সব

ভারতীয় পরিবেশ বিধি কর্মপরিষদ বনাম ভারত মামলা

ভারতীয় পরিবেশ বিধি কর্ম পরিষদ বনাম ভারত মামলা

পরিবেশ মানবজীবনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীতে সুস্থ জীবনযাপন এবং জীবনের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে এই পরিবেশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মাটি, জল, বায়ু ইত্যাদির রক্ষার জন্য পরিবেশ বেশ কিছু আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। মানুষ যদি কোনও সময় এইসব আইন লঙ্ঘন করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরিবেশের প্রতি দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তিদের শাস্তির জন্য পরিবেশগত আইন ও বিধিসমূহ কার্যকর করা হয়। এই ধরনের পরিবেশগত বিধিসমূহের মধ্যে অন্যতম হল দূষণকারী জরিমানা নীতি (Polluter Pays Principle)। ১৯৭২ সালে ‘ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (Economic Co-Operation and Development) নামের একটি সংস্থা এই নীতি চালু করেছিল যেখানে বলা হয় দূষণজনিত যে কোনওরকম খরচ এবং দূষণের ফলে ঘটা পরিণতির জন্য সম্পূর্ণরূপে দূষণকারী দায়ী হবে। এই নীতির সাহায্যেই বহুক্ষেত্রে শিল্প-প্রগতির কারণে ঘটা যে কোনও দূষণ প্রতিরোধ করা যায়। শিল্পোৎপাদন জনিত কারণে পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে ঠিক এই নীতি প্রয়োগ করেই ভারতের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া একটি বিখ্যাত মামলা হল এই ভারতীয় পরিবেশ বিধি কর্মপরিষদ বনাম ভারত মামলা (Indian Council for Environment Legal Action Vs. Union of India Case)।

১৯৮৯ সালে গুজরাট উচ্চ আদালতে শুরু হয়েছিল ভারতীয় পরিবেশ বিধি কর্মপরিষদ বনাম ভারত মামলা যার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হয় ১৯৯৬ সালে। এই মামলার বিচারের দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি জীবন রেড্ডি। মামলার প্রধান অভিযুক্ত ছিল রাজস্থানের বিছরি গ্রামে তৈরি হওয়া বেশ কিছু রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদনকারী শিল্প কারখানা ও তার মালিক-ব্যবসায়ীরা। রাজস্থানের বিছরি গ্রামের অধিবাসীদের বকলমে ভারত সরকার এই মামলায় তাদের বিরোধিতা করে।

১৯৭২ সালের স্টকহোম ঘোষণা (Stockholm Declaration) থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভারত বিস্তৃতভাবে পরিবেশগত বিধি প্রণয়নের জন্য তৎপর হয়ে পড়ে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ১৯৭৪ সালের জল সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৮১ সালের বায়ু সংরক্ষণ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৮৬ সালের পরিবেশ সুরক্ষা আইন এবং ১৯৮০ সালের অরণ্য সংরক্ষণ আইন ইত্যাদি। পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালে ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সংস্থা ওরফে ওইসিডি (OECD) যে দূষণকারী জরিমানা নীতি চালু করে তা দেশীয় এবং বৈশ্বিক স্তরে অত্যন্ত কার্যকর হয়ে ওঠে। আলোচ্য মামলাটি আবর্তিত হয়েছে রাজস্থানের উদয়পুর জেলার বিছরি গ্রামকে ঘিরে। এই গ্রামের উত্তরাংশে হিন্দুস্তান জিঙ্ক লিমিটেড সহ অন্যান্য আরও কয়েকটি রাসায়নিক শিল্প কারখানা ছিল। এই গ্রামে বহু মানুষের বসবাস কিন্তু তাদের সুরক্ষা বা তাদের বেঁচে থাকার নিরাপত্তার কথা না ভেবে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা এই কারখানাগুলির মাধ্যমে প্রচুর উৎপাদন করে বহুল অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর এনভায়রনমেন্টাল লিগ্যাল অ্যাকশন (Indian Council for Environmental Legal Action) নামে একটি পরিবেশপ্রেমী সংস্থা বিছরি গ্রামের বাসিন্দাদের দুর্দশার উপর আলোকপাত করে এবং সেই সংস্থার মাধ্যমেই প্রচারিত হয় যে কিছু শিল্পমালিক মুনাফার জন্য ঐ গ্রামের বাসিন্দাদের বাসস্থান ও কৃষিকাজের জমি অধিগ্রহণ করে এই কারখানাটি তৈরি করেছে। এই সংস্থা এবং গ্রামবাসীরা লক্ষ্য করেন যে এই রাসায়নিক শিল্পোৎপাদন তাদের পরিবেশকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই গ্রামের এই সমস্ত শিল্প কারখানাগুলির বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দুস্তান অ্যাগ্রো কেমিক্যালস লিমিটেড সংস্থাটি ওলিয়াম নামের একটি ঘনীভূত সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন শুরু করে এবং একইসঙ্গে একক সুপার-ফসফেট উৎপাদন শুরু করে যা ঐ অঞ্চলের বাসিন্দাদের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। কিন্তু যখন টাটা সিলভার কেমিক্যালস সংস্থা ঐ একই পরিসরের মধ্যে মূলত রপ্তানির জন্য এইচ অ্যাসিড (H Acid) উৎপাদন শুরু করে সেই সময় থেকেই সমস্যা আরও বেড়ে যায়। তারপরে ঐ পরিসরেরই অন্য প্রান্তে অবস্থিত জ্যোতি কেমিক্যালস সংস্থাও এইচ অ্যাসিড এবং অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ উৎপন্ন করতে শুরু করে। এছাড়া অন্যান্য আরও কয়েকটি সংস্থাও সার উৎপাদনের জন্য পরিবেশকে নানাভাবে বিষাক্ত করে তুলছিল, দূষণ ঘটছিল পূর্ণমাত্রায়। এই মামলার সমস্ত অভিযুক্ত সংস্থাগুলিই একইভাবে বিছরি গ্রামের ঐ অংশে পরিবেশের নানা ক্ষতি করছিল। তাছাড়া শিল্পোৎপাদনের ফলে যে বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছিল তা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও প্রক্রিয়াকরণ না করায় সমস্যা আরও বাড়ছিল। এর ফলে এইসব বর্জ্য পদার্থ বায়ু, জল, মাটি কিংবা প্রকৃতির অন্যান্য যে কোনও উপাদানের সংস্পর্শে আসামাত্রই সেটিকে দূষিত করে তুলছিল। দাখিল হওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা যায় যে ঐ সমস্ত সংস্থাগুলি থেকে ২৫০০ টন ক্ষতিকর বিষাক্ত বর্জ্য এবং ৩৭৫ টন এইচ অ্যাসিড উৎপন্ন হয়। কোনওরকম যথাযথ প্রক্রিয়াকরণ ছাড়াই এইসব বর্জ্যগুলিকে বিছরি গ্রামের ঐ নির্দিষ্ট অঞ্চলে জমা করা হচ্ছিল, মাটিতে পুঁতে দেওয়া হচ্ছিল। এর ফলে একইসঙ্গে ভূগর্ভস্থ জল, মাটি দূষিত হয়ে পড়ছিল। বছরের পর বছর ধরে এই বিষাক্ত পদার্থগুলি সমস্ত কূপের পাশাপাশি জলের অন্যান্য উৎসগুলিকে বিষাক্ত করে তুলছিল, মানুষের ব্যবহারের অনুপযুক্ত করে তুলছিল। মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, পানীয়, সেচকার্য, গবাদি পশুদের স্নান করানো এমনকি জল খাওয়ানোও দুষ্কর হয়ে পড়ছিল। বিপজ্জনক রাসায়নিক দূষণ ঐ গ্রাম তো বটেই, তার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী আরও কয়েকটি গ্রামের মানুষদের শরীরে দুরারোগ্য ব্যাধি সঞ্চার করতে শুরু করে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বহু মানুষের মৃত্যুও হয় এই দূষণের ফলে। ভারতের সংসদ, মন্ত্রীবর্গ পরিবেশের এই ক্রমান্বয়ী দূষণ ও তার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হলেও এর প্রতিকারের জন্য কোনও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই জন্য ঐ বিছরি গ্রামের মানুষেরাই প্রতিবাদে সামিল হয় যার তীব্রতার দরুণ এলাকার জেলা শাসক বাধ্য হন ঐ অঞ্চলে ১৪৪ ধারা জারি করতে এবং একইসঙ্গে এই সমস্ত রাসায়নিক শিল্প কারাখানাগুলি বন্ধ করার কড়া নির্দেশ জারি করেন। এক্ষেত্রে দুটি মুখ্য বিষয় উঠে আসে –

  • বিষাক্ত রাসায়নিক তৈরির সঙ্গে জড়িত শিল্প কারাখানাগুলি পরিবেশের সুরক্ষার জন্য কোনও ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা?
  • প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়ার জন্য বিবাদী আইনত দায়ী হবে কিনা?

অভিযুক্ত শিল্প কারখানাগুলির মালিকেরা বিছরি গ্রামের ঐ অঞ্চলে একইসঙ্গে এইচ অ্যাসিড ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক উৎপাদন শুরু করে। এর ফলে লৌহ ও জিপসাম সম্বলিত বর্জ্য তৈরি হতে থাকে যার যথাযথ প্রক্রিয়াকরণ না হওয়ায় পরিবেশ দূষণ হতে থাকে। এর ফলে গ্রামের ঐ অঞ্চলের বাসিন্দা এবং পরিবেশ উভয়ের ক্ষেত্রেই বিপদসীমা বেড়ে যায় ফলত শিল্প কারখানাগুলিকে প্রাথমিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বলা হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই কারখানাগুলিতে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ, নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সুরক্ষাজনিত যথাযথ ব্যবস্থা অবলম্বন না করা হয়, ততদিন পর্যন্ত সেই কারখানাগুলি বন্ধ থাকবে। এই কারখানাগুলি রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদনের জন্য কোনওরকম ‘অনাপত্তি শংসাপত্র’ (No Objection Certificate) সংগ্রহ করেনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যার ফলে বোঝা যায় যে একপ্রকার বিনা অনুমতিতেই এই উৎপাদন চলছিল এতদিন ধরে। কিন্তু হিন্দুস্তান অ্যাগ্রো কেমিক্যালস লিমিটেডের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সালফিউরিক অ্যাসিড ও অ্যালুমিনা সালফেট উৎপাদনের জন্যে অনাপত্তি শংসাপত্র আগেই সংগ্রহ করেছিল, কিন্তু তারপরেও দেখা যায় ওলিয়াম উৎপাদনের জন্য তাদের কাছে যথাযথ অনুমতি ছিল না।

এই মামলার তথ্য ও সাক্ষ্য প্রমাণাদির বিচার করে ১৯৯৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আদালত রায় দেয় যে ঐ সব শিল্প-মালিকদের পরিবেশ দূষণ করার জন্য জরিমানা দিতে হবে এবং ১৯৯৭ সালের ১৩ এপ্রিলের মধ্যে চক্রবৃদ্ধি সুদ সহ এই জরিমানা জমা করার নির্দেশ দেয় আদালত। কিন্তু রায় ঘোষণার পরও শিল্প-মালিকেরা আদালতের নির্দেশ অমান্য করেন। কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলেও গ্রামের বহু মানুষ ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়তে থাকে। আর এদিকে তারা মামলার নিষ্পত্তি করার বদলে আরও ১৫ বছর ধরে নানা অছিলায় মামলাকে দীর্ঘায়িত করে চলে। এর ফলস্বরূপ ১৯৯৭ সালের ঐ দিনে আদালত সেইসব শিল্পমালিকদের মোট ৩ কোটি ৭৩ লক্ষ ৮৫ হাজার টাকা জমা করার নির্দেশ দেন যার মধ্যে বার্ষিক ১২ শতাংশ হারে চক্রবৃদ্ধি সুদ এবং মাননীয় আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করার জন্য জরিমানার অঙ্কও ধার্য করা ছিল। পরে মামলা চালিয়ে যাওয়ার দরুণ উভয়পক্ষের কথোপকথনের ভিত্তিতে শিল্পমালিকদের সর্বশেষ ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় আদালত। এই অর্থ বিছরি গ্রাম ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার ক্ষয়ক্ষতি ও সংশোধনী কার্যকলাপের জন্য ব্যবহৃত হবে বলে জানানো হয়। এই মামলার ক্ষেত্রেই ভারতীয় আদালত প্রথম পরিবেশ দূষণকারী সংস্থা বা ব্যক্তির উপর দূষণকারী জরিমানা নীতি প্রয়োগ করে শিল্পমালিকদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।   


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়