বিবিধ

বিভিন্ন ধরণের চামড়ায় বাঁধানো বই

প্রতিটি বইয়ের একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর প্রয়োজন হয় তার সার্বিক সুরক্ষার জন্য। তাই বই আবিষ্কারের প্রথম দিন থেকেই বাধ্যতামূলকভাবে বইয়ের প্রচ্ছদের বিষয়ে বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন চামড়ায় বাঁধানো বই (VARIETIES OF LEATHER BINDINGS)-এর কদর আগেও যেমন ছিল আজও তেমন আছে। মধ্যযুগে বই বাঁধাইয়ের জন্য মূলত দুটি উপাদান ব্যবহার করা হত- (১) বোর্ড, সাধারণত কাঠের তৈরি (তবে মধ্যযুগ পরবর্তী সময়ে কাগজ দ্বারা তৈরি বোর্ড), এবং (২) চামড়া। বই বাঁধাইয়ে চামড়ার ব্যবহার মূলত চামড়ার দীর্ঘকালীন স্থায়িত্ব ও তার ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য। যুগে যুগে বই বাঁধাইয়ে বিভিন্ন প্রাণীর চামড়া ব্যবহার করা হয়েছে, এমনকি যে তালিকায় মানুষও বাদ যায়নি। নিচে সেগুলি নিয়েই আলোচনা করা হল। 

ভেলাম (VELLUM) – ভ্রূণ অবস্থায় থাকা মৃত বাছুর বা গর্ভবতী গরুর প্রথম ২৮ সপ্তাহ হয়েছে এমন ভ্রূণের চামড়া বা শিশু বাছুর, ভেড়া বা ছাগলের চামড়া দিয়ে বই বাঁধানো হলে সেই চামড়াকে ভেলাম বলে। কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরীর আশুতোষ কালকেশনে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নিজস্ব সংগ্রহে ভেলাম বাঁধানো অত্যন্ত দুর্লভ একটি PANTOGRAPHIA (১৭৯৯ সাল অবধি পৃথিবীর সমস্ত স্বীকৃত ভাষার বর্ণমালার সম্ভার) রাখা রয়েছে। প্লিনির লেখা ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’ বইটি থেকে জানা যায় তুরস্কের পার্গামন রাজ্যের রাজা ইউমেনিজের পৃষ্ঠপোষকতায় আলেকজান্দ্রিয়া থেকে রফতানিকৃত প্যাপিরাসের বিকল্প হিসাবে ভেলাম এবং পার্চমেণ্ট উদ্ভাবন করা হয়েছিল। এই ভেলাম শব্দটি প্রাচীন ফরাসি শব্দ ভেলিন (vélin) ‘বাছুরের চামড়া’, যে শব্দটি আবার ল্যাটিন শব্দ ‘ভিটুলিনাম'(vitulinum) যার অর্থ ‘বাছুর হতে প্রাপ্ত’ থেকে এসেছে। মধ্যযুগীয় বেশিরভাগ পুঁথি ভেলামের ওপর লেখা হত। ১৪৫৫ সালে জোহান গুটেনবার্গ প্রকাশিত প্রথম বাইবেলের মুদ্রিত ১৮০টি সংস্করণের এক চতুর্থাংশ এই ভেলামে ছাপা হয়েছিল। এছাড়া বেশ কিছু গান্ধারীয় বৌদ্ধ গ্রন্থ এবং সমস্ত সিফ্রেই তোরাহ (হিব্রু ধর্ম গ্রন্থ) এই ভেলামের ওপর লেখা হত।

গোল্ডবিটারস স্কিন (Goldbeater’s Skin) – এটি হল ষাঁড়ের অন্ত্রের বহিঃত্বক থেকে প্রাপ্ত প্রক্রিয়াজাত চামড়া যা ভীষণরকম টেকসই হয়। আগেকার দিনে স্বর্ণকাররা এই চামড়ার ওপর সোনা খণ্ড রেখে পিটিয়ে পিটিয়ে সোনার পাতলা পাত তৈরি করত। ভেলামে লেখা পাণ্ডুলিপির মধ্যে ক্ষয়ের কারণে ফুটো দেখা দিলে তা মেরামতে এই চামড়া ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

কাফ স্কিন (Calf skin) – এক কথায় বাছুরের চামড়া দিয়ে বই বাঁধানো হলে সেই চামড়াকে কাফ স্কিন বলে। তিন বছরের কম বয়সী বাছুরের চামড়া এটি। স্প্যানিশে একে Novilo বলে। সারা পৃথিবীতে চামড়া বাঁধানো বই বলতে অধিকাংশই এই কাফ স্কিনই বোঝায়। ভীষণ টেকসই হওয়ার কারণে সারা বিশ্বেই কাফ স্কিনের চাহিদা বিশাল।

মরক্কো লেদার (Morocco Leather) – চামড়ার জগতের রাজা এটি। চামড়ায় বাঁধানো বই -এর জগতে সর্বাধিক চাহিদা এই চামড়ার। আসলে ছাগলের চামড়া। লাক্সারি বই বাঁধাই এই চামড়ায় হয়। প্রাচীনকালে একমাত্র মরক্কো দেশের সোকোটো লাল প্রজাতির ছাগলের চামড়া থেকেই এই লেদার তৈরি হত। এই ধরণের চামড়ার ব্যবহার প্রথম আরবে শুরু হয়েছিল। উনিশ শতক থেকে অত্যন্ত দামি ইংরেজি ভাষার বইয়ের সংস্করণে এই চামড়ার ব্যবহার শুরু হয়।

রোয়ান (Roan) – ভেড়ার চামড়া। আসল মরক্কো লেদারের সস্তা সংস্করণ। দেখতে অনেকটা মরক্কো লেদারের মত কিন্তু গুণমানে বিস্তর পার্থক্য থাকে।

স্কিভার (Skiver) – এটা আবার রোয়ান অর্থাৎ ভেড়ার চামড়ার আরও সস্তা সংস্করণ। বই বাঁধাইয়ে এই চামড়ার কদর প্রায় নেই বললেই চলে।

আ্যনথ্রোপোডারমিক বিবলিওপেজি – (Anthropodermic bibliopegy) – মানুষের চামড়া যখন বই বাঁধাইয়ে ব্যবহার হয়। এখনো অবধি সারা পৃথিবীতে ১৮টি বই আছে যেগুলি মানুষের চামড়ায় বাঁধানো। স্কটল্যান্ডের রয়্যাল কলেজ অব সার্জেন – এ একটি নোটবুক রাখা আছে যেটি উইলিয়াম বার্ক নামে একজন খুনির। ওই খুনিকে ১৮২৯ সালে ফাঁসি দেওয়ার পর প্রফেসর আলেকজান্ডার মনরো ওই খুনির মৃতদেহ থেকে চামড়া নিয়ে খুনির নিজের লেখা নোটবইটি বাঁধান। এছাড়া হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারে এরকম একটি বই রাখা আছে যেটি মানুষের চামড়া দিয়ে বাঁধানো। ফরাসি লেখক আরসেন হুসেইর লেখা ‘দে দেসতিনে দো লোম’ নামের বইটি তিনি তাঁর চিকিৎসক বন্ধু লুডোভিক বুল্যান্ডকে পড়তে দিলে বুল্যান্ড তাঁর এক মৃত মহিলা মানসিক রোগীর চামড়া দিয়ে বইটি বাঁধিয়েছিলেন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন