ইতিহাস

ইন্দ্রলাল রায়

প্রথম বাঙালি তথা ভারতীয় যুদ্ধবিমানচালক ইন্দ্রলাল রায় (Indralal Roy)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ভারতীয় হিসেবে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন ইন্দ্রলাল রায় এবং বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম বাঙালি বীর শহীদ তিনিই।  

১৮৯৮ সালের ২ ডিসেম্বর কলকাতায় ইন্দ্রলাল রায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম প্যারীলাল রায় এবং মায়ের নাম ললিতা রায়। ইন্দ্রলালের বাবা ছিলেন অধুনা বাংলাদেশের বরিশালের লাকুটিয়ার জমিদার এবং ব্যারিস্টার। কলকাতার পাবলিক প্রসিকিউশন্‌স-এর ডিরেক্টর হিসেবে আইনজীবি প্যারীলাল রায়ের বেশ সুনাম ছিল। ইন্দ্রলাল রায়ের পাঁচ ভাই-বোন ছিল যাদের মধ্যে বড় ভাই পরেশলাল রায় মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে বিখ্যাত। ইন্দ্রলাল ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘ল্যাডি’। বরিশালের সম্ভ্রান্ত অভিজাত পরিবারের সন্তান প্যারীলাল বিশ্বাস করতেন একমাত্র ব্রিটিশরাই পারে ভারতীয়দের গড়ে তুলতে। ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস। সন্তানদের দেখাশোনার জন্য তিনি এক জন ইংরেজ পরিচারিকাও নিয়োগ করেছিলেন। ইন্দ্রলালের বাবা ছিলেন যথেষ্ট স্বাস্থ্যসচেতন। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ছেলেদের সাঁতার, ঘোড়ায় চড়া, সাইকেল চালানোও শিখিয়েছিলেন। ১৯০১ সালে প্যারীলাল রায় তাঁর ছয় সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে চলে আসেন লণ্ডনে। হ্যামারস্মিথে ৭৭ নং ব্রুক গ্রিনে তাঁদের বাড়ি ছিল। তাঁর মা ললিতাও স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। তৎকালীন ব্রিটেনে মেয়েদের ভোটাধিকার নিয়ে সংগঠিত ‘সাফ্রোজেট আন্দোলন’-এ তিনি নেতৃত্বের এক অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। পরবর্তীকালে ‘লণ্ডন ইণ্ডিয়ান ইউনিয়ন সোসাইটি’-র অন্যতম সদস্য হয়েছিলেন ললিতা রায়। ব্রিটেনের পাশাপাশি ভারতীয় মেয়েদের শিক্ষার জন্য তিনি নানা অনুষ্ঠান করে অর্থসংগ্রহ করতেন।  

এমনই সম্ভ্রান্ত প্রগতিশীল পরিবারের সন্তান ইন্দ্রলাল রায়ের প্রাথমিক পড়াশোনা সম্পূর্ণ হয়েছিল হ্যামারস্মিথের সেন্ট পলস্‌ বয়েজ স্কুলে। সেখানে দুই ভাইয়ের (পরেশ ও ললিত) সঙ্গে একত্রে পড়াশোনা করেন তিনি। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে সেই স্কুলে তিনি ভর্তি হন।  স্কুলজীবনেই তিনি তাঁর অসম্ভব মেধার পরিচয় দেন। সম্ভাবনাময় ছাত্র ইন্দ্রলাল বিশেষ মর্যাদার স্কলারশিপ পেয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইতিমধ্যে তাঁর দাদা পরেশলাল রায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক উত্তীর্ণ হয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন হঠাৎই। দাদাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইন্দ্রলাল মাত্র পনেরো বছর বয়সেই ঠিক করে নেন যে ভবিষ্যতে তিনিও যোগ দেবেন সেনাবাহিনীতে। তাই স্কুলের পাঠ শেষ হলে তিনি তাঁর স্বপ্নপূরণে আশায় মেতে উঠলেন। বিমানবাহিনীতে যোগ দেবার ন্যূনতম বয়স ১৮ পেরোতেই তিনি রাজকীয় বিমানবাহিনীতে তথা রয়্যাল ফ্লাইং কোর-এ ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিয়ে বসেন। ছয় মাস প্রশিক্ষণের পর পাইলট হিসেবে তিনি লাভ করেন কিংস কমিশন। ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম এই যোগ্যতা অর্জন করেন।

কমিশন লাভের পর ১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে ইন্দ্রলাল রায়কে ‘রয়্যাল ফ্লায়িং কোর’ এর ৫৬তম স্কোয়াড্রনে যোগ দেয়ার জন্য পাঠানো হয় ফ্রান্সে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধ করেন তিনি। স্কোয়াড্রনে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদের দায়িত্ব নিয়ে ইন্দ্রলাল চলে যান ফ্রান্সের ভাদোমে। তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তির দৃষ্টান্ত সম্পর্কে এও শোনা যায় যে, ‘রয়্যাল এয়ার কর্পস’-এ আবেদন করেও প্রথমবার দূর্বল দৃষ্টিশক্তির জন্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি তিনি। কিন্তু তাতে ভেঙে না পড়ে ইন্দ্রলাল তাঁর শখের দামী মোটরবাইকটি বিক্রি করে দিয়ে ব্রিটেনের সবথেকে নামী চক্ষু চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা করান তিনি। সুস্থ হয়ে পুনরায় আবেদন করেন ইন্দ্রলাল বিমানবাহিনীতে। দ্বিতীয়বারে আর তাঁকে ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয়নি। এভাবেই বিমানচালক হিসেবে ইন্দ্রলাল রায়ের কর্মজীবন শুরু হয়।

ব্রিটিশ বায়ুবাহিনীতে কার্জিস, বি ই টু, সপউইথ ক্যামেল, এস ই ফাইভ-এর মতো যুদ্ধবিমান চালাতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন তিনি। এই বাঙালি তরুণটি তখন হয়ে ওঠেন বায়ুবাহিনীর ‘হিরো’। ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর এক চরম দূর্ঘটনা ঘটে যায়। যুদ্ধের আকাশে একটি জার্মান যুদ্ধবিমানের গুলি লেগে ইন্দ্রলালের বিমান ভেঙে পড়ে নো ম্যান’স ল্যাণ্ডে। অচৈতন্য ইন্দ্রলালকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু তাঁর দেহ মর্গে নিয়ে যাওয়ার ঘন্টাখানেকের মধ্যেই তাঁর জ্ঞান ফিরে আসে। মৃত্যুর মুখ থেকে তাঁর এই ফিরে আসা এতই চমকপ্রদ যে সকলে প্রথমে মেনে নিতে পারেননি। যাইহোক সুস্থ হলেও যুদ্ধবিমান চালানোর ছাড়পত্র তাঁকে দেওয়া হয়নি তখনই। বারবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার ফলে তাঁর এই অদম্য প্রাণশক্তি ও জেদ দেখে সম্মত হন কর্তৃপক্ষ। আকাশে ওড়ার জন্য পুনরায় শারীরিকভাবে প্রস্তুত হন ইন্দ্রলাল। ক্যাপ্টেন জর্জ ম্যাকরয়ের তত্ত্বাবধানে তিনি প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ফ্রান্স থেকে ফিরে ১৯১৮ সালের ২২ জুন পুনরায় রয়্যাল এয়ার কর্পস-এর ৪০ নম্বর স্কোয়াড্রনে যোগ দেন।

৬ জুলাই ১৯১৮ সালে আবার বিমান নিয়ে ইন্দ্রলাল রায় উড়ে যান যুদ্ধক্ষেত্রে। প্রথম দিনেই তাঁর আক্রমণে পরাজিত হয় এক জার্মান বিমান। এই জয়ের ছবি তিনি এঁকে রেখেছিলেন তাঁর আঁকার খাতায়। ৯ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই, টানা দশ দিনে ন’টি জার্মান বিমানকে তিনি আক্রমণ করে মাটিতে নামিয়ে আনেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় বিমান চালক যিনি মাত্র ১৭০ ঘণ্টা বিমান চালিয়ে পাঁচটির বেশি জয় লাভ করে ফ্লাইং এস (Flying Ace) হয়েছিলেন। 

ইন্দ্রলাল রায় বেশ ভালো ছবি আঁকতেন। হাসপাতালে থাকাকালীন তিনি বেশ কিছু যুদ্ধবিমানের ছবি এঁকেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার চার মাস আগে ১৯১৮ সালের ২২ জুলাই ফ্রান্সের আকাশে ইন্দ্রলাল বিমান চালানোর সময় চার-চারটে জার্মান ফকার যুদ্ধবিমান তাঁকে চার দিক থেকে ঘিরে ধরে। একাই সর্বশক্তিতে ভর করে লড়ে যেতে থাকেন ইন্দ্রলাল। এমনকি পরাস্ত করেন দুটো জার্মান বিমানকেও। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। যেখানে ইন্দ্রলালের বিমান ভেঙে পড়েছিল সেই স্থানে শত্রুপক্ষের জার্মান বায়ুসেনার অফিসার ম্যানফ্রেড ফন রিখটোফেন ফুলের তোড়া ছুঁড়ে এই তরুণ বাঙালি বীরকে সম্মানজ্ঞাপন করেছিলেন।

১৩ দিনে ৯টি জার্মান যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার অনন্যসাধারণ কৃতিত্বের জন্য ইন্দ্রলাল রায়কে ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর তরফ থেকে মরণোত্তর বীরত্বের খেতাব ‘ডিস্টিঙ্গুইসড ফ্লাইং ক্রস’ ( Distinguished Flying Cross ) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ভারতীয়দের মধ্যে এই উপাধি তিনিই প্রথম লাভ করেন। ইন্দ্রলালের ‘ফ্লাইং লগবুক’, উইংস, বিভিন্ন অভিযানে অংশগ্রহণ সম্পর্কিত ঘটনাবলির নিজের হাতে আঁকা স্কেচবুক, সম্রাট পঞ্চম জর্জের লেখা স্কোয়াড্রনের কমান্ডিং অফিসারের চিঠি ইত্যাদি নিদর্শন দিল্লির ভারতীয় বিমান বাহিনীর মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। ভারত সরকার ১৯৯৮  সালের  ডিসেম্বর  মাসে ইন্দ্রলাল রায়ের জন্মশতবার্ষিকীতে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। তাঁর মৃত্যুর পরে ফ্রান্সের ইস্টভিল কমিউনাল সেমেট্রিতে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। উত্তর ফ্রান্সে তাঁর এই সমাধির ওপর বাংলা ও ফরাসি ভাষায় গৌরবগাথা লেখা আছে, ‘মহান বীরের সমাধি। সম্ভ্রম দেখাও। স্পর্শ কোরো না’। তাঁর নামে কলকাতায় একটি সড়কও রয়েছে, ইন্দ্র রায় রোড যা কিনা কলকাতার ভবানীপুরে ইন্দিরা সিনেমাহলের কাছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য ইন্দ্রলাল রায়ের ভাগ্নে সুব্রত মুখার্জী স্বাধীন ভারতের প্রথম এয়ারমার্শাল ছিলেন। বলা যায় ইন্দ্রলালের যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন সুব্রত মুখার্জী।  

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন