ইতিহাস

পরেশলাল রায়

ভারতীয়দের মধ্যে মুষ্টিযুদ্ধের প্রচলন করে এবং বিশ্বের দরবারে একজন শ্রেষ্ঠ ভারতীয় মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে তুলেছিলেন যিনি তিনি পরেশলাল রায় (Paresh Lal Roy)। ভারতে মুষ্টিযুদ্ধ তথা বক্সিংকে জনপ্রিয় করে তোলেন পরেশলাল রায় । ‘ভারতীয় মুষ্টিযুদ্ধের জনক’ হিসেবে আজও ইতিহাসে খ্যাতিমান তিনি।

 ১৮৯৮ সালের ২০ ডিসেম্বর অধুনা বাংলাদেশের বরিশাল জেলার লাখোটিয়া গ্রামে পরেশলাল রায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম পিয়ারীলাল রায় এবং মায়ের নাম ললিতা রায়। এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে পরেশলাল রায়ের বড় হওয়া। তাঁর বাবা পিয়ারীলাল রায় ছিলেন কলকাতার সরকারী মামলা পরিচালনার (Public Prosecution) পরিচালক। তাঁদের ছয় সন্তান – তিন ছেলে যথাক্রমে পরেশলাল, ইন্দ্রলাল, ললিতকুমার এবং তিন মেয়ের নাম লীলাবতী, মীরাবতী ও হীরাবতী। পরেশলাল ছিলেন সকলের মধ্যে তৃতীয় সন্তান। তাঁর ভাই ইন্দ্রলাল রায় ছিলেন আরেক বিখ্যাত ব্যক্তি যিনি ভারতের প্রথম যুদ্ধবিমান-চালক এবং পশ্চিমী চিকিৎসাশাস্ত্রে পারদর্শী ভারতের অন্যতম প্রথম ডাক্তার ডা. সূর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তী ছিলেন তাঁর দাদু। ফলে এক নক্ষত্রখচিত পরিবারের সন্তান পরেশলাল রায় ছিলেন আরেক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। পরেশলাল রায় পরবর্তীকালে এক আইরিশ মহিলাকে বিয়ে করেন। তাঁদের সন্তানের নাম প্রণয়লাল রায় যিনি এন ডি টিভি (NDTV) সংবাদ চ্যানেলের প্রতিষ্ঠাতা।

কলকাতায় জন্ম হলেও পরেশলাল রায়ের প্রাথমিক পড়াশোনা এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবন কেটেছে ইংল্যাণ্ডে। ১৯০১ সাল থেকেই পিয়ারীলাল রায় এবং তাঁর পরিবার-সন্তানেরা ইংল্যাণ্ডে চলে আসেন। পরেশলাল ১৯১১ সাল নাগাদ পশ্চিম লণ্ডনের ৭৭ নং ব্রুক গ্রিন এলাকায় থাকতেন এবং ১৯১৪ তে বাড়ি বদল করে চলে আসেন ১৫ নং গ্লেজ্‌বি রোডে। লণ্ডনের সেন্ট পলস্‌ স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়। মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি কেমব্রিজের তৎকালীন বক্সিং-প্রশিক্ষক এবং ‘ফেদারওয়েট বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ বিলি চাইল্ডস্‌-এর ( Billy Childs) কাছে বক্সিং শিখতে শুরু করেন। জিম ড্রিসকল (Jim Driscoll) নিজে পরেশলাল রায়ের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ফলে তিনি স্কুল-চ্যাম্পিয়ন হন। পরবর্তীতে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতক উত্তীর্ণ হন এবং সেই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়েই অক্সব্রিজ থেকে বক্সিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়-চ্যাম্পিয়ন হন। সেইসঙ্গে এই চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে তিনি ‘অক্সফোর্ড ব্লু’ (Oxford Blue) উপাধি পান। এশিয়ার মধ্যে পরেশলাল রায়ই ছিলেন প্রথম ‘অক্সফোর্ড ব্লু’ বিজয়ী। ১৯১৯ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ভারতে ফিরে আসেন। এর মধ্যে তাঁর বক্সিং-চর্চা থামেনি। পরবর্তীকালে বক্সিংই পরেশলালের একমাত্র পরিচিতি হয়ে ওঠে। ১৯১৪ সালে তিনি ইংল্যাণ্ডের ‘ব্যাণ্টামওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ’ (Bantemweight Championship) জেতেন, বক্সিং ছাড়াও শ্যুটিং এবং ঘোড়ায় চড়াতেও দক্ষ ছিলেন তিনি। সম্ভবত তিনিই ভারতের প্রথম অপেশাদার জকি যিনি রেসের মাঠে ঘোড়া চালিয়েছেন।

তবে বক্সিং ছাড়া প্রত্যক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাও তাঁর ছিল। বক্সিং-এ পরিচিতির অনেক আগে তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল সেনাবাহিনীর কাজের মধ্যে দিয়ে। ১৯১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর তিনি ব্রিটিশের ‘আপার-ক্লাস অনারেব্‌ল আর্টিলারি’র (Upper-class Honourable Artillary) সংরক্ষিত ব্যাটেলিয়ানে নাম নথিভুক্ত করেন। এর সঙ্গে সঙ্গেই সাগরপাড়ি দিয়ে বিলেতে যাবার চাকরির চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। কয়েকমাস প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরে তিনি ফ্রন্টের উদ্দেশে রওনা দেন এবং ১৯১৫ সালের ১ মে ফার্স্ট ব্যাটেলিয়ানের সঙ্গে তৃতীয় বিভাগে যোগ দেন। ততদিনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। পরেশলাল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। ১৯১৬ সালের জুন মাস থেকে ১৯১৭’র জুলাই মাস পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তিনি ‘রয়্যাল ন্যাভাল ডিভিশন’-এর (Royal Naval Division) হয়ে কাজ করেছেন। এই বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়েই তিনি ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীতে ‘লেফটেন্যান্ট’ পদ লাভ করেন এবং তাঁর ভাই ইন্দ্রলাল রায় ব্রিটিশ বাহিনীর ‘রয়্যাল ফ্লাইং কর্পস’-এ (Royal Flying Corps) কিংস কমিশন হন। একইসময়ে পরেশলাল তাঁর ভাইয়ের নেতৃত্বের অনুসরণে ‘রয়্যাল এয়ার ফোর্স’-এ যোগ দিতে চেয়েছিলেন। সেই মতো ১৯১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘অনারেব্‌ল আর্টিলারি কোম্পানি’ থেকে অব্যাহতি নিয়ে রয়্যাল এয়ার ফোর্সে যোগদানের জন্য বাড়ি পাঠানো হয় তাঁকে। কিন্তু শেষমেশ যুদ্ধের জন্য যোগ্য প্রমাণিত হননি তিনি। এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনকালে কয়েক লক্ষ ভারতীয় ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় লণ্ডনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কিছু পুরুষ ছিলেন যারা ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দেন। কিন্তু প্রবাসী ভারতীয়দের সেকালে যুদ্ধক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবক হওয়া ছাড়া আর কোনো অধিকার ছিল না। ব্রিটিশ রেজিমেন্টে প্রবেশ করা তাদের পক্ষে একপ্রকার দুরূহ ছিল। রেডক্রশে কাজ করার সুযোগ পেলেও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে সরাসরি নিযুক্ত হতে পারতেন না কোনো ভারতীয়। এভাবে মহাযুদ্ধকালে ভারতীয় হয়েও ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিলেন যে দুই উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব তাঁদের মধ্যে পরেশলাল রায় আর তাঁর ভাই ইন্দ্রলাল রায় অন্যতম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের এই পর্বে তিন বছর ফ্রান্সে ছিলেন পরেশলাল রায়। কখনো তাঁকে ট্রেঞ্চে-পরিখায় বা বাঙ্কারে কাজ করতে হয়, কখনো বা যুদ্ধের মালমশলা পাঠানোর কাজে রাস্তায় নামতে হয়। সেইসময় ঐ রাস্তাগুলিতে বোমা কিংবা গোলা-গুলিতে প্রাণ যাবার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। তবু তিনি ভীত হননি। এমনকি ট্রেঞ্চের কাজে একবার গুরুতর আহত হয়েছিলেন পরেশলাল রায়।  

১৯১৯-এ দেশে ফিরে পরেশলাল রায় বেঙ্গল রেলওয়েতে ‘ট্রাফিক সুপারিনটেণ্ডেন্ট’ হিসেবে যোগ দেন। রেলওয়ে বোর্ডের ডিরেক্টর এবং ক্রমে ক্রমে ম্যানেজার পদে উন্নীত হন তিনি। ১৯২০ সাল নাগাদ অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে বক্সিং তথা মুষ্টিযুদ্ধ খেলা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ভারতীয়দের মধ্যে এই খেলাটিকে জনপ্রিয় এবং সংগঠিত করে তোলার জন্য বালিগঞ্জে একটি বক্সিং প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালু করেছিলেন পরেশলাল রায় ১৯২৮ সালে। এর নাম দেন ‘দি বেঙ্গল অ্যামেচার বক্সিং ফেডারেশন’। পরেশলাল ছিলেন এই সংস্থার সম্পাদক এবং পরে সভাপতি। ঐ বছরই তিনি কলকাতায় প্রথম ‘আন্ত: রেলওয়ে বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ চালু করেন। ১৯৩৩ সালে সামরিক বাহিনী এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আয়োজিত মুষ্টিযুদ্ধ প্রতিযোগিতায় পরেশলাল রায়ের ছাত্র সন্তোষ দে চ্যাম্পিয়ন হন। তাঁর কৃতী ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন প্রমথ চৌধুরী, ফণীন্দ্র কৃষ্ণ মিত্র, নগেন চ্যাটার্জি, জোয়াকিম্‌ সি.এ.মিনুস (Joaquim C.A.Minus), আবুলাল, জনি নাটাল, আর. অস্টিন, ডি. গ্যাসপার, কার্তিক দত্ত প্রমুখ। পরেশলাল নিজে একজন অপেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা হলেও, ওল্ড এম্পায়ার থিয়েটারে সেকালের ‘ব্যান্টামওয়েট চ্যাম্পিয়ন’ এডগার ব্রাইটের বিরুদ্ধে লড়েন এবং তাঁকে পরাজিত করেন। তাছাড়া ফিলিপিন্সের এক মুষ্টিযোদ্ধা ইয়ং টারলিকেও তিনি পরাজিত করেন। তাঁর প্রচেষ্টাতেই কলকাতার বাইরে জব্বলপুর, লাহোর, ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই প্রভৃতি শহরে বক্সিং খেলাটি প্রচলিত হয়। আমৃত্যু তিনি কলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছে ‘নেতাজি সুভাষ ইনস্টিটিউট’ এবং ‘স্কুল অফ ফিজিক্যাল কালচার’-এ রেলওয়ে বোর্ডের তরুণ-যুবকদের বক্সিং প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

১৯৭৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৮৭ বছর বয়সে পরেশলাল রায়ের মৃত্যু হয়।   

একজন ভারতীয় খ্রিস্টান হওয়ার সুবাদে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে ভবানীপুর কবরস্থানে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর স্মৃতিতে ভারতীয় রেলওয়ে শিয়ালদহ স্টেশনের ভিতর ‘মণ্ডল রেল প্রবন্ধক কার্যালয়’-এর পরে পি.এল.রায় ইনডোর স্টেডিয়াম স্থাপন করেছে ২০১১ সালে এবং সেই স্টেডিয়ামের সামনে তাঁর বিরাটাকায় মর্মর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। মূর্তি উন্মোচন করেছিলেন পূর্ব রেলওয়ের উপ-মুখ্য ব্যবস্থাপক (Additional General Manager) এবং ক্রীড়া সংগঠনের সভাপতি এ.কে.গুপ্ত।

কম খরচে বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


তথ্যসূত্র


  1. ‘বিলাতে যুদ্ধকার্য্যে ভারতবাসী’, প্রবাসী পত্রিকা, অগ্রহায়ণ ১৩২৬, ১৯শ ভাগ ২য় খণ্ড, পৃ ১৭১
  2. https://greatwarlondon.wordpress.com/
  3. https://peoplepill.com/
  4. https://en.wikipedia.org/
  5. https://www.getbengal.com/
  6. https://news.webindia123.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

নেতাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সববাংলায় এর শ্রদ্ধার্ঘ্য



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন