ইতিহাস

সূর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তী

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন প্রথম যে ভারতীয়, তিনি সূর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তী (Soorjo Coomer Goodeve Chuckerbutty)। ‘ইণ্ডিয়ান মেডিক্যাল সার্ভিস’ (IMS) পরীক্ষায় ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম উত্তীর্ণ হন। ১৮৫২-তে লণ্ডনের ‘মেডিক্যাল টাইমস্‌ অ্যান্ড গেজেট’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রগতি বিষয়ক আলোচনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছিল যে ‘নেটিভ’ হয়েও সূর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তী আধুনিক চিকিৎসাক্ষত্রে ঔষধবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন। ‘ভারতীয় মুষ্টিযুদ্ধের জনক’ পরেশলাল রায় ও ভারতের প্রথম যুদ্ধবিমান-চালক ইন্দ্রলাল রায় ছিলেন তাঁর নাতি।

আনুমানিক ১৮২৪ সালে বাংলাদেশের ঢাকার বিক্রমপুর ডিভিশনের কনকসার গ্রামে সুর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তীর জন্ম হয়। তবে তাঁর জন্মসাল নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। কারো কারো মতে তাঁর জন্মসাল ১৮২৬ অথবা ১৮২৭-ও হতে পারে। তাঁর বাবার নাম রাধামাধব চক্রবর্তী এবং মায়ের নাম জানা যায় না। তাঁর বাবা ছিলেন একজন উকিল। এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। ভাগ্যের পরিহাসে শৈশবেই মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি পিতৃ-মাতৃহারা হন।

তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় গ্রামের পাঠশালায়। সেখানে তিনি বাংলা, সংস্কৃত এবং পার্সি ভাষা শেখেন। তবে বিদ্যাশিক্ষার আগ্রহে তেরো বছর বয়সে তিনি প্রায় ৬০ মাইল পথ হেঁটে কুমিল্লায় একটি ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন। এখানে তিনি আরো নানা ছাত্রের সঙ্গে শ্রী গোলোকনাথ সেনের বাড়িতে তাঁর রান্না করে দেওয়ার বিনিময়ে থাকতেন। এই গোলোকনাথ সেন ছিলেন কুমিল্লার জেলা আদালতের কর্মচারী। পরে কলকাতায় এসে কলুটোলা ব্রাঞ্চ স্কুলে এবং তারপরে হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৪৩ সালে মি. আলেকজান্ডারের সহায়তায় সূর্যকুমার প্রথমবার মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষা দিলেও অসফল হন। পরের বছর ১৮৪৪ সালে মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ড. হেনরী গুডিভের সহায়তায় তিনি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে সফল হন। সেসময় মেডিকেল কলেজের সুপারিনটেণ্ডেন্ট ছিলেন মি. মাউন্টফোর্ড যোসেফ ব্রামলি। তাঁরই উদ্যোগে মেডিকেল কলেজে পাশ্চাত্য ধারায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চার শুরু হয়।

মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন সূর্যকুমার একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান এবং পরিশ্রমী ছাত্র হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। অবশেষে ১৮৪৫ সালের ১৮ মার্চ উচ্চতর শিক্ষার জন্য ‘বার্ক বেণ্টিঙ্ক’ জাহাজে চেপে তিনি ইংল্যাণ্ড যাবার সুযোগ পান। তাঁর বিলেতযাত্রায় সঙ্গী ছিলেন ভোলানাথ বসু, গোপালচন্দ্র শীল এবং দ্বারকানাথ বসু। ডা. হেনরী গুডিভই এই বিলেতযাত্রার ব্যয়ভার বহন করেছিলেন। তবে দ্বারকানাথ ঠাকুরও দুজন ছাত্রের ব্যয়ভার বহন করেছিলেন। ১৮৪৮ সালের ১২ মে সূর্যকুমার ‘রয়্যাল কলেজ অফ সার্জেন্স্‌’-এর সদস্যপদ (MRCS) লাভ করেন। এর আগে যদিও ১৮৪৭-এ তিনি লণ্ডনের এম.বি (M.B)-র প্রথম পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। পরে ১৮৪৯ সালে চূড়ান্ত পরীক্ষায় দ্বিতীয় হন তিনি। একই বছর তিনি এম.ডি পরীক্ষাতেও প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় হন এবং লণ্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ থেকে তুলনামূলক শারীরবিদ্যায় দক্ষতার সুবাদে স্বর্ণপদক লাভ করেন। এই তুলনামূলক শারীরবিদ্যা বিভাগের প্রধান ডা. গ্রান্ট তাঁকে ফরাসি এবং জার্মান ভাষা শিখিয়েছেন, এমনকি তার সাথে ইউরোপ জুড়ে তিনটি অভিযানে সূর্যকুমার চক্রবর্তীকে সঙ্গীও করেছেন। ১৮৪৮ সালের ১৪ অক্টোবর লণ্ডনের ‘ল্যান্সেট’ পত্রিকায় তাঁর খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণের সংবাদ প্রকাশ পায়। সেই থেকে সূর্যকুমার চক্রবর্তী থেকে তাঁর নাম হয় সূর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তী। ১৮৫০-এ তিনি দেশে ফিরে আসেন।

দেশে ফিরে কলকাতা মেডিকেল কলেজে সহকারী চিকিৎসকের কাজ পান সূর্যকুমার। যদিও লণ্ডনে তাঁর পৃষ্ঠপোষক স্যার এডওয়ার্ড রেয়্যান তাঁকে মেডিকেল কলেজে অধ্যাপনার কাজে নিয়োগ করার প্রস্তাব লিখে পাঠালেও শেষ পর্যন্ত গ্রাহ্য হয়নি। ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে তিনি নিষ্ঠা সহকারে কাজ করে থাকেন যতক্ষণ না পর্যন্ত তিনি মেডিকেল কলেজে মেটিরিয়া মেডিকা এবং ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বিষয়ের অধ্যাপক রূপে নিযুক্ত হন। এরপরে ব্রিটিশ সরকারের আই.এম.এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৮৫৫ সালের ২৪ জানুয়ারি থেকে তিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জেন পদে বহাল হন। সূর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তীই ছিলেন প্রথম ভারতীয় সার্জেন যিনি ‘সার্জেন মেজর অফ বেঙ্গল আর্মি’ পদে উন্নীত হন ১৮৭৩-এ। ‘মেডিক্যাল টাইমস্‌ অ্যান্ড গেজেট’, ‘ল্যান্সেট’, ‘ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল’, ‘ইণ্ডিয়ান মেডিক্যাল গেজেট’ ইত্যাদি বিখ্যাত জার্নালে তাঁর মূল্যবান গবেষণাপত্রগুলি প্রকাশিত হত। সেযুগে চিকিৎসাক্ষেত্রে বিশেষপত্র তথা স্পেশালাইজেশনের কোনো নিয়মকানুন ছিল না। তাই কলেরা, বসন্ত, আন্ত্রিক, আমাশয়, মৃগীরোগ ইত্যাদি নানাবিধ রোগব্যাধি বিষয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণাপত্রগুলির দৃষ্টান্ত এইরূপ : ‘Cholera, its symptoms, clinical history, pathology, diagnosis, prognosis, treatment and prophylaxis’ (১৮৬৭),  ‘On the Pathology of Hepatic Abscess as a Result of Dysentery’ (১৮৬৭), ‘Cases illustrative of the Pathology of Dysentery’, ‘A Case of Lacerated and Contused Wound of the Scrotum’, ‘A Clinical Retrospect of Hospital Experience of Civil Medical Cases’, ‘The Connection Between Rheumatism, Pericarditis and Jaundice’ (১৮৬৪)।

এছাড়াও ১৮৫২ সালে লণ্ডনের ‘মেডিক্যাল টাইমস্‌ অ্যান্ড গেজেট’ জার্নালে তিনি মৃগীরোগ সংক্রান্ত একটি নোট লেখেন। কলেরা এবং আন্ত্রিক রোগের বিষয়ে তাঁর লেখাটি ‘ইণ্ডিয়ান অ্যানালস্‌’-এ প্রকাশ পায়। যে সময় অনুবীক্ষণের মাধ্যমে জীবাণু শনাক্তকরণের পদ্ধতিই আবিষ্কৃত হয়নি, তখন সূর্যকুমারের এই গবেষণা সত্যিই ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রোগের পরিসংখ্যান নিয়ে ভেবেছেন সূর্যকুমার। তাঁর আগে ইংরেজ চিকিৎসক রোনাল্ড মার্টিন ‘Note on the Medical Topography of Calcutta and its Suburbs’ প্রবন্ধে কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে তথ্য পরিসংখ্যান দিয়েছিলেন, তবু সূর্যকুমার নিজের প্রচেষ্টায় এবং গবেষণার ফলে জানান ১৮৫০ সালে মেডিক্যাল কলেজের বহির্বিভাগে তাঁর অধীনে মোট ৫৮৩৯ জন রোগী ছিলেন যার মধ্যে ২৫-৩০ বছর বয়সের রোগীই ছিল সংখ্যাধিক। রোগীদের মধ্যে ৪৮৩৫ জন পুরুষ এবং ১০০৪ জন ছিলেন স্ত্রীলোক। সেইসব রোগীদের রোগ নির্ণয় করে তাঁদের ১৬টি রোগের শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেন তিনি। মনে রাখার বিষয় এই যে, তিনিই কলকাতায় প্রথম ‘টাইফাস’ জীবাণুর প্রকোপে রোগের অস্তিত্ব খুঁজে পান এবং ১৮৬৪ সালে তাঁর চিকিৎসা করেন তিনি। রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি জন্ম-মৃত্যুর হার নথিভুক্ত করার কথা প্রথম ভেবেছেন এবং সেইমতো হাসপাতালগুলিতে আজও এই নথি যত্নসহকারে সংগৃহীত হয়ে থাকে। রিউমেটিক হার্ট রোগে ভারতীয়রাও যে আক্রান্ত হয় তা প্রথম দেখান সূর্যকুমার। ম্যালেরিয়া রোগের ওষুধ হিসেবে তিনি প্রথমে কুইনাইন ও ফেরাস সালফেট-ম্যাগনেশিয়াম সালফেট প্রয়োগের পর ফেরাস কার্বনেট ও সিঙ্কোনা প্রয়োগ করে সুফল পান। ১৮৬৪-’৬৫ সালে তাঁকে কলকাতার হাসপাতালগুলিতে প্রাণঘাতী জলবসন্ত রোগের নিরাময়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর নির্দেশেই ক্যাম্পবেল মেডিকেল কলেজে শুধুমাত্র সংক্রামক রোগের জন্য পৃথক ওয়ার্ড খোলা হয়। পরবর্তীকালে এই ভাবনা থেকেই আধুনিক বেলেঘাটা আই.ডি হাসপাতাল স্থাপিত হয়।  

ভারতের মানুষের মধ্যে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা প্রসার করতে চেয়েছিলেন সূর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তী। শিক্ষাবিস্তারেও তিনি অত্যন্ত সচেষ্ট ছিলেন। ভারতীয় যুবকদের তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে ক্রিকেট, জিমন্যাসিয়াম এবং তলোয়ার চালনায় পারদর্শী হয়ে উঠতে বলেছেন। এক অর্থে হয়তো বা তিনি জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। ১৮৫১ সালে বেথুন সোসাইটি স্থাপনে ও পরিচালনায় উদ্যমী ছিলেন তিনি, সেইসঙ্গে বিদ্যোৎসাহিনী সভার সদস্য এবং ১৮৬৩-তে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য হিসেবে কলকাতা শহরের ‘জাস্টিস অফ পীস্‌’ নির্বাচিত হন সূর্যকুমার। কলকাতার জনস্বাস্থ্য, বাঙালিদের শারীরিক ও মানসিক শিক্ষা বিষয়ে যে বক্তৃতাগুলি দিয়েছিলেন সেগুলি ‘Popular Lectures on Subject of Indian Interest’ নামে ১৮৭০ সালে সংকলিত আকারে প্রকাশ পায়। অধ্যাপক ডা. হেনরি গুডিভ-এর শিশু চিকিৎসা বিষয়ে লেখা ‘Hints on Children in india’ বইটির চতুর্থ সংস্করণ সম্পাদনা করেছিলেন।  

১৮৭৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মাত্র ৫০ বছর বয়সে ক্রনিক অ্যাজমার প্রকোপে হৃদ্‌যন্ত্র বিকল হয়ে বিলেতে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন সূর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তীর মৃত্যু হয়।  

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


তথ্যসূত্র


  1. সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত এবং অঞ্জলি বসু (সম্পা:), শিশু সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, পৃ ৫৭৮
  2. বিস্মৃতপ্রায় বাঙালি বিজ্ঞানী, রণতোষ চক্রবর্তী,( প্রথম খণ্ড) জ্ঞানবিচিত্রা প্রকাশনী, কলকাতা, পৃ ১৮-২১
  3. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/
  4. https://en.wikipedia.org/
  5. https://www.cambridge.org/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন