আর্যভট্ট (Aryabhatta) প্রাচীন ভারতীয় গণিতবিদদের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত নাম। তিনি প্রাচীন ভারতের প্রথম দিকের একজন গণিতবিদ, পদার্থবিদ এবং জ্যোতির্বিদ। ধারণা করা হয়, গণিতে তিনিই প্রথম শূন্যের ধারণা দিয়েছিলেন। তিনি ‘আর্যভটিয়া’ এবং ‘আর্য-সিদ্ধান্ত’-এর মত বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাঁর নামেই ভারতের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহের নাম রাখা হয় ‘আর্যভট্ট’। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, তিনি আর্যভট্ট (Aryabhatta) নামে বেশি পরিচিত হলেও তাঁর নামের প্রকৃত বানান হওয়া উচিত আর্যভট (Aryabhata)।
ভারতে গুপ্ত যুগে ৪৭৬ সালে আর্যভট্টের জন্ম হয়। আর্যভট্ট তাঁর রচিত গ্রন্থে জন্ম সাল উল্লেখ করলেও জন্মস্থান নিয়ে সুনির্দ্দিষ্ট করে কিছু বলেননি ফলত তাঁর জন্মস্থান নিয়ে বহুমত রয়েছে। আর্যভট্টের অন্যতম ভাষ্যকার প্রথম ভাস্করের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আর্যভট্টের জন্ম হয়েছিল অশ্মক নামের একটি জায়গায় যা বর্তমান মহারাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। অন্য কিছু মত অনুযায়ী তিনি কেরালায় জন্মেছিলেন। এছাড়া অন্যান্য মতে তাঁর জন্মস্থান তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ এমনকি বাংলাও হয়ে থাকতে পারে।
আর্যভট্টের ভাষ্যকার প্রথম ভাস্করের তথ্য অনুযায়ী বাল্যকাল থেকেই প্রচণ্ড জ্ঞানপিপাসু ছিলেন আর্যভট্ট। সঠিক সাল জানা না থাকলেও, আর্যভট্ট জীবনের কোনও এক সময়ে শিক্ষা গ্রহণের জন্য গিয়েছিলেন কুসুমপুরায়। সেখানে কিছুকাল বসবাস করেছিলেন। প্রথম ভাস্কর কুসুমপুরাকে পাটলিপুত্র (বর্তমানে বিহারের পাটনা) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আর্যভট্ট কুসুমপুরের আর্যভ নামে বিখ্যাত ছিলেন।
সেই সময় বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত ছিল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। ধর্মশাস্ত্র ও দর্শনের সাথে বিজ্ঞানের যোগসাজশ নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু ছিল ব্যবহারিক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা। আর আর্যভট্টের ছিল যেখানে শেখার আগ্রহ। আর সেই আগ্রহ থেকেই বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বতসহ বহু চড়াই-উতরাই পার হয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য পা রাখেন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরে অবস্থিত খাগোলা গ্রামে স্থাপন করা হয়েছিল জ্যোতির্বিদ্যার একটি গবেষণাক্ষেত্র। সেখান থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞান শিক্ষার হাতেখড়ি পেলেন আর্যভট্ট। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর থেকেই নিজের প্রতিভার প্রকাশ করার সুযোগ পেতে থাকেন তিনি। ছাত্র ও শিক্ষক মহলে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পরবর্তীকালে তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হয়েছিলেন।
আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে কোনরকম আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনক বেশ কিছু তথ্য উপস্থাপন করেছিলে আর্যভট্ট। তিনিই প্রথম পৃথিবীর আহ্নিক গতি অর্থাৎ নিজ অক্ষের উপর ঘোরার কথা বলেন। পৃথিবীর নিজ অক্ষের উপর ঘুরতে যত সময় নেয় সেই হিসেবও তিনি করেছেন এবং সেই মান হল ২৩ ঘন্টা ৫৬ মিনিত ৪.১ সেকেন্ড আধুনিক হিসেবে যা ২৩ ঘন্টা ৫৬ মিনিট ৪.০৯১ সেকেন্ড। একইভাবে তাঁর হিসেবে বছরের মান ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টা ১২ মিনিট ৩০ সেকেন্ড (৩৬৫.২৫৮৫৮ দিন) যা আধুনিক হিসেবের (৩৬৫.২৫৬৩৬ দিন) এর থেকে মাত্র ৩ মিনিট ২০ সেকেন্ড বেশি।
তিনি পৃথিবীকে কেন্দ্রে ধরে সৌরজগতের বর্ণনা করেছেন। তবে কোন কোন মত অনুসারে তিনি সূর্যকে কেন্দ্রে ধরেছিলেন তবে এই নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তিনিই প্রথম বলেন চাঁদ ও গ্রহগুলির নিজস্ব কোন আলো নেই। সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে প্রচলিত রাহু কেতু সম্পর্কিত ধারণাকেও তিনি খন্ডন করে আসল বৈজ্ঞানিক কারণ উল্লেখ করেন। তিনি চন্দ্রগ্রহণে কতটা অংশ ঢাকা পড়বে এবং কতক্ষণ ধরে গ্রহণ হবে সেই হিসেবও করেন। তাঁর পদ্ধতিতে এই হিসেবে যে উত্তর আসে তা আধুনিক পদ্ধতির হিসেবে খুবই কাছাকাছি।
আর্যভট্ট হিন্দু পৌরাণিক ধারণার পরিবর্তে সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণের প্রকৃত কারণগুলোর প্রমাণ দিয়েছিলেন। সূর্য গ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণের সময়কাল নির্ণয়ের পদ্ধতিও বের করেছিলেন তিনি। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, চাঁদের আলো আসলে সূর্যের আলোর প্রতিফলনেরই ফলাফল। এছাড়া তিনি আরও তার গণনার মাধ্যমে বের করেন যে চাঁদ এবং অন্যান্য গ্রহগুলি সূর্যের রশ্মি দ্বারা আলোকিত হয়। এবং আর্যভট্ট তার সূত্র থেকে প্রমাণ করেছেন যে বছরে ৩৬৬ দিন নয়, ৩৬৫.২৯৫১ দিন।
আর্যভট্টের হাত ধরেই ভারতীয় গণিতের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছিলো । এছাড়াও বিশ্বের গণিত ও জ্যোতিষ তত্ত্বের উপর আর্যভট্টের গভীর প্রভাব রয়েছে। সুপ্রাচীনকাল থেকে আজকের যুগেও ব্যবহৃত হচ্ছে তাঁর আবিষ্কৃত বিভিন্ন গাণিতিক নিয়ম ও সূত্র।
তিনি বীজগণিতের উপরেও সেই প্রাচীনকালেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। বীজগণিতের অনির্ণেয় সমীকরণ সমাধানের জন্য তিনি কুত্তক পদ্ধতির প্রয়োগ করেন যা আধুনিক বীজগণিতে ax – by=c হিসেবে রূপান্তরিত। আজকের যুগের ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণেও বিশেষ অবদান আছে তাঁর। যেখানে একাধিক অজানা রাশি সংবলিত সমীকরণ সমাধান করার একটি উপায় বের করেন তিনি। যার নাম দেওয়া হয় ‘কুত্তক’। এছাড়াও ত্রিকোণমিতি, পরিমিতি, বর্গমূল, ঘনমূলের মতোও গাণিতিক শাখাগুলোর সূচনা আর্যভট্টের হাত ধরেই।
আর্যভট্ট জ্যোতিষশাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজগুলি দুটি প্রধান গ্রন্থে সংকলিত করে রেখেছিলেন । এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘আর্যভটিয়ম্’ বা ‘আর্যভটিয়া’। তাঁর লেখা বইগুলির মধ্যে একমাত্র এই বইটিই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। এই বইয়ে উল্লেখিত ঘটনাগুলির সময় বিচার করে অনুমান করা হয় বইটি ৫১০ সালের কাছাকাছি সময়ে রচিত। আর্যভট্ট বইটি রচনা করেছিলেন পদবাচ্যের আকারে। যদিও বইটির নাম আর্যভট্ট নিজে দেননি। পরবর্তী সমালোচকরা এই নামটি দিয়েছেন। আর্যভট্টের কাজের বেশিরভাগ বর্ণনা মূলত তাঁর রচিত এই গ্রন্থ থেকেই এসেছে।আর্যভট্টের শিষ্য ভাস্কর প্রথম এই রচনাটিকে অশ্মক-তন্ত্র (Treatise from the Ashmaka) নামে অভিহিত করেছিলেন।
‘আর্যভটিয়া’য় মোট ১২১টি স্তোত্র আছে যা চারটি পদ বা অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশ বা পদের নাম ‘গীতিকা পদ’। এই পদে তেরোটি শ্লোক রয়েছে যেখানে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে শ্লোক দ্বারা সংস্কৃত বর্ণমালার সাহায্যে গণিতের বড় সংখ্যা প্রকাশ করা যায়। দ্বিতীয় অংশ বা পদের নাম ‘গণিত পদ’। এই অংশে তেত্রিশটি শ্লোকে বর্ণনা করেছেন অঙ্ক আর অঙ্কের বিভিন্ন সূত্র । এছাড়াও পাটীগণিত, বীজগণিত, সমতল ত্রিকোণমিতি, দ্বিঘাত সমীকরণ, প্রথম স্বাভাবিক n সংখ্যার বিভিন্ন ঘাতবিশিষ্ট পদসমূহের সমষ্টির আলোচনা আছে এই অংশে। এই অধ্যায়ে পাইয়ের মান হিসেবে বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাতকে ৩.১৪১৬ দ্বারা সূচিত করেছেন আর্যভট্ট। তৃতীয় অংশ অর্থাৎ কালক্রিয়া পদের পঁচিশটি শ্লোকে দেখিয়েছেন সময়ের হিসাব। আর সর্বশেষ অংশটি হলো ‘গোলা পদ’। এর পঞ্চাশটি শ্লোকে রয়েছে গোলা তত্ত্ব বা গোলক তত্ত্ব। এতে মূলত জ্যোতির্বিদ্যা ও গোলীয় ত্রিকোণমিতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
আর্যভট্টের দ্বিতীয় গ্রন্থটি হচ্ছে ‘আর্য-সিদ্ধান্ত’ তবে আর্য-সিদ্ধান্তের কোনো পাণ্ডুলিপি খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর তথ্য পাওয়া গিয়েছে বরাহমিহির, ব্রহ্মগুপ্ত এবং প্রথম ভাস্করের কাজে।
এছাড়া আর্যভট্টের তৃতীয় একটি রচনা সম্পর্কে খোঁজ পাওয়া যায়, তবে এটির আসল রূপ পাওয়া যায় না। একটি আরবি অনুবাদের আকারে পাওয়া গিয়েছে । পণ্ডিতদের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, আরবি রচনা ‘আল-নাতফ’ এবং ‘আল-নানফ’ আর্যভট্টের রচনাগুলির অনুবাদ। এই লেখাটি আর্যভট্টের রচনার অনুবাদ বলে দাবি করলেও এর প্রকৃত নাম অজানা। এই তথ্যটি পারস্যের ইতিহাস প্রসিদ্ধ পন্ডিত ও ঐতিহাসিক আবু রায়হান আল-বিরুনী উল্লেখ করেছেন।
আরবের জ্ঞান-তপস্বীরা আর্যভট্টকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। আর্যভট্ট আরবে পরিচিত ছিলেন আরজাভর নামে। একাদশ শতকের দিকে পণ্ডিত আল-বিরুনী ভারতে এসেছিলেন । ভ্রমণবৃত্তান্তে তিনি আর্যভট্টের কথা উল্লেখ করে বলেন, আর্যভট্টের কোনো মূল রচনার সন্ধান পাননি তিনি। পেয়েছিলেন বেশ কিছু উদ্ধৃতি, যা সংকলন করে রেখেছিলেন প্রাচীন ভারতের আরেক প্রখ্যাত মনিষী ব্রহ্মগুপ্ত। আধুনিক যুগে এসে বিজ্ঞানী কার্নের উদ্যোগে সেগুলো দুই মলাটে আবদ্ধ হয়। তিনি ১৮৭৪ সালে লেইডেন শহর থেকে আর্যভট্টের উদ্ধৃতগুলো একত্র করে ‘আর্যভাটিয়া’ গ্রন্থ প্রকাশ করেন। ১৮৭৯ সালে তা ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করা হয়।
আর্যভট্টের সাইন টেবিল এবং ত্রিকোণমিতির উপর কাজ ইসলামের স্বর্ণযুগে বেশ প্রভাবশালী ছিল। তাই তাঁর কাজগুলো আরবি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং আল-খোয়ারিজমি এবং আল-জারকালিকে প্রভাবিত করেছে।
ভারতীয় এই গণিতবিদকে সম্মান জানাতে ভারতের প্রথম উপগ্রহের নাম রাখা হয় আর্যভট্ট যা ১৯৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল উৎক্ষেপন করা হয়। তাঁকে সম্মান জানাতে বিহার সরকার পাটনায় তাঁর নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে যার নাম রাখা হয় “The Aryabhata Knowledge University (AKU).”
তাঁর মৃত্যুর সঠিক সময়কাল জানা না গেলেও অনুমান করা হয় ৫৫০ সালে আর্যভট্টের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান