সববাংলায়

ব্রহ্মগুপ্ত

বিভাগঃ , ,

প্রাচীন ভারত গণিতে, জ্যোতির্বিদ্যায় এতদূর অগ্রসর হয়েছিল, যে আজ দাঁড়িয়ে সেদিকে ফিরে তাকালে বিস্মিত হতে হয়। যেসব মহান ভারতীয় গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ সেসময়ে গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার চর্চাকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে অন্যতম একজন হলেন ব্রহ্মগুপ্ত (Brahmagupta)। গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে গণিতে ব্রহ্মগুপ্তের অবদানকে অস্বীকার করবার কোন উপায় থাকে না। চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, গ্রহের গড় দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়, স্থির নক্ষত্রের সঙ্গে গ্রহের সংযোগ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যেমন আলোচনা করেছিলেন তেমনই গণিতে শূন্যের প্রয়োগ, গুণ করবার বিভিন্ন পদ্ধতি, চক্রীয় চতুর্ভুজের সূত্র, রৈখিক ও দ্বিঘাত সমীকরণের মতো বিষয়গুলির ওপরও আলোকপাত করেন ব্রহ্মগুপ্ত। তাঁর রচিত দুটি সুবিখ্যাত বই হল, ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ এবং ‘খন্ডখাদ্যক’। এমনকি ব্রহ্মগুপ্ত নিজের রচনায় পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিরও ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন।

ব্রহ্মগুপ্তের নিজেরই বক্তব্য অনুসারে, আনুমানিক ৫৯৮ সালে তাঁর জন্ম হয়। তিনি চাভদা রাজবংশের শাসক ব্যাগ্রহমুখার রাজত্বকালে গুর্জারদেশের ভিল্লামালায় (বর্তমানে যা রাজস্থানের ভিনমাল নামে পরিচিত) জন্মেছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা সম্ভবত সিন্ধু থেকে এসেছিলেন। এই ভিল্লামালা ছিল পশ্চিম ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য গুর্জারদেশের রাজধানী, যা আধুনিক ভারতের দক্ষিণ রাজস্থান এবং উত্তর গুজরাট নিয়ে গঠিত। তখন এই অঞ্চল গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা প্রশিক্ষণের একটি কেন্দ্রবিন্দু ছিল। জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময়ে এই ভিল্লামালায় তিনি বাস করেছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন। পৃথুদাক স্বামীন তাঁকে ভিল্লামালার শিক্ষক ভিল্লামালাচার্য বলে অভিহিত করেছিলেন।

ব্রহ্মগুপ্তের পিতা জিষ্ণুগুপ্ত (Jishnugupta) নিজে সম্ভবত একজন জ্যোতিষী ছিলেন।ব্রহ্মগুপ্তরা ছিলেন শৈব। তবে ব্রহ্মগুপ্তের শৈশব বা যৌবন সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্যের অভাব রয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করে তিনি ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার চারটি প্রধান বিদ্যালয়ের মধ্যে একটি ব্রহ্মপক্ষ বিদ্যালয়ের একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়ে উঠেছিলেন। এছাড়াও তিনি প্রথম আর্যভট্ট, বরাহমিহির, শ্রীসেন, বিজয়ানন্দিন, লতাদেব, প্রদ্যুম্ন, সিংহ এবং বিষ্ণুচন্দ্রের মতো মহান গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাজ অধ্যয়ন করেছিলেন।

জানা যায় যে, ব্রহ্মগুপ্ত পরবর্তীকালে ভিল্লামালার কাজ সেরে চলে গিয়েছিলেন উজ্জয়িনীতে, যা কিনা জ্যোতির্বিদ্যাচর্চার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র ছিল, সেখানে জ্যোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান হয়েছিলেন তিনি।

৬২৮ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে ব্রহ্মগুপ্ত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ রচনা করেছিলেন, যেটির অর্থ করা যায় ব্রহ্মার সংশোধন করা গ্রন্থ বা মহাবিশ্বের উদ্বোধন। যেটি মূলত ব্রহ্মপক্ষ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ‘সিদ্ধান্ত’গুলির সংশোধিত সংস্করণ হলেও এতে অনেক নতুন কিছু যোগ করেছিলেন তিনি। এই বইটিতে সংস্কৃত ভাষায় ১০০৮টি স্তবক এবং মোট পঁচিশটি অধ্যায় বর্তমান। বইটিকে গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার পথপ্রদর্শক স্বরূপ বলা যেতে পারে। বইটির উল্লেখযোগ্য অংশগুলি জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক হলেও পাটিগণিত, বীজগণিত, ত্রিকোণমিতি, জ্যামিতি, অ্যালগরিদমের মতো গণিতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন ব্রহ্মগুপ্ত। এমনকি এই গ্রন্থের মধ্যে তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বহু গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদদের অনেক সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনাও করেছিলেন। এই গ্রন্থের অধিকাংশ অধ্যায়ই অন্যান্য গণিতবিদের ত্রুটির আলোচনাতে পূর্ণ।

তবে কেবলমাত্র সমালোচনাই নয়, এই ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ গ্রন্থে জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতের কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হয়েছে। এই গ্রন্থে পাটিগণিতের অনেক নিয়ম লিপিবদ্ধ রয়েছে যা বর্তমানে গাণিতিক সমাধানের ক্ষেত্রে খুবই কার্যকারী। এছাড়াও গণিতে শূন্যের প্রয়োগ নিয়ে যে আলোচনা এই গ্রন্থে ব্রহ্মগুপ্ত করেছিলেন তা গণিতশাস্ত্রের জন্য সত্যিই অমূল্য এক সম্পদ হয়ে রয়েছে। তাছাড়াও এই বইতে চক্রীয় চতুর্ভুজ সূত্রের মতো বহু জ্যামিতিক তত্ত্ব, পাই-এর মান নির্ণয়, দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান ইত্যাদি গণিতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়েও বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে৷ আরও একটি আশ্চর্যজনক বিষয় হল, যে এই গ্রন্থেই ব্রহ্মগুপ্ত ‘গুরুত্বাকর্ষণম’ শব্দটি ব্যবহারের দ্বারা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিরও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এর থেকে বুঝতেই পারা যাচ্ছে যে, পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের তুলনায় ভারতীয় বিজ্ঞানশাস্ত্র কতখানি এগিয়ে ছিল।

কথিত আছে, অষ্টম শতাব্দীর আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর টাইগ্রিসের তীরে বাগদাদে তাঁর নতুন প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাকেন্দ্রে ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ গ্রন্থটি নিয়ে এসেছিলেন। এটি ভারতীয় গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার সঙ্গে ইসলামীয় বিজ্ঞান ও গণিতের যোগসূত্রের প্রমাণ।

‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ ছাড়াও ব্রহ্মগুপ্ত ৬৬৫ সালে ৬৭ বছর বয়সে সংস্কৃত ভাষাতেই ‘খন্ডখাদ্যক’ নামে জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এই গ্রন্থটিতে সর্বমোট আটটি অধ্যায় ছাড়াও রয়েছে পরিশিষ্ট অংশ। এই গ্রন্থটিতে চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ নিয়ে যেমন আলোচনা রয়েছে, তেমনই গ্রহগুলির প্রতিদিনের ঘূর্ণন, গ্রহগুলির দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় ইত্যাদি জ্যোতির্বিজ্ঞানের নানারকম বিষয়ের অবতারণা করেছেন ব্রহ্মগুপ্ত। আনন্দপুরের অমা-শর্মন চালুক্য যুগে এই ‘খন্ডখাদ্যক’ গ্রন্থের একটি ভাষ্য রচনা করেছিলেন। আল-বিরুণি এই গ্রন্থটির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। জ্যেতির্বিদ্যা প্রশিক্ষণের জন্য এই গ্রন্থটি ছাত্রদের দ্বারা একটি ম্যানুয়ালের মতো ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

ব্রহ্মগুপ্তের রচনা হিসেবে উল্লিখিত আরও দুটি গ্রন্থ হল, ‘দুর্কিমিনারদা’ এবং ‘কদমকেলা’। উজ্জয়িনীতে থাকাকালীন জ্যোতির্বিদ্যার উপরেই এই দুটি গ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন বলে জানা যায়।

গণিতে ও জ্যোতির্বিদ্যায় এই ব্রহ্মগুপ্তের অবদানগুলির দিকে একটু তাকানো যাক এবারে। প্রথমত, গণিতশাস্ত্রে ব্রহ্মগুপ্তের অবদান নিয়ে কথা বলতে হবে।

‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ গ্রন্থটিতে তিনি শূন্য এবং ঋনাত্মক সংখ্যার গাণিতিক প্রয়োগ নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, যখন কোন সংখ্যায় শূন্য যোগ করা হয় বা কোন সংখ্যা থেকে শূন্য বিয়োগ করা হয়, তখন সেই সংখ্যাটি অপরিবর্তিত থাকে এবং শূন্য দ্বারা গুণিত একটি সংখ্যা শূন্যই হয়। এও জানিয়েছিলেন যে, শূন্যকে অন্য কোন সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে শূন্য হয়।

সূত্রের মতো করে ব্রহ্মগুপ্ত জানিয়েছিলেন যে, দুটি ঋণাত্মক সংখ্যা একসাথে যোগ করলে সর্বদা একটি ঋণাত্মক সংখ্যা হয়। একটি ধনাত্মক সংখ্যা থেকে একটি ঋণাত্মক সংখ্যা বিয়োগ করা, তেমন দুটি সংখ্যা যোগ করারই সমান। একটি ধনাত্মক সংখ্যাকে ঋণাত্মক দ্বারা বা ঋণাত্মক সংখ্যাকে ধনাত্মক দ্বারা ভাগ করলে একটি ঋণাত্মক সংখ্যা হয়।

এইভাবে গণিতে শূণ্য এবং ধনাত্মক-ঋণাত্মক সংখ্যার প্রয়োগের ফলাফলগুলিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন তিনি। ভাগ্য এবং ঋণকে যথাক্রমে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক সংখ্যা হিসেবে ধরে তাদের গাণিতিক প্রয়োগকে বিশ্লেষণ করেছিলেন ব্রহ্মগুপ্ত। ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ বইতে গুণের জন্য চারটি পদ্ধতির উল্লেখ করেছিলেন তিনি, যার মধ্যে একটি হল ‘গোমূত্রিকা’ পদ্ধতি। এমনকি পূর্ণসংখ্যার ঘনক ও ঘনক মূল খুঁজে বের করার, বর্গ এবং বর্গমূলের গণনার সুবিধার জন্য কিছু নিয়মও বাতলে দিয়েছিলেন তিনি।

বীজগণিতেও ব্রহ্মগুপ্তের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানের সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন।

তাছাড়াও পাই-এর মান প্রায় নির্ভুলভাবে গণনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।

ব্রহ্মগুপ্তের উপপাদ্যও খুবই জনপ্রিয়। এছাড়াও জ্যামিতির জন্যও তিনি খুবই বিখ্যাত। চক্রীয় চতুর্ভুজের ক্ষেত্রফলের জন্য একটি সূত্র দেন তিনি, যা বর্তমানে ব্রহ্মগুপ্ত সূত্র নামে পরিচিত।

এবারে ব্রহ্মগুপ্তের জ্যোতির্বিদ্যার দিকে তাকানো যাক।

তিনি মহাকাশে অবস্থিত গ্রহগুলির দ্রাঘিমাংশ, চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, উদয়-অস্ত ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গভীর গবেষণা ও বিশ্লেষণ করেছিলেন।

তিনি তাঁর প্রথম বইতে জানিয়েছিলেন যে, একটি বছরের দৈর্ঘ্য মোট ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টা ৫ মিনিট ১৯ সেকেন্ড, কিন্তু ‘খন্ডখাদ্যক’ গ্রন্থে সেই হিসেব সংশোধন করে তিনি লিখেছিলেন, ৩৬৫ দিন, ৬ ঘন্টা ১২ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড।

‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ বইয়ের সপ্তম অধ্যায়ে এই মতকে তিনি খন্ডন করেছিলেন যে, পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব সূর্যের চেয়েও বেশি এবং জানিয়ে দেন আসলে সূর্যের চেয়েও পৃথিবীর কাছে অবস্থান করে চাঁদ।

তিনি সম্ভবত একটি ভয় থেকেই ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় কিংবদন্তির বিরোধিতা করতে চাননি বলেই, বলেছিলেন যে, পৃথিবী ঘোরে না, পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে না। তবে পৃথিবীর পরিধির পরিমাপ করে তিনি জানিয়েছিলেন যে, পৃথিবী ৩৬০০০ (২২,৫০০ মাইল) কিমি পরিধির একটি গোলক।

এইভাবে ভারতীয় গণিতশাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিদ্যাকে যে-মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন ব্রহ্মগুপ্ত, তা অতুলনীয়। দ্বিতীয় ভাস্কর ব্রহ্মগুপ্তকে ‘গণক-চক্র-চূড়ামণি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা চর্চায় ব্রহ্মগুপ্তের অবদানকে অস্বীকার করা যায় না৷

৬৬৮ সালে ৬৯-৭০ বছর বয়সে এই মহান গণিতজ্ঞ এবং জ্যোতির্বিদ ব্রহ্মগুপ্তের মৃত্যু হয়। মনে করা হয় উজ্জয়িনীতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।

[এখানে ব্যবহৃত ছবিটি অ্যানড্রিয়াস স্ট্রিক-এর আঁকা ]


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading