জোহানেস গুটেনবার্গ (Johannes Gutenberg) একজন জার্মান মুদ্রক যিনি বিশ্বের প্রথম যান্ত্রিক চলনযোগ্য টাইপ প্রিন্টিং প্রেস নির্মাণ করেছিলেন। বই ছাপার জন্য তেল-ভিত্তিক কালির ব্যবহার, কাঠের তৈরি প্রিন্টিং প্রেস, চলমান যান্ত্রিক টাইপ ইত্যাদি যাবতীয় সৃষ্টির মূলে ছিলেন গুটেনবার্গ। টাইপ তৈরির জন্য ব্যবহৃত তাঁর পদ্ধতিতে ঐতিহ্যগত ধাতুর খাদ এবং ঢালাইয়ের জন্য একটি হাতের ছাঁচ অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে মনে করা হয়। বাইবেলের প্রথম মুদ্রিত সংস্করণই ছিল গুটেনবার্গ বাইবেল। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবকে সহজতর করেছিল তাঁর এই আবিষ্কার।
গুটেনবার্গের জন্ম সাল বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায়নি এখনও। তবে ১৩৯৩ সাল থেকে ১৪০৪ সালের মধ্যেকার কোন এক সময়ে জার্মানির মেইঞ্জ শহরে জোহানেস গেনসফ্লেইশ জুর লাদেন জুম গুটেনবার্গের (Johannes Gensfleisch zur Laden zum Gutenberg) জন্ম হয়। তবে বোঝার সুবিধার্থে ১৪০০ সালকেই তাঁর জন্মের স্বীকৃত বছর হিসেবে ধরে নেওয়া হয় সাধারণত। ১৯০০ সালে মেইঞ্জে অনুষ্ঠিত গুটেনবার্গ উৎসবের ৫০০তম বার্ষিকীতে ১৪০০ সালের ২৪ জুন (সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্টের উৎসবের দিন)কে গুটেনবার্গের জন্মদিন হিসেবে ধরে নেওয়া হয় আনুষ্ঠানিকভাবে।
গুটেনবার্গের বাবা ফ্রিল গেনসফ্লেইশ জুর লাদেন মধ্যযুগের ইউরোপের এক সম্মানীয় ব্যক্তি এবং বণিক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল। এছাড়াও ফ্রিল গেনসফ্লেইশ কাপড়ের ব্যবসা করতেন বলেও জানা যায়। ১৩৮৬ সালে এই ফ্রিল গেনসফ্লেইশ এক দোকানদারের মেয়ে এলস ওয়াইরিচকে বিবাহ করেন। এটি ছিল ফ্রিলের দ্বিতীয় বিবাহ। এই দম্পতিরই সম্ভবত সবচেয়ে কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন জোহানেস গুটেনবার্গ। অনেকে বলে থাকেন একজন সম্মানীয় ব্যক্তির সঙ্গে এক সাধারণ দোকানদারের মেয়ের বিয়ে পরবর্তীকালে তাঁদের পুত্র গুটেনবার্গের সামাজিক জীবনে জটিলতা সৃষ্টি করেছিল।
গুটেনবার্গের শৈশব জীবন এবং তাঁর পড়াশুনা নিয়েও খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না এমনকি হাতেগোনা কয়েকটি তথ্য সম্পর্কেও নিশ্চিতভাবে কিছু বলা মুশকিল। একজন সম্মানীয় ব্যক্তির ছেলে হিসেবে পাটিগণিত শিক্ষা স্বাভাবিক ছিল বলে মনে করেন অনেকে। তাঁর ল্যাটিন ভাষায় ভালো জ্ঞান ছিল। তবে তিনি মেইঞ্জ প্যারিস স্কুলে পড়াশুনা করেছিলেন নাকি তাঁর গৃহশিক্ষক ছিল, সে নিয়ে কিছু বলা যায় না নিশ্চিত করে।
এর মধ্যে ১৪১১ সালে মেইঞ্জে সমাজের অভিজাত ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ হয় তার ফলে শতাধিক পরিবার এই শহর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। সেসময় গুটেনবার্গের পরিবার এলটভিল অ্যাম রেইনে চলে গিয়েছিল বলে মনে করা হয়। মনে করা হয় সেখানে তিনি এরফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছিলেন। ১৪১৯ সালে সম্ভবত গুটেনবার্গের পিতার মৃত্যু হয়েছিল।
গুটেনবার্গের পরবর্তী পনেরো বছরের জীবন সম্পর্কে এখন কিছুই জানা যায় না, তবে ১৪৩৪ সালের মার্চ মাসে তাঁর একটি চিঠি ইঙ্গিত দেয় যে তিনি স্ট্রাসবার্গে বসবাস করতেন সেসময়। তিনি স্ট্রাসবার্গ মিলিশিয়াতে নথিভুক্ত একজন স্বর্ণকার ছিলেন বলেও মনে করা হয়। প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ১৪৩৭ সালে তিনি একজন ধনী ব্যবসায়ীকে রত্ন পালিশ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তবে তিনি এই জ্ঞানটি কোথা থেকে অর্জন করেছিলেন তা অজানা। এই বছরেই এনেলিন নামক এক মহিলার সঙ্গে বিবাহের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে আদালতে গিয়েও দাঁড়াতে হয়েছিল তাঁকে।
১৪৩৯ সাল নাগাদ আর্থিক দুরবস্থার কারণে গুটেনবার্গ আচেনে তীর্থযাত্রীদের জন্য পালিশ করা ধাতব আয়না তৈরির একটি দুঃসাহসিক কাজে জড়িত ছিলেন। মূলত এই সময়েই তিনি তাঁর আবিষ্কৃত মুদ্রণ প্রক্রিয়া জনগণের সামনে প্রকাশ করেন।
এখানে বলে নেওয়া দরকার গুটেনবার্গের আগেও মুদ্রণের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু গুটেনবার্গ যা করলেন তা ছিল না আগে। আগে একটি বাক্যের জন্য একটি খোদাই করা কাঠের স্ট্যাম্প তৈরি করা হত এবং কালির সাহায্যে সেই স্ট্যাম্প দ্বারা ছাপার কাজ চলত। কিন্তু যখনই একের বেশি আলাদা একটি লাইন প্রয়োজন হত তখনই আবার আলাদা স্ট্যাম্প লাগত। ফলে তাঁর স্ট্যাম্পগুলি বিভিন্ন জিনিস, বিভিন্ন বাক্যের জন্য পুনরায় যাতে ব্যবহার করা যেতে পারে গুটেনবার্গ সেদিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন। তিনি প্রতিটি চিহ্ন এবং অক্ষরের জন্য ছোট ছোট পৃথক ব্লক (টাইপ) ব্যবহার করেছিলেন। গুটেনবার্গ নাকি একবারে বিয়াল্লিশ লাইন মুদ্রণ করতে পারতেন। ১৪৪৮ সালে মেইঞ্জে ফিরে আসার পর সেখানে একটি মুদ্রণের দোকান খোলেন তিনি। সেখানে তিনি তাঁর শ্যালক আর্নল্ড গেলথাসের কাছ থেকে সম্ভবত একটি ছাপাখানা তৈরির জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। গবেষণায় বলা হয় ১৪৩৯-৪০ সাল নাগাদ ছাপাখানার উদ্ভাবন হয়েছিল। ১৪৫০ সাল অবধি প্রেসটি চালু ছিল বলে মনে করা হয় এবং একটি জার্মান কবিতা ছাপা হয়েছিল এখান থেকে। সম্ভবত এটিই প্রথম মুদ্রিত কাজ যেটি গুটেনবার্গের ছাপাখানায় ছাপা হয়েছিল। গুটেনবার্গ ধনী মহাজন জোহান ফাস্টের থেকে দুদফায় ১৬০০ গিল্ডার ঋণ নেন। এরপর ১৪৫৫ সালে গুটেনবার্গ ভেলামে মুদ্রিত প্রতি পৃষ্ঠায় বিয়াল্লিশ লাইন সমন্বিত ফোলিও বাইবেল মুদ্রণ করেন। মোট একশো আশি কপি মুদ্রণ করা হয়। এছাড়া অ্যালিয়াস ডোনেটাস রচিত ল্যাটিন ব্যাকরণের বই ‘আর্স মাইনর’ -এর কিছু সংস্করণও মুদ্রিত হয়েছিল গুটেনবার্গের ছাপাখানা থেকে বলে মনে করা হয়ে থাকে।
এদিকে বাইবেল প্রকল্পের ব্যয় যত বৃদ্ধি পাচ্ছিল ততই ফাস্টের কাছে ঋণ বাড়তে থাকছিল গুটেনবার্গের। সুদ সহ প্রায় দুহাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল সেই ঋণের অঙ্ক। আদালতের আইনি নথির রেকর্ড থেকে জানা যায় যে গুটেনবার্গ এবং ফাস্টের মধ্যে কেবল বই প্রকল্পের অংশীদারিত্বের চুক্তি হয়েছিল কিন্তু সেই টাকা গুটেনবার্গ অন্য কাজেও ব্যবহার করেছিলেন। ফলত আর্থিক তছরুপের মামলা করেন ফাস্ট গুটেনবার্গের বিরুদ্ধে। আদালত ফাস্টের পক্ষে রায় দেয় এবং তাঁকে বাইবেল প্রিন্টিং ওয়ার্কশপ এবং সমস্ত মুদ্রিত বাইবেলের অর্ধেক নিয়ন্ত্রনের অধিকার দেয়। এইভাবে গুটেনবার্গ কার্যত দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিলেন। আবার অনেকে মনে করেন তিনি একটি ছোট মুদ্রণের দোকান ধরে রেখেছিলেন (বা পুনরায় শুরু করেছিলেন) এবং ১৪৫৯ সালের দিকে বামবার্গে একটি বাইবেল মুদ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় টাইপ সরবরাহ করেছিলেন। যেহেতু তাঁর মুদ্রিত বইয়ে কখনোই তাঁর নাম বা তারিখ থাকতো না, তাই নিশ্চিত হওয়া কঠিন এ বিষয়েও।
১৪৬৫ সালের ১৮ জানুয়ারি মুদ্রণশিল্পে গুটেনবার্গের কৃতিত্বকে স্বীকৃতি জানিয়ে আর্চবিশপ দ্বিতীয় অ্যাডলফ ভন নাসাউ তাঁকে হফম্যান উপাধি প্রদান করেন । বার্ষিক বেতনেরও বন্দোবস্ত করা হয় গুটেনবার্গের জন্য, ফলে কিছুটা অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখেন তিনি। অনেকে মনে করেন শেষ বয়সে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন গুটেনবার্গ। সেসময় কখনও মেইঞ্জে এবং কখনও এলটভিলের পার্শ্ববর্তী গ্রামে বসবাস করতেন তিনি।
১৪৬৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি মেইঞ্জের সেন্ট ভিক্টর প্যারিশে জোহানেস গুটেনবার্গের মৃত্যু হয়। সেই শহরের ফ্রান্সিসকান কনভেন্টের গির্জায় সমাহিত করা হয়েছিল তাঁর মরদেহ। এই গির্জা এবং কবরস্থানটি পরে ধ্বংস হয়ে যায় এবং সেকারণেই গুটেনবার্গের কবর হারিয়ে গিয়েছিল। মুদ্রণ শিল্পে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য জোহানেস গুটেনবার্গকে অনেকে ‘সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে গণ্য করে থাকেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান