হুগলি নদীর উপর নির্মিত জুবিলি ব্রিজ (Jubilee Bridge) বাংলার রেল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য। প্রায় ১২৯ বছর ধরে এই সেতুটির ওপর দিয়ে নৈহাটি–ব্যান্ডেল রেলপথে ট্রেন চলাচল করত। রানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৮৮৫ সালে এই ব্রিজ উদ্বোধন করা হয়েছিল, এবং সেই কারণেই এর নাম রাখা হয় জুবিলি ব্রিজ। পরবর্তীকালে নতুন ব্রিজ চালু হওয়ার পর ২০১৬ সালে এই সেতুটি বন্ধ করা হয়। তবে ট্রেন চলাচল বন্ধ হলেও, দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে জুবিলি ব্রিজ আজও স্থানীয়দের কাছে একটা আবেগ হয়ে রয়েছে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
জুবিলি ব্রিজ কোথায়
জুবিলি ব্রিজ, পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর উপর অবস্থিত এবং এটি পশ্চিমবঙ্গের দুই জেলা, উত্তর ২৪ পরগনা এবং হুগলি জেলা সঙ্গে যুক্ত করেছে। সেতুটি নৈহাটি আর ব্যান্ডেলের মাঝখানে তৈরি। রেললাইনের দিক থেকে বললে এটি গরিফা স্টেশন আর হুগলি ঘাট স্টেশনের মধ্যে সংযোগকারী। সেতুটির এক কিলোমিটার দুরত্বে হুগলী ইমামবাড়া এবং আড়াই কিলোমিটার দুরত্বে ব্যান্ডেল চার্চ অবস্থিত।
জুবিলি ব্রিজের ইতিহাস
১৮৮২ সালে জুবিলি ব্রিজ তৈরির কাজ শুরু হয়। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে সেই সময় কলকাতা ও তার আশপাশের যোগাযোগ দ্রুত বাড়ানো হচ্ছিল। বিভিন্ন নতুন নতুন সেতু বা রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছিল। তবে নদীর উপর স্থায়ী সেতু বানানো তখন সহজ কাজ ছিল না। সেতুর ভিত তৈরির কাজে নদীর গভীরতা, স্রোতের ওপর নির্ভরতা অনেককিছু বিচার করতে হত। লন্ডনের বিখ্যাত টাওয়ার ব্রিজের প্রজেক্ট-ইঞ্জিনিয়ার স্যার জন উলফ-ব্যারির ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আর্থার জন ব্যারি জুবিলি ব্রিজ তৈরির দায়িত্বে ছিলেন। ব্রিজের নকশা তৈরি করেছিলেন স্যার ব্র্যাডফোর্ড লেসলি এবং আলেকজান্ডার মিডোজ রেন্ডেল। ব্রিজ তৈরিতে যে ইস্পাত ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলো ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের কোম্পানি থেকে তৈরি হয়ে এসেছিল। অবশেষে ১৮৮৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বের ৫০ বছর পূর্তি বা গোল্ডেন জুবিলি উপলক্ষে এই সেতুটি উদ্বোধন করা হয়। সেই কারণেই সেতুর নাম রাখা হয় জুবিলি ব্রিজ।
দীর্ঘ সময় ধরে নৈহাটি এবং ব্যান্ডেলের মধ্যে রেল যোগাযোগের প্রধান ভরসা ছিল এই সেতু। প্রায় ১২৯ বছর এই সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল করেছে। এই দীর্ঘ সময় এত ভার বহন করে সেতুটিতে নানান সমস্যা দেখা দিতে থাকে। বিশেষ করে সেতুর বিয়ারিং ফাটল দেখা দেয়। তাই একটা সময় ট্রেন চলাচলের সময় ট্রেনকে ধীর গতিতে চলতে হত। অবশেষে এই সেতুর পাশেই নতুন সেতু তৈরি হয়, যার নাম সম্প্রীতি সেতু। সম্প্রীতি সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু করে। অবশেষে ২০১৬ সালের ১৭ এপ্রিল জুবিলি ব্রিজের উপর দিয়ে শেষ ট্রেন ১৩১৪১ তিস্তা তোর্সা এক্সপ্রেস পাড় হয়ে যায়। তারপর জুবিলি ব্রিজ বন্ধ করা হয়। তবে সেতুটি বন্ধ হয়ে গেলেও একে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আবেগ কমেনি। সেতুটিকে “হেরিটেজ” তকমা দেওয়ার দাবী উঠেছে।
জুবিলি ব্রিজের গঠনশৈলী
জুবিলি ব্রিজ ছিল একটি স্টিল ক্যান্টিলিভার ট্রাস ব্রিজ। সেতুর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩৬৬ মিটার। এটি মূলত তিনটি বড় স্প্যানে ভাগ করা – দুই পাশে দুটি বড় স্প্যান এবং মাঝখানে একটি কেন্দ্রীয় ক্যান্টিলিভার স্প্যান। এই ব্রিজের অন্যতম বিশেষত্ব এই যে – এর ইস্পাত কাঠামো, রিভেটিং পদ্ধতিতে জোড়া দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ নাট-বল্টু দিয়ে নয়, বরং কাঠামোটি রিভেট দিয়ে গাঁথা। সেই সময় এই পদ্ধতি খুব জনপ্রিয় ছিল।
ব্রিজের নিচে যে পিলার বা স্তম্ভ আছে, সেগুলি লোহার কেসন (Caisson) ভিত্তির উপর নির্মিত। এই ধরনের ভিত্তি তখন নদীর স্রোত ও নরম তলদেশ সামলানোর জন্য খুবই কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হত। এই ব্রিজে ঢালাই লোহা দিয়ে নির্মিত পেন্ডুলাম বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়েছিল। এই বিয়ারিংগুলোর কাজ ছিল তাপমাত্রা পরিবর্তনে ব্রিজের প্রসারণ-সংকোচন সামলানো এবং চলন্ত ট্রেনের কম্পন ও চাপ সহ্য করা। সেতুর ডেক বা রেললাইন এমন উচ্চতায় রাখা হয়েছিল যাতে বড় কোন বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে নদীর জলস্তর বেড়ে গেলেও সেই জলস্তর এবং সেতুর মাঝে যেন পর্যাপ্ত ফাঁক থাকে। এর ফলে নদীপথে নৌচলাচলে বাধা আসার সম্ভাবনা থাকে না।
জনজীবনে জুবিলি ব্রিজের প্রভাব
একশো ঊনত্রিশ বছর ধরে এই সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল করেছে। ফলে নৈহাটি–ব্যান্ডেল অঞ্চলে যারা নিত্য যাতায়াত করেন, জুবিলি ব্রিজ ছিল তাঁদের রোজকার সঙ্গী। নৈহাটি ও ব্যান্ডেল অঞ্চলের সঙ্গে কলকাতা ও অন্য রেলপথের যোগাযোগ সহজ হওয়ায় শ্রমিক, কর্মচারী, ব্যবসায়ী সবাই উপকৃত হয়েছেন এই সেতুর দ্বারা। বিশেষ করে হুগলি নদীর দুই পাড়ের শিল্পাঞ্চল, জুটমিল এবং বাজারগুলির মধ্যে সংযোগ বজায় রাখতে এই সেতু বড় ভূমিকা রেখেছিল। ২০১৬ সালে ব্রিজ দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ার পরেও মানুষের কাছে এই সেতুর গুরুত্ব অনেক। কারণ এটি ইতিহাসের অংশ। একদিকে নতুন সম্প্রীতি সেতু দিয়ে ট্রেন যাতায়াত চলছে, কিন্তু পুরনো জুবিলি ব্রিজ এখনও নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে- একটা প্রাচীন স্মৃতি নিয়ে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান