ইতিহাস

বাংলায় ঘড়ির ইতিহাস

এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত মানুষের কাছে ঘড়ি ছিল অত্যন্ত অপরিহার্য। ঘড়ি ছাড়া কোন মানুষ নিজেকে ভাবতেই পারত না। সুন্দর একটা হাতঘড়ি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, আবার বাসগৃহে একটা টেবিল বা দেওয়াল ঘড়ি বাড়ির কৌলিন্য প্রকাশ করত। কিন্তু বিগত এক দশকে, মোবাইল ফোন এসে যাবার পরে, ঘড়ির সেই আভিজাত্য-কৌলিন্য একটু কমেছে সন্দেহ নেই। তবুও ঘড়ি ছিল, আছে, থাকবেই। এখানে আমরা বাংলায় ঘড়ির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করব।

ভাবলে অবাক লাগে, এই ঘড়ি সাত-আটশো বছর আগে পৃথিবীতে ছিলই না। প্রাচীনকাল থেকে সময় মাপার জন্য নানা দেশে নানা পদ্ধতি ছিল। দন্ড ঘড়ি, সূর্য ঘড়ি ইত্যাদি প্রাচীনকালে ব্যাবিলন, মিশর, চীন, ভারতে চালু ছিল রাজরাজাদের প্রয়োজনে। সাধারন মানুষের কাছে তখনো ঘড়ি কোনভাবেই পৌঁছাতে পারেনি। অবিভক্ত বাংলায় রাজা-মহারাজারা নরযন্ত্র বা নরঘড়ি চালু করেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নিচে ছিদ্রযুক্ত ৫ টি তামার বাটি, ১ টি জলপাত্র ও একটি পিতলের ঘন্টা দিয়ে এই ঘড়ি তৈরী হয়েছিল। ইংরেজরা এদেশে আসার পরেও এদেশে এই ঘড়ি বহাল তবিয়তেই চালু ছিল।

যতদূর জানা যায়, ১৭১৫ সালে এদেশে প্রথম কলকাতায় আধুনিক যান্ত্রিক ঘড়ির আমদানি করেন ইংরেজরা। নজরানা হিসাবে তাঁরা সেইসময় একটি ঘড়ি দিয়েছিলেন দিল্লীর মুঘল সম্রাটকে। ১৭৫২ সালে বঙ্গদেশের শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা উপহার হিসাবে পেয়েছিলেন একটি ঘড়ি। এদেশে প্রথম ঘড়ি কেনেন মীরজাফর, সেটা ১৭৫৮ সাল। ১৭৬০ সালের থেকে দেশীয় বিত্তবানেরা ঘড়ি কেনা শুরু করেন। ঘড়ির চাহিদার কথা মাথায় রেখে ১৭৬৫ সালে কলকাতার রাধাবাজারে প্রথম ঘড়ির দোকান স্থাপিত হয়েছিল। এইসব ঘড়ির খরিদ্দার ছিল ঢাকা, কলকাতা, মুর্শিদাবাদ এর মতো এলাকার রাজা, জমিদার, বিত্তবানেরা। তবে এই সমস্ত ঘড়িই ছিল বিদেশ থেকে আমদানি করা।

ডেভিড হেয়ার ১৮০০ সালে কলকাতায় প্রথম সাধারনের ব্যবহারের উপযোগী, স্বল্পমূল্যে ঘড়ি তৈরী শুরু করেন। নিজের বাড়ীতে কারখানা বসিয়ে ডেভিড হেয়ার এদেশে ঘড়িকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন। ১৮২০ সাল পর্যন্ত তিনি এই কাজ করেছিলেন। তারপর তিনি ঘড়ির ব্যবসা বন্ধু এডওয়ার্ডকে ১ লক্ষ টাকায় বিক্রি করে বাংলার শিক্ষা সংস্কারে মনোনিবেশ করেন। এরপর এডওয়ার্ড গ্রে’র হাত ধরে ঘড়ি ব্যবসা আরো প্রসারিত হয়।

কিন্তু তারপরে অবিভক্ত বঙ্গদেশে ঘড়ি ব্যাবসার সাথে যুক্ত হয়ে যায় শ্রী রামজীবন দত্তের নাম। দেশীয় বাঙ্গালী হিসাবে তিনিই প্রথম এদেশে ঘড়ি ব্যবসার সাথে যুক্ত হন। সুদূর ঢাকা থেকে কলকাতা, সব জায়গায় তাঁরা কয়েকপুরুষ ধরে ঘড়ি ব্যবসার কাজ চালিয়ে যান। বিশিষ্ট ঘড়ি ব্যবসায়ী হিসাবে এনারা ইংরেজদের আস্থাও অর্জন করেছিলেন। এই দত্ত বংশের ঘড়ির সেই ব্যবসা আজও রয়েছে কলকাতার কলেজ ষ্ট্রীটে।

কলকাতা শহরে একটা সময় প্রায় প্রতিটি নামীদামি ঘড়ি পাওয়া যেত। কিন্তু বহু দিন বস্তুটি কেবলমাত্র বিত্তবানের হাতে বা পকেটেই শোভা পেয়েছে। ১৯৬৬-৬৭ সাল নাগাদ সব থেক সস্তা হাতঘড়ি ছিল অ্যাংলো সুইস, ১০০ থেকে ১২৫ টাকা। এর পরের ধাপে ছিল সুইস প্রতিষ্ঠান ফাভ লিউবার ঘড়ি, ১৫০-২০০ টাকা। এটা সেই সময়, যখন পদস্থ সরকারি চাকুরেদের মাসিক বেতনই হত কুল্যে শ’দুয়েক টাকা।

আর বরাবরই প্রথম সারিতে থেকেছে টিশো, ওমেগা আর রোলেক্স। টিশোর দাম ছিল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। ওমেগা সি-মাস্টার পাওয়া যেত সাড় পাঁচশো ছশো থেকে হাজার এগারোশোর মধ্যে। ওমেগার কনস্টেলেশন ক্রোনোমিটার-এর দাম ছিল পনেরোশো টাকা। সব থেকে মহার্ঘ ছিল রোলেক্স পারপেচুয়াল ডেটজাস্ট, ২৯০০ টাকা। ভারতে রোলেক্সের এজেন্ট ছিল কুক এ্যন্ড কেলভি, এখনও আছে। তখন কলকাতা ছাড়া কুক অ্যান্ড কেলভির শাখা ছিল দিল্লি আর লাহোরে।

ঘড়ির ব্যবসায়ে দিল্লি, বম্বের নাম অনেক পরে যোগ হয়েছে। ১৮ শতক জুড়ে কলকাতারই বোলবোলাও। তার পর ছিল হায়দরাবাদ, যেখানকার নিজামদের ঘড়ির শখের কিছু নমুনা এখনও আছে সালার জং মিউজিয়ামে। ফাভ লিউবার নিজস্ব দপ্তর ছিল হায়দরাবাদে। অবশ্য কুক অ্যান্ড কেলভি সিমলাতেও ওমেগার দোকান খুলেছিল, যেখানে গরমের ছুটি কাটাতে সপার্ষদ এবং সপরিবারে যেতেন খোদ বড় লাটসাহেব।

১৮ শতকের শেষ পর্যন্ত কলকাতায় তাবড় সব ব্রিটিশ, ফরাসি আর সুইস ঘড়ি কোম্পানি ছিল। তাদের কলকাতার মেরামতিশালায় কাজ করতেন ও সব দেশ থেকে আসা দক্ষ কারিগরেরা। এদেশীয় কারিগরেরা সবাই সরাসরি তাঁদের থেকে কাজ শিখেছিলেন। ওমেগার কলকাতার কারখানায় যেমন এক সুইস মহিলা কারিগর ছিলেন, যাঁর দক্ষতা ছিল কিংবদন্তিপ্রায়। তিনি হাতে ধরে এদেশের অনেক ঘড়িমিস্ত্রিকে কাজ শিখিয়েছিলেন।

এঁরা বেশির ভাগই নিম্ন মধ্যবিত্ত হিন্দু বাঙালি পরিবার থেকে আসা ছেলেপুলে, যাদের পড়াশোনা বেশি দূর ছিল না। কিন্তু প্রায় কিশোর বয়স থেকে কাজ শিখতে শিখতে, হাতেকলমে কাজ করতে করতে এঁরা অনেকেই ওস্তাদ হয়ে উঠেছিলেন। সেই কারিগরি বিদ্যে তার পরেও বেশ কয়েক প্রজন্ম ধরে হাতবদল হয়েছে।

কলকাতা শহরের আনাচে কানাচে অনেক ঘড়ি। গীর্জার মুখে ঘড়ি, ডাকঘরে ঘড়ি, বাজারের টং-এ ঘড়ি, রাস্তার মাঝখানে ঘড়ি, ইস্টিশনের মাথায়ও ঘড়ি। কিন্তু এখন সে সব ঘড়ির অনেকেরই ভেতরের চাকা, স্ক্রু, পেন্ডুলামগুলো একটু জীর্ণতা পেয়েছে। ঢিলে ঢালা হয়েছে। দেখতে দেখতে শহরে অনেক ঘড়িও দেহ রেখেছে।

কলকাতায় প্রাচীনতম টাওয়ার ক্লক রয়েছে আর্মোনিয়ান হোলি চার্চ অফ নাজারেথ-এ। ১৭৯০ সালে ৫ ফুটের কাছাকাছি ডায়াল সাইজের ওই ঘড়িটি লাগানো হয়। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঘড়িটি অকেজো। এছাড়াও নিউ মার্কেটের ‘ওয়েস্ট মিনস্টার ক্লক’, মানিকতলা বাজারের ‘জার্মান ক্লক’, ধর্মতলার মেট্রোপলিটন বিল্ডিঙের ‘নন স্ট্রাইকিং ক্লক’, ধর্মতলা গির্জার ‘ডিং ডং কোয়ার্টার চাইমিং ক্লক’, মৌলালির জোড়া গির্জার ‘ডিং ডং আওয়ারলি চাইমিং ক্লক’, রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবের এবং অতি সাম্প্রতিককালে লেকটাউন ভিআইপি রোডের ওপর ও গৌরীবাড়ি এলাকার মুচিবাজারে অরবিন্দ সরণির ওপর কলকাতার একমাত্র বাংলা ঘড়ি মিনারটির উল্লেখ করতেই হয়।

গত শতাব্দীর সাতের দশকে সারা পৃথিবীতেই ঘড়ি শিল্পে বিপ্লব ঘটে যায়। চাবি দেওয়া ঘড়ির বদলে ব্যাটারী চালিত ঘড়ির প্রচলন হয়। আশির দশকে এসে যায় ডিজিট্যাল ঘড়ি। অত্যন্ত কম দামে সারা পৃথিবীতে ধনী-দরিদ্র সবার কাছে ঘড়ি পৌঁছে যায়। আর একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই মোবাইলে সময় দেখা শুরু হলে ঘড়ির সেই চাহিদা দারুণভাবে কমে যায়। এখন সময় দেখার জন্য মানুষ সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল মোবাইলের উপর। চাবি দেওয়া টেবিল ঘড়ি, দেওয়াল ঘড়ি, হাত ঘড়ি এখন ক্রমশঃ যাদুঘরের সম্পত্তি হতে চলছে। আধুনিক মানুষেরা কেউ কেউ ফ্যাশন হিসাবে দামী ঘড়ি ব্যাবহার করছেন ঠিকই, কিন্তু সেটা আর কতদিন চলবে বলা মুশকিল।

তথ্যসূত্র


  1. Revolution in Time: Clocks and the Making of the Modern World by David Landes, Belknap Press of the Harvard University Press (২০০০)।
  2. The history of clocks and watches by Eric Bruton, Chart well books (২০০৪)।
  3. Manufacturing Time: Global Competition in the Watch Industry, 1795-2000, by Amy Glasmeier, Jhon Wiley & Sons (২০০৯)।
  4. আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০শে ডিসেম্বর ২০১৪ সাল।
  5. এইসময় পত্রিকা, ১৮ই এপ্রিল ২০১৭ সাল।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 বাংলা ভাষায় তথ্যের চর্চাকে ছড়িয়ে দিতে পোস্টটি লাইক ও শেয়ার করুন।  

error: Content is protected !!