ইতিহাস

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল (Sardar Vallabhbhai Patel) আসল নাম বল্লভভাই  ঝাভারভাই প্যাটেল একজন ভারতীয় রাজনীতিবিদ  ছিলেন যিনি ভারতের  স্বাধীনতার পর প্রথম উপ- প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন  করেছিলেন। তিনি পেশায় একজন ব্যারিস্টার, স্বাধীনতার আগে ইংরেজদের বিরুদ্ধে  লড়াই করা প্রথম শ্রেণীর স্বাধীনতা  সংগ্রামী এবং  স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে অখন্ড ভারত  গঠনে ভূমিকা  নেওয়া একজন দায়িত্ববান প্রবীণ অভিজ্ঞ  রাজনীতিবিদ। তাঁর হাত ধরেই স্বাধীন ভারতের অখন্ডতা নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল৷ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের নির্বাচিত সরকারের সামনে প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিচ্ছিন্নতাবাদ। একাধিক ছোট ছোট রাজনৈতিক দল নিজেদের  রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবার জন্য, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে মদত দিতে থাকে, ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে যায়! এমনই এক প্রেক্ষাপটে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল নিজের হাতে ভারতবর্ষকে অখন্ড রূপ দেওয়ার চেষ্টা চালান এবং সেইসময় দেশের অখণ্ডতার স্বার্থে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে প্রয়োজনীয় কঠোর পদক্ষেপ  নিয়েছিলেন৷ তিনি ১৯৪৭ সালে ভারতপাকিস্তান যুদ্ধের সময়  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছিলেন। তাঁর দৃঢ়চেতা ও কঠোর  সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার জন্যই, ‘ভারতের লৌহ মানব’ বলা হয়৷

১৮৭৫ সালে ৩১ অক্টোবর (যদিও এই জন্ম তারিখের ব্যাপারটি নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে। তিনি নিজে স্কুলের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায়  ৩১ অক্টোবর  উল্লেখ করেন।) গুজরাটের খেদা জেলার নাদিয়ায় বল্লভভাই প্যাটেলের জন্ম হয়।  তাঁর বাবার নাম ঝাভারভাই প্যাটেল  ও মায়ের নাম লাডবা। তাঁরা সব মিলিয়ে ছয় ভাইবোন৷ বল্লভভাই মধ্য  গুজরাটের লেউদা প্যাটেল পতিদার সম্প্রদায়ের  অন্তর্গত ছিলেন। তিনি বিখ্যাত হওয়ার  পরে লেউদা ও  দাভা প্যাটেল উভয় সম্প্রদায়ই তাঁকে নিজেদের সম্প্রদায়ের বলে দাবী  করে। 

বল্লভভাই প্যাটেলের প্রাথমিক পর্যায়ের  পড়াশুনো  অন্যদের থেকে আলাদা  ছিল।  তিনি  নাদিয়াক, পেটলাভ, বরসাদ প্রভৃতি জায়গা ভ্রমণ করে সেখানকার স্কুলে  শিক্ষা লাভ করেছিলেন। এই সময় থেকেই তিনি অন্যান্য ছেলেদের থেকে স্বতন্ত্র জীবনে  অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি নিজেকে এতটাই দৃঢ়চেতা  করে  তুলেছিলেন  যে,  প্রতিবেশীরা তাঁকে এমন একজন চরিত্রের ভাবতেন যিনি নিজের সব যন্ত্রণা লুকিয়ে  রাখতে পারতেন। বল্লভভাই প্রায়  ২২ বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেছিলেন। এরপর তিনি আইনজীবী  হওয়ার  ইচ্ছা  নিয়ে ইংল্যান্ডে  যান। তিনি নিজের পরিবার থেকে  নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেন এই সময়ে এবং আইনজীবিদের কাছ থেকে  বই নিয়ে  নিজের আইন বিদ্যার পড়াশুনো চালাতেন। তিনি প্রচন্ড অধ্যাবসায়ের সাথে দুবছরের  মধ্যে পরীক্ষায়  উত্তীর্ণ হন এবং ব্যারিস্টার হিসেবে দেশে ফিরে আসেন। 

ব্যারিস্টার হিসেবে  ভারতবর্ষে  ফিরে  আসবার পর  থেকেই বল্লভভাই তাঁর কর্ম জীবন শুরু করেন। বাবা মায়ের কথায় নিজের স্ত্রী ঝভেরভাকে নিয়ে গোধরায় চলে  আসেন বল্লভভাই এবং এখানেই ঘর ভাড়া  করে  থাকতে  শুরু করেন। এখান থেকেই শুরু  করেন তিনি আইনচর্চা। ক্রমশই বল্লভভাই একজন নামকরা আইনজীবী হয়ে  উঠলেন। দক্ষ আইনজীবী হিসেবে তাঁর নাম  ছড়িয়ে পড়তে  শুরু করে। প্যাটেল দম্পতির  ১৯০৪ ও ১৯০৬ সালে একটি মেয়ে সন্তান মনিবেন এবং পুত্র সন্তান দহিয়াভাইয়ের   জন্ম হয়। এই সময় দেশে প্লেগের  প্রাদুর্ভাব  দেখা দিলে বল্লভভাইয়ের এক কাছের বন্ধু এই রোগে  আক্রান্ত হয়। বল্লভভাই তাঁর সেবা  করতে গিয়ে নিজেও এই রোগে আক্রান্ত  হয়ে  পড়েন। নিজের  পরিবারের কথা চিন্তা  করে তিনি নিজেকে আলাদা রাখেন এবং ঘর থেকে  অনেক দূরে  একটি পুরানো  মন্দিরে  একান্তে   দিন কাটাতে  থাকেন।

বল্লভভাইয়ের   স্ত্রী ঝাভাররা ১৯০৯ সালে ক্যান্সারে  আক্রান্ত হলে তাঁকে মুম্বাইতে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার  জন্য।  কিন্তু তাঁর স্ত্রীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি শেষ পর্যন্ত। বল্লভভাইকে যখন স্ত্রীর মৃত্যুর খবর চিরকুটে লিখে জানানো হয় তিনি তখন আদালতে  মামলা  লড়ছিলেন। নিজের স্ত্রী বিয়োগের খবর শুনেও মামলা লড়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত  জিতে  আসেন।  তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুতে অবশ্য তিনি প্রবল শোকাতর হয়ে পড়েন।  তাঁকে পরিবার থেকে  দ্বিতীয়  বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া  হলে,  তিনি রাজী হননি। 

এই সময় তাঁর  জীবনে  সবচেয়ে  গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূত্রপাত হয়। তাঁর ভাই  বিঠলভাইয়ের  পরামর্শে বোম্বাই প্রেসিডেন্সি থেকে রাজনীতিতে অংশ নেন এবং  প্যাটেল পরিবারের যত্ন নেওয়ার জন্য আমেদাবাদেই থাকতে  শুরু  করেন। বন্ধুদের  অনুরোধে প্যাটেল  ১৯১৭ সালে স্যানিটেশন  কমিশনার পদে নির্বাচনে অংশ নেন  এবং  জয়ী  হন। নাগরিক ইস্যু নিয়ে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদেরর সাথে তাঁর তর্ক বিতর্ক,  সংঘর্ষ  লেগেই থাকত। গান্ধীর  প্রতি প্রথম দিকে তাঁর খুব একটা উঁচু ধারনা ছিল না। পরবর্তী  সময়ে  ১৯১৭ সালে তিনি সময়ের সাথে সাথে নিজের চিন্তা পাল্টাতে  শুরু করেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে  যোগ  দেন। 

প্যাটেল ১৯১৭ সালে একটি  বক্তৃতায় স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে ভারতীয়দের উৎসাহিত  করবার জন্য  যোগ দেওয়ার ডাক দেন।  গান্ধীজির  আবেদন পত্রে  নিজের স্বাক্ষর দেন,  এবং পুরো  দেশ জুড়ে  আন্দোলনে নামবার প্রস্তুতি শুরু করেন। বল্লভভাই গুজরাট  সভার সেক্রেটারি  হয়েছিলেন। তিনি এই সময় বেশ কিছু  মৌলিক আন্দোলনের সাথে  যুক্ত  হয়েছিলেন যেমন – ভারতীয়দের  বাধ্যতামূলক  চাকরী, প্লেগ ও দুর্ভিক্ষের জন্য  ত্রাণ, কর  ছাড়ের   জন্য খেদা  কৃষক আন্দোলনের সমর্থন ইত্যাদি। কোন  আন্দোলনেই তিনি  সফলতা পাননি ; ব্যর্থ  হয়েছিলেন, তবুও হাল  ছাড়েননি।

বল্লভভাই গান্ধীজির  অসহযোগ আন্দোলন সমর্থন  করে প্রায়  তিন লক্ষের মতন  সদস্য জোগাড় করেন এবং বিপুল পরিমাণ  অর্থ  সংগ্রহ করেছিলেন। স্বদেশী পোশাকের  জন্য নিজের ছেলে ও মেয়ের সাথে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সুতির  পোশাক বিলি করেন। এর পাশাপাশি  মদ্যপান বিরোধিতা, বর্ণগত শ্রেণীর বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই, নারীর  ক্ষমতায়ন, স্কুল  ব্যবস্থার পরিবর্তন, নারীর  শিক্ষা, এমনকি বন্যা পরিস্থিতিতে আর্তদের   জন্য  ত্রানের  ব্যবস্থাও  করেছিলেন। তাঁর এই পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে সাধারণ  শ্রেণীর  কাছে বল্লভভাইয়ের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। তিনি ধীরে  ধীরে স্বাধীনতা  আন্দোলনের সাথে  যুক্ত   হতে  শুরু করেন। তিনি ১৯২৮ সালের এপ্রিলে পুরসভার  দায়িত্ব থেকে সরাসরি কৃষকদের মধ্যে নেমে আসেন। তিনি বুঝেছিলেন জননেতা  হতে হলে অবশ্যই ভারতবর্ষের  কৃষক শ্রেণীর  কাছের নেতা হতে হবে বারেলির কৃষকরা খাজনা বৃদ্ধির ফল্র বিপদে পড়ে। দুর্ভিক্ষের কারনে খাজনা দেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব   ছিল না।  প্যাটেল তাঁদের পাশে  দাঁড়ান। তিনি অহিংসার মাধ্যমে কৃষক প্রতিনিধিদের সাথে সরকার পক্ষের আলোচনা চালিয়ে যান। 

বল্লভভাই অহিংস  নীতিতে বিশ্বাস করতেন। তিনি ১৯৩১  সালে মৌলিক অধিকার ও অর্থনৈতিক  নীতির  রেজুলেশন কংগ্রেসে  নিয়ে  আসেন। তিনি লবন সত্যাগ্রহ  আন্দোলনে গান্ধীর  সাথেই  গ্রেপ্তার  হন; এতে  আন্দোলন আরও সুতীব্র  হয়।  বল্লভভাই কংগ্রেসের সভাপতি  নির্বাচিত  হলে  গুজরাতে  যাদের  জমি সরকার দখল  করেছিল সেই সব  কৃষকদের জমি ফিরিয়ে আনবার ব্যবস্থা করেন। এইসময়  কংগ্রেসের  অভ্যন্তরীণ  ব্যাপারে  বেশ  কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। বল্লভভাই নেহেরুর  সমাজতন্ত্রের  বিরোধীতা  করেন। তিনি সুভাষ বোসের  অহিংসানীতি  থেকে সরে এসে  তাঁর সশস্ত্র বিপ্লবী মনোভাবের বিরোধিতা  করেছিলেন। ভারত ছাড়ো  আন্দোলন শুরু  হলে প্যাটেল তাতে অংশ নেন।

প্যাটেল দেশ ভাগের  জন্য মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্যগুলি নিয়ে  আলাদা দেশ গঠনের  পক্ষে মুসলিম লীগের  সাথে  কথা  বলেছিলেন। সেইসময় অনেক হিন্দু  অধ্যুষিত অঞ্চল, বিশেষ করে  বাংলা  ও পাঞ্জাব  পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত  হয়ে পড়েছিল প্রায়।  বল্লভভাই প্যাটেলের  হস্তক্ষেপে মুসলিম লীগ শেষ অবধি এই অন্তর্ভুক্তিকরনে ব্যর্থ  হয়।

স্বাধীনতা  পরবর্তী সময়ে  ভারতীয় রাজনীতিতে বল্লভভাই প্যাটেলের গুরুত্ব অসীম। ভারত স্বাধীনতা অর্জনের পরে বল্লভভাই প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। বল্লভভাই অখণ্ড  ভারতবর্ষ   গঠনে  যে কোন  পদক্ষেপ  নিতে পিছপা  হননি। রাষ্ট্রনীতিকে কখনই  শুধুমাত্র  সমর্থন বা  ভোটব্যঙ্ক  বানাননি।  তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতবর্ষে প্রায় ৫২২ টি রাজ্যকে ভারতের অধীনে এনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা(CIVIL SERVICE) এবং ভারতীয় পুলিশ পরিষেবা প্রতিষ্ঠার মূল শক্তি ছিলেন।

১৯৫০ সালের  ১৫  ডিসেম্বর  প্রবল ভাবে হৃদরোগে  আক্রান্ত  হয়ে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মৃত্যু হয়।

২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর সর্দার পটেলের ১৪৩তম জন্মবার্ষিকীতে গুজরাতের কেড়ওয়াড়িতে নর্মদা নদীর তীরে ১৮২ মিটার উচ্চতার সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মূর্তিটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন