সববাংলায়

অমল দত্ত

বিভাগঃ , ,

অমল দত্ত (Amal Dutta) একজন ভারতীয় ফুটবলার, জনপ্রিয় কোচ ও বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ। ফুটবল মাঠে তিনি একজন মিডফিল্ডার খেলোয়াড় হিসাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও ভারতের ফুটবল ইতিহাসে তিনি মূলত একজন সুদক্ষ কোচ হিসেবে অমর হয়ে আছেন। ভারতের ফুটবল ইতিহাসে তিনিই প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত পেশাদার কোচ হিসেবে স্বীকৃত। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান ও মহামেডানের মতো বাংলার শীর্ষস্থানীয় ফুটবল দল ছাড়াও তিনি বেশ কিছুদিন ভারতের জাতীয় দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি কোচ থাকাকালীন ইস্টবেঙ্গল সিএফএল, আইএফএ শিল্ড, রোভার্স কাপ, ডুরান্ড কাপ, দার্জিলিং গোল্ড কাপ, বোরদোলোই ট্রফি, এয়ারলাইন্স গোল্ড কাপ, সঞ্জয় গান্ধী গোল্ড কাপ জিতেছিল। এছাড়া তাঁর কোচিংয়ে মোহনবাগান সিএফএল, আইএফএ শিল্ড, ফেডারেশন কাপ, ডুরান্ড কাপ এবং ডিসিএম ট্রফি, এয়ারলাইন্স গোল্ড কাপ, সিকিম গভর্নরস গোল্ড কাপ এবং নেহেরু ট্রফির মতো বড় প্রতিযোগিতায় সাফল্য পায়। তাছাড়া তিনি এক মরসুমে মহামেডান এসসি ক্লাবকে তিনটি ট্রফি দেন। কোচিং জীবনে সবমিলিয়ে ৩৭ টি ট্রফি জয় করেন তিনি। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ভারতের ফুটবলে বিখ্যাত ‘ডায়মন্ড সিস্টেম’ প্রবর্তন করেন। আর এই কৌশলের জন্য অনেকে তাঁকে ‘ডায়মন্ড কোচ’ নামে অভিহিত করেন।

অমল দত্ত » সববাংলায়
জীবনীটি তথ্যচিত্র আকারে দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন

১৯৩০ সালের ৪ মে (মতান্তরে ১০ জানুয়ারি) কলকাতার এক সুশিক্ষিত পরিবারে অমল দত্তের জন্ম হয়। প্রখ্যাত বাঙালি কবি ও লেখক অক্ষয় কুমার বড়াল ছিলেন তাঁর মাতামহ। মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে ফেলার পর কঠিন সংঘর্ষ করে তিনি নিজেকে একজন কঠোর নিয়মানুবর্তী ব্যক্তিতে পরিণত করেন। এছাড়া ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা তাঁর জীবনে এক গভীর প্রভাব বিস্তার করে। আর এই কারণে তিনি ব্যক্তিগতভাবে যেকোনো দুর্নীতি এবং দলীয় রাজনীতিকে চরম ঘৃণা করতেন। অমল দত্ত আরতি দত্তকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই সন্তান আশিস এবং অনিতা।

অমল দত্ত জোড়াসাঁকো ফ্রেন্ডস ক্লাবের হয়ে প্রথম ফুটবল খেলা শুরু করেছিলেন। তারপর তিনি লোয়ার ডিভিশনের অনেক ক্লাব, যেমন- সুরানন ক্লাব, স্পোর্টিং ইউনিয়ন, এরিয়ান, বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ের হয়েও একাধিক ম্যাচ খেলেছিলেন। তবে তিনি প্রথম পেশাদার ফুটবলে পা রাখেন ১৯৫৩ সালে। ওই বছর থেকে টানা তিন বছর তিনি ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলেছিলেন। ঐতিহাসিক ইউরোপ সফরকারী ইস্টবেঙ্গল দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। তাছাড়া ইস্টবেঙ্গলের হয়ে তিনি রোমানিয়া ও রাশিয়া সফরেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ইস্টবেঙ্গলে তিনি একজন দক্ষ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতেন। ১৯৫৩ সালে রেঙ্গুনে অনুষ্ঠিত চতুর্দেশীয় টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারতের হয়ে অভিষেক হয় অমল দত্তের। এই ম্যাচটি ছিল ভারতের জাতীয় দলের হয়ে তাঁর প্রথম এবং একমাত্র আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এছাড়া তিনি ১৯৫৪ সালে ফিলিপাইনের ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসেও ভারতীয় দলের সদস্য ছিলেন।

এরপর অমল দত্ত অল্প সময়ের জন্য মোহনবাগানের হয়ে খেলেছিলেন। এই সময় তিনি রোভার্স কাপে ওই ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। খেলোয়াড় জীবনে তিনি বাঘা সোম এবং সৈয়দ আব্দুল রহিমের মতো বিখ্যাত কোচের অধীনে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন।

তবে মাত্র ২৯ বছর বয়সে চোটের কারণে অমল দত্তের ফুটবলার হিসেবে কেরিয়ার শেষ হয়ে যায়। এরপর তিনি কিছুদিন বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়েতে কোচ হিসাবে কাজ করেছিলেন। তবে তিনি মনে করেছিলেন যে, এ দেশে ফুটবল খেলা ঠিকভাবে চলছে না। তাই তিনি ভারতীয় রেলের নিরাপদ চাকরি ছেড়ে ফুটবল কোচিং শেখার জন্য পাড়ি দেন ইংল্যান্ডে। সেখান থেকে নিয়ে আসেন এদেশের প্রথম পেশাদার কোচিং ডিগ্রি। দেশে ফেরার পর তিনি হয়ে ওঠেন ভারতের প্রথম পেশাদার ফুটবল কোচ। তিনি ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের অন্যতম বিখ্যাত ম্যানেজার ওয়াল্টার উইন্টারবটমের (Walter Winterbottom) থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

অমল দত্ত ভারতে ফিরে আসার পর বিভিন্ন ক্লাবে কোচিং করানো শুরু করেছিলেন। তিনি ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এরিয়ান ফুটবল দলকে পরিচালনা করেন। তারপর ১৯৬৩ সালে কলকাতা ফুটবল লীগ চলাকালীন তিনি ইস্টবেঙ্গলে যোগ দেন। আর এই মরসুম থেকেই অমল দত্তের হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ায় ইস্টবেঙ্গল। ইস্টবেঙ্গলে কোচিং করানোর সময় তিনি লক্ষ করেছিলেন যে, রাশিয়ানরা তিনজন সদস্যকে দক্ষভাবে ডিফেন্সে খেলায়। তিনি এই পরিকল্পনা দ্বারা দারুণ ভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং এই বিষয়ে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের শীর্ষ কর্মকর্তা জ্যোতিষ গুহকে নতুন কাঠামোর কার্যকারিতা সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে জ্যোতিষ গুহ এই প্রস্তাব মেনে না নিলে তিনি ১৯৬৪ সালে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব ছেড়ে চলে যান।

তারপর কিছুদিন পর অমল দত্ত বাংলা ছেড়ে পাড়ি দেন ওড়িশায়। তিনি ওড়িশার ফুটবলকে তুলে আনেন সবার সামনে। সেই সময় সন্তোষ ট্রফিতে তাঁর আধুনিক রণকৌশলের কারণে ওড়িশা সেই টুর্নামেন্টে অনেক শক্তিশালী রাজ্য দলকে পরাজিত করে সবাইকে চমকে দিয়েছিল। ওড়িশার এই উন্নত মানের ফুটবল দেখেই কলকাতার মোহনবাগান তাঁকে কোচ হিসেবে নিয়োগ করতে আগ্রহী হয়।

এরপর তিনি আবার কলকাতায় ফিরে আসেন ও ১৯৬৯ সালে মোহনবাগান দলে যোগ দেন। আর এটি ছিল তাঁর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। সেই সময় তিনি খেলার মধ্যে কৌশলগত নানা পরিবর্তন আনেন। তিনি ভবানী রায়ের মতো ফুটবলারকে প্রথমবার ওভারল্যাপিং উইং-ব্যাক বা সাইড-ব্যাক হিসেবে খেলিয়ে বিপক্ষকে আক্রমণের এক নতুন ধারণা তৈরি করেন। এই কৌশল ব্যবহার করেই মোহনবাগান ওই বছর ঐতিহাসিক আইএফএ শিল্ড ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গলকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে। তবে এরপরেও তিনি ১৯৭০ সালে মোহনবাগান ক্লাব থেকে সরে যান। পরবর্তীকালে তিনি আবার ইস্টবেঙ্গলে ফেরেন এবং তাঁর কোচিংয়ে ১৯৭৬ সালে ইস্টবেঙ্গল রোভার্স কাপ জয় করে।

মোহনবাগান , ইস্টবেঙ্গল ছাড়াও মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব অমল দত্তের কোচিংয়ে ১৯৮০ সালে রোভার্স কাপ, ডিসিএম ট্রফি এবং সিকিম গভর্নর্স গোল্ড কাপ জিতেছিল। এরপর তিনি আবার ইস্টবেঙ্গলে ফিরে এসে দলকে কলকাতা লিগ চ্যাম্পিয়ন এবং ডুরান্ড কাপে জয় করেন। পরে মোহনবাগান দল তাঁর কোচিং-এ ডুরান্ড ও রোভার্স কাপ জয় করেছিল।

অবশেষে ১৯৮৭ সালের শেষের দিকে অমল দত্তকে নেহেরু কাপের জন্য ভারতের জাতীয় দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর করা হয়। এই সময় কলকাতায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে তিনি বাবু মণি এবং উত্তম মুখার্জিকে উইঙ্গার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এই গেমসের ফাইনালে ভারত নেপালকে পরাজিত করে স্বর্ণপদক জিতেছিল। তবে তিনি খুবই স্বল্প সময়ের জন্য জাতীয় দলে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন।

এরপর অমল দত্ত ১৯৯৭ সালে মোহনবাগানে ফিরে আসেন। তিনি সেই সময়ে ফুটবলে প্রচলিত পদ্ধতির বদলে ৪-৪-২ পদ্ধতির আধুনিক ব্রাজিলিয়ান কৌশল ৪-১-২-১-২ ব্যবহার করেছিলেন। ফুটবল জগতে এই সিস্টেম ডায়মন্ড সিস্টেম নামে প্রচলিত। এই সিস্টেমে মাঝ মাঠে হীরে বা ডায়মন্ড আকৃতির গঠন তৈরি করা হত। এখানে ৪ জন ডিফেন্ডার, মাঝমাঠে ৪ জন মিডফিল্ডার (১ জন রক্ষণাত্মক, ২ জন সেন্ট্রাল, ১ জন আক্রমণাত্মক) এবং সামনে ২ জন ফরোয়ার্ডে থাকত। এটি মাঠে বল নিয়ন্ত্রণে খুবই কার্যকরী একটি পদ্ধতি ছিল। এই কৌশলে খেলে মোহনবাগান শক্তিশালী গোয়ার ক্লাব চার্চিল ব্রাদার্সের বিরুদ্ধে ৬-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে। আর এই জয়ের পর মোহনবাগানের এই কৌশলটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে পরবর্তীকালে ফেডারেশন কাপের সেমিফাইনালে কোচ অমল দত্তের ডায়মন্ড সিস্টেম সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ হয়। এই ম্যাচে কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে ইস্টবেঙ্গল ৪-১ গোলে মোহনবাগানকে হারিয়ে দেওয়ার পর বিশেষজ্ঞরা ‘ডায়মন্ড সিস্টেম’-এর সমালোচনা শুরু করেন। পিকে ব্যানার্জী ছিলেন ওই ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলের কোচ। ১ লক্ষ ৩০ হাজার দর্শক ঠাসা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে বাইচুং ভুটিয়া ইস্টবেঙ্গলের হয়ে হ্যাটট্রিক করেন। সেই হারের পর ডায়মন্ড সিস্টেম নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ সমালোচনা করলেও পরবর্তীকালে বহু ক্লাব তাঁর সেই সিস্টেমে দলকে খেলাতে থাকে। পরবর্তীকালে তাঁর কোচিংয়ে ২০০৫ সালে মোহনবাগান কলকাতা ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তবে ম্যানেজমেন্টের সাথে কিছু মতপার্থক্যের কারণে ২০০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি কোচের পদ ছেড়ে দেন।

অমল দত্ত নিজের জীবনকে ফুটবলের জন্য একেবারে উজার করে দিয়েছেন। বাংলার কোচিংয়ের চরিত্র বদলে দিয়েছেন তিনি। বাঙালি তরুণদের সেই সময়ে তিনি বিখ্যাত ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের ভিডিও ক্লিপিং দেখিয়ে বিশ্ব ফুটবলের প্রথম স্বাদ দেন। এছাড়া তিনি অনেক ফুটবলারের জীবন বদলে দিয়েছিলেন। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, শিশির ঘোষ, দেবাশিষ রায়, ভবানী রায়, সত্যজিৎ চট্টোপাধ্যায়দের মতো ফুটবলারদের ছোট ক্লাব থেকে তুলে এনে তারকা বানিয়ে তোলেন। তবে তিনি তাঁর স্পষ্টবাদী এবং কঠোর স্বভাবের জন্য বিভিন্ন সময়ে নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন। ফুটবলের ব্যাপারে কখনই আপোষ করেননি তিনি। তিনি এমনই প্রতিবাদী মানুষ ছিলেন যে তাঁর পাওনা আদায়ের জন্য মোহনবাগানকে আইনি নোটিশ পাঠানোর হুমকি দিতেও পিছিয়ে আসেননি। আধুনিক কৌশল বিশেষজ্ঞ এই ফুটবল কোচ ভারতীয় ফুটবলকে সমস্যা থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন।

অমল দত্ত ‘ফুটবল খেলতে হলে’ নামে একটি বই লেখেন যা উদীয়মান ফুটবলার ও কোচদের জন্য একটি শিক্ষণীয় বই। এছাড়া এই বইতে তিনি আধুনিক ফুটবল কৌশল, শারীরিক সক্ষমতা এবং স্পোর্টস মেডিসিন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

২০১৬ সালে ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উৎপল গাঙ্গুলি কলকাতা ফুটবল লীগের প্রতিটি মরসুমের সেরা কোচকে অমল দত্ত ট্রফি প্রদান করার ঘোষণা করেন। এছাড়া ফুটবল জগতের তাঁর কৃতিত্বকে স্বীকার করে ২০২০ সালের মার্চ মাসে উত্তর ২৪ পরগনায় ‘অমল দত্ত ক্রীড়াঙ্গন’ নামে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ক্রীড়াজগতের সকলেই স্বীকার করেন ভারতীয় ফুটবলের আধুনিকতার জন্য অমল দত্তের যা অবদান তার যোগ্য স্বীকৃতি তিনি জীবদ্দশায় পাননি।

২০১৬ সালের ১০ জুলাই কলকাতায় অমল দত্তের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading