ভারতবর্ষের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন অনেক আন্দোলন ও বিদ্রোহ দেশের নানাপ্রান্তে সংঘটিত হয়েছে, যেগুলির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবেই স্বাধীনতা লাভ সম্ভব হয়েছে। সেই সমস্ত বিক্ষিপ্ত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন আসলে সারা দেশজুড়ে ভারতবাসীর জাগরণেরই প্রমাণ। স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রাক্কালে ১৯৪৬ সালে তেমনই এক বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠেছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর অভ্যন্তরে। স্বৈরাচারী ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে তাদের সমবেত ক্ষোভ যে বিদ্রোহের রূপ নিয়েছিল, ইতিহাসে তা নৌবিদ্রোহ (Naval Mutiny) নামে পরিচিত। বোম্বাইয়ের নৌ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহের আগুন কিন্তু বোম্বাই ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত নৌসেনাদের ঘাঁটিতে। এছাড়াও নৌসেনাদের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অন্যান্য সামরিকক্ষেত্রে কর্মরত মানুষেরাও বিদ্রোহের দামামা বাজিয়ে দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীতে রাজনৈতিক নানা কারণে উত্তাল ভারতবর্ষের বুকে এমন একটা বিদ্রোহ কিন্তু অগ্নিতে ঘৃতসংযোগের কাজই করেছিল।
সাম্প্রতিক পোস্ট
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে স্বাধীনতার পূর্বকাল পর্যন্ত ভারতবর্ষের রাজনীতি নানারকম জট-জটিলতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসে জার্মানির পতনের ফলে বিশ্বযুদ্ধের অবসান হলেও এশিয়া ভূখন্ডে তখনও কিন্তু জাপানের সঙ্গে যুদ্ধ চলছিল। সেই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য ভারতের সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল। এই যুদ্ধে রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অন্যদিকে আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিচারকে কেন্দ্র করে সারা দেশে স্কুল-কলেজ, অফিস-কাছারিতে ধর্মঘট পালিত হচ্ছে। রসিদ আলির বিচার শুরু হলে হিন্দু-মুসলিম লক্ষ লক্ষ মানুষ ও সংগ্রামী ছাত্রদের প্রতিবাদে সরকার বিচলিত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যে তখন গণবিক্ষোভ আর হরতাল চলছে। এমনকি পুলিশ বাহিনী, বিমান বাহিনী, ডাক ও তার বিভাগ ইত্যাদি প্রত্যেক ক্ষেত্রে অসন্তোষ দেখা দেয়। একই সময়েই ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতীয় নৌবিদ্রোহ আছড়ে পড়েছিল।
ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মীদের সরকার থেকে অত্যন্ত নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ করা হত, ইংরেজ অফিসাররা তাদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ ব্যবহার করতেন এমনকি বেতনের ক্ষেত্রেও ছিল বৈষম্য। একই কাজে নিযুক্ত ইংরেজ কর্মচারীরা ভারতীয় সেনাদের থেকে অনেক বেশি সুযোগসুবিধা ভোগ করত। ভারতীয় নৌসেনারা একেবারেই সামান্য বেতন পেতেন। নৌসেনাদের এই যে সামগ্রিকভাবে এক হতাশাজনক জীবনযাত্রা, ইংরেজ কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারী আচরণ, বেতনের বৈষম্য ইত্যাদির ফলে তাদের ভিতরে দীর্ঘদিন ধরে একটা ক্ষোভ জমতে থাকে।
১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বোম্বাইয়ের নৌ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘ এইচএমআইএস তলোয়ার’ নামক জাহাজে প্রায় ১৫০০ নাবিক পরিবেশিত অখাদ্য খাবার গ্রহণে অস্বীকার করে। এভাবেই নৌবিদ্রোহের গোড়াপত্তন হয়েছিল।
১৯ ফেব্রুয়ারি বোম্বে হারবারে বিদ্রোহীরা ‘তলোয়ার’-এ (HMIS Talwar) মিলিত হয় তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নেভাল সেন্ট্রাল স্ট্রাইক কমিটি নির্বাচন করতে এবং চার্টার অব ডিমান্ড প্রণয়ন করতে। ধর্মঘট কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন এম. এস. খান। কর্তৃপক্ষের কাছে যে সমস্ত চাহিদার কথা সেই চার্টার অব ডিমান্ডের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল — সমস্ত ভারতীয় বন্দীদের মুক্ত করতে হবে, নিঃশর্তভাবে সমস্ত আইএনএ কর্মীদের মুক্ত করতে হবে, ইন্দোনেশিয়া ও মিশর থেকে সমস্ত ভারতীয় কর্মীদের প্রত্যাহার করতে হবে, বেতন, পারিবারিক সুযোগসুবিধা ইত্যাদি সমস্ত ক্ষেত্রেই রয়্যাল নেভির সঙ্গে সমতা থাকতে হবে, ভারতীয়দের সর্বোত্তম মানের খাদ্যপ্রদান পরিসেবার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, ভারতীয় অফিসার এবং সুপারভাইজার নিযুক্ত করতে হবে ইত্যাদি।
১৯ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশদের পতাকা ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে দিয়ে বিদ্রোহীরা জাহাজে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ এবং কমিউনিস্ট পার্টি—এই তিন দলের পতাকা উত্তোলন করে। রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির নাম বদলে নাবিকেরা নতুন নামকরণ করেন ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল নেভি’ (Indian National Navy)। এখানে উল্লেখ্য যে, সে সময় আইএনএবাহিনীর বিচারের (INA Trials) কথা ও সেই সূত্রে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আইএনএ-এর ইম্ফল অবরোধ এবং বার্মায় একের পর এক লড়াইয়ের ঘটনাগুলি ওয়্যারলেস সেট এবং মিডিয়ার মাধ্যমে নাবিকদের কানে আসছিল, যা তাদের ভীষণভাবেই উদ্দীপ্ত ও প্রাণিত করে তুলেছিল। উচ্চপদস্থ অফিসারদের আদেশ প্রত্যাখান করতে থাকে নিম্নস্তরের নাবিকেরা। তারা ঘোষণা করে যে, জাতীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়া তারা আর কারও আদেশকে মান্যতা দেবে না। একদিনের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন বন্দরে আরও ২২টি জাহাজে এবং বোম্বেরই অন্য ১২টি উপকূলীয় ঘাঁটিতে ছড়িয়ে পড়ে। ওই দিন ক্যাসাল ব্যারাকে বোম্বাইয়ের সমস্ত রণতরি এবং প্রায় ২০ হাজার নাবিক ও কর্মী বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিল।
কেবল জাহাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না নৌবিদ্রোহ। শহরের মধ্যেও বিক্ষোভ, আন্দোলন শুরু হয়। ট্রাক থেকে পেট্রোল বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হয়। প্রিন্স অব ওয়েলস মিউজিয়ামের বাইরের ট্রামলাইনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। মার্কিন তথ্য অফিসে অভিযান চালিয়ে ভিতরে অবস্থিত আমেরিকান পতাকা রাস্তায় নামিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। ক্রমে ক্রমে নৌবিদ্রোহ মাদ্রাজ, কলকাতা, কোচিন, করাচি ইত্যাদি নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। করাচিতে নাবিকেরা ব্রিটিশ জাহাজে অগ্নিসংযোগ করে দেয়।
২০ ফেব্রুয়ারি সকালে জানা যায় যে বোম্বাই হারবারের সমস্ত জাহাজ এবং নৌ-ঘাঁটি বিদ্রোহীরা দখল করে নিয়েছে। ভারসোভায় অবস্থিত ‘মাচলিমার’ নামে একটি অ্যান্টি-সাবমেরিন ট্রেনিং স্কুল, এইচএমআইএস কাকৌরি সেন্টার, ট্রম্বে দ্বীপে মহুল ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন স্টেশন, এইচএমআইএস চিতা নামক একটি দ্বিতীয় ডিমোবিলাইজেশন সেন্টার ইত্যাদিও বিদ্রোহীদের কবলে চলে যায়। বোম্বাইয়ের বিদ্রোহীরা কংগ্রেস, মুসলিম লিগ এবং কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা নিয়ে রাস্তায় মিছিল বের করেন। তারা অস্ত্রাগার লুন্ঠনও চালান। নৌ-সেনাপতি অ্যাডমিরাল গডফ্রে বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেও তাতে কোন কাজই হয়নি। গডফ্রে তখন স্থলবাহিনীকে কামান দাগার নির্দেশ দিলেও মারাঠা বাহিনীরা তা অমান্য করে ব্যারাকে ফিরে যান।
২১ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সেনাবাহিনী গোলাগুলি-সহ নৌসেনাদের ওপর আক্রমণ চালায়। প্রায় সাত ঘন্টা ধরে দুই পক্ষের মুখোমুখি সংঘর্ষ চলে। বোম্বাইয়ের রাজপথ রক্তে ভেসে যায়। ঠিক তার পরেরদিন, ২২ ফেব্রুয়ারি বিদ্রোহীদের সমর্থনে বোম্বাইতে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করা হয়। প্রায় ১০ লক্ষ শ্রমিক এই ধর্মঘটে অংশ নিয়েছিল। পুলিশ কিন্তু সেই শোভাযাত্রার উপরেও গুলি চালিয়েছিল। রাস্তায় এবং ডক-এলাকায় তখন আবারও রক্তাক্ত সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল। ২২ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি কিন্তু লাগাতার ব্যাপক গণ-আন্দোলন চলতে থাকে। উন্মত্ত বিদ্রোহীরা একে একে ইম্পেরিয়াল ব্যাঙ্কের শাখাগুলি, পুলিশ ফাঁড়ি, পোস্ট অফিস ইত্যাদি তছনছ করতে শুরু করে। সামরিক বাহিনীর চল্লিশটি লরি তাদের হাতে ধ্বংস হয়। সেই একই সময়ে আবার বোম্বাই, পুনা ও অন্যান্য স্থানে বিমান বাহিনীর পাইলট ও কর্মীরা ধর্মঘট শুরু করেছিল। এমনকি জব্বলপুরের স্থলবাহিনীও বিদ্রোহের ঘোষণা করেছিল।
নৌ-বিদ্রোহীরা ভেবেছিলেন তাঁরা জাতীয় নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে নানারকম সহযোগিতা পাবেন, তাদের সেই ভাবনা কিন্তু ব্যর্থ হয়। জওহরলাল নেহেরু, বল্লভভাই প্যাটেল, আজাদ এমনকি স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী কিন্তু এই বিদ্রোহের নিন্দা করেছিলেন। গান্ধীজী এও বলেন যে, ইংরেজদের ব্যবহার অপছন্দ হলে নাবিকরা পদত্যাগ করতে পারেন। জিন্না ও লিয়াকৎ আলি খান বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। গডফ্রে যখন গোলাবর্ষণের মাধ্যমে বোম্বাই শহর ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন তখন বল্লভভাই প্যাটেলের মধ্যস্থতায় এবং সর্দারজীর নির্দেশেই বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করেন। ১৯৪৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শহরের সামরিক বাহিনী সফলভাবে কারফিউ জারি করবার পর থেকে অস্থিরতাও হ্রাস পেতে শুরু করে।
আপাতভাবে দেখলে নৌবিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক এর গুরুত্বকে অস্বীকার করেননি। ড. সুমিত সরকার এই বিদ্রোহকে আজাদ হিন্দ ফৌজের মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন। ঐতিহাসিক রজনী পাম দত্ত বলেছেন এই বিদ্রোহ নবযুগের সূচনা করেছিল। এই বিদ্রোহের ফলেই ইংরেজ সরকার আতঙ্কিত হয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে ভারতে মন্ত্রী মিশন পাঠিয়েছিল। যদিও এই মন্তব্যকে অনেকেই অসত্য বলে মনে করেছেন। এমনকি কেউ কেউ মনে করেছেন এই বিদ্রোহ জনমানসে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। এমন মিশ্র প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় স্বাধীনতার প্রাক্কালে নৌবিদ্রোহ কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের ভিত একেবারে মূল থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘স্বদেশ, সভ্যতা ও বিশ্ব’, জীবন মুখোপাধ্যায়, শ্রীধর পাবলিশার্স, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ, জানুয়ারি, ২০২১।
- https://en.m.wikipedia.org/
- https://amritmahotsav.nic.in/
- https://www.drishtiias.com/
- https://marxbadipath.org/


আপনার মতামত জানান