সববাংলায়

সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সঙ্গে এসেছিল দেশভাগের মতো অভিশাপ। মূলত ধর্মের ভিত্তিতেই ভাগ হল দেশ এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে ভারতবর্ষের নয়া ভূখন্ডের জন্ম হল। এই যে ধর্মীয় দলাদলি, এর সূত্রপাত ব্রিটিশের হাতে বঙ্গভঙ্গের সময়তেই হয়েছিল এবং রাজনৈতিকভাবে যখন মুসলিম স্বার্থের কথা ভেবে মুসলিম লীগ দল তৈরি হল তখন থেকে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি আরও জোরালো হয়ে উঠতে শুরু করে। মহম্মদ আলি জিন্নাহ-র মতো নেতৃত্বের হাত ধরেই মুসলিম লীগ কেবলমাত্র মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবি জানায় এবং তারই ফলশ্রুতি আজকের পাকিস্তান। জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে মুসলিম লীগের নানারকম বোঝাপড়া, রাজনৈতিক সংঘাতই স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মতো মুসলিম লীগ দলটি যদিও দীর্ঘায়ু হয়নি তবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত যে রাজনৈতিক ইতিহাস, সেখানে মুসলিম লীগের উপস্থিতি ও ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যাবে না।

১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ (All India Muslim League) গঠিত হয়। তবে এই গড়ে ওঠার নেপথ্যের ইতিহাসটুকু জানা প্রয়োজন। ১৯০১ সাল থেকেই জাতীয় পর্যায়ে একটি মুসলিম রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তারপরেই মূলত হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা এবং তাদের একতাকে বিনষ্ট করে দিয়ে জাতীয়তাবাদকে সমূলে ধ্বংস করে দেওয়ার লক্ষ্যেই ব্রিটিশ সরকার ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করেছিল। এই ন্যক্কারজনক ঘোষণার বিরুদ্ধে সেদিন হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সামিল হয়েছিল। তবে ইতিহাসে একচেটিয়া এই বিরোধিতা দেখা যায় না। সরকারের সমর্থনপুষ্ট বেশ কিছু মুসলমান কিন্তু বঙ্গভঙ্গের পক্ষেও ছিলেন। লর্ড কার্জন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহকে সেসময় বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিলেন এবং মুসলিম তরুণদের নানাভাবে প্রলোভিত করবারও প্রয়াস করেন। ১৯০৬ সালে সেপ্টেম্বর মাসে লক্ষ্ণৌতে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় যেখানে সমগ্র ভারত থেকে মুসলিম প্রতিনিধিরা যোগ দেন এবং একটি মুসলিম রাজনৈতিক দল গঠনের পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর সরকারের প্ররোচনাতেই আগা খাঁ-এর নেতৃত্বে কয়েকজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম নেতা মিলে ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর বড়লাট মিন্টোর সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং একটি স্মারকলিপি জমা দিয়ে মুসলমানদের স্বার্থে কিছু সুযোগ-সুবিধার দাবি জানান। লর্ড মিন্টো রাজনৈতিক সুবিধার কথা ভেবেই সেইসব সাম্প্রদায়িক দাবিগুলি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেদিন। এরমধ্যে নবাব সলিমুল্লাহ খান একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করেন যার মাধ্যমে তিনি দলটিকে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম কনফেডারেসি’ নামকরণের পরামর্শ দেন।

সেই বছরেই অর্থাৎ ১৯০৬ সালের ২৭ থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকাতে অল-ইন্ডিয়া মহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্সের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মুসলমান ঐক্যের কথা বলা হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবেই সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ গঠিত হয়। এই লীগের মূল লক্ষ্যগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল, মুসলিমদের স্বার্থ সুরক্ষিত করা, জাতীয় কংগ্রেসের প্রভাব-প্রতিপত্তিকে খর্ব করা, মুসলিম যুবকদের জন্য আধুনিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা। এখানে উল্লেখ্য যে মুসলিমদের আধুনিক শিক্ষার কথা অনেকদিন আগেই ভেবেছিলেন সৈয়দ আহমদ খান। মুসলিম লীগের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সলিমুল্লাহের নামই করতে হবে এবং এর প্রথম সভাপতি ছিলেন আগা খাঁ।

মুসলিম লীগ এরপর মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা এবং পৃথক নির্বাচনী এলাকার জন্য লড়াই শুরু করে। ১৯০৮ সালের অক্টোবর মাসে ভারতীয় কাউন্সিল আইন সংস্কারের খসড়ায় মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হলেও মুসলিম লীগের দাবি কেবল উত্তরপ্রদেশ এবং মাদ্রাজে সম্পূর্ণভাবে পূরণ করা হয়েছিল। সরকার মুসলিমদের এই যে পৃথক নির্বাচনের ধারণা, তা মেনে নিলেও রাজ্য সচিব তা মেনে নিতে চাননি বরং তিনি মিশ্র নির্বাচনের কথা বলেছিলেন। ফলে মুসলিম লীগ বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছিল। চরমপন্থীদের জব্দ করা এবং মুসলিমদের হাতে রাখবার জন্যই সরকার ১৯০৯ সালে মর্লে-মিন্টো শাসন সংস্কার প্রবর্তন করে মুসলিমদের এই দাবি মেনে নেয় -যা ছিল মুসলীম লীগের প্রথম সাফল্য। তবে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল বিল মুসলিম লীগের দাবি সম্পূর্ণ করতে পারেনি এবং মুসলিম লীগের লণ্ডন শাখাও এর বিরোধিতা করেছিল। ১৯০৯ সালেই মুসলিম লীগের সদস্যরা একটি প্রতিবাদও সংগঠিত করে। সরকার এরপর আপোষের মাধ্যমে মুসলিমদের আরও কয়েকটি আসন প্রদানের প্রস্তাব দিলেও তাদের দাবি সম্পূর্ণরূপে মেনে নিতে রাজি হয়নি। ১৯০৯ সালের ১২ অক্টোবর মুসলিম লীগ পুনরায় পৃথক নির্বাচনী এলাকা ও আরও বেশি প্রতিনিধিত্বের দাবি করে। মিন্টোর বিরোধিতা সত্ত্বেও মর্লে আশঙ্কা করেছিলেন লীগের সমর্থন ছাড়া পার্লামেন্টে বিল পাশ হবে না। তখন তিনি পুনরায় লীগের সঙ্গে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা করেন এবং তা সফল হয়। আগা খাঁ আপোষে রাজি হন এবং ইম্পেরিয়াল কাউন্সিলে মুসলমানদের জন্য আরও দুটি আসন সংরক্ষিত থাকে। আগা খাঁ ১৯১২ সালে মুসলিম লীগের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯১৩ সালে মহম্মদ আলি জিন্নাহ মুসলিম লীগে যোগদান করেছিলেন।

মর্লে-মিন্টো শাসন সংস্কারের পর হিন্দুদেরও টনক নড়েছিল এবং তারা নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য গড়ে তোলে ‘হিন্দু মহাসভা’। ব্রিটিশের ‘ভেদনীতি’ ফলে বেশ কিছুটা অক্সিজেন পায়। তবে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ, শিক্ষিত মুসলিম সমাজের সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মনোভাব, দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের উপর শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচার এবং মুসলিম ধর্মগুরু খলিফার উপর অত্যাচারের ফলে মুসলমানদের মধ্যেও ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাব জাগ্রত হয়। এই সময়তেই জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে একটি পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে ওঠে। ১৯১৬ সালে জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে লক্ষ্ণৌ চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তির দ্বারাই জাতীয় কংগ্রেস মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনের দাবি মেনে নেয় এবং প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিমদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থাতেও সম্মত হয়।

এরপর খিলাফৎ আন্দোলনকে সমর্থন করে গান্ধীজি হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঐক্য সুদৃঢ় করবার প্রয়াসী হন। এরপরই অসহযোগ আন্দোলনের সময়তে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে দারুণ ঐক্য ও সম্প্রীতি লক্ষিত হয়। তবে চৌরিচোরার ঘটনা ও খলিফা পদের বিলুপ্তি ঘটে যাওয়ার পর যখন অসহযোগ ও খিলাফত এই দুই আন্দোলনই বন্ধ হয়ে যায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সেতু পুনরায় ভেঙে পড়ে। মহম্মদ আলি ও সৌকত আলি স্পষ্টত ঘোষণা করে দেন যে তাঁরা প্রথমে মুসলিম তারপর ভারতীয়। একমাত্র মৌলানা আজাদ ছাড়া সব খিলাফত নেতাই গান্ধীকে ত্যাগ করেন।

১৯২৩ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন অংশে প্রায় ৯১টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে গিয়েছিল। এইভাবে ধর্মের ভিত্তিতে সমাজ-পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তাপও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এই দাঙ্গাগুলির একটি অন্যতম কারণ অবশ্যই খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের অবসানের পর আগা খাঁ, মহম্মদ আলি জিন্নাহের মতো মুসলিম লীগের শীর্ষনেতারা কেবল সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়েই মুসলিম সম্প্রদায়কে সংঘবদ্ধ করবার কাজে প্রয়াসী হন। ১৯২৮ সালের নেহেরু রিপোর্টকে (ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান রচনার জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটি সংবিধানের যে খসড়া দেয় তা হল নেহেরু রিপোর্ট। এতে ভারতকে পূর্ণ ডোমিনিয়নের মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়) মুসলিম লীগ প্রত্যাখান করে কারণ তা লীগের কোন দাবিকেই সমর্থন করেনি এবং এই রিপোর্টের প্রতিক্রিয়ায় জিন্নাহ চৌদ্দ দফা প্রস্তাব করেছিলেন। সেই প্রস্তাবগুলি বলাই বাহুল্য মুসলমানদের স্বার্থ চরিতার্থতার জন্যই তৈরি। লীগ আইনসভায় কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব এবং মুসলিম প্রদেশগুলির জন্য উল্লেখযোগ্য স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছিল, কিন্তু জিন্নাহর অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যাত হয় এবং লীগ ও কংগ্রেসের সম্পর্ক আরও খারাপ হতে শুরু করে।

১৯৩০ সালে মুহম্মদ ইকবাল এলাহাবাদে মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে একটি ভাষণ দেন। অনেক ঐতিহাসিক বলেন তিনি ভারত ভাগ করে একটি পৃথক রাষ্ট্রের কথা বলেননি বরং ভারতীয় ফেডারেশনের মধ্যেই একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের প্রস্তাব করেছিলেন। এই সময়েই ‘পাকিস্তান’ শব্দটির উত্থান। এই শব্দটির লেখক সম্পর্কেও বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং জওহরলাল নেহেরু বলেন, ইকবাল পাকিস্তানের প্রাথমিক সমর্থকদের একজন ছিলেন, তবুও তিনি এর অন্তর্নিহিত বিপদ এবং অযৌক্তিকতা বুঝতে পেরেছিলেন বলে মনে হয়। এসময় আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হলে জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতারা তাতে যোগ দেন। এমনকি এই আন্দোলনের কিছুদিন আগে গড়ে ওঠা ‘কংগ্রেস মুসলিম দল’, ‘নিখিল ভারত মুসলিম জাতীয়তাবাদী দল’ প্রভৃতি মুসলিমদের আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দিতে উৎসাহ দেয়। তবে মহম্মদ আলি ও সৌকত আলি জানান এই আন্দোলন হিন্দুদের আন্দোলন এবং এর উদ্দেশ্য হল মুসলিম সম্প্রদায়কে ‘হিন্দু মহাসভা’র ওপর নির্ভরশীল করে তোলা। আইন অমান্য যখন তুঙ্গে তখন লণ্ডনে গোলটেবিল বৈঠক হয়। সেখানে মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ সমস্বরে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে নির্বাচনের দাবি করেন এবং বলেন মুসলিম স্বার্থ চরিতার্থ না হলে তারা কোনও সংবিধানই মানবেন না। এই বৈঠক অবশেষে ব্যর্থ হয়। ১৯৩২ সালে র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড ‘সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি’ ঘোষণা করে সংখ্যালঘুদের পৃথক নির্বাচনের দাবি মেনে নিলে মুসলিম সাম্প্রদায়িক রাজনীতিরই জয় হয়।

এ.কে ফজলুল হক১৯৩৭ সাল পর্যন্ত সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ মূলত অভিজাত মুসলমান সম্প্রদায়েরই একটি সংগঠন ছিল। তবে ১৯৪০-এর দশকে লাহোর প্রস্তাবের পর সাধারণ মুসলমান জনগণের কাছেও লীগ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। জিন্নাহের নেতৃত্বে মুসলিম লীগের সদস্যসংখ্যা প্রায় দুই লক্ষেরও বেশি হয়ে যায় এবং তা আরও ধর্মীয় ও বিচ্ছিন্নতাবাদী হয়ে উঠতে থাকে। ১৯৩৭ সাল থেকেই মুসলিম লীগ ও জিন্নাহ তাদের মিছিল ও ধর্মঘটে ভারতজুড়ে বিশাল জনতাকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। লাহোরে লীগের এক সম্মেলনে দাঁড়িয়ে জিন্নাহ স্পষ্টতই বলেন হিন্দু ও মুসলিম দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মীয় দর্শন। তাদের সামাজিক রীতিনীতি এমনকি সাহিত্যও আলাদা। দুটি জাতিকে একটি একক রাষ্ট্রের অধীনে একত্রিত করার ফলে একদল সংখ্যাগুরু ও একদল সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। তাদের মধ্যেকার ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ জাতীয় রাষ্ট্রকে ধ্বংসের পথে চালিত করবে। এ.কে ফজলুল হক কর্তৃক প্রেরিত লাহোর প্রস্তাব ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ গৃহীত হয় এবং এর নীতিগুলি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানের ভিত্তি তৈরি করেছিল। যদিও এই প্রস্তাবে পাকিস্তান শব্দের উল্লেখ ছিল না তবুও পরবর্তীতে এটি পাকিস্তান প্রস্তাব নামেই পরিচিতি পায়। লাহোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে অল ইন্ডিয়া আজাদ মুসলিম কনফারেন্স ১৯৪০ সালের এপ্রিল মাসে দিল্লিতে একত্রিত হয়ে অখণ্ড ভারতের প্রতি সমর্থন জানায়। অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ ভারত বিভাগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা মুসলিমদের চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা প্রচারকারী হুসেন আহমদ মাদানীকেও আক্রমণ করে মুসলিম লীগ। ১৯৪৩ সালে অল ইন্ডিয়া আজাদ মুসলিম কনফারেন্সের নেতা আল্লাহ বখশ সুমরোর হত্যাকাণ্ড পাকিস্তান সৃষ্টির দাবিতে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগকে আরও দৃঢ় করে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জিন্নাহ ব্রিটিশ সরকারকে সর্বপ্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন এবং বদলে পৃথক রাষ্ট্রের দাবির কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের নেতারা যখন কারারুদ্ধ ছিলেন তখন জিন্নাহ তাঁর দাবি আরও জোরদার করে তোলেন এবং সরকারকে বলেন, ‘দেশ ভাগ করো এবং ভারত ছাড়ো’। ১৯৪৬ সালে মন্ত্রী মিশনের সঙ্গে বৈঠকে গান্ধীজি জিন্নাহের দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিরোধিতা করলেও জিন্নাহ পাকিস্তানের দাবিতে অটল থাকেন। ফলে মন্ত্রী মিশন নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে প্রদেশগুলিকে বিভক্ত করার কথা বললে তা পাকিস্তান গঠনের উপযোগী হবে মনে করে মুসলিম লীগ এই প্রস্তাব মেনে নেয়।

১৯৪৬ সালের জুলাইতে সংবিধান সভার নির্বাচনে কংগ্রেস বিপুল ভোটে জেতে। মুসলিম লীগ সংবিধান সভা ও সরকারে যোগ দিতে অসম্মত হয়। জিন্নাহ পুনরায় পাকিস্তানের কথা তোলেন। এর মধ্যে কংগ্রেস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দিতে সম্মত হয় এবং অন্যদিকে মুসলিম লীগের তরফে জিন্নাহ প্রত্যক্ষ সংগ্রাম বা ডাইরেক্ট অ্যাকশনের ডাক দেন। বাংলার হোসেন শহিদ সুরাবর্দি পরিচালিত মুসলিম লীগ ১৬ আগস্ট থেকে তিনদিন কলকাতার বুকে ব্যাপক লুন্ঠন এবং হিন্দুনিধন চালায়। এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়গুলির একটি।

এরপর ১৯৪৭ সালে বড়লাট মাউন্টব্যাটেন তাঁর ভারত বিভাগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যে প্রস্তাব অনুযায়ী ভারতকে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক ডোমিনিয়নের বিভক্ত করা হবে।

স্বাধীনতার পর ভারতে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ ভেঙে দেওয়া হয় এবং তার স্থলাভিষিক্ত হয় ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ । অবশ্য পাকিস্তানে, যুক্তরাজ্যে এবং ক্ষীণভাবে হলেও বাংলাদেশে মুসলিম লীগ আজও বর্তমান।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘স্বদেশ, সভ্যতা ও বিশ্ব’, জীবন মুখোপাধ্যায়, শ্রীধর পাবলিশার্স, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ, জানুয়ারি, ২০২১।
  2. https://en.m.wikipedia.org/
  3. https://www.nextias.com//
  4. https://www.neversuchinnocence.com/
  5. https://testbook.com/
  6. https://infinitylearn.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading