনে অনেকবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি এই পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

১৮২৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার তুলা প্রদেশের ইয়াসনায়া পলিয়ানা (Yasnaya Polyana) নামে এক গ্রামে লিও টলস্টয়ের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম ছিল লেভ নিকোলায়েভিচ টলস্টয় (Lev Nikolayevich Tolstoy)। তাঁর বাবার ছিলেন কাউন্ট নিকোলাই টলস্টয় এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল মারিয়া টলস্টায়া। নিকোলাস, সের্গেই, দিমিত্রি ও লেভ – নিকোলাই এবং মারিয়ার এই চার সন্তানের মধ্যে লিও ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। মাত্র ২ বছর বয়সে তিনি মাকে হারান এবং ৯ বছর বয়সে তাঁর বাবারও মৃত্যু হয়। তখন আত্মীয়-পরিজনেরাই চার ভাইয়ের দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে টলস্টয় সোফিয়া অ্যান্ড্রেয়েভ্‌না বেরোস (Sofya Andreyevna Behrs) নামে এক চিকিৎসকের কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। এই দম্পতির তেরোটি সন্তান ছিল। প্রথম জীবনে তাঁদের বিবাহ জীবন সুখের হলেও বিভিন্ন কারণে ধীরে ধীরে তা ক্রমশ দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

১৮৪৪ সালে টলস্টয় কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিনি আইন ও ভাষা শিক্ষা শুরু করেন। কিন্তু ছাত্র হিসেবে তিনি ভালো হতে পারেননি। পড়াশোনার প্রতি বিশেষ আগ্রহান্বিত ছিলেন না বলে খুব শীঘ্রই শিক্ষকেরা তাঁকে ‘শিখতে অক্ষম এবং অনিচ্ছুক’ বলে চিহ্নিত করেন। ফলে আশাহত হয়ে প্রথাগত শিক্ষার মাঝামাঝি সময়েই টলস্টয় পড়া ছেড়ে দেন এবং নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। এরপর তিনি মস্কো, তুলা ও সেন্ট পিটার্সবার্গে অনেক সময় কাটিয়েছিলেন এবং ক্রমেই একটি শিথিল উদ্দেশ্যহীন জীবনযাপন করতে শুরু করেন টলস্টয়। ছাত্র থাকাকালীনই বিখ্যাত দার্শনিক মন্টেস্কুর ‘স্পিরিট অফ ল’জ’ এবং ক্যাথরিন দ্য গ্রেটের লেখা ‘নাকাজ’ বিষয়ে একটি তুলনামূলক লেখা লিখেছিলেন তিনি। চার্লস ডিকেন্সের সাহিত্য এবং রুশোর দার্শনিক প্রতর্কের প্রতি আকৃষ্ট হলেও ১৮৪৭ সালে কোনো ডিগ্রি ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন টলস্টয়।   

১৮৫১ সালে টলস্টয় তাঁর বড় ভাই নিকোলাসের পরামর্শে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। যুদ্ধকালীন বিরতির সময় থেকেই তিনি লিখতে শুরু করেন। ১৮৫২ সালে জনপ্রিয় পত্রিকা ‘দ্য কনটেম্পোরারি’তে তাঁর লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের প্রথম খণ্ড ‘চাইল্ডহুড’ প্রকাশিত হয় যেখানে তিনি তাঁর ছোটোবেলার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত হয় সেই বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ড ‘বয়হুড’ যাতে বর্ণিত আছে তাঁর যৌবনের কাহিনী।     

১৮৫৫ সালে ক্রিমিয়ান যুদ্ধের সময় তিনি আর্টিলারি অফিসার হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং ১১ মাস সেভাস্তোপোলে কাটান। এইসময় তিনি ‘সেভাস্তোপোল টেলস’ নামের তিন খণ্ডের একটি ধারাবাহিকে যুদ্ধের মারাত্মক দ্বন্দ্বের বিষয়ে তাঁর মতামত প্রকাশ করেছিলেন। যুদ্ধকালীন সাহসিকতার জন্য তিনি প্রশংসিত হন এবং লেফটেনেন্ট পদে উন্নীত হন। কিন্তু যুদ্ধের সময় অসংখ্য মানুষের মৃত্যু তাঁকে আতঙ্কিত করে তোলে। ফলস্বরূপ ক্রিমিয়ান যুদ্ধের পর তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন। 

সেনাবাহিনীতে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং ১৮৫৭ ও ১৮৬০-৬১ সালে দুবার ইউরোপ ভ্রমণ টলস্টয়কে অহিংস এবং আধ্যাত্মিক নৈরাজ্যবাদী (anarkyst) করে তুলেছিল। ১৮৫৭ সালে সফরের সময় তিনি প্যারিসে প্রকাশ্য জনসমাবেশে গিলোটিনে একটি মৃত্যুদন্ড প্রত্যক্ষ করেন যা ছিল তাঁর জীবনের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এই দৃশ্য দেখার পর টলস্টয় তাঁর বন্ধু ভ্যাসিলি বটকিনকে একটি চিঠিতে লেখেন, “সত্য হল রাষ্ট্র একটি ষড়যন্ত্র যা শুধু শোষণের জন্যই নয়, সর্বোপরি তার নাগরিকদের দুর্নীতি করার জন্যই তৈরি হয়েছে….এখন থেকে আমি কোথাও আর কোনো সরকারের চাকরি করবো না।” এখানে তিনি জুয়া খেলে তাঁর সমস্ত সঞ্চিত অর্থ নষ্ট করে ফেলেন এবং বাধ্য হয়ে রাশিয়ায় ফিরে আসেন। ১৮৫৭ সালে তাঁর আত্মজীবনীমূলক ট্রিলজির তৃতীয় অংশ ‘ইয়ুথ’ প্রকাশিত হয়।  

১৮৬০-৬১ সালে ভ্রমণের সময় তাঁর পরিচয় হয় লেখক ভিক্টর হুগোর সাথে। হুগোর সদ্য সমাপ্ত উপন্যাস ‘লে মিজারেবল’ টলস্টয়ের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তীকালে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ার অ্যাণ্ড পিস’ (War and Peace)-এ যুদ্ধের দৃশ্যগুলিতে এই উপন্যাসের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ১৮৬০-এর দশকে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ইয়াসনায়া পলিয়ানাতে বসবাসের সময় তিনি লিখতে শুরু করেন তাঁর প্রথম বিখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ার অ্যাণ্ড পিস্‌’। ১৮৬৫ সালে উপন্যাসটির একটি অংশ ‘দ্য ইয়ার ১৮০৫” শিরোনামে ‘রাশিয়ান ম্যাসাঞ্জোর’-এ প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৮৬৮-র মধ্যে তিনি আরো তিনটি অংশ প্রকাশ করেছিলেন এবং ১৮৬৯ সালে উপন্যাসটি সম্পূর্ণ হয়েছিল। এই বইতে উল্লেখিত আছে টলস্টয়ের যুদ্ধ ও শান্তি বিষয়ক বিভিন্ন ধারণা। বইটির একটি বিখ্যাত উক্তি, “কারও জীবনের উদ্দেশ্য এবং গুণগত মান মূলত তার প্রতিদিনের কাজকর্ম থেকে প্রাপ্ত।”  

উপন্যাসটির সাফল্যের পরে ১৮৭৩ সাল থেকে তিনি তাঁর দ্বিতীয় জনপ্রিয় উপন্যাস ‘আন্না কারেনিনা’ (Anna Karenina) লিখতে শুরু করেছিলেন। এই কাহিনীতে তিনি তাঁর জীবন থেকে তুলে আনা কিছু চরিত্রকে কাল্পনিক রূপে সাজান। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ্য, কিটি ও লেভিন চরিত্রদুটির রোম্যান্সের ঘটনাগুলির সঙ্গে টলস্টয় ও তাঁর স্ত্রীর বিবাহজীবনের অনেক মিল পাওয়া যায়। ‘আন্না কারেনিনা’ উপন্যাসের প্রথম লাইনটি বইটির সর্বাধিক বিখ্যাত উক্তিগুলির মধ্যে অন্যতম, “সমস্ত সুখী পরিবার একে অপরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, প্রতিটি অসুখী পরিবার তার নিজস্ব উপায়ে অসন্তুষ্ট।” ১৮৭৩ থেকে ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত এই উপন্যাসটি ধারাবাহিক হিসেবে প্রকাশিত হয় এবং সমালোচক ও সাধারণ পাঠকের মন জয় করে। এই রচনা থেকে প্রাপ্ত অর্থ টলস্টয়ের সম্পদকে দ্রুত বর্ধিত করেছিল।

এরপর তাঁর মনে ধর্ম ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে অদ্ভুতরকম সঙ্কট সৃষ্টি হয় এবং তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। মনের ভিতর জেগে ওঠা প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়ার জন্য তিনি শরণাপন্ন হন রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের। কিন্তু এখানে তাঁর অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর হয়নি। তাঁর চোখে চার্চের ধর্মের নামে দুর্নীতির সমস্ত প্রমাণ ধরা পড়েছিলো। এই মর্মে তাঁর মনে নতুন বিশ্বাস উদিত হয় এবং ১৮৮৩ সালে ‘দ্য মিডিয়েটর’ গ্রন্থে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস লিপিবদ্ধ করেন। সরাসরি চার্চের বিরুদ্ধাচরণ করা এবং বিতর্কিত বিশ্বাস প্রচার করার জন্য অর্থোডক্স চার্চ তাঁকে বহিষ্কার করে। 

জীবনের শেষ ৩০ বছরের বেশি সময় তিনি নিজেকে নৈতিক ও ধর্মীয় নেতা হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন। অহিংসা সম্পর্কে তাঁর ধারণা মহাত্মা গান্ধীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। শেষ জীবনে তিনি একজন সাধারণ কৃষকের মতো সহজ-সরল জীবনযাপন করতেন। 

সারা জীবনে অসংখ্য ছোট গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন টলস্টয়। তাঁর রচিত কয়েকটি বিখ্যাত গ্রন্থের নাম হল ‘দ্য ডেথ অফ ইভান ইলিখ’, ‘এ কনফেশন’, ‘হাদজি মুরাট’, ‘দ্য কিংডম অফ গড ইজ উইদিন ইউ’, ‘দ্য কোস্যাকস’, ‘হোয়াট মেন লিভ বাই’, ‘ফ্যামিলি হ্যাপিনেস’ ইত্যাদি। তাঁর রচিত কাহিনীগুলি থেকে নির্মিত হয়েছে অনেক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র যার মধ্যে আছে ‘অ্যানা কারেনিনা’, ‘ওয়ার অ্যাণ্ড পিস’, ‘দ্য প্রিজনার অফ দ্য মাউন্টেন’, ‘দ্য রিভার অফ লাভ’, ‘দ্য ওম্যান হু লেফট’ ইত্যাদি। টলস্টয়ের চিন্তাধারা সম্পর্কে প্রায় তেইশ হাজার বই এবং সংবাদপত্র ও বিভিন্ন পত্রিকাতে প্রায় ছাপ্পান্ন হাজার প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। তাঁর বইগুলি সুলভ সংস্করণে ছাপানো হতো এবং মালবাহী গাড়িতে করে বিক্রি ও বিতরণ করা হত। মাত্র চার বছরের মধ্যেই টলস্টয়ের বিভিন্ন বইয়ের প্রায় এক কোটি কুড়ি লক্ষ কপি বিক্রীত হয়েছিল। 

কিন্তু জীবৎকালে টলস্টয় তাঁর প্রতিভার উপযুক্ত সম্মান পাননি। ১৯০২ থেকে ১৯০৬ পর্যন্ত প্রতি বছরই তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য এবং ১৯০১, ১৯০২ এবং ১৯১০ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি হলেও তিনি এই পুরস্কার অর্জন করতে পারেননি। সাহিত্যে কৃতিত্বের নিদর্শন হিসেবে যোকোভিচ পুরস্কার এবং বোসনিয়া পুরস্কার পেয়েছেন টলস্টয়। 

১৯১০ সালের ২০ নভেম্বর ৮২ বছর বয়সে রাশিয়ার এক রেলস্টেশনে নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে  লিও টলস্টয় এর মৃত্যু হয়। 

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন