ইতিহাস

এয়ারমার্শাল সুব্রত মুখার্জী

স্বাধীন ভারতের বায়ুসেনার প্রথম ‘কমান্ডার ইন চিফ’ ছিলেন সুব্রত মুখার্জী (Subroto Mukherjee)। বায়ুসেনার সর্বাধিনায়ক এই বাঙালিকে আপামর ভারতবাসী চেনে ‘ভারতীয় বায়ুসেনার জনক’ হিসেবে। সুব্রত মুখার্জীর সহযোদ্ধা এয়ার মার্শাল অ্যাস্পি ইঞ্জিনিয়ার তাঁকে ‘ভারতীয় বায়ুসেনার জনক’ নামে অভিহিত করেছিলেন।  ভারত স্বাধীন হবার পরে বায়ুসেনায় প্রথম যে তিনজন সর্বাধিনায়কের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন তাঁরা প্রত্যেকেই ব্রিটিশ ছিলেন। সুব্রত মুখার্জীই প্রথম ভারতীয় এবং বাঙালি যিনি তৎকালীন ভারতীয় বায়ুসেনাকে আরো সুসংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। বায়ুসেনার সর্বোচ্চ পদাধিকারী হলেও একজন ফুটবলপ্রেমী ও সমর্থক হিসেবেও তিনি পরিচিত। মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব-এর নিয়মিত সদস্য সুব্রত মুখার্জীর নামে পরবর্তীকালে তাঁর মৃত্যুর পরে ‘সুব্রত কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ চালু হয়।    

১৯১১ সালের ৫ মার্চ কলকাতা শহরে ৭ নং বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে মামার বাড়িতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম হয় সুব্রত মুখার্জীর। তাঁর বাবার নাম সতীশচন্দ্র মুখার্জী এবং মায়ের নাম চারুলতা মুখার্জী। তাঁরা চার ভাই-বোন। সুব্রত ছিলেন সবার ছোট। তাঁর বাবা সতীশচন্দ্র মুখার্জী ছিলেন ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের প্রধান কর্মকর্তা, ১৮৯২ সালে তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আই.সি.এস) পাশ করেন। তাঁর মা চারুলতা দেবী নারীশিক্ষা ও নারী অধিকারের জন্য কাজ করতেন। তিনি ছিলেন সেকালে প্রেসিডেন্সি কলেজের একমাত্র ছাত্রী। সুব্রত মুখার্জীর দাদা প্রশান্ত মুখার্জী ছিলেন রেলওয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান। তাঁর ছোটো বোনের নাম নীতা সেন। তাঁর ঠাকুরদা নিবারণ চন্দ্র মুখার্জী সেকালে ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম সদস্য হিসেবে খ্যাত ছিলেন। ভারতের শিক্ষা সংস্কারে তাঁর বহুবিধ ভূমিকা ছিল। তাঁর দাদু ড. প্রসন্নকুমার রায় ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ। তাঁর দিদিমা সরলা রায় একজন শিক্ষাবিদ, মূলত তাঁর উদ্যোগেই স্থাপিত হয় গোখেল মেমোরিয়াল স্কুল এবং সবশেষে সুব্রত মুখার্জীর দিদি রেণুকা রায় ছিলেন বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী।

সুব্রত মুখার্জীর প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় নৈনিতাল ডায়োসেসান বয়েজ হাই স্কুল (অধুনা শেরউড কলেজ) এবং কলকাতার লরেটো কনভেন্ট স্কুলে। মাত্র তিন মাস বয়সে তাঁর বাবা-মা তাঁকে ইংল্যাণ্ডে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁরা দেড় বছর ছিলেন। ইংল্যাণ্ড থেকে ফিরে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর এবং চুঁচুড়ায় তাঁর বাল্যকাল কেটেছে। তাঁর শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় ইংল্যাণ্ডে। ১৯২১-এ তিনি আবার ইংল্যাণ্ডে চলে যান বাবা-মায়ের সঙ্গে এবং হ্যাম্পস্টেডের একটি স্কুলে ভর্তি হন। পরে আবার হাওড়া জেলা স্কুল থেকে ১৯২৭ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার আগে একবছর প্রেসিডেন্সি কলেজেও তিনি পড়াশোনা করেছিলেন। ১৯২৯ সালে তিনি পুনরায় ইংল্যাণ্ডে পাড়ি দেন উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে। ইংল্যাণ্ডের ক্র্যানওয়েলে রয়্যাল এয়ার ফোর্স কলেজ থেকে দু’বছরের বায়ুসেনার প্রশিক্ষণ নেন তিনি। এই ১৯২৯ সালেই ইংল্যাণ্ডের বায়ুসেনার পরীক্ষার মাধ্যমে ৬ জন ভারতীয় এই কলেজে প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এইচ. সি. সরকার, এ. বি. আওয়ান, ভূপেন্দ্র সিং, অমরজিৎ সিং, জে. এন. ট্যাণ্ডন প্রমুখের সঙ্গে শীর্ষস্থানে ছিল সুব্রত মুখার্জীর নাম।   

সুব্রত মুখার্জীর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ বায়ুসেনার অধীনে নির্মিত ভারতীয় বায়ুসেনার পাইলট অফিসার অর্থাৎ বিমানচালক হিসেবে। অন্য পাঁচজন ভারতীয়ও এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। প্রথম বাঙালি ভারতীয় বিমানচালক ছিলেন প্রখ্যাত ইন্দ্রলাল রায় যিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একমাত্র ভারতীয় হিসেবে অংশগ্রহণ করে জার্মানির বিরুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। সুব্রত মুখার্জী ছিলেন তাঁরই ভাগ্নে, ইন্দ্রলাল রায় ছিলেন সুব্রত’র আদর্শ। সেসময় রয়্যাল এয়ার ফোর্সের কর্মকর্তারা ভারতীয় বিমানচালকদের নিচু চোখে দেখতেন, যার জন্য ভারতীয় বিমানচালকদের মনে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের যোগ্য এবং সমকক্ষ করে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য জেদ চাপে। তাঁরা কোনো অংশেই যে  ব্রিটিশদের থেকে কম দক্ষতাসম্পন্ন নন, তা তাঁদের প্রমাণ করতে হয়েছিল। ১৯৩৩-এর ১ এপ্রিল করাচিতে ১ নং স্কোয়াড্রনের একটি বিমানের উড়ানে সুব্রত ছিলেন অন্যতম ভারতীয় বিমানচালক। এটি ছিল ভারতীয় বায়ুসেনার নির্মিত প্রথম বিমান যাতে চারটি ‘ওয়েস্টল্যাণ্ড ওয়াপিতি’ ছিল। এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, ‘ওয়াপিতি’ হল দুটি সিটযুক্ত বাইপ্লেন যার সর্বোচ্চ গতিবেগ ২২৫ মাইল প্রতি ঘণ্টায়।

সুব্রত মুখার্জীর সবথেকে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল পাশতুন বিদ্রোহ প্রতিরোধে সহায়তা করা। ১৯৩৬-৩৭ সাল নাগাদ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (বর্তমানে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া নামে পরিচিত) উত্তর ওয়াজিরিস্তানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পাশতুন জনগণের বিদ্রোহ দানা বাধে। সেই বিদ্রোহ রোধ করতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে তথা ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সকে সহায়তা করেছিলেন সুব্রত মুখার্জী। এর জন্য তিনি ইংরেজ সরকারের থেকে পুরস্কৃত হন। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি ১৯৩৯ সালে স্কোয়াড্রন পরিচালকের পদে উন্নীত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন পর্বে তিনিই বায়ুসেনার সবথেকে প্রবীণ বিমানচালক ছিলেন। এসময় ১৯৪১ সালে ১ নং স্কোয়াড্রনের দায়ভার করুণকৃষ্ণ মজুমদারের হাতে ছেড়ে সুব্রত মুখার্জী কোয়েটা’র (Quttea) স্টাফ কলেজে পড়তে গিয়েছিলেন। পরে ফিরে এসে ১৯৪২ সালের মার্চ মাসে তিনি দ্বিতীয়বার স্কোয়াড্রনের অধিনায়ক হন। এই বছরই উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অভিযান চলাকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনা অফিসার এবং লেখক মেজর ফ্রান্সিস ইয়েট্‌স ব্রাউন তাঁর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোহাট বিমানবন্দরে সুব্রত মুখার্জীর পেশাদারিত্ব এবং দক্ষতার সমূহ প্রশংসা করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৪-এর মধ্যে প্রথম ভারতীয় ব্যক্তি সুব্রত মুখার্জী অধুনা পাকিস্তানের কোহাটে রয়্যাল এয়ার ফোর্স স্টেশনের নেতৃত্ব দেন প্রায় ১৭ মাস। ১৯৪৫ সালে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অফিসার অফ দ্য অর্ডার অর্থাৎ ও.বি.ই (অফিসার অফ দ্য অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার) সম্মানে সম্মানিত হন। ভারত স্বাধীন হবার পরে তিনি এয়ার ভাইস মার্শাল পদে উন্নীত হয়েছিলেন। ব্রিটিশ এয়ার মার্শাল স্যার থমাস এলম্‌হার্স্টের অধীনে সুব্রত মুখার্জী বিমানবাহিনীর উপপ্রধান তথা ডেপুটি চিফ অফ দ্য এয়ার স্টাফ হিসেবে কাজ করতে থাকেন। প্রায় টানা সাত বছর তিনি তিনজন ভিন্ন ভিন্ন ব্রিটিশ বায়ুসেনা-প্রধানের অধীনে কাজ করার ফলে ভারতীয় বায়ুসেনা বাহিনীতে সর্বোচ্চ পদলাভের জন্য অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা সঞ্চয় করেছিলেন। ১৯৫২ সালের এপ্রিল মাসে লণ্ডনের ইম্পেরিয়াল ডিফেন্স কলেজের (বর্তমানে যা রয়্যাল কলেজ অফ ডিফেন্স স্টাডিজ নামে পরিচিত) প্রশিক্ষণ নিতে ইংল্যাণ্ড যান সুব্রত মুখার্জী। তারপর ১৯৫৪-তে ভারতে ফিরে তিনি ভারতীয় বায়ুসেনার কমান্ডার-ইন-চিফ পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৪৩ বছর বয়সে। পরে ১৯৫৫ সালে এই পদের নাম পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলে সুব্রত মুখার্জী হন ভারতের প্রথম ‘চিফ অফ দ্য এয়ার স্টাফ’। ভারতীয় বায়ুসেনার সর্বোচ্চ পদ এটি, এখনো এই পদটি রয়েছে। এই পদ লাভ করে সুব্রত মুখার্জী বায়ুসেনাকে নতুনতর সরঞ্জাম ও উন্নত প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতির সাহায্যে পুনর্নির্মাণ করতে শুরু করেন। উদাসীন ভারত সরকারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য পাওয়া সেসময় যথেষ্ট কঠিন ছিল। ১৯৫৭ সালে ভি.কে.কৃষ্ণ মেনন-এর পরে তিনি ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর সময়ে কিছু নতুন বিমান বায়ুবাহিনীতে আনা হয়, যদিও ১৯৬২-তে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে চীন-ভারত বিবাদের সময়ে আক্রমণাত্মক বিমান ব্যবহার করা হয়নি। ১৯৩৯ সালে শারদা পণ্ডিত নামে একজন মহারাষ্ট্রীয় মহিলাকে বিবাহ করেন তিনি। তাঁদের একমাত্র পুত্র সঞ্জীব মুখার্জী। সুব্রত’র মৃত্যুর পরে শারদা মুখার্জী গুজরাট ও অন্ধ্রপ্রদেশের প্রথম মহিলা রাজ্যপাল হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। জানা যায়, ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তিনি সিনিয়ার ব্রিটিশ আধিকারিকদের ভারতীয় বিমানবাহিনীতে কতদিন থাকতে চান। সুব্রত মুখার্জী সহাস্যে উত্তর দিয়েছিলেন পাঁচ-সাত বছর। আসলে আইএফএ-র সর্বোচ্চ পদস্থ ভারতীয় হিসেবে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় তিনি তাঁর পদোন্নতি আটকে রেখেছিলেন। ব্যক্তিগত প্রয়োজনের আগে তিনি দেশের প্রয়োজনকেই আজীবন গুরুত্ব দিয়েছেন।               

জাপান এবং ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক আকাশ-পরিবহন উদ্বোধনের জন্য জাপানের টোকিও-তে গিয়েছিলেন সুব্রত মুখার্জী। সেখানেই ১৯৬০ সালের ৮ নভেম্বর এক রেস্তোরাঁয় খাবার সময় মাংসের টুকরো গলায় আটকে শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন