সববাংলায়

ঢালি নাচ

বাংলার লোকসংস্কৃতির ধারা যেমন বিচিত্র তেমনই সেগুলির মধ্যে থেকে অনেক প্রাচীন ইতিহাসেরও সন্ধান পাওয়া যায়। এই লোকসংস্কৃতির ধারার একটি বিরাট অংশ জুড়ে লোকগানের পাশাপাশি লোকনৃত্যেরও স্বতন্ত্র জায়গা রয়েছে। ঢালি নাচ (Dhali Dance) তেমনই এক লোকনৃত্য ধারার অংশ। এই নাচ আসলে যুদ্ধনৃত্য। মধ্যযুগের যুদ্ধের কলাকৌশলগুলি থেকেই এই নাচের ভঙ্গিমাগুলির উদ্ভব হয়েছিল। অনেকটা অভিনয়ও মিশে থাকে এই নাচে। প্রথমদিকে এই ঢালি নাচ পুরুষদের নৃত্য হিসেবেই মূলত পরিচিতি পেলেও, পরবর্তীকালে নারীরাও এই নৃত্য অনুশীলন করেছেন এবং আজও করছেন। মূলত বাংলার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই নাচের সংস্কৃতি লক্ষ করা যায়। ব্রতচারী আন্দোলনের পুরোধা পুরুষ এবং লোকসঙ্গীত ও লোকনৃত্যের পৃষ্ঠপোষক গুরুসদয় দত্তের মতো মানুষ ঢালি নৃত্যকে পরবর্তীকালে খুবই জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।

ঢালি নাচের সঙ্গে এবং এই নামটির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ইতিহাস। মূলত ঢাল থেকে ঢালি শব্দটির আগমন। বিশেষত মধ্যযুগে জমিদার বা রাজাদের যে-সৈন্যরা যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ঢাল এবং তলোয়ার বা বর্শা ব্যবহার করত, তারাই ঢালী নামে পরিচিত ছিল। সেই ঢালী সৈন্যদের যুদ্ধাঙ্গিকের অনুসরণেই এই নাচের উদ্ভব হয়েছে বলে একে ঢালি নৃত্য বলা হয়ে থাকে। এই বাংলার যে একটা বীরত্বের ইতিহাস ছিল, তাকেই যেন স্পষ্ট করে তুলে ধরে এই ঢালি নাচ।

যুদ্ধে ঢালের ব্যবহার অত্যন্ত প্রাচীন। এমনকি পৌরাণিক যুদ্ধের গল্পেও ঢালের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন দুর্গা এবং মহিষাসুর উভয়ের হাতেই কিন্তু আত্মরক্ষার জন্য ঢাল ছিল। পরবর্তীকালের সম্রাট এবং রাজাদের সৈন্যদের মধ্যেও এই ঢালের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। মুঘল সম্রাট আকবরের ঢালি সৈন্যের অস্তিত্ব ইতিহাসবিদিত। আবার এই বাংলার বুকেও জমিদারদের, বারোভুঁইয়াদের ঢালি সৈন্যের কথা জানতে পারা যায়। যেমন, বাংলার বারোভুঁইয়ার অন্যতম একজন যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের বাহান্ন হাজার ঢালি সৈন্য ছিল বলে জানা যায়। এই তথ্যটি পাওয়া যায় ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য থেকে।  মানসিংহ ও প্রতাপাদিত্যের যুদ্ধের প্রসঙ্গে কবি এই বাহান্ন হাজার ঢালির কথা লিখেছিলেন। মধ্যযুগে মূলত হাড়ি, বাগদী, ডোম ইত্যাদি প্রান্তিক জাতির মানুষদের নিয়েই জমিদারদের এই ঢালি সৈন্যদল তৈরি হয়ে উঠত।

এই ঢালি নৃত্যকে পরবর্তীকালে ব্রতচারী সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা গুরুসদয় দত্ত একপ্রকার পুনরুদ্ধারই করেছিলেন বলা যায়। জেলাশাসক হিসেবে কাজ করবার সময় তিনি বাংলার বিভিন্ন জেলায় ঘুরেছেন এবং সেইসব জেলার স্থানীয় সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধার করেছিলেন, তা নিয়ে লেখালিখিও করেছেন। এই ঢালি নৃত্যের সঙ্গে ব্রতচারীদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বাংলার বীরত্বের অতীত যেসব লোকসংস্কৃতির মধ্যে লুকিয়ে আছে তিনি সেগুলি নতুনভাবে মানুষের সম্মুখে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। ঢালি নৃত্য এবং আরও দুটি বীরত্বের ইঙ্গিতবাহী নৃত্যকে (রায়বেঁশে ও কাঠি নৃত্য) তিনি ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বীর-নৃত্যগুলির মধ্যে অন্যতম’ বলেছিলেন তাঁরই একটি লেখায়। খুলনা এবং যশোরের কয়েকজন ঢালী সৈন্যের কাছ থেকে গুরুসদয় দত্ত এই নাচের ভঙ্গি এবং নাচের সঙ্গে বাদ্য হিসেবে ঢোলের এক নির্দিষ্ট বোল সংগ্রহ করেছিলেন।

এই ঢালি নৃত্য যুদ্ধ কৌশলের ভঙ্গীতে সাধারণত দুই ধরণের হতে পারে, আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এবং আত্মরক্ষাত্মক ভঙ্গিতে। এই যুদ্ধনৃত্যের আবার মোট পাঁচটি পর্যায় থাকে, যথা, ১। আসর বন্দনা ২। কসরত ৩। বীরনৃত্য বা বীরচন্দন ৪। যুদ্ধ প্রস্তুতি ও যুদ্ধ ৫। যুদ্ধ শেষ বা তান্ডব নৃত্য।

এই ঢালি নাচ এককভাবেও যেমন নাচা যায় আবার দলবদ্ধভাবে এই নৃত্য পরিবেশন করা যায়। সাধারণত তিন জন এক সঙ্গে এই নৃত্য পরিবেশন করে থাকেন, অনেক সময় আবার কয়েকজন দুটি দলে বিভক্ত হয়ে এই নাচ করেন। যুদ্ধে আত্মরক্ষা কিংবা আক্রমণের কৌশল, শত্রুকে আক্রমণ করবার উচ্ছ্বাস ও ঢালের দ্বারা আক্রমণ প্রতিহত করবার পদ্ধতি, এমনকি যুদ্ধে আক্রান্ত হয়ে যে যন্ত্রণার অভিব্যাক্তি, সে-সবই ঢালি নৃত্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। শারিরীক নানা অঙ্গভঙ্গির পাশাপাশি মুখের বিভিন্ন ভঙ্গি করে অনেকটা অভিনয়ের ধাঁচেই এইসব অভিব্যাক্তি ফুটিয়ে তোলেন নর্তক। এই নাচে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় একজন মূল ঢালিযোদ্ধা দুজন দেহরক্ষী দ্বারা পরিবৃত হয়ে আছেন, তবে তিনজনেই নৃত্যে অংশগ্রহণ করেন।

ঢালি নাচের সময় নর্তকের ডানহাতে থাকে লাঠি, কাঠের তরবারি বা বর্শা এবং বামহাতে দেখা যায় কাঠ, চামড়া কিংবা বেতের তৈরি ঢাল। এই ঢালি নৃত্যের সঙ্গে সাধারণত ঢাক, ঢোল, টিকারা কাঁসি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাজতে থাকে৷ একটি নির্দিষ্ট দ্রুতলয়ে এইসব বাদ্যযন্ত্র বাজে, যা খানিকটা যেন যুদ্ধেরই আবহে তৈরি করে তোলে। এই নৃত্য পরিবেশনের সময় নর্তকদের পরণে সাধারণত মালকোচা, মাথায় লাল ফেট্টি এবং হাতে কাপড় জড়ানো থাকে। তবে সবসময় এই পোশাক একইরকম নাও হতে পারে।

নর্তকরা নৃত্যক্ষেত্রে চক্রাকারে ঘোরেন, শরীরের বিচিত্র কারিগরি প্রদর্শন করতে থাকেন। কখনও এগিয়ে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে কখনও আবার আত্মরক্ষার জন্য এক-দুপা পিছিয়ে ঠিক যুদ্ধের মতো করেই এই নৃত্য করা হয়।

মূলত বাংলাদেশের যশোর, খুলনা ইত্যাদি অঞ্চলে এই ঢালি নাচের বহুল প্রচলন রয়েছে। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের দক্ষিণাঞ্চলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঢালি নাচ লক্ষ করা যায়। মুহররমের সময় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই ঢালি নাচ অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘রায়বেঁশে, ঢালি ও কাঠি নৃত্যের পোশাক’, গুরুসদয় দত্ত, ব্রতচারী কেন্দ্রভবন, ৩ আগস্ট, ১৯৩৭
  2. https://www.auchitya.com//
  3. https://mynewspapercut.blogspot.com/
  4. https://songbadmanthan.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading