ইতিহাস

অক্ষয়কুমার বড়াল

অক্ষয়কুমার বড়াল

উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা গীতিকাব্য ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি অক্ষয়কুমার বড়াল (Akshay Kumar Boral)। পূর্বতন কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর কাব্যধারার অনুসরণেই মূলত তিনি কাব্যচর্চা করেছেন। মূলত সেই কারণে অনেকেই তাঁকে বিহারীলালের ভাবশিষ্য বলে থাকেন। অক্ষয়কুমার বড়ালের কাব্যে রবীন্দ্রনাথেরও কিছু প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। একদিকে প্রকৃতিচেতনা, প্রেম এবং অন্যদিকে সৌন্দর্য আর শোকের ছায়া তাঁর কাব্যের মূল সুর হিসেবে বিবেচিত হয়। রবীন্দ্রনাথের দিগন্তবিস্তারি প্রতিভার ছায়ায় অক্ষয়কুমার বড়াল কখনই নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি, বরং উনিশ শতকের গীতিকাব্যধারার সকল কবিদের মধ্যে তিনি আজও স্বীয় স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল। তাঁর লেখা বিখ্যাত কাব্যগুলি হল এষা (১৯১২), ভুল (১৮৮৭), প্রদীপ (১৮৮৪), কনকাঞ্জলি (১৮৮৫) ইত্যাদি। এছাড়াও তাঁরই সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল রাজকৃষ্ণ রায়ের কবিতা (১৮৮৭) এবং গিরীন্দ্রমোহিনী দাসীর অশ্রুমালা (১৮৮৭)।

১৮৬০ সালে কলকাতার চোরবাগান অঞ্চলে অক্ষয়কুমার বড়ালের জন্ম হয়। তাঁর বাবা কালীচরণ বড়াল পেশায় একজন স্বর্ণব্যবসায়ী ছিলেন। হুগলী জেলার চন্দননগরে তাঁদের আদি নিবাস ছিল। পরবর্তীকালে সৌদামিনী দেবীর সঙ্গে কবির বিবাহ হয়েছিল। কিন্তু ১৯০৭ সালে সৌদামিনী দেবীর মৃত্যু তাঁর মনে এক গভীর আঘাত হেনেছিল। বলা হয় স্ত্রীর মৃত্যুর পরেই তিনি বিখ্যাত ‘এষা’ কাব্যটি লেখেন।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

কলকাতার হেয়ার স্কুলে পড়াশোনা সম্পন্ন হয় অক্ষয়কুমার বড়ালের। তবে প্রথাগত পড়াশোনা বেশিদূর করেননি তিনি। মেধাবী ছাত্র হলেও ধরা-বাঁধা পড়াশোনার প্রতি তাঁর খুব একটা আগ্রহ ছিল না। তবে বাংলা বা ইংরেজি বই পড়ার খুবই আগ্রহ ছিল তাঁর।

দিল্লি এবং লণ্ডন ব্যাঙ্কে কেরানি হিসেবেই মূলত তাঁর কর্মজীবন কেটেছে। এছাড়াও নর্থ-ব্রিটিশ জীবন বীমা কোম্পানিতেও বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন তিনি। তবে কাব্যসাধনার কারণেই তাঁর পরিচিতি গড়ে উঠেছে। বিহারীলাল চক্রবর্তীর কাব্যধারা দ্বারা অনেকাংশেই প্রভাবিত ছিলেন অক্ষয়কুমার বড়াল। তাছাড়া পূর্বতন রবীন্দ্রনাথের কবিতাও পড়তেন তিনি। পরবর্তীকালে অক্ষয়কুমার বড়ালের কাব্যচর্চায় বিহারীলালের প্রভূত প্রভাব থাকায় তাঁকে অনেকেই বিহারীলালের ভাবশিষ্য বলে থাকেন। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের বর্ণনা থেকে জানা যায়, স্বভাবের দিক থেকে অক্ষয়কুমার বড়াল আদপে খুবই লাজুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, সভা-সমিতিতে তিনি খুব একটা যেতেন না। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর মনে পরম শ্রদ্ধা ছিল। তাই যখন শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ গড়ে তোলেন ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়, সেখানে নিজের জ্যেষ্ঠ পুত্র অময়কুমারকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তিনি সনেটও লিখেছেন। তাঁর লেখা বিখ্যাত ‘ভুল’ কাব্যগ্রন্থটি তিনি রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গও করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সমকালে সাহিত্যচর্চাও করেও রবীন্দ্র-প্রতিভার দিগন্তবিস্তারি ছায়ায় ঢেকে যাননি তিনি। বরঞ্চ তাঁর লেখা ‘এষা’ কাব্যটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল সেই সময় যে রবীন্দ্রনাথের ‘মালঞ্চ’ উপন্যাসেও তার উল্লেখ পাওয়া যায়।

বিহারীলাল চক্রবর্তীকে নিজের গুরু বলে মানতেন তিনি। অক্ষয়কুমার বড়ালের কবিতায় ভাবের উচ্ছ্বাস অনেক সংযত এবং বিষয়বস্তু সংহত ও সেই তুলনায় ভাবের প্রকাশ অনেক স্পষ্ট। অক্ষয়কুমারকে বলা হয় প্রেমবৈচিত্ত্যের কবি। আরেক গীতিকবি দেবেন্দ্রনাথ সেনের সঙ্গেও তাঁর কাব্যধারার অনেক সাদৃশ্য পাওয়া যায়। অক্ষয়কুমার বড়াল তাঁর কাব্যলক্ষ্মীকে অন্তঃপুরবাসিনী করে রাখতে চেয়েছেন, তাঁকে প্রকাশ্যে সকলের উপভোগ্য করে তুলতে চাননি। তাঁর কবিতায় দেবেন্দ্রনাথ সেনের মত অনেকাংশে ঈশ্বরভক্তির প্রকাশ চোখে পড়েছে। রবীন্দ্রনাথের ‘তারকার আত্মহত্যা’ অবলম্বনে অক্ষয়কুমার বড়াল প্রথম যৌবনে লেখেন ‘রজনীর মৃত্যু’ কবিতাটি। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার ১২৮৯ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ সংখ্যায় এই কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়াও রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘বনানীর ছায়া’ ও ‘বসন্ত অবসান’ কবিতার ছায়াপাত ঘটেছে অক্ষয়কুমারের লেখা ‘নিদাঘে’ ও ‘মথুরায়’ কবিতায়। তবে অক্ষয়কুমার বড়ালের কবিতা এর পরেও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত কারণ তাঁর কবিতার মধ্যে বিহারীলালের কাব্যধারা আর রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের কাব্যধারার মধ্যে এক সেতুবন্ধনের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। অক্ষয়কুমারের রচনায় বিরহের অবকাশ থাকলেও, মাথুর জনিত কোনও উপলক্ষ্য নেই। নারীপ্রেম তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান উপজীব্য। তাঁর ‘কনকাঞ্জলি’ কাব্যের প্রথম সংস্করণে মোট ২৬টি কবিতা ছিল যার মধ্যে উৎসর্গ কবিতাটি বিহারীলালকে উদ্দেশ্য করে লেখা। এই কাব্যের ‘বনলতা’ অংশটি ভিক্টর হুগোর ‘টয়লার্স অফ দি সী’ রচনার অনুসরণে লেখা। তাঁর লেখা ‘ভুল’ কাব্যগ্রন্থেও বেশ কিছু কবিতায় হুগোর লেখার অনুসরণ বা ছায়াপাত ঘটতে দেখা যায়। এছাড়াও তাঁরই সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল রাজকৃষ্ণ রায়ের কবিতা (১৮৮৭) এবং গিরীন্দ্রমোহিনী দাসীর অশ্রুমালা (১৮৮৭)।

১৯১২ সালে প্রকাশিত অক্ষয়কুমার বড়াল রচিত ‘এষা’ একটি আদ্যোপান্ত শোককাব্য যা কবির পত্নীবিয়োগের যন্ত্রণা থেকে লেখা। পত্নীর মৃত্যুর পরে সংসারে এক অখণ্ড শূন্যতা তাঁকে গ্রাস করে, সেই বেদনার হাহাকার যেন ঝরে পড়ে তাঁর এই কাব্যে। উপহার ও নিবেদন অংশ ছাড়া এই কাব্যের মোট ৪টি অংশ – মৃত্যু, অশৌচ, শোক ও সান্ত্বনা। প্রমথনাথ বিশী তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে তিনি তাত্ত্বিক কবি নন, গৃহজীবনের বিশেষ রসের কবি। অক্ষয়কুমার বড়াল কিছু গানও লিখেছিলেন যার মধ্যে ‘বুঝতে নারি নারী কি চায় গো’ গানটিতে রবীন্দ্রনাথ নিজে সুরারোপ করেছিলেন। শেষজীবনে কলকাতা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্টের অধীনে তাঁর পৈতৃক ভগ্নপ্রায় বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়। কবি বাধ্য হন নিজের বাস্তুভিটে ছেড়ে ভাড়া বাড়িতে থাকতে। এই আঘাতও তাঁকে বেদনার্ত করে তুলেছিল।

১৯১৯ সালের ১৯ জুন অক্ষয়কুমার বড়ালের মৃত্যু হয়।  

তথ্যসূত্র


  1. শ্রী সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, 'সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান', সাহিত্য সংসদ, মে ১৯৬০, কলকাতা পৃষ্ঠা ২
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://www.bengaliguidence.com/
  4. https://www.amimishuk.com/
  5. https://www.maatv.in/

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: আজকের দিনে ।। ১৯ জুন | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন