সববাংলায়

হংসেশ্বরী মন্দির

বিভাগঃ ,

পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় প্রাচীন কালী মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত মন্দির হল হুগলী জেলার বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দির (Hangseswari Temple)। শাক্ত ধর্মাবলম্বী ও তান্ত্রিক সাধকদের কাছে এই মন্দিরটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেবী কালী এখানে হংসেশ্বরী রূপে পূজিতা হন। দেবী হংসেশ্বরী মূলত আত্মা ও জ্ঞানের প্রতীক। তান্ত্রিক নীতি অনুসারে এই মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছিল, যার স্থাপত্য, ভাস্কর্য, কারুকার্য সবেতেই রয়েছে অপরূপ বিশেষত্বের ছোঁয়া। এমনকি দেবী হংসেশ্বরীর সুন্দর মূর্তিটিও অন্যান্য কালী মূর্তির থেকে কিছুটা আলাদা। হংসেশ্বরী মন্দিরের জটিল গঠনশৈলী একদিকে যেমন দর্শনার্থীদের মোহিত করে আবার তেমন মন্দিরের স্নিগ্ধ, মনোরম ও শান্ত পরিবেশ ভক্তদের আধ্যাত্মিক ভাবনাতেও নিমজ্জিত করে।

হুগলীর বাঁশবেড়িয়ার রাজা নৃসিংহদেব রায় ছিলেন একজন দক্ষ ও প্রজাবৎসল শাসক। পাশাপাশি তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এক মহান ব্যক্তি। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে, আনুমানিক ১৭৯০ সালে (মতান্তরে ১৭৯২ সাল) তিনি বারাণসী পরিভ্রমণে যান এবং সেখানে গিয়ে হিন্দুধর্মের তন্ত্র সাধনা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তিনি বারাণসীর জনপ্রিয় সাধু বা সাধকদের থেকে তন্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। এইসময় তিনি মানবদেহের কুণ্ডলিনী চক্র ও এর ছয়টি কেন্দ্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। এরপর ১৭৯৮ সাল নাগাদ তিনি বাঁশবেড়িয়াতে ফিরে আসেন এবং তন্ত্র সাধনার কুণ্ডলিনী চক্রের উপর ভিত্তি করে একটি বিশাল মন্দির নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেন।

প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে রাজা নৃসিংহদেব তাঁর মা রানী হংসেশ্বরীর নামেই দেবী কালীকে এই মন্দিরে হংসেশ্বরী কালী রূপে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অন্য একটি মতানুসারে, তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী প্রতিটি মানুষের শ্বাস ছাড়ার সময় ‘হং’ শব্দটি আর শ্বাস নেওয়ার সময় ‘সঃ’ শব্দটি উচ্চারিত হয়, একে হংস মন্ত্র বলা হয়। আর এই মন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন মা হংসেশ্বরী। এখানে ‘হং’ দ্বারা পরম পুরুষ মহাকাল শিবকে আর ‘সঃ’ দ্বারা মাতৃশক্তি প্রকৃতিকে বোঝানো হয়েছে। তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের মতে, মানুষের শরীরের আধার হল কুণ্ডলিনী চক্র। আর এই চক্রকে নিয়ন্ত্রিত করে কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত করার জন্য যোগ, ধ্যান, সাধনা, প্রাণায়ম করতে হয়। রাজা নৃসিংহদেব দেবী হংসেশ্বরীকে এই মন্দিরে এই কুণ্ডলিনী চক্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী রূপেই স্থাপন করেছিলেন। রাজা বিশ্বাস করতেন যে, একমাত্র ওই কুণ্ডলিনী চক্র নিয়ন্ত্রণের মধ্যে দিয়েই দেবী হংসেশ্বরীর কৃপা লাভ সম্ভব।

১৭৯৯ সালে রাজা নৃসিংহদেব হুগলীর বাঁশবেড়িয়াতে হংসেশ্বরী মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করেন। কিন্তু ১৮০২ সালে মন্দিরের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর অর্থ অনটনের কারণে কিছু দিন মন্দিরের কাজ বন্ধ থাকে। তারপর ১৮১৪ সালে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রানি শঙ্করী স্বামীর ইচ্ছা অনুসারে মন্দিরের কাজ সম্পূর্ণ করে সর্বসাধারণের জন্য মন্দিরের দরজা খুলে দেন। এই মন্দির নির্মাণ করতে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ করা হয়েছিল।

বর্তমানে হংসেশ্বরী মন্দিরটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধীনে রয়েছে। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ মন্দিরের স্থাপত্য রক্ষা করার জন্য মন্দিরের উপরের তলায় জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ করে দিয়েছে। তাই ভক্ত বা দর্শনার্থীরা কেবল নীচের তলার দেবীমূর্তি ও স্থাপত্যশৈলীই দেখতে পায়।

মন্দিরটি বাংলার রত্ন স্থাপত্য শৈলীতে তৈরি। যদিও এর নির্মাণে অন্যান্য বিভিন্ন স্থাপত্যের প্রভাব রয়েছে। মন্দিরের কিছু অংশ বারাণসীর মন্দিরের আদলে নির্মাণ করা হয়েছে। রাজস্থানের জয়পুরের কারিগররা দক্ষতার সঙ্গে এই অপরূপ মন্দির নির্মাণ করে। রাজা নৃসিংহদেব বাংলার অন্যান্য মন্দিরের থেকে এই মন্দিরটিকে একটু আলাদা ভাবেই নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। অনেকে মনে করেন, তিনি আসলে এই মন্দির নির্মাণের মধ্যে দিয়ে নিজের তন্ত্র শিক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রানি শঙ্করীর ইচ্ছায় এই মন্দিরের স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত হয় রাশিয়ার স্থাপত্যশৈলী। তাই মন্দিরের গঠনে মস্কোর পকরোভস্কি ক্যাথিড্রালের (Pokrovsky Cathedral) সুস্পষ্ট সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।

হংসেশ্বরী মন্দিরটি দক্ষিণমুখী। মন্দিরের মাথায় ১৩টি চূড়া বা রত্ন রয়েছে। রত্নগুলি পদ্ম ফুলের মতো দেখতে। মন্দিরের আট কোণে আটটি, মাঝখানে চারটি আর কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি রত্ন। মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৭০ মিটার। মন্দিরটি ইট আর পাথর দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের চুনার থেকে এই মন্দির নির্মাণের জন্য বেলেপাথর আনা হয়েছিল। মন্দিরের চারিদিকে রয়েছে সুন্দর ও নির্জন বারান্দা। যেখান থেকে সবুজে ঘেরা সুন্দর গ্রাম দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া মন্দিরটির সারা গায়ে দেখা যায় পোড়ামাটির অপরূপ কারুকার্য। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এই মন্দিরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন। হংসেশ্বরী মন্দিরের মূল মিনারের উপর দিকে সূর্যদেবের একটি উজ্জ্বল ও ধাতব মূর্তি খোদাই করা আছে। মন্দিরের তিনতলায় কষ্টিপাথরের প্রায় বারোটি শিব লিঙ্গ রয়েছে। সবচেয়ে উপরের তলায় রয়েছে আর একটি বিশেষ শিব লিঙ্গ, যাকে পরম পুরুষোত্তম বলে মনে করা হয়।

হংসেশ্বরী মন্দিরের গঠন কৌশলে আগাগোড়া দেখা যায় তন্ত্র শিক্ষার বহিঃপ্রকাশ। যেমন- মন্দিরের পাঁচটি তলা মানবদেহের ইরা, পিঙ্গলা, বজরাক্ষ, সুষুম্না, চিত্রিণীকে নির্দেশ করে। এর তেরোটি চূড়া বা রত্ন মানুষের শরীরের তেরোটি চক্রকে নির্দেশ করে। তান্ত্রিক সাধুরা মনে করে যে সাধনার মাধ্যমে এই নাড়ী ও চক্রগুলি নিয়ন্ত্রিত করলে তবেই কুন্ডলিনী শক্তি জাগ্রত করা যায় এবং তারপরই মোক্ষলাভ সম্ভব হয়।এই কারণে মন্দিরের স্থাপত্য শিল্পকে অনেকে ‘তান্ত্রিক স্থাপত্যবিদ্যা’ বলেও অভিহিত করেছেন। এছাড়া মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে চূড়া পর্যন্ত বেশ কিছু সিঁড়ি ও গোপন সংযোগ পথ রয়েছে। সঠিক পথ না জানলে এই মন্দিরের ভিতরে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এইভাবে বোঝানো হয়েছে যে গুরু প্রদত্ত সঠিক পথই মানুষকে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে দেয়, নাহলে মানুষ সংসারের মোহে হারিয়ে যায়।

মূল মন্দিরের পাশে রয়েছে অনন্ত বাসুদেব মন্দির। এছাড়া অতীতে হংসেশ্বরী মন্দিরের কাছেই স্বয়ম্ভবা মহিষমর্দিনী নামক এক দুর্গামন্দির ছিল। যদিও বর্তমানে মন্দিরটির ধ্বংসাবশেষ ছাড়া বিশেষ কিছু বেঁচে নেই। দুর্গামন্দিরের দেবীমূর্তিটি বর্তমানে হংসেশ্বরী মন্দিরের গর্ভগৃহের বাঁ দিকের একটি ঘরে রাখা আছে।

হংসেশ্বরী মন্দিরের দেবী মূর্তিটি নীল নিম কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে, এই কাঠ গঙ্গা নদীতে ভেসে এসেছিল। রাজা নৃসিংহদেব এই কাঠ সংগ্রহ করেন এবং এই কাঠ দিয়েই দেবী মূর্তি নির্মাণের আদেশ দেন। দেবী মূর্তির গায়ের রঙ নীল। দেবী এখানে মূলাধার নামক গর্ভগৃহে অবস্থান করেন। এখানে পাথরের পঞ্চমুন্ডি বেদীর উপর শায়িত রয়েছে দেবাদিদেব মহাদেব। তাঁর নাভি থেকে বেরিয়ে এসেছে বারোটি পাপড়ি বিশিষ্ট একটি লাল পদ্ম যার উপর দেবী হংসেশ্বরী বসে র‍য়েছেন। দেবীর এক পা ভাঁজ করা আর একটি পা রয়েছে মহাকাল শিবের উপর। মা হংসেশ্বরী চতুর্ভুজা। তাঁর উপরের বাম হাতে রয়েছে তরবারি, নীচের বাম হাতে রয়েছে নরমুণ্ড, উপরের ডান হাতে অভয়মুদ্রা ও নীচের ডান হাতে আশীর্বাদের ভঙ্গিমা।

হংসেশ্বরী মন্দিরে নিত্য পূজা ও পশুবলি দেওয়া হয়। অনেক ভক্তই প্রতিদিন মা হংসেশ্বরীর উদ্দেশ্যে পূজা দিতে মন্দিরে আসেন। মন্দিরে বিশেষভাবে অনুষ্ঠিত হয় দীপান্বিতা কালী পূজা। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে এই বাৎসরিক পূজার আয়োজন করা হয়। এই সময় দেশ-বিদেশ থেকে বহু ভক্তের সমাগম হয় মন্দিরে। মন্দির আলোয় সেজে ওঠে। বছরের অন্যান্য দিন মায়ের রূপ থাকে শান্ত ও স্নেহময়ী। তবে দীপান্বিতা অমাবস্যার দিন দেবীকে ভয়ঙ্করী রূপে সাজানো হয়। এইদিনে দেবীর চুল থাকে সম্পূর্ণ খোলা, অঙ্গে কোনও বস্ত্র থাকে না, পরিবর্তে দেবীকে ফুল, মালা ও নানাবিধ অলঙ্কার দিয়ে সাজানো হয়। দেবীকে পরানো হয় রুপোর অলঙ্কার আর সোনার জিভ। সন্ধ্যা আরতির পর মা হংসেশ্বরীকে এই রাজবেশ পরানো হয়। এই দিনে সারা রাত ধরে দেবীর পূজা চলে। তারপর ভোরে মা হংসেশ্বরীর রাজবেশ পরিত্যাগ করিয়ে তাঁকে সাধারণ বস্ত্র পরিধান করানো হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading